পারমাণবিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহারের কারণে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্ত হতে পারে বলে সতর্ক বার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’। সংস্থাটির নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। যদিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এই সম্ভাবনার হার তুলনামূলকভাবে কম।
‘ল্যানসেট কমিশন অন টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে আগামী ৭৫ বছরে মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন ১৭টি বড় হুমকির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণায় ৩৫ জন বিশেষজ্ঞ অংশ নেন, যার তথ্য-উপাত্ত জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিতব্য ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিট’-এ উপস্থাপন করা হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক যুদ্ধ, জৈবাস্ত্র তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, শৈশবকালের পুষ্টিহীনতা, স্থূলতা এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য তহবিল হ্রাস মানব সভ্যতার জন্য অন্যতম প্রধান বাধা। এসব সংকট একে অপরের সাথে যুক্ত এবং এগুলো সামলাতে বিশ্বনেতাদের এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কমিশনের সহ-সভাপতি ও ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের পরিচালক অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, “আজকের বিশ্বনেতারা যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন, তা আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নির্ধারণ করবে। তিন বছর আগে যখন আমরা কাজ শুরু করি, তখন ভেবেছিলাম যুদ্ধ, জলবায়ু ও মহামারী—এই তিনটিই সবচেয়ে বড় হুমকি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হুমকির ব্যাপ্তি অনেক বিশাল। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোর উচিত আগাম প্রস্তুতি ও প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করা।”
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা মারাত্মক জৈবাস্ত্র লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে পারে, যা চরম পর্যায়ে মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে, পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে যে বিপুল ধূলিকণা ছড়াবে, তা সূর্যের আলো আটকে দিয়ে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করবে।
গবেষকরা ‘অসুস্থতা বা অকালমৃত্যুর’ কারণে মানুষের সুস্থ জীবনের কত বছর নষ্ট হতে পারে, তা মাপার জন্য ‘ডিজেবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ (ডিএএলওয়াই) পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যদি ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ে, তবে চরম দাবাদাহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ও নতুন নতুন রোগের কারণে কোটি কোটি মানুষ অসুস্থ হবে ও মারা যাবে। কিন্তু বিশ্ব যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখতে পারে, তবে বিশ্বজুড়ে মানুষ রোগভোগ ও অকালমৃত্যু এড়িয়ে সব মিলিয়ে ১৮৯ কোটি বছর বেশি সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে।
প্রতিবেদনটিতে বিশ্বব্যাপী অঞ্চলভেদে ঝুঁকির ভিন্নতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। উন্নত বা উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে স্থূলতা ও মানসিক স্বাস্থ্য অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে কম শিক্ষা ও পুষ্টিহীনতাই প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি। মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে সরকারগুলোকে আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে প্রতি বছর এই মূল্যায়ন নবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছে কমিশন।