বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিদলের বৈঠকে চুক্তির বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে। কিন্তু এই চুক্তি আসলে কী? এর মাধ্যমে কি বাংলাদেশ নতুন করে ঋণ পাবে, নাকি এর সঙ্গে রয়েছে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা?
সহজ ভাষায়, এই চুক্তির মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক কোন কোন খাতে সহযোগিতা করবে, তার একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ বা সিপিএফ। সহজ ভাষায়, এটি একটি দেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কয়েক বছরের উন্নয়ন সহযোগিতার রূপরেখা। আগামী দিনে কোন কোন খাতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, কোথায় অর্থায়ন করা হতে পারে এবং কোন ধরনের সংস্কারে সহযোগিতা প্রয়োজন, তা এই কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়।
বিষয়টিকে একটি দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনা হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। যেমন, একটি শহরকে উন্নত করতে হলে আগে ঠিক করতে হয় কোথায় রাস্তা তৈরি হবে, কোথায় হাসপাতাল প্রয়োজন এবং কোন এলাকার উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর প্রতিটি প্রকল্পের জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরি করা হয়। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সিপিএফও অনেকটা সে রকম। এটি সামগ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করে, আর নির্দিষ্ট প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের জন্য পরে আলাদা অনুমোদন ও চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।
কেন এই চুক্তি করা হয়?
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ওয়েবসাইটে কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক বা সিপিএফ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অনেক ধরনের সহায়তার প্রয়োজন হয়। কোথাও অবকাঠামো তৈরি করতে হয়, কোথাও কর্মসংস্থান বাড়াতে হয়, আবার কোথাও শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করতে হয়। কিন্তু সব খাতে একই সময়ে সমান গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। তাই দেশের প্রয়োজন ও উন্নয়নের লক্ষ্য বিবেচনা করে বিশ্বব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সরকার সহযোগিতার অগ্রাধিকার ঠিক করে।
এই কাঠামোর মাধ্যমে কোন খাতে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি হয়। এতে উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ানো, নীতিগত সংস্কার এবং অর্থনীতির বিভিন্ন সমস্যার সমাধানেও গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
এই চুক্তির মাধ্যমে কি বাংলাদেশ ঋণ পাবে?
সিপিএফের সঙ্গে ঋণের বিষয়টি জড়িত থাকলেও এটি নিজে কোনো নির্দিষ্ট ঋণচুক্তি নয়। অর্থাৎ, সিপিএফ চূড়ান্ত হলেই বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাবে, এমন নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। বরং এই কাঠামোতে ভবিষ্যতে কোন কোন খাতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন প্রয়োজন হতে পারে, তার দিকনির্দেশনা থাকে।
পরবর্তী সময়ে কোনো প্রকল্পে ঋণ বা অনুদান দিতে হলে সেটির জন্য আলাদা প্রস্তাব, মূল্যায়ন এবং অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে। প্রকল্পের ধরন অনুযায়ী অর্থ ছাড়ের শর্তও নির্ধারিত হয়। ফলে সিপিএফকে সম্ভাব্য অর্থায়নের সামগ্রিক পরিকল্পনা বলা যায়, কিন্তু নিশ্চিত অর্থপ্রাপ্তির চুক্তি নয়। তবে বাংলাদেশ এই চুক্তি থেকে কী পেতে পারে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য চুক্তিটি হওয়ার পর জানা যাবে। কারণ, একেক দেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক এই চুক্তি করে একেক রকম শর্তে।
বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মধ্যে এই চুক্তির আলোচনা অবশ্য নতুন করে শুরু হয়নি। ২০২৩ সাল থেকেই এই আলোচনা চলছে। সেই সময়ে বাংলাদেশ ও ভুটানে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুলায়ে সেক বলেছিলেন, “বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মধ্যে পাঁচ দশকের শক্তিশালী অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে এই কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ দেশ হতে চায়। এ লক্ষ্য অর্জনে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের উপযোগী শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে। সরকারের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সবার অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতির সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে এই কাঠামো সহায়তা করবে।”
সিপিএফ তৈরির আগে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ দেশজুড়ে এবং অনলাইনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা করেছে। এসব আলোচনায় সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিনিয়োগ সংস্থা ‘এমআইজিএ’র অপারেশনস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জুনায়েদ কামাল আহমদ বলেন, “বাংলাদেশের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী। দেশটি স্বল্প সময়ের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এ জন্য বেসরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
কোন কোন খাতে সহযোগিতা আসতে পারে?
দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সিপিএফে বিভিন্ন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য কমানো, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের মতো বিষয় থাকতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উন্নত করা এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের মতো বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে নতুন সিপিএফে ঠিক কোন কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে, তা চূড়ান্ত কাঠামো প্রকাশের পরই জানা যাবে।
বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি এর বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি নিশ্চয়তাবিষয়ক সংস্থা ‘মাল্টিল্যাটারাল ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি এজেন্সি (এমআইজিএ)’ কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও সহযোগিতার পরিকল্পনায় বিবেচিত হতে পারে। এসব সংস্থার কাজের ধরন এক নয়। তাই তাদের সম্ভাব্য সহায়তাও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ও অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা আইএফসির কান্ট্রি ম্যানেজার মার্টিন হল্টম্যান বলেছেন, “বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উদাহরণ। তবে রপ্তানি বাড়াতে এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরও বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারি খাত গড়ে তোলার জন্য অতিরিক্ত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও এর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের অর্থায়নও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করার মতো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন সিপিএফের মাধ্যমে সরকার ও বিশ্বব্যাংক যদি দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সমাধানে অভিন্ন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে, তাহলে উন্নয়ন সহযোগিতার পরিকল্পনা আরও সমন্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে কোন খাতে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করাও সহজ হবে। তবে বাস্তবে কতটা সুফল পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত পরিকল্পনা, প্রকল্প নির্বাচন, সংস্কার বাস্তবায়ন এবং অর্থায়নের অনুমোদনের ওপর।
অন্য দেশেও কি এমন চুক্তি হয়?
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত দেশভিত্তিক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার অংশ। বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক এ ধরনের কাঠামো তৈরি করে। এর মাধ্যমে প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বিবেচনা করে সহযোগিতার ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশেও এর আগে বিভিন্ন মেয়াদে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এ ধরনের কাঠামো কার্যকর ছিল। ফলে এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। বরং আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন সময়ের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী সহযোগিতার পরিকল্পনা হালনাগাদ করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তিকে শুধু নতুন ঋণ পাওয়ার চুক্তি হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এটি মূলত আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া। কোন খাতে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কী ধরনের সংস্কারে সহায়তা মিলতে পারে এবং ভবিষ্যতে কোন প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে, তার একটি সামগ্রিক রূপরেখা তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। তবে পরিকল্পনায় কোনো খাত অন্তর্ভুক্ত হওয়া আর সেই খাতে অর্থ অনুমোদন পাওয়া এক বিষয় নয়। চূড়ান্ত চুক্তি ও পরবর্তী প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমেই সহযোগিতার প্রকৃত পরিধি স্পষ্ট হবে।