বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট সূচকে এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ভিসামুক্ত সুবিধা পাওয়া দেশের সংখ্যা আগের চেয়ে একটি কমেছে। এমনিতে তথ্য এটুকুই। কিন্তু পাসপোর্ট সূচকে অগ্রগতি বা অবনমনের এই তথ্য আসলে কী বার্তা দিচ্ছে?
একটি পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের পরিচয়পত্র নয়, বরং একজন নাগরিক বিশ্বের কতটা দেশে সহজে প্রবেশ করতে পারবেন, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। কোনো দেশের পাসপোর্ট নিয়ে ভিসা ছাড়াই কিংবা আগাম ভিসা অনুমোদন ছাড়াই যত বেশি দেশে যাওয়া যায়, আন্তর্জাতিক চলাচলের ক্ষেত্রে সেই পাসপোর্টকে তত বেশি শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। এই দেশটির নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি দেশে ভিসামুক্ত চলাচলের সুযোগ পায়। তাই সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী বলে বিবেচিত।
বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। বৈশ্বিক সূচকে যেকোনো দেশের পাসপোর্টের অবস্থানই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা পর্যটনের জন্য ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পাসপোর্ট সূচকে একটি দেশের অগ্রগতি বা অবনমন দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কূটনৈতিক তৎপরতাসহ নানা বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত সূচকে জানা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট সূচকে এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের অক্টোবরে শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯৯তম। তবে এবার ভিসামুক্ত সুবিধা নিয়ে যাওয়া যায়, এমন দেশের সংখ্যা কমেছে।
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, কোনো দেশের পাসপোর্ট দিয়ে আগাম ভিসা ছাড়া কিংবা ভিসামুক্ত সুবিধা নিয়ে কতটি দেশে যাওয়া যায়, তার ওপর ভিত্তি করে শক্তিশালী পাসপোর্টের এই সূচক তৈরি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট ও ২২৭টি ভ্রমণ গন্তব্য।
এই সংস্থা প্রতি বছর বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টের সূচক প্রকাশ করে থাকে। এই প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পাসপোর্টের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান ছিল ২০২২ সালে। এর পর ধীরগতিতে হলেও কিছুটা উন্নতি দেখা গিয়েছে, কখনো আবার কিঞ্চিৎ অবনতিও হয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থানে পরিবর্তন কতটা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন, এরপর আসে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশ ৯৮তম অবস্থানে ছিল। সে সময় বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৪১টি দেশে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা পেত। পরের বছরই পাসপোর্ট সূচকে তিন ধাপ পিছিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০১তম। তবে ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা একই ছিল।
বাংলাদেশ আর উত্তর কোরিয়ার পাসপোর্টের র্যাংক এখন একই। ছবি: সংগৃহীত
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ওই বছর বাংলাদেশে সার্বিকভাবে বেশ অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ওই বছর ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২১ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়- ওই বছর রাজনৈতিক সংঘাতের ৯৩২টি ঘটনায় ১৫৭ জন নিহত হন। এসব সংঘাতের বড় অংশ ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধকেন্দ্রিক।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ওই বছর কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, বাড়ি-ঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। এসব ঘটনা দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
২০২২ সালে বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে আরও পেছায় বাংলাদেশে। ওই বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৩তম। আর ভিসামুক্ত দেশের সুবিধাও কমে ৪০টি হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ওই বছরে দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-সংকট, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি বিভাগীয় শহরগুলোতে আন্দোলন করেছিল।
পরের বছর দুই ধাপ এগিয়ে সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান হয় ১০১তম। ভিসামুক্ত দেশের সুবিধাও আবার ৪১টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ওই বছর বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভিসা বিধিনিষেধ আরোপের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিল ওয়াশিংটন।
ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি দল, বিরোধী দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এর আওতায় আসতে পারেন। ওই বছর বিএনপিও তাদের আন্দোলন জোরদার করেছিল।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পটপরিবর্তন ঘটে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। পরে দায়িত্ব নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছর বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি দেখা যায়।
হেনলি পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯৭তম। আর ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ ছিল ৪২টি দেশে। গত বছরে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০০তম। আর ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুবিধা ছিল ৪০টি দেশে।
সূচক অনুযায়ী, শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯৯তম। তবে এবার ভিসামুক্ত সুবিধা নিয়ে যাওয়া যায়- এমন দেশের সংখ্যা কমেছে। এবার বাংলাদেশের সঙ্গে একই অবস্থানে আছে উত্তর কোরিয়া।
এখন বাংলাদেশ ও উত্তর কোরিয়ার পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা আগাম ভিসা ছাড়া কিংবা ভিসামুক্ত সুবিধা নিয়ে বিশ্বের ৩৫টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন।
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত সূচকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট সূচকের এই ওঠানামা থেকে বোঝা যায়- আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান এখনও বেশ সীমিত। তবে শুধু র্যাংকিংয়ে পরিবর্তন দিয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতা কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব নির্ধারণ করা যায় না। কারণ, এই সূচক মূলত বিভিন্ন দেশের ভিসানীতি এবং ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের সুযোগের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান উন্নত করতে হলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিসা অব্যাহতি চুক্তি বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক আস্থা তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেখতে হবে, বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য নতুন নতুন দেশের দরজা খুলছে কি না?
সমালোচকদের মতে, পাসপোর্টের শক্তি শুধু একটি তালিকায় কত ধাপ এগিয়ে বা পিছিয়ে আছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং একজন বাংলাদেশি নাগরিক কতটা সহজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতে পারছেন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিতে পারছেন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে চলাচলের স্বাধীনতা পাচ্ছেন- সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের পাসপোর্ট সূচকে অবস্থান কত, তা নয়। বরং, আগামী দিনে এই অবস্থান বদলাতে নাগরিকদের জন্য আরও বেশি ভ্রমণসুবিধা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কতটা কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে, তা-ই মুখ্য বিবেচ্য বিষয়।