
বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কী বার্তা দিচ্ছে?
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত সূচকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট সূচকের এই ওঠানামা থেকে বোঝা যায়- আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান এখনও বেশ সীমিত।
চরচা ডেস্ক

গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬-এর বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১০৫তম। ১৩৯টি দেশের অর্থনীতির এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২১ দশমিক ৫। দক্ষিণ এশিয়ার ছয় দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে সর্বশেষ অবস্থানে। সূচকে বাংলাদেশের এই অবস্থান আসলে দেশের সার্বিক অর্থনীতি এবং এতে উদ্ভাবনী শক্তির ভূমিকা ও প্রয়োগ সম্পর্কে একটা ধারণা দেয়। এটি একই সঙ্গে জানান দেয় ক্রমপরিবর্তনশীল অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশ খাপ খাওয়াতে কতটা প্রস্তুত, এর শক্তি বা দুর্বলতাই-বা কোথায়?
জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) সম্প্রতি গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সের ১৯তম সংস্করণ প্রকাশ করেছে। এবারের প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘পাওয়ারিং অন্ট্রাপ্রেনারস অ্যাট দ্য ফ্রন্টিয়ার অব সায়েন্স’।
তবে ২০২০ ও ২০২১ সালের তুলনায় সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। ওই দুই বছর দেশের অবস্থান ছিল ১১৬তম। অন্যদিকে, ২০২২ সালে এক লাফে ১৪ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ চলে এসেছিল ১০২-এ। কিন্তু ২০২৩ সালে আবার পিছিয়ে অবস্থান হয় ১০৫। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৬। অর্থাৎ, এবার একধাপ এগিয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির স্কোর ৪০ দশমিক ১ এবং বৈশ্বিক অবস্থান ৩৮তম। তালিকায় এরপর রয়েছে ভুটান ৭৪তম, শ্রীলঙ্কা ৯৪তম, পাকিস্তান ৯৫তম এবং নেপাল ১০৪তম।
একটি দেশের সামগ্রিক উদ্ভাবন সক্ষমতা পরিমাপে ডব্লিউআইপিও মোট ৭৯টি সূচক ও দুটি প্রধান দিক (ইনপুট ও আউটপুট) আমলে নেয়। ইনপুট হিসেবে বিবেচনা করা হয় দেশের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ (রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও সরকারি নীতি), মানবসম্পদ ও গবেষণা (শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান এবং গবেষণায় সরকারি-বেসরকারি ব্যয়), অবকাঠামো (তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও লজিস্টিকস সক্ষমতা), বাজারের পরিপক্বতা (সহজে ঋণ ও বিনিয়োগ পাওয়ার সুবিধা এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল) এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ (জ্ঞানভিত্তিক কর্মী, উচ্চপ্রযুক্তি আমদানি ও করপোরেট গবেষণা)।
অন্যদিকে আউটপুট হিসেবে বিবেচনা করা হয় উদ্ভাবনের বাস্তব ফলাফল যেমন পেটেন্ট আবেদন, বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা, উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য রপ্তানি, ডিজিটাল সেবা এবং সৃজনশীল পণ্য ও সেবার উৎপাদন। এসবের সমন্বয়েই নির্ধারিত হয় কোনো দেশের চূড়ান্ত অবস্থান।
ইনপুট-আউটপুটে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এবার সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো–ইনপুটের তুলনায় আউটপুটে দেশের অবস্থান বেশ এগিয়ে।
ইনপুটে বাংলাদেশ এবার রয়েছে ১১৫তম স্থানে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবে ইনপুট সূচকে অবস্থান এখনো পিছনের সারিতে।
ইনোভেশন ইনপুটের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অবকাঠামোয় বাংলাদেশ রয়েছে ৮৪তম অবস্থানে। বাজার সক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম। তবে মানবসম্পদ ও গবেষণায় দেশটির অবস্থান ১২৭তম। ব্যবসায়িক সক্ষমতায় ১২৫তম এবং প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১১৩তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
আউটপুটে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করে বাংলাদেশ চলে এসেছে ৯২তম স্থানে।
তবে ইনোভেশন আউটপুটের দুটি স্তম্ভে বাংলাদেশের অবস্থান খুব ওপরে নয়। জ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫তম। সৃজনশীল উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশটি রয়েছে ৮৭তম অবস্থানে।
শিক্ষা ও গবেষণায় ঘাটতি এবং বিভিন্ন সূচকে পিছিয়ে থাকার কারণে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তালিকার নিচের দিকেই।
এর চেয়েও খারাপ খবর হলো, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় অবস্থানের চেয়ে বাংলাদেশ বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ উপসূচকে, যেমন: প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, মানবসম্পদ ও গবেষণা, ব্যবসায়িক দক্ষতা, এবং জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত ফলাফলে পিছিয়ে আছে।
বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার, বিশ্বমানের ল্যাব কিংবা শীর্ষ উদ্ভাবনী ক্লাস্টারে তালিকায় বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনো নজরে পড়ার মতো নয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টেকসই প্রতিযোগিতায় বড় বাধা।
উপ-সূচকগুলোর মধ্যে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আইসিটি সেবা আমদানি, শিক্ষাখাতে ব্যয়, বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প গবেষণা সহযোগিতা, মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীর স্বল্পতা।
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬-এর উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের উদ্ভাবন ইকোসিস্টেমের একটি বাস্তবমুখী চিত্র ফুটে উঠেছে। ইনডেক্সে বাংলাদেশের অর্জন এবং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর বিশদ বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উদ্ভাবনী সম্ভাবনার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ যেখানে ‘একটু’ এগিয়ে
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তিনটি প্রধান শক্তির জায়গাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন, জ্বালানি ব্যবহারের বিপরীতে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম। জিডিপির শতাংশ হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণ বিবেচনায় অবস্থান ১২ এবং শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিতে অবস্থান ২১।
পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার (২৫তম) ও মোট মূলধন গঠন (২৬তম) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তরুণ জনসংখ্যার আধিক্য বা ‘ইয়ুথ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (৪১তম), ইউনিকর্ন ভ্যালুয়েশন (৪৭তম), সাইটেবল ডকুমেন্ট এইচ-ইনডেক্স (৫৭তম) এবং সেরা তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিউএস র্যাঙ্কিং (৫৮তম) সূচকেও দেশের তুলনামূলক ইতিবাচক পারফরম্যান্স পরিলক্ষিত হয়।

এখানে ইউনিকর্ন ভ্যালুয়েশন হলো–একটি দেশের জিডিপির তুলনায় সে দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম কতটা শক্তিশালী এবং বড় আকারের বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে, তার সূচক।
দুর্বলতা কোথায়
শক্তিমত্তার বিপরীত দিকে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী অগ্রযাত্রায় বেশ কিছু বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে মৌলিক সূচকগুলোর দুর্বলতা। বৈশ্বিক করপোরেট আরঅ্যান্ডডি (গবেষণা ও উন্নয়ন) বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি (৪৬তম) এবং শীর্ষ বৈশ্বিক ব্র্যান্ড মূল্যে (৮১তম) পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি বরাদ্দ (৮৯তম) ও পেটেন্ট নিবন্ধনের হার (৯৮তম) বেশ নিম্নমুখী।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ইউনিকর্ন ভ্যালুয়েশনে এগিয়ে থাকলেও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অর্থায়নের অপ্রতুলতা। এখানে চুক্তি সংখ্যায় ১০৯তম এবং প্রাপ্ত তহবিলের পরিমাণে ১১২তম স্থানে অবস্থান করছে দেশ।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রির অভাব (১১৪তম), উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কম আগমন (১১৭তম), বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে গবেষণা ও উন্নয়ন সমন্বয়ের অভাব (১২৮তম) এবং মোট বাণিজ্যে আইসিটি সেবা আমদানির হার (১৩২তম) বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
উপাত্তগুলোর সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ তার সীমিত সম্পদ ও সাশ্রয়ী অবকাঠামো ব্যবহার করে শ্রম উৎপাদনশীলতা এবং ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অর্থনীতিতে অভাবনীয় পারফরম্যান্স প্রদর্শন করলেও গবেষণা ও উদ্ভাবনের টেকসই ভিত্তি গঠনে এখনো বেশ পিছিয়ে। উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার, স্টার্টআপ খাতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পেটেন্ট বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে শিল্পকারখানার সমন্বিত গবেষণা জোরদার করতে না পারলে আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন প্রতিযোগিতায় টেকসই অগ্রগতি অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং থাকবে।

বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কী বার্তা দিচ্ছে?
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত সূচকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট সূচকের এই ওঠানামা থেকে বোঝা যায়- আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগের ক্ষেত্রে দেশের অবস্থান এখনও বেশ সীমিত।

‘মোস্তাফিজ ২.০’ হয়ে ফিরবেন নাহিদ রানা?
‘মোস্তাফিজুর ২.০’ হয়ে ফিরবেন নাহিদ রানা? আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে ড্র হওয়া টেস্টের পঞ্চম দিনের শেষ ঘণ্টায় একজনকে খুব মিস করেছে বাংলাদেশ দল। তিনি নাহিদ রানা। কেননা, চলতি বছরই পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে পঞ্চম দিনে একটা স্পেলে তার গতিময় বোলিংয়ের সামনে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা উ

ইরান-হুতিদের কারণে কতটা ঝুঁকিতে উপসাগরীয় ডেটা সেন্টারগুলো
উপসাগরীয় দেশগুলো এতদিন নিজেদের আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেও প্রযুক্তির জন্য শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ এলাকা হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু চলমান যুদ্ধ তাদেরকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ইরান এখন প্রযুক্তির এই নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তাকেই একটি ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার বানাতে চাইছে।

হুতি কারা, কী চায় তারা?
হুতিরা উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী। তারা দেশটির সংখ্যালঘু জায়দি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে। জায়দিবাদ শিয়া ইসলামের একটি শাখা।