চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাস বলছে, প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, সরকারের লক্ষ্যের চেয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। একই সঙ্গে সংস্থাটি মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করেছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে সরকারের প্রত্যাশার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মূল্যায়নের বড় ব্যবধান দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ে এবং একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান দুর্বল থাকে, তাহলে মানুষ দুই দিক থেকে চাপের মধ্যে পড়বে।
গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি গত এপ্রিলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। জুলাইয়ে তা আরও কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হয়। সর্বশেষ পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, এপ্রিলের হিসাবের তুলনায় ছয় মাসে পূর্বাভাস কমেছে ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট।
আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি করোনার সময়ের চেয়েও কম হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাথমিক হিসাবে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ফলে আইএমএফের পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে প্রায় চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর চরচাকে বলেন, “সরকারের প্রবৃদ্ধির যে প্রত্যাশা সেটা হয়তো পূরণ হবে না। কারণ, অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা ভালো নয়। হাতে গোনা কয়েকটি সূচক ছাড়া প্রায় সবগুলো সূচকের অবস্থা খারাপ। এই পরিস্থিতে অর্থনীতি চাঙ্গা করা কঠিন। আর অর্থনীতি ভালো না হলে প্রবৃদ্ধিও কমতে পারে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা একই সঙ্গে কম প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির মধ্যে আছি। সাধারণত প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে অর্থনীতিতে চাহিদার চাপ কমে এবং মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার পরও মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু চাহিদার নয়; এর সঙ্গে সরবরাহ, জ্বালানি, বিনিময় হার, বাজার কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা জড়িয়ে আছে।”
সেলিম রায়হান আরও বলেন, “প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা অর্থায়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট আছে। সুদের হার বেড়েছে। সরকারের রাজস্ব পরিস্থিতি দুর্বল হওয়ায় উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় করার সক্ষমতাও সীমিত। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষা করার প্রবণতা বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন ঝুঁকিও আছে।”
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর ক্ষেত্রে আইএমএফ একা নয়। বিশ্বব্যাংকও চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে ৪ শতাংশ। অর্থাৎ, তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবেই প্রবৃদ্ধি সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের নিচে থাকবে। তবে তাদের পূর্বাভাসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধির গতি কমার আশঙ্কা জানায়। এর আগে জুনে সংস্থাটি চলতি অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। পরে তা কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নামায়। এতে বোঝা যায়, চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন আগের তুলনায় আরও সতর্ক হয়েছে।
বাজেটের লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে আইএমএফের হিসাব
গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করে সরকার। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। পাশাপাশি গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ ধরা হয়েছে।
আইএমএফ’র লোগো। ছবি: রয়টার্স
প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য ও আইএমএফের পূর্বাভাসের ব্যবধান ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে ব্যবধান ৩ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ, সরকার যে হারে অর্থনীতির সম্প্রসারণ আশা করছে, আইএমএফ তার অর্ধেকেরও কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে, সরকার যে হারে মূল্যস্ফীতি কমানোর আশা করছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছে বৈশ্বিক সংস্থাটি।
বাজেট প্রণয়নের সময় সরকার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ঋণপ্রবাহ, আমদানি ব্যয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহের ওপর। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ১৬ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার আশঙ্কা
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে। গত এপ্রিলে সংস্থাটি মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দিয়েছিল ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট।
আইএমএফের হিসাবে, এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ গড় মূল্যস্ফীতির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু চলতি অর্থবছরে আবারও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা যায়। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো এতে বেশি চাপে পড়ে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেন, “সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অবশ্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ইতিমধ্যে অনেকটা ক্ষয় হয়েছে। এখন যদি মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ে এবং একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান দুর্বল থাকে, তাহলে মানুষ দুই দিক থেকে চাপের মধ্যে পড়বে। একদিকে খাদ্য, বাসা ভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ বাড়বে; অন্যদিকে আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে বাড়বে না। নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার তখন খাদ্যের পরিমাণ বা মান কমানো, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় পিছিয়ে দেওয়া, সঞ্চয় ভাঙা কিংবা ঋণ নেওয়ার মত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এর প্রভাব শুধু বর্তমান ভোগে সীমাবদ্ধ থাকে না; ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপরও পড়ে।”
আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এডিবির পূর্বাভাসেও মূল্যস্ফীতির চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। এডিবি সরবরাহসংক্রান্ত চাপ, জ্বালানির ঘাটতি, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য জাহাজ চলাচলের বিঘ্নের কথা উল্লেখ করেছে। বিশ্বব্যাংকও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতির কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির কথা জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানির ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। আইএমএফের জুলাইয়ের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি করেছে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির প্রয়োজন বেড়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে এবং প্রবাসী আয়ের ধারা বেশি থাকা সত্ত্বেও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জ্বালানি ও শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের ব্যয় বাড়ে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে পণ্যের দাম বাড়ালে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে। আবার জ্বালানি আমদানিতে বেশি ডলার খরচ হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হয়।
সেলিম রায়হান বলেন, “জ্বালানি খাতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। শুধু এলএনজি আমদানি করে সংকট সামাল দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাস্তবসম্মত সম্প্রসারণ করতে হবে এবং আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে।”
জ্বালানি আমদানির ওপর কর ও শুল্কের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন এই অর্থতীনিতবিদ।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগে ধীরগতি
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ব্যাংক খাত। সংস্থাটি জানুয়ারিতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ২০২৫ সালের আর্টিকেল ফোর পর্যালোচনায় দুর্বল ব্যাংক খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম রাজস্ব আদায় এবং বিনিময় হার সংস্কারে ধীরগতিকে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়। এতে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে পারে না। অন্যদিকে, ঋণের সুদ, ব্যবসার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগ্রহ কমাতে পারে। এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও বেসরকারি ঋণপ্রবাহে ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে। জুনের শেষ দিকে প্রকাশিত মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের জুন শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। এর আগে নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। পরে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি ঋণপ্রবাহের গতি কম থাকলে নতুন শিল্প স্থাপন, যন্ত্রপাতি কেনা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে ঋণপ্রবাহ কমার অর্থ সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ কমে যাওয়া নয়। ঋণের চাহিদা, সুদের হার, ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা এবং ব্যবসায়ীক আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ব্যাংক খাতের চাপ এখনো বেশি। সংস্থাটি ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশল নেওয়ার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। ব্যাংক খাতের সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “ব্যাংকিং খাতের সংস্কার দ্রুত করতে হবে। দুর্বল ব্যাংককে বছরের পর বছর কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখা, খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে বারবার ছাড় দেওয়া কিংবা প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা চলতে পারে না। কোন ব্যাংক কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা সম্ভব, কোনটির একীভূতকরণ প্রয়োজন এবং কোথায় মালিকানা ও পরিচালনায় পরিবর্তন দরকার- এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা না ফিরলে বিনিয়োগেও আস্থা ফিরবে না।”
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বাজেট বাস্তবায়নেও চাপ
রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতাও বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। জানুয়ারিতে প্রকাশিত আর্টিকেল ফোর পর্যালোচনায় সংস্থাটি বলেছিল, বাংলাদেশের রাজস্ব আয় দীর্ঘদিন ধরে কম। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে বাধা তৈরি করছে।
সরকারের আয় কম হলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়। তখন ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। আবার ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি হয়। তবে এই প্রভাব নির্ভর করে ব্যাংক খাতে তারল্যের অবস্থা, সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক মুদ্রানীতির ওপর।
চলতি অর্থবছরে সরকার বড় বাজেট বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু রাজস্ব আদায় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়বে। এ অবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের জন্য কঠিন হবে।
সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “সরকারের যে আয়-ব্যয়ের হিসাব সেটা কাজ করবে না। কারণ, আয়ের হিসাব যেটা করা হয়েছে সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবে না সরকার। কারণ, এনবিআর যদি আয় না করে তাহলে আর কোথা থেকে আয় হবে। অন্য উৎস থেকে টাকা নেওয়া যাবে কিন্তু সেটা তো ঋণ। তাই সরকারকে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়াতে হবে।”
আইএমএফ রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ভর্তুকি আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার সুপারিশ করেছে। সংস্থাটি বলছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারলে অগ্রাধিকারভিত্তিক সামাজিক ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অর্থের জোগান নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর সংস্কারের চাপ কমাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন।
সেলিম রায়হানও বলেছেন, “রাজস্ব সংস্কারের ‘বিকল্প নেই’।” তার মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। কিন্তু রাজস্ব বাড়ানো মানে যারা ইতিমধ্যে কর দিচ্ছেন তাদের ওপর আরও বেশি চাপ দেওয়া নয়। করের আওতা বাড়াতে হবে, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি ও বিশেষ সুবিধা পর্যালোচনা করতে হবে, প্রত্যক্ষ করের ভূমিকা বাড়াতে হবে এবং কর প্রশাসনে হয়রানি ও স্বেচ্ছাচারিতা কমাতে হবে।
বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ
বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনাও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে এবং রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। প্রবাসী আয় এই চাপ সামলাতে সহায়তা করলেও আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রয়োজন বিবেচনায় রাখতে হয়।
আইএমএফের জানুয়ারির মূল্যায়নে বিনিময় হার সংস্কারে ধীরগতিকে অর্থনীতির একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সংস্থাটি জুলাইয়ের বিবৃতিতে বলছে, ২০২৫ সালে চালু করা ক্রলিং পেগ বিনিময় হার ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।