পশ্চিম আফ্রিকার স্থলবেষ্টিত দেশ বুরকিনা ফাসো। পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় দরিদ্র এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরে খরা, অর্থনৈতিক সংকট ও বারবার সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে পড়েছে। তবে সম্প্রতি একদম ভিন্ন একটি কারণে আলোচনায় এসেছে বুরকিনা ফাসো।
দেশটিতে সব ধরনের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা আপাতত স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের দুই মাস পর দেশটিতে তরুণীদের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
বুরকিনা ফাসো সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দেশের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও নারীর ক্ষমতায়নের একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন এই উদ্যোগ?
তরুণীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সরকারের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা ও পেশাগত সহায়তার মাধ্যমে তরুণীদের বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহিত করা।
আফ্রিকা নেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার দেশের ‘সাংস্কৃতিক পরিচিতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবমর্যাদা’ রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলো যাতে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সে লক্ষ্যে নতুন নীতিমালাও তৈরি করছে সরকার।
গত ৮ জুন দেশটির যোগাযোগ, সংস্কৃতি, শিল্প ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সব ধরনের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিতের কথা নিশ্চিত করে।
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা বন্ধের দুই মাসের মাথায় গত আগস্টে দেশটির সরকার ‘হাকিলি মুসো’ নামে একটি জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার সূচনা করে। এই প্রতিযোগিতায় দেশের ৮৪ জন তরুণী গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়ে মুখোমুখি হন। কৃতী প্রতিযোগীদের সম্মাননা ও বৃত্তি দেওয়া হয়।
প্রতিযোগিতা শেষে প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে বিজয়ীদের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তরুণীদের নিজেদের মেধার ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ার গঠন করে ভবিষ্যতে বড় লক্ষ্য অর্জনের পরামর্শ দেন।
বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওর। ছবি: রয়টার্স
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে কেন বিজ্ঞানচর্চা?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্য বলছে, বুরকিনা ফাসোতে জনসংখ্যা মাত্র ২ কোটি ৩৬ লাখ। নানাকারণে দেশটি দরিদ্রতায় জর্জরিত। বুরকিনা ফাসোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণের মজুত রয়েছে। তবে অর্থনীতির অবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট বলছে, এরই মধ্যে সুন্দরী প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে এই বিজ্ঞানচর্চা চালু করার সিদ্ধান্তটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে। অনেকেই এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে তরুণীরা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করতে এবং এ ক্ষেত্রে পেশা গড়তে উৎসাহিত হবে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি নারীর ক্ষমতায়ন এবং তাদের জন্য আরও সুযোগ তৈরির পথে একটি পদক্ষেপ।
ইনস্টাগ্রামে একজন লিখেছেন, “এটি দূরদর্শী একটি উদ্যোগ! ভাবুন তো, এটি কত তরুণীকে অনুপ্রাণিত করবে! দারুণ উদ্যোগ!”
আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “আমি এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই! তিনি দেশের জন্য কাজ করছেন। একজন নারীকে শিক্ষিত করলে পুরো পরিবার শিক্ষিত হয়। তা ছাড়া, সৌন্দর্যশিল্প যত মেয়ের উপকার করেছে, তার চেয়ে বেশি মেয়ের ক্ষতি করেছে।”
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমতও দেখা গেছে। কেউ কেউ নারীর নিজের পছন্দমতো কিছু করার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, বিজ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করার অর্থ এই নয় যে সৌন্দর্য ও নারীত্বকে উপেক্ষা করতে হবে। নারীদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
এক্সে এক ব্যক্তি লিখেছেন, “দুটিই কেন করা যাবে না? নারীত্ব ও সৌন্দর্যকেও উদযাপন করা উচিত!”
সবশেষে, বুরকিনা ফাসোর এই উদ্যোগ একদিকে যেমন তরুণীদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী করে তোলার নতুন সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি নারীর স্বাধীনতা ও পছন্দের অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে নারীদের পছন্দের পরিসর সংকুচিত না করে বরং আরও বিস্তৃত করাও জরুরি। শেষ পর্যন্ত সৌন্দর্যচর্চা কিংবা বিজ্ঞানচর্চা–কোন পথে এগোবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নারীদেরই থাকা উচিত।