Advertisement Banner

দ্য ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদন

ফিরছে বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা: দায় কার?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ফিরছে বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা: দায় কার?
ফিরছে বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা। ছবি: এআই

২০০৮ সালে লেম্যান ব্রাদার্সের পতন বিশ্বজুড়ে কি ভয়াবহ আর্থিক মন্দার সূত্রপাত করেছিল, তা সবাই জানে। আগের বছরগুলোতেই কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতিবিদেরা চিন্তিত ছিলেন। তবে তাদের উদ্বেগ ঋণে জর্জরিত মার্কিন ব্যাংকগুলোকে নিয়ে ছিল না। তারা চিন্তিত ছিলেন, এশিয়ার সাশ্রয়ী অর্থনীতিগুলো নিয়ে।

সেই সময় ‘গ্লোবাল সেভিং গ্লাট’ বা বিশ্বজুড়ে সঞ্চয়ের আধিক্য নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ডলারের রিজার্ভ বা মজুত বাড়ানোর প্রতি এশীয় দেশগুলোর প্রবল ঝোঁক সুদের হার কমিয়ে দিচ্ছিল, যা আমেরিকানদের অতিরিক্ত খরচে প্রলুব্ধ করে।

ফলশ্রুতিতে, এশিয়ার দেশগুলোতে ব্যয়ের চেয়ে আয় বেড়ে গিয়েছিল, যা বড় ধরনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি করেছিল। বিপরীতে, আমেরিকায় আয়ের চেয়ে ব্যয় হচ্ছিল বেশি। যার প্রতিফলন ঘটেছিল দেশটির বিশাল ‘কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট’ বা চলতি হিসাবের ঘাটতিতে (যেখানে বাণিজ্য ঘাটতিসহ অন্যান্য বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত)।

তখনকার সেই আলোচিত বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা কিন্তু আবারও ফিরে এসেছে। আর একে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন এক বিশ্লেষণধর্মী তৎপরতা।

গত মার্চ মাসে চারজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর কাছে এই ভারসাম্যহীনতা নিয়ে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়েছেন। ইউরোপের দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সেন্টার ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চ (সিইপিআর) এবং ব্রুগেল ইনস্টিটিউট এর নতুন প্রকাশনা— চতুর্থ প্যারিস রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই স্মারকলিপি তৈরি করা হয়েছে। চলতি মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) এই বিষয়ের ওপর নিজেদের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে।

বর্তমান এই বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা দুই দশক আগের মতো অতটা প্রকট নয়। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে ঘাটতিতে থাকা দেশগুলোর সম্মিলিত ‘কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট’ বা চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল বিশ্ব জিডিপির ১.৬ শতাংশ। অথচ ২০০৬ সালে এর পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ২.৬ শতাংশ।

বর্তমান এই বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা দুই দশক আগের মতো অতটা প্রকট নয়। ছবি: এআই
বর্তমান এই বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা দুই দশক আগের মতো অতটা প্রকট নয়। ছবি: এআই

তবে বর্তমান সময়ে এসে এই বিতর্কটি আগেরবারের চেয়েও অনেক বেশি জটিল। গত বছর নিজের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার এই ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছিলেন। অন্যদিকে, বর্তমানে জি-৭-এর প্রধান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ গত ডিসেম্বরে বেইজিং সফরকালে চীনের এই উদ্বৃত্ত আয়কে অসহনীয় বলে অভিহিত করেছেন।

প্যারিস রিপোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০ বছর আগে যখন এই ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আলোচনা হতো, তখন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইতেন “এই বিপদের নেপথ্যে আসলে আছে কে? আর ভুক্তভোগীই বা কে এবং কেন?” আজ আবারও সেই একই প্রশ্নগুলো সামনে চলে এসেছে।

প্রথমত এই প্রশ্নের একটি উত্তর হলো আমেরিকার বাজেট ঘাটতি। কয়েকটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজস্ব শিথিলকরণ বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে।

ট্যাক্স বা কর কমানো অথবা সামাজিক খাতে খাতে ব্যয় বাড়ানোর ফলে আমেরিকানদের ভোগব্যয় বেড়ে যায় এবং সঞ্চয় কমে যায়। এটি সুদের হার এবং সেই সঙ্গে ডলারের মান বাড়িয়ে দিতে পারে— যার ফলে রপ্তানি পণ্য প্রতিযোগিতার বাজারে পিছিয়ে পড়ে এবং বাণিজ্য ঘাটতি আরও ঘনীভূত হয়। আবার বিশ্বজুড়ে সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে এটি অন্যান্য দেশে সঞ্চয়ের প্রবণতা এবং তাদের ‘কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স’ বা চলতি হিসাবের ভারসাম্যকেও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

তবে শুধু ম্যাখোঁই নন, অন্যান্য বিশ্লেষকেরা আত্মবিশ্বাসী যে, এই পরিস্থিতির মূল হোতা আবারও এশিয়া, বিশেষ করে চীন। তবে এবারের ঘটনা আর আগের বারের মতো রিজার্ভ বা মজুদের পাহাড় গড়া নয়, বরং অন্যায্য শিল্পনীতির কারসাজি।

চীন তার উৎপাদন খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়, যার ফলে দেশটিতে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়। এই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন পণ্যগুলো নিজেদের বাজারে বিক্রি করতে পারে না, তখন তারা বিদেশের বাজারে সেগুলো সস্তায় ছেড়ে দেয়। এতে অন্যান্য দেশের স্থানীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, যার ফলে কর্মসংস্থান নষ্ট হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং চাহিদা পুনরুদ্ধার ও বেকারত্ব কমাতে আমেরিকার মতো দেশগুলো তাদের বাজেট ঘাটতি বাড়াতে বাধ্য হয়।

এই সহজ সরল ব্যাখ্যার পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকিয়ে আছে। সিইপিআরের আমব্রোজিও সেসা-বিয়াঞ্চি এবং তার সহ-গবেষকদের একটি গবেষণাপত্রে শিল্পনীতির ‘তীব্রতা’ পরিমাপ করা হয়েছে। তারা মূলত ২৪টি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত আলোচনায় (আর্নিংস কল) এই নীতি কতবার ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তার ভিত্তিতে পরিমাপটি করেছেন। দেখা গেছে, শিল্পনীতির এই পরিমাপের সঙ্গে ২০০২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রপ্তানি বৃদ্ধির একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতির নাট্যমঞ্চে চিত্রনাট্য সচরাচর এত সহজ হয় না। যেহেতু এই ভারসাম্যহীনতা সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল, তাই এখানে মানুষের প্রত্যাশাও বড় ভূমিকা পালন করে। আর এই প্রত্যাশাই অনেক সময় আমাদের সাধারণ ধারণার উল্টো ফল বয়ে আনে।

আমেরিকার বাজেট ঘাটতি এবং এর ফলে সৃষ্ট বাণিজ্য ঘাটতির চাপের জন্যও কি শেষ পর্যন্ত চীনই দায়ী? ছবি: এআই
আমেরিকার বাজেট ঘাটতি এবং এর ফলে সৃষ্ট বাণিজ্য ঘাটতির চাপের জন্যও কি শেষ পর্যন্ত চীনই দায়ী? ছবি: এআই

আইএমএফ উল্লেখ করেছে যে, শিল্পনীতি গ্রহণ করলেই যে একটি দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত হবে, তা অনিবার্য নয়। বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই নীতিটি কি স্থায়ী নাকি সাময়িক হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং সেটি দক্ষতা বৃদ্ধিতে সফল হচ্ছে নাকি উল্টো ফল দিচ্ছে, তার ওপর।

যদি এই নীতিকে একটি সাময়িক সাফল্য হিসেবে দেখা হয়, তবে আয় সাময়িকভাবে বাড়লেও মানুষ তাদের ব্যয় বাড়াবে না। এর ফলে সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্য ভারসাম্যের উন্নতি ঘটবে। অন্যদিকে, যদি এই নীতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য হিসেবে দেখা হয় যেটি স্থায়ীভাবে আয় বাড়াবে, তবে মানুষ তাদের ব্যয়ও বাড়িয়ে দেবে। সেক্ষেত্রে বাণিজ্য ভারসাম্যে কোনো বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না। কারণ, রপ্তানি বাড়লেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমদানিও বাড়বে।

প্রকৃতপক্ষে, সেসা-বিয়াঞ্চি এবং তার সহ-গবেষকেরা শিল্পনীতির তীব্রতা পরিমাপের সঙ্গে একটি দেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সারপ্লাস বা চলতি হিসাবের উদ্বৃত্তের কোনো সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পাননি।

শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বা বাড়তি আয় ধরে রাখতে হলে তার সঙ্গে মানুষের কেনাকাটা কমিয়ে রাখার একটি যোগসূত্র থাকতে হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, চীন ঠিক এই কৌশলটিই বেছে নিয়েছে। দেশটির রক্ষণশীল অর্থনৈতিক নীতি এবং দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেদের আয়ের বড় অংশ জমিয়ে রাখতে বাধ্য হয়।

তবে এই যুক্তিতে একটি ফাঁক আছে। চীনের বাড়তি আয় বা উদ্বৃত্ত যখন বেড়েছে বা কমেছে, তখন মানুষের কেনাকাটা কমানোর প্রবণতা কিন্তু সেই একইভাবে বদলায়নি। দেখা গেছে, উদ্বৃত্ত আয় বাড়ার সময়ও চীন সরকার পেনশন এবং পুরনো পণ্য বদলে নতুন পণ্য কেনার প্রকল্পে খরচ বাড়িয়েছে।

আইএমএফ-এর হিসাব বলছে, ২০২৩ সালে চীনের বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির ১২.৮ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪.৩ শতাংশে। অথচ অবাক করার মতো বিষয় হলো, একই সময়ে দেশটির চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ১.৪ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৩.৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

চীনে অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা বা খরচ কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো আবাসন খাতের ধস। যদিও এই ধসের সূত্রপাত হয়েছিল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নেওয়ার ওপর সরকারের কড়াকড়ির কারণে, কিন্তু নীতিনির্ধারকেরা সম্ভবত আশা করেননি যে আবাসন বিনিয়োগ এভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে। তারা এটাও চাননি যে, বাড়ির দাম কমে যাওয়ার প্রভাবে সাধারণ মানুষের খরচ করার ক্ষমতা কমে যাক। তাই বৈশ্বিক এই ভারসাম্যহীনতার জন্য যদি চীনকে দায়ী করা হয়, তবে একে পরিকল্পিত অপরাধের চেয়ে একটি বড় ভুল হিসেবে দেখাই শ্রেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, আমেরিকার বাজেট ঘাটতি এবং এর ফলে সৃষ্ট বাণিজ্য ঘাটতির চাপের জন্যও কি শেষ পর্যন্ত চীনই দায়ী? উত্তর হলো—একেবারেই না। বিশ্বজুড়ে আর্থিক সংকটের পরবর্তী বছরগুলোতে যখন চাহিদার অভাব ছিল এবং সুদের হার ছিল একেবারে নিচে, তখন কর্মসংস্থান ঠিক রাখতে আমেরিকার বড় বাজেট ঘাটতির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই বছরগুলোতে চীনের উদ্বৃত্ত আয় উল্টো কমছিল।

অন্যদিকে, ২০২১ সাল থেকে আমেরিকা বরং অতিরিক্ত চাহিদার চাপে ভুগছে, যার ফলে সুদের হারও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার বিশাল বাজেট ঘাটতি কোনো অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি তাদের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

পরিশেষে, বৈশ্বিক এই ভারসাম্যহীনতার কারণগুলো ততটা স্পষ্ট নয় যতটা অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন। এখানে সব পক্ষই কোনো না কোনোভাবে জড়িত এবং পুরো বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তবে এর শেষটা যে খুব একটা ভালো কিছু বয়ে আনবে না, সেই শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সম্পর্কিত