ads

নেপালে সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবে দলগুলোর ভিন্নমত

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
নেপালে সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবে দলগুলোর ভিন্নমত
নেপালের পতাকা।

নেপালের সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত সরকারি টাস্ক ফোর্স দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের কাছে ২৫৫টি ধারা সংশোধনের সুপারিশ সম্বলিত ৫০০ পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ আলোচনাপত্র জমা দিয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন জমা পড়ার পর দেশটিতে এক বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বেশ কয়েকটি দল এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কাঠমান্ডু পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

Advertisement

এখন সংবিধান সংশোধনের এই সরকারি উদ্যোগের ভবিষ্যৎ এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। ২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রামবরণ যাদব নেপালের বর্তমান যে সংবিধানটি ঘোষণা করেছিলেন, তার ৩০৮টি ধারার মধ্যে ২৪৫টি ধারাই পরিবর্তনের এই খসড়া প্রস্তাবটি মূলত দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, শাসন কাঠামো এবং ফেডারেলিজম বা শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে। তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সুপারিশমালা বা সংশোধনী প্যাকেজ নয়। বরং পরবর্তী আলোচনার একটি ভিত্তি মাত্র বলে টাস্ক ফোর্সের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে।

এই টাস্ক ফোর্সের প্রধান সমন্বয়কারী এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অসীম শাহ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তাদের দেওয়া এই দলিলের উদ্দেশ্য সংবিধানকে দুর্বল করা কিংবা এর মূল ভিত্তি ভেঙে দেওয়া নয়। এই টাস্ক ফোর্স মূলত রাজনৈতিক দল, সাংবিধানিক সংস্থা, আইনি বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারক, সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন মতামত ও পরামর্শ সংগ্রহ করে এই সংকলনটি তৈরি করেছে।

অসীম শাহের তথ্য অনুযায়ী, তারা বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রায় ৪৪ হাজার ৬১৩টি পরামর্শ পেয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ হাজার ২৩৯টি ইমেলের মাধ্যমে এবং ২৫ হাজার ৩৭৪টি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এসেছে। তবে টাস্ক ফোর্সের কোনো নিজস্ব অবস্থান বা রাজনৈতিক এজেন্ডা তৈরি করার আইনি এখতিয়ার ছিল না। তারা সংগৃহীত পরামর্শগুলোকে ২০টি প্রধান ভাগে ভাগ করে এই প্রতিবেদনটি সাজিয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু পরামর্শও রয়েছে যা সরাসরি সংবিধান সংশোধন না করে প্রচলিত আইন পরিবর্তনের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। প্রতিবেদনটিতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, নেপালের সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং জনগণের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যে মূল উৎস, এই মৌলিক বিষয়গুলোতে কোনো প্রকার পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়নি।

সংগৃহীত এই ৫৪টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের মধ্যে আটটি প্রধান ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্টের ব্যবস্থা চালু করা, নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার, বিচার বিভাগের পুর্নগঠন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যা হ্রাস করা এবং বর্তমানের সাতটি প্রদেশের ফেডারেল বা প্রাদেশীয় কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা। এমনকি নেপালের বর্তমান ফেডারেল ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করার দাবিও এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি, প্রবাসী নেপালি নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রদান এবং আদালতের সকল স্তরে বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই আলোচনায় উঠে এসেছে।

তবে রাজনৈতিক দলগুলো এবং নেপালের প্রবীণ সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এই সরকারি উদ্যোগের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় রকমের সংশয় প্রকাশ করেছেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তিকারাম ভট্টরাই মনে করেন, শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়াটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে যখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই টাস্ক ফোর্স থেকে একে একে তাদের প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করে নেয়, তখন এর নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

তাদের মতে, সংবিধানের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশোধনী আনতে গেলে দেশের সমস্ত প্রধান রাজনৈতিক শক্তির স্বত্বাধিকার এবং গভীর জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন, যা এই টাস্ক ফোর্সের কার্যক্রমে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।

নেপালের জেন-জি আন্দোলনে সহিংসতা। ছবি: রয়টার্স
নেপালের জেন-জি আন্দোলনে সহিংসতা। ছবি: রয়টার্স

নেপালের বর্তমান পার্লামেন্টের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে নেপালি কংগ্রেস, সিপিএন-ইউএমএল এবং এনসিপি (নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি) শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছে। নেপালি কংগ্রেসের অবস্থান ছিল যে সংবিধান সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয় কোনো অবস্থাতেই শুধুমাত্র সরকারের নির্বাহী বিভাগের একার সিদ্ধান্তে পরিচালিত হতে পারে না। এই আশঙ্কায় তারা এই টাস্ক ফোর্সে যোগ দেয়নি। পরবর্তীতে সিপিএন-ইউএমএল এবং এনসিপির মতো বড় দলগুলোও টাস্ক ফোর্স থেকে বের হয়ে আসে।

তাদের মূল অভিযোগ ছিল, সরকারের এই টাস্ক ফোর্স তাদের মূল ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে সংবিধান সংশোধনের নামে আসলে পুরো সংবিধানটিকে নতুন করে লেখার এবং এর মূল রাজনৈতিক মতৈক্যগুলো নষ্ট করার চেষ্টা করছে।

নেপালি কংগ্রেস এবং সিপিএন-ইউএমএল বর্তমান সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য যেমন- ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, পার্লামেন্ট দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সংসদীয় ব্যবস্থা এবং মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে এনসিপি, জনতা সমাজবাদী পার্টি এবং জনমত পার্টির মতো দলগুলো সরাসরি নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান এবং সম্পূর্ণ আনুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার পক্ষে দাবি জানিয়ে আসছে।

নেপালের জেন-জি আন্দোলন। ছবি: রয়টার্স
নেপালের জেন-জি আন্দোলন। ছবি: রয়টার্স

এদিকে, সরকারের এই একতরফা উদ্যোগকে প্রতিহত করতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে নেপালি কংগ্রেস ইতিমধ্যেই তাদের দলের সহ-সভাপতি পুষ্পা ভূসালের নেতৃত্বে একটি নিজস্ব ‘সংবিধান সংশোধন অধ্যায়ন ও পরামর্শ কমিটি’ গঠন করেছে।

দলের সভাপতি গগন থাপা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা নেপালের বহুত্ববাদী ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, আনুপাতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব এবং মৌলিক অধিকারের মতো মূল অর্জনগুলোর সাথে কোনো আপোস করবেন না। নেপালি কংগ্রেস বর্তমান সাত প্রদেশের কাঠামো বজায় রাখার পক্ষে হলেও কেন্দ্রীয়, প্রদেশীয় এবং স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বণ্টনের সাংবিধানিক তফশিলগুলো আরও স্পষ্ট করার দাবি তুলেছে।

অন্যদিকে, সিপিএন-ইউএমএলের সংবিধান সংশোধন দলের সদস্য মহেশ বৰ্তৌলা সরকারের এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, “সংবিধানে পরিবর্তনের কোনো সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ রোডম্যাপ সরকারের কাছে ছিল না এবং স্থানীয় নির্বাচনকে অরাজনৈতিক করার চেষ্টা থেকে বোঝা যায় যে- সরকার আসলে দেশের ফেডারেল কাঠামোর বিরোধী।”

একইভাবে এনসিপির দেব গুরুং এবং জনতা সমাজবাদী পার্টির উপেন্দ্র যাদব জোর দিয়ে বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া এই ধরনের সংশোধনী প্রস্তাবের কোনো আইনি বা রাজনৈতিক বৈধতা থাকতে পারে না।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ যদিও বিষয়টিকে শুধুমাত্র একটি সাধারণ আলোচনাপত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দলগুলোর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে একটি নতুন সর্বদলীয় সাংবিধানিক কমিশন গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই প্রতিবেদনটি এক গভীর বিভাজন তৈরি করেছে।

সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ভিমার্জুন আচার্য সতর্ক করে বলেছেন, “দেশ যদি একটি সর্বসম্মত পথ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর এই পারস্পরিক কাঁদা ছোড়াছুড়ি এবং দূরত্বের কারণে নেপাল শেষ পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট বিকল্প ছাড়াই তার বর্তমান সংবিধানটি হারানোর এক চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে।”

কাঠমান্ডু পোস্টের এই প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, হিমালয় কন্যা নেপালের শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংবিধানের সংস্কার অপরিহার্য হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস দূর না হওয়া পর্যন্ত এই বিশাল ৫০০ পৃষ্ঠার প্রস্তাবটি কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

সম্পর্কিত