ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতবাসীর কাছে যা চান, সাধারণত তা-ই পেয়ে যান। মহামারির সময় তিনি যখন ভারতীয়দের ঘরে থাকা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন, পুরো দেশ তা মেনে চলেছিল।
গত ১০ মে তিনি দেশবাসীকে করোনাকালের সেই শৃঙ্খলা আবারও ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেছেন। এবার সম্ভব হলে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এবং বিদেশ ভ্রমণ কমিয়ে আনার আহ্বানও জানান তিনি।
ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে মোদির এই অনুরোধ এল। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারত সরকার তেলের দাম বাড়তে দেয়নি, যার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোকে চড়া দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
তবে এশিয়ায় ভারতই একমাত্র দেশ নয়, যেখানে জনগণকে খরচ কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনসের মতো যে দেশগুলো অনেক আগে থেকেই জ্বালানি ব্যবহারে লাগাম টেনেছিল, তারাও এখন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি। যুদ্ধের এই ধাক্কা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ওলটপালট করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
পাকিস্তান ও ফিলিপাইনসের মতো যেসব দেশে তেলের দামের ওপর কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা সীমা নেই, সেখানে দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় উদ্বেগ হলো, জ্বালানি সরবরাহ হয়তো পুরোপুরিই শেষ হয়ে যেতে পারে। জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়ার কাছে মাত্র তিন সপ্তাহের এবং ভিয়েতনামের কাছে এক মাসের কম সময়ের জ্বালানি মজুত আছে।
ছবি: দ্য ইকোনমিস্ট
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানুষকে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় ভুগতে হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে প্রায়ই জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একজন কৃষক মিজানুর রহমানের ভাষ্য, “আমরা রাত ২টায় ঘুম থেকে উঠে প্রায় ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করি, শুধু দুই লিটার ডিজেল পাওয়ার জন্য।”
মিজানুর রহমানের এই কষ্ট মূলত কৃষি খাতের দুর্দশাকেই ফুটিয়ে তোলে। ডিজেলের পাশাপাশি কৃষকরা সারের সংকটেও ভুগছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত ইউরিয়া সারের দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে। এশিয়ার লাখো ধানচাষী বীজ বপন শুরু করলেও সারের অতিরিক্ত খরচের কারণে চাষাবাদের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফিলিপাইনসের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. আলিশের মির্জাবায়েভ দ্য ইকোনোমিস্টকে বলেন, “এই মুহূর্তে ধান চাষ একটি অলাভজনক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে, তবে এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।”
উদ্বেগে আছেন শিল্পকারখানার মালিকেরাও। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাত থেকে দেশের জিডিপির প্রায় ১৩% আসে। কারখানার মালিকদের মতে, চড়া দামের ডিজেল এবং পেট্রোকেমিক্যাল-ভিত্তিক রঙের কারণে উৎপাদন খরচ ১০-১৫% বেড়ে গেছে। একটি শিল্পসংস্থার মতে, দেশের সামগ্রিক কারখানা উৎপাদন প্রায় ৩০-৪০% কমে গেছে। জাপানের স্ন্যাকস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যালবি’ তাদের পণ্যের প্যাকেজিং সাদাকালো করে ফেলেছে, যাতে নাফথার বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া যায়।
নাফথা হলো একটি পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল, যা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। নাফথার এই ঘাটতির কারণে এশিয়ার বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই তাদের চুক্তির ক্ষেত্রে ‘অপারগতা’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ফিলিপাইনসের মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে ৭.২% এ পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.৮% হয়েছে, যা করোনা মহামারির পর সর্বনিম্ন। এটি আসলে একটি অশনিসংকেত। জাতিসংঘের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৬% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। জার্মানির কিল ইনস্টিটিউটের মতে, এই বছর ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১০% ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ছবি: দ্য ইকোনমিস্ট
এই পরিস্থিতি সরকারি কোষাগারকে একদম বিপর্যস্ত করে তুলছে। জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভারতের প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ কোটি ডলার। এ ছাড়া চলতি চাষের মৌসুমে সারে ভর্তুকি দিতে সরকারের আরও প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া জ্বালানি ভর্তুকিতে প্রতিদিন প্রায় ৬ কোটি ডলার খরচ করছে। ওয়াশিংটনের ‘সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট’-এর হিসাব অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ধরে রেখে পাম্পে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখতে গেলে এশিয়ার দেশগুলোর বছরে জিডিপির প্রায় ১% খরচ হয়ে যাবে।
এশিয়ার খুব কম দেশেরই এই বিপুল খরচ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আছে। কিন্তু দাম বাড়িয়ে দেওয়াটাও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতের কৃষকরা আশা করেন, সরকার সারে ভর্তুকি জারি রাখবে। যদিও নরেন্দ্র মোদি সারের ব্যবহার অর্ধেক কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে মোদি যখনই কৃষি সংস্কারের চেষ্টা করেছেন, তখনই গণবিক্ষোভের মুখে তা ভেস্তে গেছে। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, মূল্যবৃদ্ধির ফলে পুরো এশিয়া জুড়েই শ্রীলঙ্কার মতো গণ-অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। আমেরিকার নজরদারি সংস্থা ‘এসিএলইডি’-র তথ্য অনুযায়ী, ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইনস এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
জ্বালানি ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। এর এমন কিছু প্রভাব পড়তে পারে, যা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘকাল স্থায়ী হবে। যেমন, থাইল্যান্ড এখন ব্রাজিল ও লিবিয়ার মতো দেশ থেকে বেশি তেল কিনছে। এশিয়ার দেশগুলো জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুরের মতো কিছু দেশ নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করছে।
এই সংকটের মধ্যে এশিয়ার কিছু দেশ আবার লাভবানও হচ্ছে। কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় রপ্তানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়া বেশি পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রির বিনিময়ে পরিশোধিত জ্বালানি কেনার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। তারা ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা আরেকটি দেশ হলো চীন। তারা যে শুধু বেশি করে সোলার প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে, তা নয়। নিজেদের জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত ব্যবহার করে কূটনৈতিক প্রভাবও বাড়াচ্ছে তারা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও, চীনের বিশাল নিজস্ব তেলের মজুত রয়েছে, যা তাদের বড় ‘সুরক্ষা কবচ’ এবং কূটনৈতিক শক্তি জোগাচ্ছে।
চলতি মাসে চীন তাদের শোধনাগারগুলোকে কিছু পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল বিদেশে রপ্তানি করার অনুমতি দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর দিকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে কিছুটা শিথিল করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম চালানের জ্বালানি ভিয়েতনাম ও লাওসে যাবে, যাদের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি আমেরিকার মিত্ররাও এখন চীনের দ্বারস্থ হচ্ছে। গত ২৯ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং বেইজিং সফরে গিয়ে জেট ফুয়েলের একটি চুক্তি নিশ্চিত করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, এশিয়ার অনেক দেশই এখন একে অপরের কাছাকাছি আসার মধ্যে বড় সুযোগ দেখছে। ফিলিপাইনসে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক সম্মেলনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা জ্বালানির একটি যৌথ মজুত গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া, গত ৩ মে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ হাজার কোটি ডলার তহবিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি সফল হলে বিদ্যুতের দাম কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে। সিঙ্গাপুরের এনার্জি মার্কেট অথরিটির ইউজিন তোহ বলেন, “এই ব্যবস্থাটা থাকলে গত দুই মাসের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হতো।”
এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বিদ্যুৎ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করার ব্যাপারে সতর্ক ছিল। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর হাতে নিজেদের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগত তারা। এখন তারা হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো ঘটনার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাই এশীয় প্রতিবেশীদের মধ্যকার কোন্দল আর তেমন বড় কোনো হুমকি বলে মনে হচ্ছে না।
(লেখাটি ইকোনোমিস্ট থেকে নেওয়া)
ছবি: রয়টার্স
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতবাসীর কাছে যা চান, সাধারণত তা-ই পেয়ে যান। মহামারির সময় তিনি যখন ভারতীয়দের ঘরে থাকা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন, পুরো দেশ তা মেনে চলেছিল।
গত ১০ মে তিনি দেশবাসীকে করোনাকালের সেই শৃঙ্খলা আবারও ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেছেন। এবার সম্ভব হলে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এবং বিদেশ ভ্রমণ কমিয়ে আনার আহ্বানও জানান তিনি।
ইরানে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে মোদির এই অনুরোধ এল। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারত সরকার তেলের দাম বাড়তে দেয়নি, যার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলোকে চড়া দামে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
তবে এশিয়ায় ভারতই একমাত্র দেশ নয়, যেখানে জনগণকে খরচ কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনসের মতো যে দেশগুলো অনেক আগে থেকেই জ্বালানি ব্যবহারে লাগাম টেনেছিল, তারাও এখন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি। যুদ্ধের এই ধাক্কা পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ওলটপালট করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
পাকিস্তান ও ফিলিপাইনসের মতো যেসব দেশে তেলের দামের ওপর কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা সীমা নেই, সেখানে দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় উদ্বেগ হলো, জ্বালানি সরবরাহ হয়তো পুরোপুরিই শেষ হয়ে যেতে পারে। জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়ার কাছে মাত্র তিন সপ্তাহের এবং ভিয়েতনামের কাছে এক মাসের কম সময়ের জ্বালানি মজুত আছে।
ছবি: দ্য ইকোনমিস্ট
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানুষকে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় ভুগতে হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে প্রায়ই জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একজন কৃষক মিজানুর রহমানের ভাষ্য, “আমরা রাত ২টায় ঘুম থেকে উঠে প্রায় ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করি, শুধু দুই লিটার ডিজেল পাওয়ার জন্য।”
মিজানুর রহমানের এই কষ্ট মূলত কৃষি খাতের দুর্দশাকেই ফুটিয়ে তোলে। ডিজেলের পাশাপাশি কৃষকরা সারের সংকটেও ভুগছেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে উৎপাদিত ইউরিয়া সারের দাম যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে। এশিয়ার লাখো ধানচাষী বীজ বপন শুরু করলেও সারের অতিরিক্ত খরচের কারণে চাষাবাদের পরিমাণ কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফিলিপাইনসের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. আলিশের মির্জাবায়েভ দ্য ইকোনোমিস্টকে বলেন, “এই মুহূর্তে ধান চাষ একটি অলাভজনক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে, তবে এটি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।”
উদ্বেগে আছেন শিল্পকারখানার মালিকেরাও। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাত থেকে দেশের জিডিপির প্রায় ১৩% আসে। কারখানার মালিকদের মতে, চড়া দামের ডিজেল এবং পেট্রোকেমিক্যাল-ভিত্তিক রঙের কারণে উৎপাদন খরচ ১০-১৫% বেড়ে গেছে। একটি শিল্পসংস্থার মতে, দেশের সামগ্রিক কারখানা উৎপাদন প্রায় ৩০-৪০% কমে গেছে। জাপানের স্ন্যাকস প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যালবি’ তাদের পণ্যের প্যাকেজিং সাদাকালো করে ফেলেছে, যাতে নাফথার বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া যায়।
নাফথা হলো একটি পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল, যা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। নাফথার এই ঘাটতির কারণে এশিয়ার বেশ কয়েকটি প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই তাদের চুক্তির ক্ষেত্রে ‘অপারগতা’ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ফিলিপাইনসের মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে ৭.২% এ পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.৮% হয়েছে, যা করোনা মহামারির পর সর্বনিম্ন। এটি আসলে একটি অশনিসংকেত। জাতিসংঘের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৬% পর্যন্ত কমে যেতে পারে। জার্মানির কিল ইনস্টিটিউটের মতে, এই বছর ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১০% ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ছবি: দ্য ইকোনমিস্ট
এই পরিস্থিতি সরকারি কোষাগারকে একদম বিপর্যস্ত করে তুলছে। জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভারতের প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ কোটি ডলার। এ ছাড়া চলতি চাষের মৌসুমে সারে ভর্তুকি দিতে সরকারের আরও প্রায় ৪৩০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়া জ্বালানি ভর্তুকিতে প্রতিদিন প্রায় ৬ কোটি ডলার খরচ করছে। ওয়াশিংটনের ‘সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট’-এর হিসাব অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ধরে রেখে পাম্পে তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখতে গেলে এশিয়ার দেশগুলোর বছরে জিডিপির প্রায় ১% খরচ হয়ে যাবে।
এশিয়ার খুব কম দেশেরই এই বিপুল খরচ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আছে। কিন্তু দাম বাড়িয়ে দেওয়াটাও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতের কৃষকরা আশা করেন, সরকার সারে ভর্তুকি জারি রাখবে। যদিও নরেন্দ্র মোদি সারের ব্যবহার অর্ধেক কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে মোদি যখনই কৃষি সংস্কারের চেষ্টা করেছেন, তখনই গণবিক্ষোভের মুখে তা ভেস্তে গেছে। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, মূল্যবৃদ্ধির ফলে পুরো এশিয়া জুড়েই শ্রীলঙ্কার মতো গণ-অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। আমেরিকার নজরদারি সংস্থা ‘এসিএলইডি’-র তথ্য অনুযায়ী, ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ফিলিপাইনস এমনকি দক্ষিণ কোরিয়ায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
জ্বালানি ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎসের সন্ধান করছে। এর এমন কিছু প্রভাব পড়তে পারে, যা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘকাল স্থায়ী হবে। যেমন, থাইল্যান্ড এখন ব্রাজিল ও লিবিয়ার মতো দেশ থেকে বেশি তেল কিনছে। এশিয়ার দেশগুলো জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুরের মতো কিছু দেশ নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করছে।
এই সংকটের মধ্যে এশিয়ার কিছু দেশ আবার লাভবানও হচ্ছে। কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় রপ্তানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়া বেশি পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রির বিনিময়ে পরিশোধিত জ্বালানি কেনার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। তারা ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা আরেকটি দেশ হলো চীন। তারা যে শুধু বেশি করে সোলার প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে, তা নয়। নিজেদের জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত ব্যবহার করে কূটনৈতিক প্রভাবও বাড়াচ্ছে তারা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হওয়া সত্ত্বেও, চীনের বিশাল নিজস্ব তেলের মজুত রয়েছে, যা তাদের বড় ‘সুরক্ষা কবচ’ এবং কূটনৈতিক শক্তি জোগাচ্ছে।
চলতি মাসে চীন তাদের শোধনাগারগুলোকে কিছু পেট্রোল, ডিজেল ও জেট ফুয়েল বিদেশে রপ্তানি করার অনুমতি দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর দিকে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে কিছুটা শিথিল করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম চালানের জ্বালানি ভিয়েতনাম ও লাওসে যাবে, যাদের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি আমেরিকার মিত্ররাও এখন চীনের দ্বারস্থ হচ্ছে। গত ২৯ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং বেইজিং সফরে গিয়ে জেট ফুয়েলের একটি চুক্তি নিশ্চিত করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, এশিয়ার অনেক দেশই এখন একে অপরের কাছাকাছি আসার মধ্যে বড় সুযোগ দেখছে। ফিলিপাইনসে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক সম্মেলনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতারা জ্বালানির একটি যৌথ মজুত গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া, গত ৩ মে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এশিয়ার বিদ্যুৎ গ্রিডগুলোকে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জন্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ হাজার কোটি ডলার তহবিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি সফল হলে বিদ্যুতের দাম কমবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে। সিঙ্গাপুরের এনার্জি মার্কেট অথরিটির ইউজিন তোহ বলেন, “এই ব্যবস্থাটা থাকলে গত দুই মাসের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হতো।”
এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের বিদ্যুৎ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করার ব্যাপারে সতর্ক ছিল। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর হাতে নিজেদের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগত তারা। এখন তারা হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো ঘটনার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাই এশীয় প্রতিবেশীদের মধ্যকার কোন্দল আর তেমন বড় কোনো হুমকি বলে মনে হচ্ছে না।