চরচা ডেস্ক

প্রতিটি শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী আগের চেয়ে আরও কিছুটা সংকুচিত হয়। এর সঙ্গে এই নদীর পানির ওপর নির্ভর করা লাখো বাংলাদেশির জীবিকাও বিপন্ন হয়।
হংকং-ভিত্তিক ইংরেজি সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক নিবন্ধে বলেছে, বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে এই তিস্তা নিয়ে ভারতের কাছে সাহায্য চেয়ে আসছে। এখন, এর পরিবর্তে তারা বেইজিংয়ের কাছে অনুরোধ করছে।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে হংকংয়ের সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের শুরুর দিকে তিস্তা নদী পুনর্বাসন প্রকল্পে সহায়তার জন্য চীনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।
১০০ কোটি মার্কিন ডলারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পূর্ব হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবাহিত নদীপথের ১০২ কিলোমিটার (৬৩ মাইল)-এরও বেশি অংশ খনন ও পুনর্বাসন করা।
গত ৬ মে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ঢাকার এই অনুরোধ আসে। যেখানে ওয়াং বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’কে বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
চীন দীর্ঘ দিন ধরেই তিস্তা নদী পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। নদীটি শিলিগুড়ি করিডরের কাছ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত, ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূখণ্ড। এটি ‘চিকেনস নেক’ নামেও পরিচিত।
এই প্রতিবেশীদের অনেকেই ভারতের কাছে সমর্থন চেয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো প্রকল্পটি অনুমোদন বা শুরু করতে খুব বেশি সময় লেগে যায়, তাই তারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা সবাই জানে যে, ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলে যেকোনো চীনা বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো প্রকল্পে অংশ নেওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখে।
নেপাল, বাংলাদেশ ও ভুটান বেষ্টিত পশ্চিমবঙ্গের এই কৌশলগত সংকীর্ণ পথ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যের সঙ্গে দেশটির একমাত্র স্থল সংযোগ। এটি অবরোধ ও সামরিক হুমকির ঝুঁকিতে রয়েছে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো অপর্ণা পান্ডের মতে, ভারত সীমান্তে চীনা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ নিয়ে নয়াদিল্লির অস্বস্তি নিয়ে মোটামুটি সবার জানা।
এই গবেষক বলেন, “এই প্রতিবেশীদের অনেকেই ভারতের কাছে সমর্থন চেয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো প্রকল্পটি অনুমোদন বা শুরু করতে খুব বেশি সময় লেগে যায়, তাই তারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা সবাই জানে যে, ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলে যেকোনো চীনা বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো প্রকল্পে অংশ নেওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখে।”
অপর্ণা পরামর্শ দিয়েছেন, এর একটি সমাধান হতে পারে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সংলাপ। আর আলোচনা স্থবির হয়ে পড়লে জাপানের মতো নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীকে যুক্ত করা যেতে পারে।
ঢাকার হতাশা
ভারত কখনো শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার উজানের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে কোনো চুক্তি করেনি। ফলে ভাটিতে থাকা বাংলাদেশকে প্রতি বছর তার কৃষিভিত্তিক অঞ্চল আরও একটু করে শুকিয়ে যেতে দেখতে হচ্ছে।
পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না চলতি বছরের শেষের দিকে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত মহাপরিকল্পনা জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিপরীতে, ভারত এখনো কেবল প্রযুক্তিগত সমীক্ষার প্রস্তাব দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, তিস্তা প্রকল্পটি, “লাখ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার বিষয়।” তার মতে, শুষ্ক মাসগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ফসল উৎপাদনকে বিপর্যস্ত করে, যা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল জুড়ে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলে। দিল্লি তার ঘোষিত ‘প্রতিবেশী প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতির পরও ধারাবাহিকভাবে এই পরিণতিগুলোকে গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, বেইজিংকে এই ইস্যুতে যুক্ত করা ছিল দিল্লিকে তার আত্মতুষ্টি থেকে নাড়া দেওয়ার একটি উপায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি বাংলাদেশ এই প্রকল্পকে ভারতের বিরুদ্ধে চীন-সমর্থিত কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে দিল্লি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাবে।”
শফি মোহাম্মদ বলেন, ‘কোনো ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে’ না দেখে ঢাকার জন্য সবচেয়ে ভালো ‘চাল’ হবে, উদ্যোগটিকে কঠোরভাবে একটি নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা।
এই গবেষক আরও বলেন, “সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হবে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং প্রকল্পটিকে যথেষ্ট উন্মুক্ত রাখা, যাতে ভারত নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বাদ পড়া মনে না করে।”
ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী অধ্যাপক এলিজাবেথ রোশে-ও উন্মুক্ততার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সবচেয়ে কম অস্থিতিশীল পথটি নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষকেই একে অপরের প্রতি ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছ’ হতে হবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি হয়তো বিরল এক কূটনৈতিক সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে। বহু বছর ধরে, পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদল-শাসিত সরকার তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। তাদের যুক্তি ছিল, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ ভাগাভাগি করলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পানীয় জল ও কৃষিকাজের জন্য পানির সংকট তৈরি হবে।
কিন্তু গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে রাজ্যটিতে ক্ষমতায় আসে, যা প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো শাসক দল করেছে।
যদি ভারত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি হতে চায়, যদি সে তার প্রতিবেশে চীনের উপস্থিতিকে প্রতিহত করতে চায়, তাহলে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেন পররাষ্ট্রনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার কারণেই তা হয়নি বলে এক ধরনের ভাষ্য আছে। ভারতের কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকেও এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কেন্দ্র চাইলেও পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কারণে তারা তা পারছে না।
মমতা নিজেও তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এবার কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গে একই দল ক্ষমতায় আসাকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বিএনপি।
ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি আটকে থাকার মধ্যে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে বেইজিং সফরে এটিসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছেন বলে ওই সময় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।
তিস্তা প্রকল্পে নদীর তীর ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে ওই সময় এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল বিবিসি।
এ প্রকল্পে চীনা কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকাকে নয়াদিল্লির উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই বেইজিং প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আনুষ্ঠানিক প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়।
এর মধ্যেই ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়। এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দলের দ্রুত বাংলাদেশ সফরের কথা শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের।
শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, “এখন, তারাও সেখানে ক্ষমতায় রয়েছে। তাই ভারতের উচিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সমাধানে ইতিবাচক সদিচ্ছা দেখানো। না হলে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই অন্য বিকল্প খুঁজতে চাইবে।”
দিল্লি এই সুযোগ কাজে লাগাবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
অপর্ণা পান্ডের মতে, বিজেপির সমান্তরালভাবে অভিবাসীবিরোধী রাজনীতি অনুসরণ ‘মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের’ আবহে পরিস্থিতিকে আরও বিষিয়ে তুলতে পারে, যার মধ্যে অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান, হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক বহিষ্কারের অভিযোগও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদি বিজেপি ভোটারদের আকৃষ্ট করা কঠোর অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য অব্যাহত রাখে, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অপর্ণা বলেন, “যদি ভারত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি হতে চায়, যদি সে তার প্রতিবেশে চীনের উপস্থিতিকে প্রতিহত করতে চায়, তাহলে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেন পররাষ্ট্রনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।”

প্রতিটি শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদী আগের চেয়ে আরও কিছুটা সংকুচিত হয়। এর সঙ্গে এই নদীর পানির ওপর নির্ভর করা লাখো বাংলাদেশির জীবিকাও বিপন্ন হয়।
হংকং-ভিত্তিক ইংরেজি সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক নিবন্ধে বলেছে, বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে এই তিস্তা নিয়ে ভারতের কাছে সাহায্য চেয়ে আসছে। এখন, এর পরিবর্তে তারা বেইজিংয়ের কাছে অনুরোধ করছে।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে হংকংয়ের সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের শুরুর দিকে তিস্তা নদী পুনর্বাসন প্রকল্পে সহায়তার জন্য চীনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।
১০০ কোটি মার্কিন ডলারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পূর্ব হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবাহিত নদীপথের ১০২ কিলোমিটার (৬৩ মাইল)-এরও বেশি অংশ খনন ও পুনর্বাসন করা।
গত ৬ মে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ঢাকার এই অনুরোধ আসে। যেখানে ওয়াং বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’কে বাংলাদেশের উন্নয়ন এজেন্ডার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
চীন দীর্ঘ দিন ধরেই তিস্তা নদী পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। নদীটি শিলিগুড়ি করিডরের কাছ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত, ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ভূখণ্ড। এটি ‘চিকেনস নেক’ নামেও পরিচিত।
এই প্রতিবেশীদের অনেকেই ভারতের কাছে সমর্থন চেয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো প্রকল্পটি অনুমোদন বা শুরু করতে খুব বেশি সময় লেগে যায়, তাই তারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা সবাই জানে যে, ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলে যেকোনো চীনা বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো প্রকল্পে অংশ নেওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখে।
নেপাল, বাংলাদেশ ও ভুটান বেষ্টিত পশ্চিমবঙ্গের এই কৌশলগত সংকীর্ণ পথ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যের সঙ্গে দেশটির একমাত্র স্থল সংযোগ। এটি অবরোধ ও সামরিক হুমকির ঝুঁকিতে রয়েছে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো অপর্ণা পান্ডের মতে, ভারত সীমান্তে চীনা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ নিয়ে নয়াদিল্লির অস্বস্তি নিয়ে মোটামুটি সবার জানা।
এই গবেষক বলেন, “এই প্রতিবেশীদের অনেকেই ভারতের কাছে সমর্থন চেয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো প্রকল্পটি অনুমোদন বা শুরু করতে খুব বেশি সময় লেগে যায়, তাই তারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা সবাই জানে যে, ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলে যেকোনো চীনা বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো প্রকল্পে অংশ নেওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখে।”
অপর্ণা পরামর্শ দিয়েছেন, এর একটি সমাধান হতে পারে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সংলাপ। আর আলোচনা স্থবির হয়ে পড়লে জাপানের মতো নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীকে যুক্ত করা যেতে পারে।
ঢাকার হতাশা
ভারত কখনো শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার উজানের পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে কোনো চুক্তি করেনি। ফলে ভাটিতে থাকা বাংলাদেশকে প্রতি বছর তার কৃষিভিত্তিক অঞ্চল আরও একটু করে শুকিয়ে যেতে দেখতে হচ্ছে।
পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না চলতি বছরের শেষের দিকে এই প্রকল্পের চূড়ান্ত মহাপরিকল্পনা জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিপরীতে, ভারত এখনো কেবল প্রযুক্তিগত সমীক্ষার প্রস্তাব দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, তিস্তা প্রকল্পটি, “লাখ লাখ মানুষের বেঁচে থাকার বিষয়।” তার মতে, শুষ্ক মাসগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ফসল উৎপাদনকে বিপর্যস্ত করে, যা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল জুড়ে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলে। দিল্লি তার ঘোষিত ‘প্রতিবেশী প্রথম’ পররাষ্ট্রনীতির পরও ধারাবাহিকভাবে এই পরিণতিগুলোকে গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, বেইজিংকে এই ইস্যুতে যুক্ত করা ছিল দিল্লিকে তার আত্মতুষ্টি থেকে নাড়া দেওয়ার একটি উপায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি বাংলাদেশ এই প্রকল্পকে ভারতের বিরুদ্ধে চীন-সমর্থিত কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে দিল্লি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাবে।”
শফি মোহাম্মদ বলেন, ‘কোনো ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে’ না দেখে ঢাকার জন্য সবচেয়ে ভালো ‘চাল’ হবে, উদ্যোগটিকে কঠোরভাবে একটি নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা।
এই গবেষক আরও বলেন, “সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হবে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং প্রকল্পটিকে যথেষ্ট উন্মুক্ত রাখা, যাতে ভারত নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বাদ পড়া মনে না করে।”
ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী অধ্যাপক এলিজাবেথ রোশে-ও উন্মুক্ততার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সবচেয়ে কম অস্থিতিশীল পথটি নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষকেই একে অপরের প্রতি ‘সম্পূর্ণ স্বচ্ছ’ হতে হবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি হয়তো বিরল এক কূটনৈতিক সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে। বহু বছর ধরে, পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদল-শাসিত সরকার তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। তাদের যুক্তি ছিল, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ ভাগাভাগি করলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পানীয় জল ও কৃষিকাজের জন্য পানির সংকট তৈরি হবে।
কিন্তু গত মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে রাজ্যটিতে ক্ষমতায় আসে, যা প্রায় পাঁচ দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো শাসক দল করেছে।
যদি ভারত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি হতে চায়, যদি সে তার প্রতিবেশে চীনের উপস্থিতিকে প্রতিহত করতে চায়, তাহলে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেন পররাষ্ট্রনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় আসার পর তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনা গেলেও মমতার কারণেই তা হয়নি বলে এক ধরনের ভাষ্য আছে। ভারতের কেন্দ্র সরকারের তরফ থেকেও এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, কেন্দ্র চাইলেও পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকারের কারণে তারা তা পারছে না।
মমতা নিজেও তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে এবার কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গে একই দল ক্ষমতায় আসাকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বিএনপি।
ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি আটকে থাকার মধ্যে ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে বেইজিং সফরে এটিসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছেন বলে ওই সময় সংবাদমাধ্যমে খবর আসে।
তিস্তা প্রকল্পে নদীর তীর ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে ওই সময় এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল বিবিসি।
এ প্রকল্পে চীনা কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে ঢাকাকে নয়াদিল্লির উদ্বেগ জানানোর মধ্যেই বেইজিং প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আনুষ্ঠানিক প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়।
এর মধ্যেই ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নে ভারতের আগ্রহের কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা। এরপর জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়। এর অংশ হিসেবে ভারতের একটি কারিগরি দলের দ্রুত বাংলাদেশ সফরের কথা শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই আলোচনার মাসখানেকের মাথায় ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের।
শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, “এখন, তারাও সেখানে ক্ষমতায় রয়েছে। তাই ভারতের উচিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সমাধানে ইতিবাচক সদিচ্ছা দেখানো। না হলে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই অন্য বিকল্প খুঁজতে চাইবে।”
দিল্লি এই সুযোগ কাজে লাগাবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
অপর্ণা পান্ডের মতে, বিজেপির সমান্তরালভাবে অভিবাসীবিরোধী রাজনীতি অনুসরণ ‘মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের’ আবহে পরিস্থিতিকে আরও বিষিয়ে তুলতে পারে, যার মধ্যে অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অভিযান, হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক বহিষ্কারের অভিযোগও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যদি বিজেপি ভোটারদের আকৃষ্ট করা কঠোর অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য অব্যাহত রাখে, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অপর্ণা বলেন, “যদি ভারত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি হতে চায়, যদি সে তার প্রতিবেশে চীনের উপস্থিতিকে প্রতিহত করতে চায়, তাহলে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেন পররাষ্ট্রনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।”

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং-এর আমন্ত্রণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী ১৯-২০ মে চীনে রাষ্ট্রীয় সফর করবেন বলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রেমলিনের পক্ষ থেকেও একই দিনে এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীত