ইরাক থেকে দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির পর সব সেনা সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু কোন ইরাককে রেখে যাচ্ছে তারা? এ নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। তাদের তিনজন সাংবাদিক নানা দিক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছেন পুরো বিষয়টির। তাদের পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ২০০৩ সালে একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ মার্কিন সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও ইরাক আজ এক চরম ভূরাজনৈতিক দোটানা ও নিরাপত্তার শঙ্কায় আচ্ছন্ন।
এই দুই দশকে রক্তের বন্যা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং উত্থান-পতনের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী সাধারণ ইরাকিদের একাংশ যখন এই চলে যাওয়াকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের বিজয় হিসেবে উদ্যাপন করছে, তখন অন্য একাংশ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্বে নিজেদের দেশের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। মসুলের পুরোনো শহরের ঐতিহাসিক আল-নূরী গ্র্যান্ড মসজিদে টাঙানো বিরাট ইরাকি জাতীয় পতাকা কিংবা দেশজুড়ে ঘোষিত তিন দিনের ‘সার্বভৌমত্ব উদ্যাপন’ আপাতদৃষ্টিতে এক নতুন সূচনার বার্তা দিচ্ছে। তবে এর নেপথ্যে রয়ে গেছে চরম অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার এক রক্তাক্ত ইতিহাস।
মসুলের চিত্রগ্রাহক ওমর আল-হুসাইনির মতো সাধারণ জনগণের অনুভূতিটি অত্যন্ত মিশ্র ও বিষাদময়। ওমর আল-হুসাইনি জানিয়েছেন, কীভাবে মার্কিন গুলিতে ছিটকে আসা স্প্লিন্টারের আঘাতে তার স্ত্রী দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং পরবর্তীতে তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত চাচাও আইএসের হাতে নিহত হয়েছেন। ফলে মার্কিন সামরিক শক্তির বিদায় একদিকে তাকে আনন্দিত করলেও অন্যদিকে আসন্ন অস্থিতিশীলতার ভয়ে তার হৃদয় আশঙ্কায় ভরিয়ে দিচ্ছে।
একইভাবে ফালুজার অধিবাসী ৫৭ বছর বয়সী আওয়াতিফ আল-আজাবি বলছেন, একসময় সাদ্দাম হোসেনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি আমেরিকানদের ভালোবাসলেও পরবর্তীতে তার নিজের ছেলে মার্কিন বাহিনী ও জঙ্গিদের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে মারা যায়। ফলে তার মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর নির্মমতা সাদ্দামের অত্যাচারকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি এই প্রত্যাহার উদ্যাপনে নিজের বাড়িতে কেক কেটে ও মোমবাতি জ্বালিয়ে আনন্দ প্রকাশের কথা ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে, সুলাইমানিয়ার ২৬ বছর বয়সী দোকানদার সারকাউত আহমেদের মতো তরুণরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ২০১১ সালের প্রথম মার্কিন প্রত্যাহারের পরই দেশটিতে আইএসের চরম উত্থান ঘটেছিল। অতএব এবার আন্তর্জাতিক জোটের অনুপস্থিতিতে ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশকে কোন অভিমুখে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা ভাবনা অত্যন্ত প্রবল।
ইতিহাসের গতিপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৩ সালের মার্কিন আক্রমণ এবং পরবর্তীতে ২০১১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত দখলদারিত্ব ইরাককে এক বিধ্বংসী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও জঙ্গি আন্দোলনের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। এতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা এবং সর্বনিম্ন হিসাব অনুযায়ী ১ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি ইরাকি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। এরপর ২০১৪ সালে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখল করে নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। শিয়া মুসলিমদের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, জিম্মিদের নৃশংস প্রাণদণ্ড এবং ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের নারীদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতন ও বন্দিদশা বিশ্বজুড়ে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়।
আইএস দমনে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’-এর আওতায় আমেরিকান বাহিনী পুনরায় ইরাকে প্রবেশ করে বহুজাতিক সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দেয়। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও আইএসকে পরাস্ত করা সম্ভব হয় এবং পরিশেষে ২০২৪ সালে বাগদাদ সরকার ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবশিষ্ট ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার আনুষ্ঠানিক অপসারণ সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ বা ‘ফরএভার ওয়ারস’-এর প্রতি তীব্র নাগরিক অসন্তোষ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি কমানোর নীতি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
তবে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী পেছনে রেখে গেছে এক চরম জটিল ও কণ্টকাকীর্ণ উত্তরাধিকার। দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি চলাকালে মার্কিন বাহিনী নিজেরাও অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে আবু গরাইব কারাগারে ইরাকি বন্দীদের ওপর পরিচালিত নির্মম নির্যাতন এবং ব্ল্যাকওয়াটারের মতো বেসরকারি সামরিক ঠিকাদারদের মাধ্যমে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড অন্যতম। এই জাতীয় ঘটনাগুলো ইরাকিদের মনে আমেরিকানদের বিচারহীনতা ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছিল। যদিও বর্তমান বাগদাদসহ বিভিন্ন ইরাকি শহরে আধুনিক জীবনের গতিধারা ফিরে এসেছে, ব্লাস্ট ওয়াল বা বোমারু নিরোধক দেয়ালগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং মল ও নির্মাণ সাইটগুলোতে নতুন জীবনের চাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। তথাপি দেশের ভেতরে ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখনো এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে নবীন প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশজুড়ে বিস্তৃত শক্তিশালী শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা।
প্রতিবেদনটিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে ২০১৪ সালে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে গঠিত সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো কেবল সামরিক শক্তিতেই বলীয়ান হয়নি, বরং তারা রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়ে ইরাকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে নিজেদের শিকড় গেড়েছে। এই গোষ্ঠীগুলোর একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সমর্থক এবং তারা আমেরিকান বাহিনীর বিদায়কে তাদের নিজস্ব প্রতিরোধ সংগ্রামের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। মিলিশিয়া গোষ্ঠী ‘কাতাইয়েব হিজবুল্লাহ’-র নেতা আবু মুজাহিদ আল-আসফ সরকারকে সরাসরি হুমকি দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, ওয়াশিংটনের তেহরান-বিরোধী নীতি অনুসরণ করলে বাগদাদ সরকারকে যেকোনো উপায়ে উৎখাত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে মিলিশিয়াদের অস্ত্র ত্যাগ করিয়ে রাষ্ট্রীয় অধীনে আনার অঙ্গীকার করলেও ইরান তাদের এই কৌশলগত সঙ্গীদের নিঃশ্বেষ হতে দেবে না। অধিকন্তু, ইরাকের তেল বিক্রির আন্তর্জাতিক তহবিল ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্যাংকে সংরক্ষিত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির অস্ত্র বজায় রেখেছে। তবে সরকার যদি অভ্যন্তরীণ সীমান্ত, আকাশসীমা এবং মিলিশিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব চরম হুমকির মুখে পড়বে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চল। ১৯৯০-এর দশকে মার্কিন সামরিক ও বিমান সহায়তায় কুর্দিরা নিজেদের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিশ্বস্ত নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিদায়ের ফলে এই অঞ্চলটি চরম প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়েছে। কুর্দিস্তানের প্রথম প্রধান মাসুদ বারজানির উপদেষ্টা কিফাহ মাহমুদ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সমগ্র ইরাক বা কুর্দিস্তান অঞ্চলের কোনো নিজস্ব কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই, যা চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরবের ওপর পরিচালিত ড্রোন হামলা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের জেরে কুর্দিস্তান বারংবার ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আকাশসীমা ও সীমান্ত জুড়ে এই দুর্বলতার কারণে বাগদাদের কেন্দ্রীয় সরকার নিজের জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছে।
সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতামতও প্রতিবেদনে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কর্মসূচির উপ-পরিচালক অ্যাডাম ওয়েনস্টেইন যুক্তি দিয়েছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক উপস্থিতিই মূলত ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে তাদের অস্ত্রধারন ও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান অজুহাত জুগিয়েছিল। তার মতে, মার্কিন বাহিনীর প্রস্থান মিলিশিয়াদের সেই যৌক্তিকতা কেড়ে নেবে। অন্যদিকে লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘চ্যাথাম হাউস’-এর জ্যেষ্ঠ ইরাক বিশ্লেষক রেনাদ মনসুর উল্লেখ করেছেন যে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এই প্রত্যাহারের ঘটনাটি নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র আর আগের জায়গায় অবস্থান করছে না এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্য ও ইরাকের অবস্থানও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে।
প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে আমেরিকান সামরিক শক্তির প্রস্থান ইরাকিদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট স্বস্তি বা নিশ্চিত ভবিষ্যতের বার্তা নিয়ে আসতে পারেনি। বহু ইরাকি নাগরিক সাদ্দাম হোসেনের শাসন আমলের অত্যাচার ও পরবর্তীতে আমেরিকানদের নিষ্ঠুরতার স্মৃতি পেরিয়ে আজ যখন নিজেদের মতো করে বাঁচতে চাচ্ছে, তখন আইএসের পুনরুত্থান, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ মিলিশিয়াদের বেপরোয়া প্রভাব দেশের নিরাপত্তাকে এক অজানা মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইরাক আজ তার এই নতুন সার্বভৌমত্ব উদ্যাপনের অন্তরালে এক চরম সংকটময় সন্ধিক্ষণে উপস্থিত, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্বলতা এবং সার্বভৌমত্বের অভাব দেশটিকে পুনরায় কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয় কি না, সেটাই এখন বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসার বিষয়।