ইসরায়েলি বিমান হামলায় ওমর আল-হাসাইনার বড় পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর তিনি গাজা ছেড়ে কায়রোতে পালিয়ে এসেছিলেন। তিন বছর পরও তিনি সেখানে অপেক্ষা করছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত নিজ মাতৃভূমিতে পর্যাপ্ত স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন নিশ্চিত হলে তবেই ফিরবেন।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজা উপত্যকা ছেড়ে যাওয়া এবং এখনো বিদেশে আটকে থাকা এক লাখের বেশি গাজাবাসীর একজন হাসাইনা। তাদের অনেকেই এখনো মৃত স্বজন, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর ও জনপদের শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘‘আমি গাজা ছেড়ে মিশরে, কিনানার (মিশরকে বোঝাতে বলা হয়) ভূমিতে এসেছি, কিন্তু একই সঙ্গে এ কথা কখনো ভোলা যাবে না, প্রিয় ভাই, এ কথা কখনো ভোলা যাবে না। আমি সেই সুযোগের অপেক্ষায় আছি। আমি সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় আছি, যখন গাজা স্থিতিশীল হবে...আমি আমার দেশে (গাজা) ফিরতে পারি, দেশের একজন উৎপাদনশীল নাগরিক হতে এবং দেশের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারি।”
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রায় এক বছর হতে চলেছে। ওই যুদ্ধবিরতির আওতায় কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি সরকারের অধীনে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী এখনো গাজার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রায় প্রতিদিনই বিমান হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, হামাস নিয়ন্ত্রণ করছে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের বেশির ভাগ এলাকা। এসব এলাকায় অধিকাংশ মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণের সরবরাহ অপর্যাপ্ত এবং অদূর ভবিষ্যতে পুনর্গঠনেরও কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর ইসরায়েলি হামলায় গাজা সিটির একটি আবাসিক ভবনসমষ্টি ধ্বংস হয়ে যায়। সেখানে আশ্রয় নেওয়া হাসাইনার বর্ধিত পরিবারের ৩০৮ সদস্য নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন তার স্ত্রী, তাদের চার প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে এবং চার নাতি-নাতনি। নিহত নাতি-নাতনিদের একজন ছিল মাত্র কয়েক মাস বয়সী শিশু।
হাসাইনার বড় ছেলে মোহাম্মদও কায়রোতে রয়েছেন তার চার সন্তানকে নিয়ে। তার নিহত এক ছেলের বিধবা স্ত্রী ও তার মেয়েও কায়রোতে আছেন। হাসাইনার কয়েকজন ভাইও মিশরের রাজধানীতে বসবাস করছেন।
তার এক মেয়েকে স্বামী ও ছয় সন্তানসহ চিকিৎসার জন্য তুরস্কে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরেক মেয়ে গাজায় রয়েছেন তার পাঁচ সন্তানকে নিয়ে। ওই মেয়ের স্বামীও হামলায় নিহত হয়েছেন।
২২ নভেম্বরের ওই হামলার বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তবে তারা বলে আসছে, গাজায় তাদের হামলার লক্ষ্য সামরিক স্থাপনা ও লক্ষ্যবস্তু এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা হয়।
প্রায় ৭ হাজার ফিলিস্তিনি গাজায় ফিরে গেছে
আগস্টে কায়রো থেকে ভিডিওতে হাসাইনা দেখেছেন, তার স্বজনেরা তার স্ত্রী, ছেলে ও নাতি-নাতনিসহ পরিবারের ১১২ সদস্যের দাফন করছেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে পরিবারের আরও কয়েক ডজন সদস্য এখনো নিখোঁজ।
গাজায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা উপকরণ বিক্রির ব্যবসা ছিল হাসাইনার। তার কিছু পণ্য যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেয়েছে। তিনি সময়-সময় সেসব পণ্য বিক্রি করে কায়রেতে নিজের জীবনযাপনের খরচ চালান। সেখানে তিনি পুনরায় বিয়েও করেছেন।
গাজা ছেড়ে যাওয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই ইসরায়েল ও মিশর—দুই দেশের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের অনেকের পক্ষেই গাজায় ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজার পুরো জনগোষ্ঠীকে সেখান থেকে চলে যেতে উৎসাহিত করা এবং যারা চলে গেছে, তাদের ফিরে আসা ঠেকানোর নীতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের কিছু রাজনীতিক। তারপরও প্রায় ৭ হাজার ফিলিস্তিনি গাজায় ফিরে গেছে। হাসাইনা মনে করেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুত হতে দেবে না মিশর।
তবে যারা গাজা ছেড়ে পালিয়েছে, তাদের ব্যাপকভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুব শিগগিরই তৈরি হবে কি না, তা নির্ভর করছে ভূখণ্ডটির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কতটা স্পষ্ট হয় তার ওপর।
“গাজা যদি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। যদি ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য একটি সার্বিক ব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমঝোতা হয় এবং পুনর্গঠন শুরু হয়, তাহলে আমি কেন দেরি করব?”—বলেন হাসাইনা।