Advertisement Banner

ট্রাম্পকে না বলল কানাডা, কী হতে পারে এখন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্পকে না বলল কানাডা, কী হতে পারে এখন?
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দেশটির প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন। ১২ এপ্রিল মন্ট্রিয়েলে অনুষ্ঠিত লিবারেল পার্টির জাতীয় সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কানাডা আর তার সামরিক বাজেটের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে ব্যয় করতে চায় না। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করা প্রতি ডলারের প্রায় ৭০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেত। এই ব্যবস্থা থেকে সরে আসার ঘোষণা শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয় বরং এটি একটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের সূচনা।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ কাজ করছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্কনীতি, যা কানাডার অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বাধীন ও টেকসই প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা। কার্নির বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি প্রতিরক্ষা ব্যয়কে শুধুমাত্র নিরাপত্তা নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চান।

কানাডা-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কানাডার পণ্য কিনুন’ উদ্যোগের মাধ্যমে কানাডা স্থানীয় উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। এর আওতায় দেশীয় ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ এবং শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে দেশীয় শিল্পখাত যেমন লাভবান হবে, তেমনি কর্মসংস্থানও বাড়বে। একইসঙ্গে এটি কানাডার সাপ্লাই চেইনকে আরও স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে, যা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কানাডিয়ান আর্মির সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করছে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স
কানাডিয়ান আর্মির সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করছে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স

তবে এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– বৈদেশিক অংশীদারিত্বের পুনর্বিন্যাস। এতদিন কানাডার প্রতিরক্ষা উৎপাদনের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র এবং ফাইভ আইজ জোটভুক্ত দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের মতো নতুন অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। এই বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা কানাডাকে একটি বহুমুখী কৌশলগত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরতা কমে যাবে।

তবে এই নীতির বাস্তবায়ন সহজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীর সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড বা নোরাড দুই দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে আসা সম্ভব নয় এবং কার্নিও তা স্বীকার করেছেন। বরং এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো নির্ভরতা কমানো, সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।

এই সিদ্ধান্তের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ‘অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব’ ধারণার ওপর জোর দেওয়া। কার্নি মনে করেন, একটি দেশের নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হয়, যখন সে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে এবং অন্য দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল না থাকে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন দ্রুত ঘটে এবং জোটের স্বার্থ পরিবর্তিত হয়, সেখানে এই ধরনের স্বনির্ভরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একইসঙ্গে, এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। ইতোমধ্যেই মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর কানাডার এই ধরনের নীতিকে ‘বাণিজ্যিক উত্তেজক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আরও মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।

সব মিলিয়ে, কানাডার এই নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল একটি বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের প্রচেষ্টা। একদিকে এটি দেশীয় শিল্প ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।

কার্নির এই পদক্ষেপ সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর। তবে এটি স্পষ্ট যে, বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে কানাডা তার অবস্থান পুনর্নির্ধারণের পথে হাঁটছে– যেখানে স্বনির্ভরতা ও কৌশলগত বৈচিত্র্যই হবে ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি।

সম্পর্কিত