মে মাসে কম্বোডিয়ার একটি হ্রদে প্রায় দুই টন মৃত মাছ ভেসে উঠেছিল। সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার আরেকটি হ্রদের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে নিমজ্জিত থাকা সোমাং নামের একটি গ্রামের ধ্বংসাবশেষ ভেসে ওঠে। অন্যদিকে, ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার অধিবাসীদের সতর্ক করে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, যেকোনো সময় তাদের পানির সরবরাহ কমে যেতে পারে। তীব্র দাবদাহ ও শুষ্ক আবহাওয়া থেকে সৃষ্ট এই ঘটনাগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে এগুলো এশিয়ায় এল নিনোর তাণ্ডবের বার্তাই দেয়।
এই জলবায়ু প্রক্রিয়াটি প্রাকৃতিক নিয়মেই নির্দিষ্ট সময় পর পর ঘটে থাকে। প্রতি কয়েক বছর অন্তর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরের বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি বিশাল অংশে তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে। এ বছর মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই এল নিনোর প্রভাব নভেম্বরে চরম আকার ধারণ করতে পারে।
দৈনিক পরিমাপ অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রার তারতম্য এর মধ্যেই আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর এই প্রভাব আগামী ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
কৃষি ফসলের পাশাপাশি উত্তপ্ত আবহাওয়ার প্রভাব পড়ে পশুসম্পদ ও মৎস্য খাতেও। ছবি: রয়টার্স
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট জানিয়েছে, এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী দেখা গেলেও এশিয়া অঞ্চল বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়ছে। কারণ, এ অঞ্চলের শত কোটি মানুষ জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এখানকার সরকারগুলো এখনও ইরানের যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হওয়া জ্বালানি সংকটের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। এশিয়ার বহু অঞ্চলে এল নিনোর ক্ষয়ক্ষতি এরই মধ্যে দেখা দিচ্ছে।
ভারতে বছরের প্রায় ৭০ শতাংশ বৃষ্টিই হয় বর্ষাকালে। কিন্তু এবার প্রায় ১৩ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খরা বা শুষ্ক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দেশটি। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, ইন্দোনেশিয়া গত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের মৌসুম পার করছে। ফিলিপাইনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির সাতটি প্রদেশ এরই মধ্যে খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং আগামী বছরের শুরুর দিকে পুরো দেশজুড়ে খরা দেখা দিতে পারে।
এর সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে খাদ্যশস্যের ওপর। বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ায়, যেখানে মূল ধান রোপণ করা হয় অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। ঠিক এই সময়ে এল নিনো চরম আকার ধারণ করবে।
এখানে সেচনির্ভর খামারগুলোও নিরাপদ নয়। কারণ অনাবৃষ্টির কারণে জলাধারগুলোর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। মধ্য থাইল্যান্ডে এই পরিস্থিতির কারণে সরকার কৃষকদের এ বছর দ্বিতীয়বার ধান রোপণ না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এসবের পাশাপাশি ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সার সরবরাহেও চরম বিঘ্ন ঘটেছে। বিশ্বব্যাংক ধারণা করছে যে, এ বছর সারের গড় দাম গত বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি হতে পারে। একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, অন্যদিকে চরম আবহাওয়া–এ দুই মিলে কৃষকের আয় যেমন কমিয়ে দিচ্ছে, তেমনি বাড়িয়ে দিচ্ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও। ভারতে বার্ষিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার জানুয়ারিতে ছিল ২.১ শতাংশ, আগস্টে তা বেড়ে ৬ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। শ্রীলঙ্কায় সেপ্টেম্বরে ৯ শতাংশে উঠে গেছে।
এল নিনোর আশঙ্কা রয়েছে। ছবি: রয়টার্স
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো খাদ্যশস্যের সরবরাহ। দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডের ব্যাংক করুংথাই-এর হিসাব অনুযায়ী, এখন থেকে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে থাইল্যান্ডের চাল উৎপাদন ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। দেশটিতে পর্যাপ্ত সঞ্চয় বা মজুদ থাকলেও, অন্যান্য অনেক দেশের আপৎকালীন পরিস্থিতিতে নির্ভর করার মতো তেমন সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশের চালের বর্তমান মজুত দেশের বার্ষিক মোট খরচের ৪ শতাংশের কম।
কোন দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তা পরিমাপ করতে দ্য ইকোনমিস্ট এশিয়ার ১১টি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি ‘ঝুঁকি সূচক’ তৈরি করেছে। এই সূচকে দুটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এল নিনো কোনো দেশের অর্থনীতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে (জিডিপিতে কৃষির গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে) এবং দেশগুলোর সরকার সেই ধাক্কা কতটা ভালোভাবে সামলে নিতে সক্ষম (খাদ্যশস্যের মজুদ, সরকারি ঋণ এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরিধির ওপর ভিত্তি করে)।
এই সূচকে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত মায়ানমারের তথ্য অসম্পূর্ণ, তা না হলে হয়তো এটিই তালিকার শীর্ষে থাকত। আর স্বাভাবিকভাবে, তুলনামূলক ধনী দেশ থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে ক্ষতির রূপ ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন রকম। ভারতে এই ঝুঁকি মূলত কৃষকদের ওপর বেশি পড়ছে। অন্যদিকে ফিলিপাইন এবং বাংলাদেশে এই দুর্ভোগের মূল শিকার সাধারণ ভোক্তারা।
খাদ্য ও কৃষিখাতের বাইরেও এল নিনোর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) সতর্ক করে জানিয়েছে যে, এটি জ্বালানি সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ার ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়ে তীব্র গরমের কারণে এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে; যা দেশগুলোকে তুলনামূলক বেশি কয়লা পোড়াতে বাধ্য করছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্যও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার অগ্নিকাণ্ড থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অংশকে ঢেকে ফেলেছে। ১২ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের বাতাসের মান বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর থেকে নেমে সবচেয়ে ক্ষতিকর বা দূষিত অবস্থায় পৌঁছায়, যা দিল্লির বাতাসের চেয়েও খারাপ ছিল।
এল নিনোর অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে বিশাল, বিশেষ করে এই কারণে যে, সরকারগুলোর এই ধাক্কা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি বা ক্ষমতা নেই। ১৯৯৭ সালের এল নিনো নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, তার পরের পাঁচ বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ক্ষতি ছিল প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার–যার একটি বড় অংশ এশিয়াকে একাই বহন করতে হয়েছিল।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যের ঊর্ধ্বগতির পুরো বোঝা যদি সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় (অর্থাৎ ভর্তুকি এবং অন্যান্য সরকারি সহায়তা তুলে নেওয়া হয়), তবে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের শিকার হবে। এর মধ্যে ৯ কোটি ১০ লাখ মানুষই এশিয়ার। আবার অন্যদিকে সরকারের ঋণ ক্রমেই বাড়তে থাকায় এই বিপর্যয় এড়ানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে আশার কথা হলো, সরকারগুলো এই সংকটকে আগেই অনুধাবন করতে পারছে। এডিবির রশেন ফার্নান্দোর মতে, উন্নত তথ্য ও নিখুঁত পূর্বাভাসের কারণে নীতি-নির্ধারকেরা এল নিনোর আগের পর্বগুলোর তুলনায় এবার অনেক বেশি প্রস্তুত। চালের বিপদকালীন মজুত গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারগুলো কৃষকদের সরাসরি সহায়তা করার চেষ্টাও করছে। ভারতে খরাকবলিত অঞ্চলের কৃষকদের ডাল জাতীয় ফসল ও অন্যান্য বিকল্প চাষাবাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ফিলিপাইন বিতরণ করছে খরা-সহিষ্ণু জাতের বীজ।
অর্থের সংস্থানও আগে থেকেই করে রাখা প্রয়োজন। প্রায়ই দেখা যায়, দুর্যোগ নেমে আসার পরেই কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল করা হয়। এর পরিবর্তে সরকারগুলোর উচিত এল নিনোর জন্য নির্দিষ্টভাবে আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখা–এমনটাই মনে করেন ফার্নান্দো। সংকট চরম আকার ধারণ করার আগেই জরুরি ঋণ সুবিধা এবং দুর্যোগ বীমার চুক্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকর একটি পদক্ষেপ হলো ‘পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম পদক্ষেপ’। এর মাধ্যমে পূর্বাভাস যখন কোনো নির্দিষ্ট বিপদসীমা অতিক্রম করে (যেমন–জলাধারের পানির স্তর একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যাওয়া), তখনই অর্থ বা অন্যান্য সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হয়। জাতিসংঘের হিসাব মতে, এভাবে ব্যয় করা প্রতিটি ডলার পরবর্তীতে ক্ষতি কাটাতে এবং ত্রাণ সহায়তায় দেওয়া সাত ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারে।
আফ্রিকান ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতির পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তবে এশিয়ায় আর্থিক সহায়তার অভাবে এর প্রয়োগ খুবই সীমিত। গত জুন মাসে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনসহ ২২টি দেশের ৮৮ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ২০২ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৪০ মিলিয়ন ডলার। ধনী দাতা দেশগুলো তাদের খরচে কড়াকড়ি আরোপ করায় আগাম প্রস্তুতিমূলক খাতগুলোতেই বরাদ্দ সবচেয়ে আগে কাটা পড়ছে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে অতি তীব্র এক এল নিনোর কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে ভারত, চীন ও অন্যান্য দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল–ঘটনাটি ঘটার আগে কেউ টের পায়নি কিংবা পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, সে বিষয়ে কারো কোনো ধারণা ছিল না। তবে আজকের এশিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং তারা জানে সামনে কী আসতে চলেছে। কিন্তু এই পূর্বাভাসগুলো কেবল তখনই কাজে লাগবে, যখন সরকার ও দাতা গোষ্ঠীগুলো সে অনুযায়ী সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নেবে।