ছয় মাসের হিসাব শেষ হয়েছে গত আগস্টেই। এখন অক্টোবর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আট মাসের মাথায় এসে অনেকেই প্রথম ১৮০ দিনের উদ্যোগগুলোর দিকে নতুন করে দেখছেন। কোন উদ্যোগ বাস্তবে কতটা এগিয়েছে, কোনটির সুফল মিলছে এবং কোন প্রতিশ্রুতি এখনো রয়ে গেছে ঘোষণার পর্যায়ে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, জ্বালানি সরবরাহ, প্রশাসনিক সংস্কার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। আগস্টে ছয় মাস পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ৩৫টি খাতের অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রকাশ করে।
কিন্তু এখন সেই পর্যালোচনার পর প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে। ফলে সরকারের সামনে প্রশ্নটি আর শুধু ‘কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে’- এমন নয়; বরং ‘সেসব উদ্যোগের ফল কী’। মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো উচ্চ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে চাপ রয়েছে, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ আছে, আর নির্বাচনী অঙ্গীকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের বড় অংশ বাস্তবায়নে সামনে রয়েছে দীর্ঘ পথ।
সরকারের পক্ষ থেকে কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ড, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান পরিকল্পনা, খাদ্য মজুত, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এখন এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব কতটা দৃশ্যমান হচ্ছে, সেটিই হয়ে উঠছে সরকারের পরবর্তী পরীক্ষার প্রধান মাপকাঠি।
অর্থাৎ, প্রথম ১৮০ দিন ছিল উদ্যোগ নেওয়ার সময়; অক্টোবর থেকে সেই উদ্যোগের ফল দেখানোর সময়। অর্থনীতি থেকে আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি থেকে কর্মসংস্থান, প্রশাসন থেকে রাষ্ট্র সংস্কার, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিএনপি সরকারের সামনে এখন ঘোষণাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়ার পরীক্ষা।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপিও সরকারের সামনের দিনগুলোকে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য চরচাকে বলেন, “সময়টা এখন কঠিন। বিএনপি সরকার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছে দেশের সবচেয়ে ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে। এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে, এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।”
অর্থনীতি: স্থিতিশীলতার পর এখন প্রবৃদ্ধির পরীক্ষা
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতির সামনে ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম বিনিয়োগ, রাজস্ব ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের চাপ। প্রথম ছয় মাসে সরকার মূলত সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর দিকে জোর দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত জুলাই শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, আগস্টে তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতিও জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকার এটিকে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার লক্ষণ হিসেবে দেখছে। প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়নে সরকার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, রপ্তানি ও মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে অগ্রগতির কথা তুলে ধরে। একই সঙ্গে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতিকে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকন্সট্রাকশন’ বা থ্রি-আর কৌশলের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে অন্যদিকে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের জিডিপি অনুপাত ১৪ বছরের সর্বনিম্ন ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দুইমাস হয়েছে। ছবি: ফেসবুক
ফলে অক্টোবরের পর সরকারের সামনে প্রশ্ন হবে- রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির স্থিতিশীলতাকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতিতে কীভাবে রূপ দেওয়া যায়। কারণ, বৈশ্বিক সংস্থা আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, সরকারের লক্ষ্যের চেয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কম। একই সঙ্গে সংস্থাটি মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা করেছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে সরকারের প্রত্যাশার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মূল্যায়নের বড় ব্যবধান দেখা দিয়েছে।
দ্রব্যমূল্য: ‘মূল্যস্ফীতি কমেছে’ থেকে বাজারে স্বস্তি
মূল্যস্ফীতির হার কমেছে- এটি সরকারের জন্য একটি ইতিবাচক সূচক। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে বাজারে মানুষের প্রকৃত স্বস্তি ফিরেছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকার প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়নে বাজার স্থিতিশীল রাখতে খাদ্য মজুত বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলেছে। সরকারি হিসাবে আগস্টে খাদ্যশস্যের মজুত প্রায় ২৪ লাখ টনে পৌঁছেছিল, যা সরকার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মজুত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও চাপ রয়েছে।
এখন সরকারের পরীক্ষা হবে, পরিসংখ্যানের মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে বাজারের বাস্তব স্বস্তির ব্যবধান কতটা কমানো যায়।
জ্বালানি: সংকট সামলানো থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ
প্রথম ছয় মাসে জ্বালানি ছিল সরকারের অন্যতম বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, এলএনজি সরবরাহের সংকট এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে চাপ তৈরি করেছে।
সরকারের দাবি, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানেও কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সেপ্টেম্বরে সংসদে জানান, ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচির মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে এবং এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে; আরও সাতটি কূপ থেকে ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
তবে সেপ্টেম্বরেও শিল্পে গ্যাস সংকট বড় সমস্যা হয়ে থেকেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, “উচ্চ এলএনজি মূল্যের কারণে শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরকারি ভর্তুকিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।”
সুতরাং, সরকারের সামনে এখন শুধু সংকট সামলানোর প্রশ্ন নয়; শিল্পের উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: ঘোষণার পর বাস্তব বিনিয়োগ
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প পুনরুজ্জীবন এবং প্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জুলাইয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, “সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, নীতিগত সংস্কার ও বিনিয়োগকারীদের সহায়তার মাধ্যমে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায়।”
সেপ্টেম্বরে ইনভেস্ট বাংলাদেশ তাদের ১৮০ দিনের বিনিয়োগ পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রকাশ করে। সংস্থাটি জানায়, বিনিয়োগ পাইপলাইনে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ রয়েছে, যার মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে গেছে। তবে এগুলো সম্ভাব্য বিনিয়োগের হিসাব।
এখানেই অক্টোবরের বড় প্রশ্ন, পাইপলাইন থেকে প্রকৃত বিনিয়োগে কতটা রূপান্তর হয়, আর বিনিয়োগ থেকে কতটা নতুন শিল্প ও চাকরি তৈরি হয়।
ব্যাংকিং খাত: টাকা ঢাললেই আস্থা ফিরবে?
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যাগুলোর একটি। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল ব্যাংক এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট- সব মিলিয়ে এ খাতে সংস্কারের চাপ রয়েছে।
সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দুর্বল ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণের জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “এর সঙ্গে ব্যবস্থাপনা সংস্কার, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং ব্যাংকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর উদ্যোগও থাকবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকও উৎপাদনশীল খাত, বন্ধ শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য ৪১ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন প্যাকেজে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তি করেছে।
তবে এখানে সরকারের জন্য ঝুঁকি হলো, দুর্বল ব্যাংককে অর্থ দিয়ে টিকিয়ে রাখা এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কার এক বিষয় নয়।
অক্টোবর থেকে তাই প্রশ্ন হবে, পুনঃমূলধনীকরণের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, খেলাপি ঋণ আদায় কতটা হচ্ছে এবং আমানতকারীর আস্থা কতটা ফিরছে।
আইনশৃঙ্খলা: সরকারের দাবি বনাম মানুষের প্রত্যাশা
প্রথম ১৮০ দিনে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখিয়েছে সরকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, “গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে।” তবে জনগণের প্রত্যাশার পর্যায়ে যেতে আরও সময় প্রয়োজন বলেও তিনি স্বীকার করেছেন। আগস্টে তিনি আরও দাবি করেন, গত ছয় মাসে সংঘটিত প্রায় সব ফৌজদারি মামলার আসামিদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে।
সংসদেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, অধিকাংশ গুরুতর অপরাধের আসামিকে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশকে ভবিষ্যতে আরও ‘জনবান্ধব’ বাহিনীতে রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
কিন্তু সরকারের নিজের বক্তব্যেই যখন ‘আরও সময়ের প্রয়োজন’ বলা হচ্ছে, তখন অক্টোবরের পর আইনশৃঙ্খলার মূল্যায়ন হবে শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে নয়। অপরাধের পুনরাবৃত্তি, তদন্তের মান, বিচার, নাগরিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের প্রয়োগ- সবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রশাসন: রদবদল কতটা সংস্কারে যাবে?
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল ও পুনর্বিন্যাস হয়েছে। ছয় মাসের মূল্যায়নের সময়ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেছে সরকার।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা। কিন্তু ছয় মাসের পরও প্রশাসনে বদলি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ওএসডি ও বাধ্যতামূলক অবসরের মতো পুরনো চর্চা অব্যাহত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, ছয় মাসের মূল্যায়নের পরই সরকার মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনে। চারজন নতুন মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সরকারের ভাষ্য ছিল, প্রশাসন ও মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা বাড়ানো এবং পুনর্গঠনের প্রয়োজনেই এ পরিবর্তন।
ফলে প্রশাসনের ক্ষেত্রে এখন বড় পরীক্ষা হবে কতজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হলো নয়, বরং সরকারি সেবা কত দ্রুত হচ্ছে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় কত কমছে এবং প্রশাসনের জবাবদিহি কতটা বাড়ছে।
৩১ দফা ও নির্বাচনী অঙ্গীকার: তালিকা থেকে বাস্তবায়ন
বিএনপির ৩১ দফা ও ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন, দুর্নীতি দমন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বিস্তৃত অঙ্গীকার রয়েছে। দলটি ৩১ দফা, ভিশন- ২০৩০, ১৯ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারকে নির্বাচনী কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সরকার বলছে, প্রথম ১৮০ দিনে এসব প্রতিশ্রুতির অনেকগুলোর বাস্তবায়নের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মূল্যায়নেও ৩৫টি খাতে উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের বড় অংশ আইন, প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে যুক্ত। তাই অক্টোবর থেকে গুরুত্বপূর্ণ হবে একটি বাস্তবায়ন-মানচিত্র। কোনো প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে কার্যকর, কোনোটি আইনের অপেক্ষায়, কোনোটি প্রক্রিয়াধীন এবং কোনোটির জন্য আরও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: পরীক্ষা এবার দলের
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপির জন্য সরকারের বাইরে আরেকটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠছে। কারণ সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম বড় মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দলকে একদিকে প্রার্থী বাছাই করতে হবে, অন্যদিকে একই দলের একাধিক আগ্রহী প্রার্থী ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সামলাতে হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়ার কথা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও বলেছেন, “রাজনৈতিক দল সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেবে না; দল চাইলে প্রার্থীদের সমর্থন করতে পারে।”
এদিকে, মাঠপর্যায়ে একাধিক প্রার্থীর আগ্রহ এবং স্থানীয় কোন্দল নিয়ে বিএনপির ভেতরেই উদ্বেগের খবর এসেছে। সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা বা সংসদ সদস্যদের পছন্দের প্রার্থী সামনে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত ধাপে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে; প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর এবং প্রায় চার হাজার ৫০০ ইউনিয়ন পরিষদে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন হওয়ার কথা।
অতএব স্থানীয় নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশনের পরীক্ষা নয়, ক্ষমতাসীন বিএনপির মাঠের সংগঠন, প্রার্থী ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণেরও পরীক্ষা।
সামাজিক নিরাপত্তা: কার্ড কত পরিবারে, সুফল কত ঘরে?
ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ডকে বিএনপি সরকারের অন্যতম দৃশ্যমান জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের দর্শন, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। ফ্যামিলি কার্ডে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়নে সরকার জানায়, জুন পর্যন্ত ৭০ হাজার ৮৬১ নারী এই সুবিধা পেয়েছেন। কৃষক কার্ডের প্রাক-পাইলটে ২০ হাজার ৮৩২ কৃষক অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এবং ২০ হাজার ৪৮৩ কৃষক ৫ দশমিক ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছেন।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, সেচ, কৃষিঋণ, বীমা, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কার্ড বিতরণই শেষ কথা নয়। প্রকৃত দরিদ্র পরিবার ও কৃষক নির্বাচন, বাদ পড়া সুবিধাভোগী, অর্থের ধারাবাহিকতা, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিতরণে অনিয়ম ঠেকানো- এসবই কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করবে।
বৈদেশিক সম্পর্ক: ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ থেকে অর্থনৈতিক ফল
সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়নে সরকার চীন, মালয়েশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশের সমঝোতা হয়েছে। চীনের সঙ্গে মংলা বন্দর এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল নিয়েও অগ্রগতির কথা যৌথ বিবৃতিতে এসেছে।
সরকারের একাধিক মন্ত্রীও বলেছেন, অর্থনৈতিক স্বার্থই কূটনীতির অন্যতম ভিত্তি।
এখন অক্টোবর থেকে কূটনীতির মূল্যায়ন হবে বৈঠক বা সফরের সংখ্যা দিয়ে নয়- কত বিনিয়োগ এল, কত শ্রমবাজার খুলল, কত রপ্তানি বাড়ল এবং জ্বালানি ও বাণিজ্যে কতটা বাস্তব সুবিধা পাওয়া গেল, তা দিয়ে।
সামনে বিএনপির মূল পরীক্ষাগুলো
প্রথম ১৮০ দিনে বিএনপি সরকার যেসব উদ্যোগ ও অর্জনের কথা বলেছে, অক্টোবর থেকে সেগুলোর ফলাফলকে কয়েকটি সূচকে মাপা যাবে-
- অর্থনীতি: রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির স্থিতিশীলতা থেকে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে যাওয়া।
- বাজার: মূল্যস্ফীতির হার কমার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় বাস্তব স্বস্তি আনা।
- জ্বালানি: সংকট সামলানোর পাশাপাশি শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
- কর্মসংস্থান: বিনিয়োগের পাইপলাইনকে বাস্তব শিল্প ও চাকরিতে রূপ দেওয়া।
- ব্যাংকিং: পুনঃমূলধনীকরণের পাশাপাশি খেলাপি ঋণ, সুশাসন ও আমানতকারীর আস্থার সংকট মোকাবিলা।
- আইনশৃঙ্খলা: দ্রুত গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত, বিচার ও নাগরিক নিরাপত্তায় স্থায়ী উন্নতি।
- প্রশাসন: রদবদলের বাইরে মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন তৈরি।
- সংস্কার: ৩১ দফা ও নির্বাচনী অঙ্গীকারকে দৃশ্যমান আইন ও প্রতিষ্ঠানগত পরিবর্তনে রূপ দেওয়া।
- স্থানীয় নির্বাচন: প্রার্থী বাছাই ও মাঠের কোন্দল সামলে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা।
- সামাজিক নিরাপত্তা: কার্ড বিতরণের সংখ্যা থেকে প্রকৃত সুবিধাভোগীর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা।
- কূটনীতি: ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে বিনিয়োগ, রপ্তানি, শ্রমবাজার ও জ্বালানি সহযোগিতার বাস্তব ফলে পরিণত করা।
প্রথম ছয় মাসে সরকার কিছু ইতিবাচক সূচক তুলে ধরতে পারছে- রিজার্ভ বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষি সহায়তার কর্মসূচি শুরু হয়েছে, বিনিয়োগ সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের সংস্কার তহবিলের ঘোষণা এসেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের চাপ, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তাই এখন সরকারের সামনে নতুন ধরনের পরীক্ষা।
আগস্টে ছিল ১৮০ দিনের হিসাব। অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে সেই হিসাবের ফল মেলানোর সময়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতিতে সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছে।
চরচাকে তিনি বলেন, “জ্বালানি ও গ্যাস সংকট মোকাবিলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।” আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
রিজভীর ভাষ্য, রাষ্ট্র পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ থাকবেই; সেগুলো ঠান্ডা মাথায় ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করাই সরকারের মূল কাজ।
তাই, সরকার কী করেছে- তার তালিকা এখন কম গুরুত্বপূর্ণ; কী বদলেছে- সেটিই হবে বিএনপি সরকারের পরবর্তী মূল্যায়নের আসল প্রশ্ন।