বাংলাদেশে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী ও লাভজনক কোম্পানির সংখ্যা কম নয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশই শেয়ারবাজারের বাইরে রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহে পুঁজিবাজারের ভূমিকা সীমিত থাকছে, বাড়ছে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা। এই পরিস্থিতিতে বড় কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
তবে প্রশ্ন হলো, কোম্পানিগুলো কেন শেয়ারবাজারে আসতে চায় না? আর তাদের তালিকাভুক্ত করা গেলে দেশের অর্থনীতি কীভাবে লাভবান হবে?
বড় ও ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি বলেছেন, “কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্ত না হলে প্রয়োজনে আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে। প্রথমে কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করা হবে। তাতে কাজ না হলে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”
বিএসইসির এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো। বর্তমানে বাজারের বড় অংশজুড়ে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে। নতুন বড় কোম্পানি যুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের সামনে বিকল্প বাড়বে। বাজারের গভীরতাও বাড়তে পারে। তবে শুধু নির্দেশ দিয়ে কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোম্পানির স্বার্থ, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং বাজারের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান চরচাকে বলেন, “আমাদের বড় ও ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে না আসা আসলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক দুর্বলতা। অর্থনীতির আকার বেড়েছে, বড় বড় দেশীয় কোম্পানি তৈরি হয়েছে, অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে দীর্ঘদিন ধরে ভালো ব্যবসা করছে। কিন্তু তার প্রতিফলন শেয়ারবাজারে সেভাবে দেখা যায়নি।”
বড় অনেক কোম্পানি কেন শেয়ারবাজারে আসতে চায় না, এ ব্যাপারে সেলিম রায়হানের বিশ্লেষণ, “শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে একটি কোম্পানিকে অনেক বেশি স্বচ্ছ হতে হয়। আর্থিক হিসাব প্রকাশ করতে হয়, করপোরেট সুশাসনের নিয়ম মানতে হয়, ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করতে হয় এবং অনেক সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান অনুসরণ করতে হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নব্যবস্থায় বড় কোম্পানিগুলো অনেক সময় তুলনামূলক সহজেই ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ পেয়েছে। তাই তারা শেয়ারবাজারে আসতে চায়নি। এর সঙ্গে শেয়ারবাজারের নিজের সমস্যাও আছে। বাজারে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট, কারসাজির অভিযোগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা এবং নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন দেখা গেছে।”
এ প্রসঙ্গে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “আমাদের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এখানে ভালো ও বড় কোম্পানির অভাব। এর মূল কারণ, আমরা এখনো বড় কোম্পানিগুলোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি। তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও স্বস্তি দিতে পারিনি। তবে এখন সেই পরিবেশ তৈরিতে আইন-কানুন পরিবর্তনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরপরও কোনো কোম্পানি বাজারে না এলে বিএসইসির হাতে তাদের তালিকাভুক্ত হতে বাধ্য করার সুযোগ রয়েছে। বিএসইসি চেয়ারম্যান হয়তো সেই বিষয়টিই বোঝাতে চেয়েছেন।”
নিবন্ধিত কোম্পানি লাখ লাখ, তালিকাভুক্ত কয়েকশ
যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ছিল দুই লাখ ২৭ হাজার ৪১৯টি। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ছিল তিন হাজার ৮৭৮টি এবং একক মালিকানাধীন কোম্পানি এক হাজার ৩৫২টি। সব ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিন লাখ ১৫ হাজার ৬৫টি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের দুই শেয়ারবাজারের মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানি প্রায় ৩৬০টি। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) ৩২৬টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়। তবে একই কোম্পানি দুই এক্সচেঞ্জেই তালিকাভুক্ত থাকতে পারে।
তবে আরজেএসসিতে নিবন্ধিত সব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা যায় না। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হয়। তাই নিবন্ধিত সব প্রতিষ্ঠান নয়, বরং বড়, লাভজনক ও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে- এমন কোম্পানিকে চিহ্নিত করাই বেশি কার্যকর।
ব্যাংকে যাওয়া সহজ বলেই শেয়ারবাজারে যায় না?
বাংলাদেশের বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে না আসতে চাওয়ার অন্যতম কারণ ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা। ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। ফলে শেয়ার বিক্রি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন মনে করে না।
ব্যাংকঋণ নিলে সুদসহ অর্থ ফেরত দিতে হয়। কিন্তু নতুন শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করলে সেই অর্থ ঋণের মতো কিস্তিতে ফেরত দিতে হয় না। এর বিনিময়ে কোম্পানির মালিকানার একটি অংশ নতুন বিনিয়োগকারীদের দিতে হয়। ভবিষ্যতের মুনাফায়ও তারা পায়। কিন্তু বাংলাদেশে পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত অনেক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা মালিকানা ভাগ করতে চান না।
তাছাড়া, শেয়ারবাজারে এলে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, নিরীক্ষা, পরিচালনা পর্ষদের কাছে জবাবদিহিতা এবং করপোরেট সুশাসনের নিয়ম মানতে হয়। এসব বিষয়ও অনীহার কারণ। এছাড়া, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ব্যয়, অনুমোদনপ্রক্রিয়ার জটিলতা এবং শেয়ারের ন্যায্য মূল্যায়ন না পাওয়ার আশঙ্কাও কোম্পানিগুলোকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
জবাবদিহিতার বাধ্যবাধকতার কারণেও অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসতে চায় না উল্লেখ করে সাইফুল ইসলাম বলেন, “শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানির আয়-ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে হিসাব দিতে হয় এবং জবাবদিহির আওতায় আসতে হয়। অনেক কোম্পানি এই বাড়তি জবাবদিহি এড়াতে বাজারে আসতে চায় না।”
শুধু কোম্পানিরই দায় না, বাজারে আস্থার সংকট কে কাটাবে?
কোম্পানির কাছে শেয়ারবাজার আকর্ষণীয় হওয়ার জন্য ন্যায্য মূল্যায়ন ও কার্যকর লেনদেনব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু বাজারে কারসাজি, অস্বাভাবিক দর ওঠানামা কিংবা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে চায় না।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইর মোট বাজার মূলধনের প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল মাত্র ১০টি কোম্পানির হাতে। এতে বোঝা যায়, বাজারের বড় অংশ অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। নতুন বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলে এই নির্ভরতা কমতে পারে। তবে তার জন্য বাজার কারসাজি নিয়ন্ত্রণ, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, মানসম্মত নিরীক্ষা এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান বাজার বিশ্লেষকরা।
উন্নত দেশগুলো কীভাবে বড় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনে
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোতে কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করা হয় না। তালিকাভুক্তির ব্যয় কমানো, কর সুবিধা দেওয়া, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং ছোট কোম্পানির জন্য আলাদা বাজার তৈরির মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের এমন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের ক্যাটালিস্ট বাজারের কথা এসেছে সেখানে। ক্যাটালিস্ট হলো সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জের একটি বিশেষায়িত শেয়ারবাজার প্ল্যাটফর্ম, যা মূলত উদীয়মান এবং দ্রুত বর্ধনশীল ছোট-মাঝারি কোম্পানিগুলোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ক্যাটালিস্ট বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে কিছু শর্তসাপেক্ষে আইপিও ব্যয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তার ব্যবস্থা ছিল। এর সর্বোচ্চ সীমা ছিল তিন লাখ সিঙ্গাপুর ডলার।
এর বাইরে জাপানের কিছু স্থানীয় সরকারও শেয়ারবাজারে কোম্পানির তালিকাভুক্তির ব্যয়ের কিছু অংশ বহন করে। ইতালিতে তালিকাভুক্তির পরামর্শ সেবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু শর্তসাপেক্ষে কর রেয়াত দেওয়া হয়েছিল। মালয়েশিয়ায় প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানির আইপিও ব্যয় কমাতেও কর সুবিধার উদ্যোগ ছিল। ভারতে বড় কোম্পানির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা বাজার রয়েছে। এতে কোম্পানিগুলো নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী শেয়ারবাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
বাংলাদেশে কী করা উচিত?
বড় কোম্পানিগুলোর ধরন এক নয়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয় রয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানির ক্ষেত্রে মূল প্রতিষ্ঠানের নীতি ও অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। আবার বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পারিবারিক মালিকানা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও হিসাবব্যবস্থা বড় বিষয়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোর তালিকা তৈরি করে তাদের তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি যাচাই করা যেতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের বাধা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধানের পরিকল্পনা নিতে হবে।
নতুন শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ আর উদ্যোক্তার বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নতুন শেয়ার ইস্যু করলে কোম্পানি সরাসরি নতুন মূলধন পায়। অন্যদিকে, বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করলে অর্থ সাধারণত বিক্রেতার কাছে যায়। তাই উৎপাদনশীল খাতে নতুন অর্থ আনতে নতুন শেয়ার ইস্যু করা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
সেলিম রায়হান বলেন, “প্রথমে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করা দরকার। তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির কর কাঠামোর মধ্যে যৌক্তিক পার্থক্য থাকতে পারে। তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও অনুমানযোগ্য করতে হবে। একই সঙ্গে করপোরেট সুশাসনের মান এবং আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শেয়ারবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা। বাজারে যদি কারসাজি হয়, ভালো ও খারাপ কোম্পানির মধ্যে বিনিয়োগকারীরা পার্থক্য করতে না পারেন এবং নিয়ম যদি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে শুধু কয়েকটি বড় কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে একটি সুস্থ পুঁজিবাজার তৈরি করা যাবে না।”
বড় কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে বিএসইসির সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে জানিয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে বিএসইসির সঙ্গে আমাদের নিয়মিত বৈঠক হয়। আমরা চাই, শেয়ারবাজারে একটি-দুটি নয়, একাধিক বড় কোম্পানি আসুক। এতে বাজারের পরিধি ও শক্তি দুটোই বাড়বে।”
বড় কোম্পানি শেয়ারবাজারে এলে দেশের লাভ কী?
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে এলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ। নতুন শেয়ার ইস্যু করে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কারখানা স্থাপন, উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব। এতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয় না। বড় কোম্পানিগুলো বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করলে ব্যাংকের অর্থায়ন ছোট ও মাঝারি ব্যবসা এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতেও ব্যবহারের সুযোগ বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষ বড় কোম্পানির প্রবৃদ্ধির অংশীদার হতে পারেন। কোম্পানি মুনাফা করলে বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ পেতে পারেন। শেয়ারের দাম বাড়লে মূলধনী মুনাফাও হতে পারে। তবে শেয়ারের দাম কমলে বিনিয়োগকারীর ক্ষতির ঝুঁকিও রয়েছে।
তৃতীয়ত, তালিকাভুক্তির ফলে কোম্পানির আর্থিক তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা বাড়ে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়ে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারের আকার ও গভীরতা বাড়লে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে বিকল্প বাড়ে।
সব মিলিয়ে, বড় কোম্পানির অংশগ্রহণ শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব সুফল পেতে হলে কোম্পানির অর্থ যেন বাস্তব উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সেলিম রায়হান বলেন, “বিএসইসি চেয়ারম্যান বড় কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কথা বলেছেন। কমিশনের এ ধরনের আইনি ক্ষমতা আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। আমি মনে করি, বড় ও লাভজনক দেশীয় কোম্পানি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং উপযুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজন। এতে বাজারের গভীরতা বাড়বে, ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।”
এ ক্ষেত্রে বিএসইসিরও দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়েছেন সেলিম রায়হান, “…তবে আমি বাধ্য করাকেই প্রথম বা প্রধান নীতি হিসেবে দেখতে চাই না। প্রশ্ন করতে হবে, ভালো কোম্পানি স্বেচ্ছায় শেয়ারবাজারে আসতে চায় না কেন? সেই কারণগুলো দূর না করে শুধু বাধ্যতামূলক তালিকাভুক্তির পথে গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।”