চরচা ডেস্ক

একজন ‘ভারতীয় আঙ্কেল’ বা মধ্যবয়সী মুরুব্বিকে কীভাবে চিনবেন?
এর সবচেয়ে সহজ ও মোক্ষম উপায় হলো তার মুখের একটি চেনা বাক্য, “লেট মি টেল ইউ” (আমাকে আগে বলতে দাও)। ব্যস, এই একটি বাক্য শুরু হওয়া মানেই ধরে নেবেন এরপরই আপনি শুনতে যাচ্ছেন এই দেশের আসল সমস্যাটা কোথায় এবং তা সমাধানের এক দীর্ঘ গবেষণামূলক থিসিস!
আঙ্কেলদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিনা মূল্যে বা অযাচিতভাবে উপদেশ দেওয়া। সেই উপদেশ ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং থেকে শুরু করে ডায়েট চার্ট যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। তারা হয়তো অবলীলায় বলে বসবেন, “সাহিত্য তো শুধু মেয়েরাই পড়ে, ওসব দিয়ে ক্যারিয়ার হবে না!” কিংবা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হুট করেই প্রেসক্রিপশন দিয়ে দেবেন, “প্রতিদিন সকালে পানিতে ভেজানো পাঁচটা কাঠবাদাম খাও।”
তবে ভারতীয় আঙ্কেলদের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান চেনা রূপটি ফুটে ওঠে আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাদের অগাধ এবং অন্তহীন অবজ্ঞায়। তাদের চোখে আজকের যুগের ছেলেমেয়েরা হলো দায়িত্বজ্ঞানহীন, দিনরাত ফোনে বুঁদ হয়ে থাকা একদল ‘ অপদার্থ! তাদের একমাত্র দাওয়াই হলো কড়া শাসন আর শৃঙ্খলা।
ধর্ম, জাতপাত কিংবা ভাষার মতো ভারতের যত বড় বড় দেওয়ালই থাকুক না কেন, এই ‘আঙ্কেল’ চরিত্রটি সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং সবখানেই একচ্ছত্রভাবে বিরাজমান। মধ্যবয়সে পা দেওয়া মাত্রই এক অলৌকিক উপায়ে তারা রাতারাতি এই ‘তেজস্ক্রিয় আত্মবিশ্বাস’ আর সর্বজ্ঞানীর খেতাব অর্জন করে বসেন। এরপরই শুরু হয় হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে নিজেদের তৈরি আঙ্কেল নীতির প্রচার ও প্রসার।
তবে সাধারণ আঙ্কেলদের এই মাতব্বরি বা কর্তৃত্ব কেবল তাদের নিজেদের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আসল বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গায়। ভারতের শাসনভার বা ক্ষমতার চেয়ারে যে ‘আঙ্কেল’রা বসে আছেন, তাদের সীমানা কিন্তু এতটুকুতেই আটকে নেই।
তারা তাদের সেই আদিম ও মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণা পুরো জাতির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিচ্ছেন। আর তাই বর্তমান ভারতের চালচিত্র দেখে মনে হতেই পারে এই দেশ আসলে আঙ্কেলদেরই একটি প্রজাতন্ত্র, যা পরিচালিত হচ্ছে আঙ্কেলদের দ্বারাই এবং শুধুমাত্র আঙ্কেলদেরই কল্যাণের জন্য!

আঙ্কেলদের এই মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণার কারণেই ভারতের নীতি নির্ধারণে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু অদ্ভুত ও শিশুসুলভ সিদ্ধান্ত দেখা যায়, যা প্রাপ্তবয়স্কদের রীতিমতো খাটো করে। যেমন গুজরাট সরকারের সেই পরিকল্পনা, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো কাপল আইনত বিয়ে করতে চাইলে তাদের বাবা-মায়ের সই বা অনুমতি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
কিংবা গোয়ার সরকারি কলেজগুলোতে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম বা স্কুল ড্রেস বাধ্যতামূলক করার নিয়ম। এমনকি খোদ রাজধানীতেও আইনগুলো অদ্ভুত। দিল্লিতে একজন নাগরিক ১৮ বছর বয়সে ভোট দিতে পারেন, ২১ বছরে বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু ২৫ বছর না হওয়া পর্যন্ত আইনিভাবে এক গ্লাস বিয়ার খাওয়ার অনুমতি পান না!
একই আঙ্কেলতন্ত্রের হাওয়া বইছে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোতেও, যার বিচারকদের ৮৫ শতাংশেরই বেশি হলেন মধ্যবয়সী পুরুষ। স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিভিন্ন মন্তব্য ও রায়েও সেই ‘আঙ্কেলসুলভ’ মানসিকতা প্রকাশ পায়। ২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট তরুণীদের পরামর্শ দিয়ে বলেছিল, ‘মাত্র দুই মিনিটের যৌন আনন্দ’ উপভোগ না করে বরং নিজেদের ‘যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ’ করা উচিত।
আবার কর্ণাটকের এক বিচারক পর্যবেক্ষণ করে জানান, ১৮ বা ২১ বছর বয়স পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা ‘দেশের জন্য মঙ্গলজনক’ হবে। আর গত ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আক্ষেপ করে বলে বসেন, “আজকালকার তরুণরা সব ককরোচ বা তেলাপোকার মতো, তারা কোনো চাকরি পায় না, পেশাগত জগতেও তাদের কোনো জায়গা নেই।”
তবে তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে করা প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যই যেন বুমেরাংয়ের মতো ফিরে আসে। এই মন্তব্যের ঠিক এক দিনের মাথায় বোস্টনে বসবাসরত এক ভারতীয় শিক্ষার্থী মজার ছলে একটি রাজনৈতিক দল খুলে বসেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক দিনেই ইনস্টাগ্রামে এই পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ (২২ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে যায় যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) চেয়েও দ্বিগুণের বেশি! একই সঙ্গে এই পেজটি ভারতীয় তরুণদের মনে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশার এক বিশাল অনলাইন প্রতিবাদী মঞ্চে পরিণত হয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে প্রধান বিচারপতি অবশ্য পরে সাফাই গেয়ে জানান, তিনি আসলে ভুয়া ল ডিগ্রিধারীদের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। তবে আঙ্কেলসুলভ স্বভাবসুলভ অহংকার থেকে তিনি শেষমেশ যোগ করতে ভুললেন না, “তরুণরা আমাকে ভীষণ শ্রদ্ধা ও সম্মান করে!” আর এটাই হলো পৃথিবীর প্রতিটি আঙ্কেল বা মুরুব্বির চিরন্তন অলীক কল্পনা ও আত্মতুষ্টি!
বাড়িতে কোনো বিষয়ে আঙ্কেল বা মুরুব্বিদের একটু ভুল ধরিয়ে দিতে গেছেন কি মরেছেন! তাদের ঝুলি থেকে সঙ্গে সঙ্গে একটা চেনা ধমক বেরিয়ে আসবে- “যত বড় মুখ না তত বড় কথা!” ঠিক এই ঘরের ‘আঙ্কেলতন্ত্র’ যখন দেশের শাসনব্যবস্থার চেয়ারে গিয়ে বসে, তখন তরুণদের সমালোচনার জবাবে তাদের প্রতিক্রিয়াও ঠিক একই রকম হয়। শুধু তফাত একটাই- এবার ধমকের সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতা।
যেমন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র মতো তরুণদের একটি অনলাইন পেজ যখন তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠল, তখন এই ‘আঙ্কেলদের সরকার’ তড়িঘড়ি করে একে ‘জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ’ বলে দিল। ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি আখ্যা দিয়ে সরকার এই তেলাপোকাদের এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টটিই দেশে বন্ধ করে দিল।
এমনকি এক নেতা তো এই সাধারণ ইন্টারনেট মিম বা ট্রলকে সরাসরি বিদেশি চক্রান্ত বলে দাগিয়ে দিলেন! আসলে একজন সাধারণ ভারতীয় আঙ্কেলের মাথায় এটা আসেই না যে আজকের তরুণদেরও নিজস্ব কোনো বুদ্ধি বা স্বাধীন মতামত থাকতে পারে।
একইভাবে, আঙ্কেলদের পক্ষে এটাও মেনে নেওয়া অসম্ভব যে তারা নিজেরা সব জান্তা নাও হতে পারেন। অথচ বাস্তব চিত্র বলছে, ভারতের অর্ধেক মানুষের বয়সই ৩০ বছরের নিচে। প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় ৫০ লাখ তরুণ পড়াশোনা শেষ করে বের হচ্ছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ একটি স্থায়ী চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন।

কিন্তু দেশের আঙ্কেলরা কখনোই নিজেদের প্রশ্ন করেন না যে কেন চাকরি তৈরি হচ্ছে না। কারণ, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার চেয়ে তরুণদের ওপর দোষ চাপানো অনেক সহজ!
ঠিক এই মানসিকতা থেকেই কয়েক বছর আগে এক সত্তরোর্ধ্ব ধনকুবের তরুণদের জ্ঞান দিয়ে বলেছিলেন, দেশের উন্নতির জন্য তরুণদের সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজ করা উচিত। আরেক কোম্পানির বড় কর্তা তো আরও এক কাঠি ওপরে গিয়ে সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টা খাটুনির পরামর্শ দিয়ে বসলেন এবং খোঁচা মেরে বললেন, “বাড়িতে বসে আপনারা আসলে কী করেন? নিজের স্ত্রীর দিকেই বা আর কতক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়?”
বাস্তবতার সাথে কোনো যোগাযোগ না থাকা এমন মন্তব্য আর ক্ষমতার জোরে তরুণদের মুখ চেপে ধরার এই ‘আঙ্কেলসুলভ’ আচরণই এখন ভারতের যুব সমাজের মনে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আসলে ভারতের কোটি কোটি তরুণ কিন্তু ইতিমধ্যেই এই পরিমাণ খাটুনি খাটছেন। তারা নিয়মিত স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন, এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটছে কোচিং ক্লাসের চার দেওয়ালে, আর বাড়ি ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পড়াশোনা। এই তো গত মে মাসেই প্রায় ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার মেডিকেল আসনের জন্য একটি জাতীয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এর মাত্র ৯ দিন পরেই পুরো পরীক্ষাটি বাতিল করে দেওয়া হয়, কারণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল!
ঠিক একই মাসে ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়, যা ভারতের স্কুল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হয়। প্রায় ১৮ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় বসেছিলেন, কিন্তু সেই ফলাফলেও দেখা গেল গণ্ডগোল আর ভুলে ভরা এক হুলুস্থুল কাণ্ড! বর্তমানে একটি সংসদীয় কমিটি এই দুটি কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে। অর্থাৎ, আঙ্কেলদের ভুল এখন অন্য আঙ্কেলরাই খতিয়ে দেখছেন এবং তারাই নিজেদের গ্রেড বা নম্বর দেবেন!
একদিকে বাবা-মায়ের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দাদাগিরি, শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত অযোগ্যতা আর সেই সঙ্গে তীব্র বেকারত্ব- এতসব কিছুর মুখে পড়েও ভারতের তরুণরা যে কেবল একটি সাধারণ ইন্টারনেট মিম বানিয়ে শান্ত রয়েছে, তা সত্যিই এক অলৌকিক মিরাকল বা বিস্ময়! কারণ, পাশের দেশ নেপাল, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কার তরুণরা কিন্তু তাদের নিজেদের দেশের এই বৃদ্ধ বা বয়স্ক নেতাদের মান্ধাতা আমলের নিয়মের বিরুদ্ধে অনেক বেশি কঠোর ও হিংস্রভাবে রাজপথে জবাব দিয়েছে।
তাই সবশেষে ভারতের এই সর্বজ্ঞানী আঙ্কেলদের জন্য একটি ছোট্ট অযাচিত ফ্রিতে উপদেশ- এই ‘তেলাপোকা’ বা তরুণদের ইন্টারনেটে একটু আনন্দ-মজা করতে দিন, মুখ চেপে ধরবেন না। এটা আসলে আপনাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই ভালো। আর হ্যাঁ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখতে প্রতিদিন সকালে পানিতে ভেজানো ওই পাঁচটা কাঠবাদাম খেতে কিন্তু একদম ভুলবেন না!
দ্য ইকোনোমিস্টের বিশ্লেষণ

একজন ‘ভারতীয় আঙ্কেল’ বা মধ্যবয়সী মুরুব্বিকে কীভাবে চিনবেন?
এর সবচেয়ে সহজ ও মোক্ষম উপায় হলো তার মুখের একটি চেনা বাক্য, “লেট মি টেল ইউ” (আমাকে আগে বলতে দাও)। ব্যস, এই একটি বাক্য শুরু হওয়া মানেই ধরে নেবেন এরপরই আপনি শুনতে যাচ্ছেন এই দেশের আসল সমস্যাটা কোথায় এবং তা সমাধানের এক দীর্ঘ গবেষণামূলক থিসিস!
আঙ্কেলদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিনা মূল্যে বা অযাচিতভাবে উপদেশ দেওয়া। সেই উপদেশ ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং থেকে শুরু করে ডায়েট চার্ট যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে। তারা হয়তো অবলীলায় বলে বসবেন, “সাহিত্য তো শুধু মেয়েরাই পড়ে, ওসব দিয়ে ক্যারিয়ার হবে না!” কিংবা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হুট করেই প্রেসক্রিপশন দিয়ে দেবেন, “প্রতিদিন সকালে পানিতে ভেজানো পাঁচটা কাঠবাদাম খাও।”
তবে ভারতীয় আঙ্কেলদের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান চেনা রূপটি ফুটে ওঠে আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাদের অগাধ এবং অন্তহীন অবজ্ঞায়। তাদের চোখে আজকের যুগের ছেলেমেয়েরা হলো দায়িত্বজ্ঞানহীন, দিনরাত ফোনে বুঁদ হয়ে থাকা একদল ‘ অপদার্থ! তাদের একমাত্র দাওয়াই হলো কড়া শাসন আর শৃঙ্খলা।
ধর্ম, জাতপাত কিংবা ভাষার মতো ভারতের যত বড় বড় দেওয়ালই থাকুক না কেন, এই ‘আঙ্কেল’ চরিত্রটি সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং সবখানেই একচ্ছত্রভাবে বিরাজমান। মধ্যবয়সে পা দেওয়া মাত্রই এক অলৌকিক উপায়ে তারা রাতারাতি এই ‘তেজস্ক্রিয় আত্মবিশ্বাস’ আর সর্বজ্ঞানীর খেতাব অর্জন করে বসেন। এরপরই শুরু হয় হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে নিজেদের তৈরি আঙ্কেল নীতির প্রচার ও প্রসার।
তবে সাধারণ আঙ্কেলদের এই মাতব্বরি বা কর্তৃত্ব কেবল তাদের নিজেদের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আসল বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গায়। ভারতের শাসনভার বা ক্ষমতার চেয়ারে যে ‘আঙ্কেল’রা বসে আছেন, তাদের সীমানা কিন্তু এতটুকুতেই আটকে নেই।
তারা তাদের সেই আদিম ও মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণা পুরো জাতির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিচ্ছেন। আর তাই বর্তমান ভারতের চালচিত্র দেখে মনে হতেই পারে এই দেশ আসলে আঙ্কেলদেরই একটি প্রজাতন্ত্র, যা পরিচালিত হচ্ছে আঙ্কেলদের দ্বারাই এবং শুধুমাত্র আঙ্কেলদেরই কল্যাণের জন্য!

আঙ্কেলদের এই মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণার কারণেই ভারতের নীতি নির্ধারণে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু অদ্ভুত ও শিশুসুলভ সিদ্ধান্ত দেখা যায়, যা প্রাপ্তবয়স্কদের রীতিমতো খাটো করে। যেমন গুজরাট সরকারের সেই পরিকল্পনা, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো কাপল আইনত বিয়ে করতে চাইলে তাদের বাবা-মায়ের সই বা অনুমতি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
কিংবা গোয়ার সরকারি কলেজগুলোতে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম বা স্কুল ড্রেস বাধ্যতামূলক করার নিয়ম। এমনকি খোদ রাজধানীতেও আইনগুলো অদ্ভুত। দিল্লিতে একজন নাগরিক ১৮ বছর বয়সে ভোট দিতে পারেন, ২১ বছরে বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু ২৫ বছর না হওয়া পর্যন্ত আইনিভাবে এক গ্লাস বিয়ার খাওয়ার অনুমতি পান না!
একই আঙ্কেলতন্ত্রের হাওয়া বইছে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোতেও, যার বিচারকদের ৮৫ শতাংশেরই বেশি হলেন মধ্যবয়সী পুরুষ। স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিভিন্ন মন্তব্য ও রায়েও সেই ‘আঙ্কেলসুলভ’ মানসিকতা প্রকাশ পায়। ২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট তরুণীদের পরামর্শ দিয়ে বলেছিল, ‘মাত্র দুই মিনিটের যৌন আনন্দ’ উপভোগ না করে বরং নিজেদের ‘যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ’ করা উচিত।
আবার কর্ণাটকের এক বিচারক পর্যবেক্ষণ করে জানান, ১৮ বা ২১ বছর বয়স পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা ‘দেশের জন্য মঙ্গলজনক’ হবে। আর গত ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আক্ষেপ করে বলে বসেন, “আজকালকার তরুণরা সব ককরোচ বা তেলাপোকার মতো, তারা কোনো চাকরি পায় না, পেশাগত জগতেও তাদের কোনো জায়গা নেই।”
তবে তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে করা প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যই যেন বুমেরাংয়ের মতো ফিরে আসে। এই মন্তব্যের ঠিক এক দিনের মাথায় বোস্টনে বসবাসরত এক ভারতীয় শিক্ষার্থী মজার ছলে একটি রাজনৈতিক দল খুলে বসেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)।
দেখতে দেখতে মাত্র কয়েক দিনেই ইনস্টাগ্রামে এই পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ (২২ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে যায় যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) চেয়েও দ্বিগুণের বেশি! একই সঙ্গে এই পেজটি ভারতীয় তরুণদের মনে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশার এক বিশাল অনলাইন প্রতিবাদী মঞ্চে পরিণত হয়।
অবস্থা বেগতিক দেখে প্রধান বিচারপতি অবশ্য পরে সাফাই গেয়ে জানান, তিনি আসলে ভুয়া ল ডিগ্রিধারীদের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। তবে আঙ্কেলসুলভ স্বভাবসুলভ অহংকার থেকে তিনি শেষমেশ যোগ করতে ভুললেন না, “তরুণরা আমাকে ভীষণ শ্রদ্ধা ও সম্মান করে!” আর এটাই হলো পৃথিবীর প্রতিটি আঙ্কেল বা মুরুব্বির চিরন্তন অলীক কল্পনা ও আত্মতুষ্টি!
বাড়িতে কোনো বিষয়ে আঙ্কেল বা মুরুব্বিদের একটু ভুল ধরিয়ে দিতে গেছেন কি মরেছেন! তাদের ঝুলি থেকে সঙ্গে সঙ্গে একটা চেনা ধমক বেরিয়ে আসবে- “যত বড় মুখ না তত বড় কথা!” ঠিক এই ঘরের ‘আঙ্কেলতন্ত্র’ যখন দেশের শাসনব্যবস্থার চেয়ারে গিয়ে বসে, তখন তরুণদের সমালোচনার জবাবে তাদের প্রতিক্রিয়াও ঠিক একই রকম হয়। শুধু তফাত একটাই- এবার ধমকের সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতা।
যেমন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র মতো তরুণদের একটি অনলাইন পেজ যখন তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠল, তখন এই ‘আঙ্কেলদের সরকার’ তড়িঘড়ি করে একে ‘জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ’ বলে দিল। ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি আখ্যা দিয়ে সরকার এই তেলাপোকাদের এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টটিই দেশে বন্ধ করে দিল।
এমনকি এক নেতা তো এই সাধারণ ইন্টারনেট মিম বা ট্রলকে সরাসরি বিদেশি চক্রান্ত বলে দাগিয়ে দিলেন! আসলে একজন সাধারণ ভারতীয় আঙ্কেলের মাথায় এটা আসেই না যে আজকের তরুণদেরও নিজস্ব কোনো বুদ্ধি বা স্বাধীন মতামত থাকতে পারে।
একইভাবে, আঙ্কেলদের পক্ষে এটাও মেনে নেওয়া অসম্ভব যে তারা নিজেরা সব জান্তা নাও হতে পারেন। অথচ বাস্তব চিত্র বলছে, ভারতের অর্ধেক মানুষের বয়সই ৩০ বছরের নিচে। প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় ৫০ লাখ তরুণ পড়াশোনা শেষ করে বের হচ্ছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ একটি স্থায়ী চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন।

কিন্তু দেশের আঙ্কেলরা কখনোই নিজেদের প্রশ্ন করেন না যে কেন চাকরি তৈরি হচ্ছে না। কারণ, নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার চেয়ে তরুণদের ওপর দোষ চাপানো অনেক সহজ!
ঠিক এই মানসিকতা থেকেই কয়েক বছর আগে এক সত্তরোর্ধ্ব ধনকুবের তরুণদের জ্ঞান দিয়ে বলেছিলেন, দেশের উন্নতির জন্য তরুণদের সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজ করা উচিত। আরেক কোম্পানির বড় কর্তা তো আরও এক কাঠি ওপরে গিয়ে সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টা খাটুনির পরামর্শ দিয়ে বসলেন এবং খোঁচা মেরে বললেন, “বাড়িতে বসে আপনারা আসলে কী করেন? নিজের স্ত্রীর দিকেই বা আর কতক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়?”
বাস্তবতার সাথে কোনো যোগাযোগ না থাকা এমন মন্তব্য আর ক্ষমতার জোরে তরুণদের মুখ চেপে ধরার এই ‘আঙ্কেলসুলভ’ আচরণই এখন ভারতের যুব সমাজের মনে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আসলে ভারতের কোটি কোটি তরুণ কিন্তু ইতিমধ্যেই এই পরিমাণ খাটুনি খাটছেন। তারা নিয়মিত স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন, এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটছে কোচিং ক্লাসের চার দেওয়ালে, আর বাড়ি ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পড়াশোনা। এই তো গত মে মাসেই প্রায় ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার মেডিকেল আসনের জন্য একটি জাতীয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু এর মাত্র ৯ দিন পরেই পুরো পরীক্ষাটি বাতিল করে দেওয়া হয়, কারণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল!
ঠিক একই মাসে ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়, যা ভারতের স্কুল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হয়। প্রায় ১৮ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় বসেছিলেন, কিন্তু সেই ফলাফলেও দেখা গেল গণ্ডগোল আর ভুলে ভরা এক হুলুস্থুল কাণ্ড! বর্তমানে একটি সংসদীয় কমিটি এই দুটি কেলেঙ্কারির তদন্ত করছে। অর্থাৎ, আঙ্কেলদের ভুল এখন অন্য আঙ্কেলরাই খতিয়ে দেখছেন এবং তারাই নিজেদের গ্রেড বা নম্বর দেবেন!
একদিকে বাবা-মায়ের আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দাদাগিরি, শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত অযোগ্যতা আর সেই সঙ্গে তীব্র বেকারত্ব- এতসব কিছুর মুখে পড়েও ভারতের তরুণরা যে কেবল একটি সাধারণ ইন্টারনেট মিম বানিয়ে শান্ত রয়েছে, তা সত্যিই এক অলৌকিক মিরাকল বা বিস্ময়! কারণ, পাশের দেশ নেপাল, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কার তরুণরা কিন্তু তাদের নিজেদের দেশের এই বৃদ্ধ বা বয়স্ক নেতাদের মান্ধাতা আমলের নিয়মের বিরুদ্ধে অনেক বেশি কঠোর ও হিংস্রভাবে রাজপথে জবাব দিয়েছে।
তাই সবশেষে ভারতের এই সর্বজ্ঞানী আঙ্কেলদের জন্য একটি ছোট্ট অযাচিত ফ্রিতে উপদেশ- এই ‘তেলাপোকা’ বা তরুণদের ইন্টারনেটে একটু আনন্দ-মজা করতে দিন, মুখ চেপে ধরবেন না। এটা আসলে আপনাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই ভালো। আর হ্যাঁ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখতে প্রতিদিন সকালে পানিতে ভেজানো ওই পাঁচটা কাঠবাদাম খেতে কিন্তু একদম ভুলবেন না!
দ্য ইকোনোমিস্টের বিশ্লেষণ

একজন ‘ভারতীয় আঙ্কেল’ বা মধ্যবয়সী মুরুব্বিকে কীভাবে চিনবেন? এর সবচেয়ে সহজ এবং মোক্ষম উপায় হলো তার মুখের একটি চেনা বাক্য, “লেট মি টেল ইউ” (আমাকে আগে বলতে দাও)। ব্যস, এই একটি বাক্য শুরু হওয়া মানেই ধরে নেবেন এরপরই আপনি শুনতে যাচ্ছেন এই দেশের আসল সমস্যাটা কোথায় এবং তা সমাধানের এক দীর্ঘ গবেষণামূলক থিসিস

জাতিসংঘ জানিয়েছে, মার্চের শেষ নাগাদ পাকিস্তানি বোমায় ৩৭২ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আরও হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কুনার প্রদেশের নারি জেলার ৩১ বছর বয়সী দেলাওয়ার খান বলেন, তার পরিবার এবং আরও অনেকেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। খাবার ও পানি জোগাড় করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।