ads

সংসদ সদস্যদের যেসব ঘটনায় বিতর্কিত দেশের রাজনীতি

সুপ্রিয় সিকদার
সুপ্রিয় সিকদার
সংসদ সদস্যদের যেসব ঘটনায় বিতর্কিত দেশের রাজনীতি
বহু ঘটনায় জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক আজও চলমান। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে একাধিক সংসদ সদস্য (এমপি) নানা বিতর্ক, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অপরাধমূলক অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন। সে হোক সরকারি দলের বা বিরোধী দলের। নারী কেলেঙ্কারি, হত্যাচেষ্টা, দুর্নীতি, জালিয়াতি, মানবপাচারসহ নানা অভিযোগ দেশের রাজনীতিকে তারা বিতর্কিত করেছেন বেশ কয়েকবার। নানা অভিযোগে কয়েকজন সংসদ সদস্য আবার পদও হারিয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলীয় শাস্তি বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, অনেক ঘটনায় জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কারণে আলোচনায় এসেছেন সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। ব্যাপক সমালোচনার মুখে জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। একই সঙ্গে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়েও পদক্ষেপের দাবি ওঠে। এছাড়া নিজ গাড়িচালককে প্রাণনাশের হুমকি ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে আদৌ গাজী নজরুল ইসলাম সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন তো?

Advertisement

কী হয়েছিল গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে

গত সোমবার রাতে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত’ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। শুরুর দিকে এমপির সমর্থকরা দাবি করেছিল, ভিডিওটি ২০২৩ সালে ধারণ করা। এ ঘটনায় দেশজুড়ে কড়া সমালোচনা শুরু হয়। পরে নজরুল ইসলাম তার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, রাজধানীর মগবাজারে তার ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’র বাবার অফিসে তাকে ‘জিম্মি’ করে এক লাখ টাকা আদায় করা হয়। এরপর উদ্দেশ্যপ্রাণোদিতভাবে তাদের (তরুণী ও গাজী নজরুল ইসলাম) ‘ব্যক্তিগত’ ও ‘ঘনিষ্ঠ’ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আর এ কাজটি করেছে তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা।

গাজী নজরুল ইসলাম। ফাইল ছবি
গাজী নজরুল ইসলাম। ফাইল ছবি

এর মধ্যে গত মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন মাধ্যমে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ২০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলাম ও ওই তরুণী দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সেখানে টেবিলে রাখা আইডি কার্ডে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ পার্লামেন্ট। ঠিক এর নিচে লেখা ত্রয়োদশ সংসদ। এরপর গাজী নজরুল ইসলামের ছবি দেওয়া। ছবির নিচে লেখা জি এম নজরুল ইসলাম। পদবি হিসেবে লেখা সংসদ সদস্য। এ সময় হট্টগোলের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা যায়, “দেখেন সাতক্ষীরা জামায়াতের লোক মেয়েসহ এখানে ধরা খাইছে। এই যে এই মুরুব্বি।”

ইতিহাস কী বলছে?

রাজশাহী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এনামুল হকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন। ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এনামুল হকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন। ছবি: সংগৃহীত

নারী সংক্রান্ত বিতর্কে অতীতেও দেশের বিভিন্ন সংসদ সদস্যের নাম এসেছে। ২০২৩ সালে রাজশাহী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এনামুল হকের বিরুদ্ধে এক নারীকে বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক ও প্রতারণার অভিযোগ ওঠে। তখন তার বিরুদ্ধে স্থানীয়রা মানববন্ধনও করেন।

এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয় টাঙ্গাইল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামানের ছেলে ও পরবর্তী সময়ে ওই আসনের এমপি তানভীর হাসান ছোট মনিরের বড় ভাই গোলাম কিবরিয়া ওরফে বড় মনিরের বিরুদ্ধে। তখন বড় মনিরকে আওয়ামী লীগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই ঘটনায় মামলার বাদীর মৃত্যুর পর আলোচনা আরও জোরালো হয়।

নারী সংক্রান্ত বিতর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ও জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মুরাদ হাসানকে ঘিরে। ২০২১ সালে ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপে অভিনেত্রী মাহিয়া মাহির সঙ্গে তার অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং ধর্ষণের হুমকির অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। একই সময়ে এক নারী রাজনৈতিক নেত্রীকে নিয়ে তার আপত্তিকর মন্তব্যও সমালোচনার জন্ম দেয়।

ডা. মো. মুরাদ হাসান। ফাইল ছবি
ডা. মো. মুরাদ হাসান। ফাইল ছবি

এই ঘটনার পর তিনি মন্ত্রিসভার পদ হারান এবং দল থেকেও বহিষ্কৃত হন। তবে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য পদ হারাননি।

হত্যাচেষ্টার অভিযোগ যেসব সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে

হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার অভিযোগেও বিভিন্ন সময়ে একাধিক সংসদ সদস্যের নাম এসেছে। গাইবান্ধা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ২০১৫ সালে এক শিশু শিক্ষার্থীকে গুলি করার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচিত হন। পরে ২০১৬ সালের শেষ দিকে নিজ বাড়িতে আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন তিনি।

নরসিংদী-৩ আসনের জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া মোহনকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দল ও হত্যা-হত্যাচেষ্টার মামলার আলোচনা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, হত্যা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে। ত্বকী হত্যা মামলাসহ একাধিক ঘটনায় তাদের নাম জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে।

মানবপাচারেও সংসদ সদস্য

মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল। ফাইল ছবি
মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল। ফাইল ছবি

মানবপাচার ও দুর্নীতির ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত নাম লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল। ২০২০ সালে কুয়েতে মানবপাচার ও অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশটির আদালত তাকে দণ্ডিত করেন।

নানা কারণে যারা সংসদ সদস্য পদ নিয়ে জটিলতায় পড়েছেন

নানা কারণে সংসদ সদস্য পদ হারানোর ঘটনাও রয়েছে দেশের ইতিহাসে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়।

অপরদিকে হজ ও তাবলিগ জামাত নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং পরে নিজেই সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

মানবপাচার ও দুর্নীতির ঘটনায় ২০২১ সালে জাতীয় সংসদ সচিবালয় লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণা করে। বিদেশি আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে সংসদ সদস্য পদ হারানোর ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম ঘটনা।

এইচ এম এরশাদ। ফাইল ছবি
এইচ এম এরশাদ। ফাইল ছবি

সংসদ সদস্য পদ নিয়ে যা বলছে সংবিধান

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কেউ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হলে, তিনি যদি নিজের দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে। তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনো নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন না।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কোনো এমপি কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে, সাজা ভোগের পর আরও পাঁচ বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদ নির্বাচনে অযোগ্য থাকবেন। তবে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত হলেও, উচ্চ আদালত যদি ওই দণ্ড ও সাজা স্থগিত বা বাতিল করেন, তাহলে তিনি সংসদ সদস্যপদ ফিরে পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। 

সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে সংসদের আসন শূন্য হওয়া নিয়ে বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে, যদি তার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠক থেকে ৯০ দিনের মধ্যে স্পিকারকে না জানিয়ে তিনি শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন; সংসদের অনুমতি না নিয়ে ৯০ বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকেন; সংসদ ভেঙে যায়; সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন অযোগ্য হয়ে যান; অথবা ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়।

জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ শুধু ব্যক্তি নয়, সংসদীয় ব্যবস্থার ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, বহু ঘটনায় জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক আজও চলমান।

সম্পর্কিত