চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের পর্যটন খাতকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর অবকাশ এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে পর্যটন খাত প্রসারে সরকারের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
অর্থমন্ত্রীর এই মেগা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ক্যাশলেস ট্রাভেল’। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের ডুয়াল কারেন্সি (দ্বৈত মুদ্রা) পলিসি এবং ব্যাংকগুলোর কৌশলগত প্রোডাক্ট ডিজাইন কীভাবে এই বাজেট আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ।
অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশকে কেবল অভ্যন্তরীণ পর্যটন নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। আর এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে নিরাপদ পেমেন্ট ইকোসিস্টেম।
সরকারের এই উচ্চাভিলাষী রূপকল্প বাস্তবায়নের পথে একদিকে যেমন রয়েছে অসীম সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক আচরণ, চার্জের কাঠামো এবং বৈদেশিক মুদ্রার নীতি প্রয়োগের ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ।
পর্যটন খাতের প্রসারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রচারের জন্য বাজেট বরাদ্দ আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সাথে বাজেট রূপরেখায় পর্যটকদের নিরাপত্তা ও লেনদেন সহজ করতে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান পর্যটন কেন্দ্র পর্যন্ত পেমেন্ট ডিজিটালাইজেশন বা ক্যাশলেস ট্রাভেল উৎসাহিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
এই ক্যাশলেস ট্রাভেলের মূল লাইফলাইন হলো, ক্রেডিট কার্ডের ডুয়াল কারেন্সি পলিসি, যা নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট (এফইপিডি)। এফইপিডির সর্বশেষ সংশোধিত এফই সার্কুলার অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি নাগরিক এক ক্যালেন্ডার বছরে পাসপোর্টের বিপরীতে কার্ড ও নগদ মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এনডোর্স করাতে পারেন।
কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ক্যাশলেস লেনদেনের সুযোগ সীমিত। দেশের বড় দোকান বাদে বেশিরভাগ জায়গায় নগদ টাকা ছাড়া লেনদেন করা যায় না। এমন বাস্তবতায় বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশ ভ্রমণ তুলনামূলক সহজ ও নিরাপদ করতে কার্ড-বান্ধব পরিকাঠামো, যেমন- পিওএস মেশিন, এটিএম নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার খুবই প্রয়োজন।
বিদেশি পর্যটকের খরচ ব্যাংকিং চ্যানেলে হলে ওই বৈদেশিক মুদ্রা আয় সরকারি হিসাবে নথিভুক্ত হয়। ফলে রেমিট্যান্স বা রপ্তানির মতোই এটাও দেশের রিজার্ভে যোগ হবে। নগদ-নির্ভরতা কমানো গেলে কর ফাঁকি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির পরিধিও কিছুটা কমতে পারে, কারণ লেনদেনের একটা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ধারা তৈরি হয়। একইভাবে, পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (হোটেল, ট্যুর অপারেটর, রেস্তোরাঁ) বিদেশি মুদ্রায় সরাসরি অর্থ পেলে তাদের নগদ ব্যবস্থাপনারও ঝুঁকি কমে।
ক্যাশলেস ট্রাভেলের অফিশিয়াল চ্যানেলকে শক্তিশালী করতে ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের চার্জ ও রূপান্তর হারের প্রভাব নিয়ে দেশি ও বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে কার্ড ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাশলেস ট্রাভেলের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক কার্ডের চার্জ এবং এক্সচেঞ্জ রেট যেন যৌক্তিক সীমার মধ্যে থাকে, সে বিষয়ে আমাদের নজরদারি রয়েছে। বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখব।”
বাংলাদেশে বেড়াতে আসা বিদেশি পর্যটকরা নিজ দেশের কার্ড দিয়ে সরাসরি লেনদেন করতে পারলে ভ্রমণ অনেকটাই সহজ হয়। কেবল তাই নয়; মানি এক্সচেঞ্জ খোঁজার ঝক্কি থেকে মুক্তি পেতে পারেন অতিথিরা। এতে করে একটা কমফোর্ট জোন তৈরি হয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর বাইরেও ভারতের মতো অনেক দেশই এখন কার্ডভিত্তিক লেনদেন কিংবা ক্যাশলেস লেনদেনে অভ্যস্ত।
ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (এসএমই ও রিটেইল ব্যাংকিং প্রধান) মো. খোরশেদ আনোয়ার চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ধরন গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আগে কার্ডকে মূলত জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমানে গ্রাহকরা এটিকে দৈনন্দিন ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন কেনাকাটা, ভ্রমণ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং লাইফস্টাইল ব্যয়ের একটি নিয়মিত আর্থিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন।”
এই ব্যাংকার আরও বলেন, “আমাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এখনো অধিকাংশ গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করে বিভিন্ন রিওয়ার্ড, ক্যাশব্যাক, অফার ও ০% ইএমআই সুবিধা উপভোগ করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে একটি অংশের গ্রাহকের মধ্যে রিভলবিং ক্রেডিট ব্যবহারের প্রবণতাও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি স্বাভাবিক বাজারগত বাস্তবতা।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত রিটেল ব্যাংকিং গোলটেবিল সেমিনারে (সেপ্টেম্বর ২০২৫) উপস্থাপিত গবেষণাপত্র ‘ডিজিটালাইজেশন অব ক্রস বর্ডার পেমেন্টস অ্যান্ড ট্রাভেল স্পেন্ডিং ইন বাংলাদেশ’-এ বলা হয়েছে, “বিগত তিন বছরে (২০২৩-২০২৫) বাংলাদেশে পাসপোর্ট এনডোর্সমেন্টের বিপরীতে ডুয়াল কারেন্সি কার্ড ব্যবহারের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর চার্জের ভিন্নতা, কারেন্সি কনভার্সন ফি (১.৫% থেকে ৩% পর্যন্ত) এবং মার্ক-আপ ফি-এর কারণে অনেক সাধারণ ভ্রমণকারী কার্ড ব্যবহারের চেয়ে খোলাবাজার (কার্ব মার্কেট) থেকে ক্যাশ ডলার বহন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।”
আইএমএফ-এর গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ডেটাবেজের অধীনে প্রকাশিত গবেষণা পত্র ‘ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যান্ড ক্যাপিটাল ফ্লাইট কন্ট্রোলস ইন এমারজিং মার্কেটস’-এ বলা হয়েছে, “ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে ট্রাভেল কোটার বিপরীতে প্লাস্টিক মানি বা ডুয়াল কারেন্সি কার্ডের চার্জ সহনীয় রাখার পর, অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে (হুন্ডি) ডলার লেনদেন এবং ক্যাপিটাল ফ্লাইটের ঝুঁকি প্রায় ১৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। নীতিমালার সহজীকরণ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রাহকদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে ধরে রাখার প্রধান হাতিয়ার।”
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময় গ্রাহক ও ব্যাংকের মধ্যে করা চুক্তি আরও বোধগম্য করে উপস্থাপন করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য ‘ব্যক্তিগত ক্রেডিট স্কোরিং সিস্টেম’ চালু না হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন।
সাবেক অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার ২৫ শতাংশে ক্যাপ করে দেওয়া হলেও ব্যাংকগুলো ভেতরের হিসাব যেভাবে করে, তা সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ভারত বা অন্যান্য দেশের মতো হিসাবের স্পষ্ট পদ্ধতি সার্কুলার দিয়ে বাধ্যতামূলক না করে, তবে এই নীরব পকেট কাটা বন্ধ হবে না। চুক্তির শর্তাবলীর অজুহাতে ব্যাংকগুলো কোনো অনৈতিক প্র্যাকটিস চালু রাখতে পারে না।”
বিআইবিএম আয়োজিত ব্যাংকিং লিটারেসি ও ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন সেমিনারে অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সিংহভাগ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী ফিন্যান্সিয়ালি লিটারেট (আর্থিক সচেতন) নন। ব্যাংকগুলোর ‘শিডিউল অব চার্জেস’ এত ছোট অক্ষরে এবং জটিল ভাষায় লেখা থাকে যে সাধারণ গ্রাহক ট্রেইলিং ব্যালেন্স বা ডাবল পেনাল্টটির হিসাব ধরতে পারেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত প্রতিটি ব্যাংকের জন্য একটি এক পাতার ‘কি ফ্যাক্টস স্টেটমেন্ট (কেএফএস)’ বাধ্যতামূলক করা, যেখানে সুদের প্রকৃত হিসাব পদ্ধতি বাংলায় স্পষ্ট করে লেখা থাকবে।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশে উন্নত বা উদীয়মান অর্থনীতির মতো একটি ‘ব্যক্তিগত ক্রেডিট স্কোরিং সিস্টেম’ তৈরি করতে না পারায় ব্যাংকগুলো ভালো ও খারাপ গ্রাহকের ঝুঁকি বণ্টন করতে পারছে না। ঝুঁকি সামাল দিতে ব্যাংকগুলো থার্ড-পার্টি এজেন্টের মাধ্যমে আগ্রাসী বিপণন করছে এবং জটিল চক্রবৃদ্ধি সুদের আশ্রয় নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখানে কেবল সুদের সিলিং নির্ধারণ করে বসে আছে, যা আসল সমস্যার সমাধান নয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেশের পর্যটন খাতকে যে সম্ভাবনার দুয়ারে দাঁড় করিয়েছে, তার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ক্যাশলেস ট্রাভেল পলিসির নিখুঁত বাস্তবায়নের ওপর। ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষা এবং সরকারের নীতিগত রূপকল্পের মধ্যে যদি একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় তৈরি করা যায়-তবেই এই ‘নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ’ দেশের পর্যটন শিল্প ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম হবে।