প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হলেও, বিশ্ব অর্থনীতি কি ক্রমেই অল্প কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে?
চরচা ডেস্ক

বর্তমানে হাজার কোটি বা লাখ কোটি টাকার অঙ্ক শুনতে শুনতে মানুষ অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিশাল অঙ্কের নতুন চুক্তির খবর আসে।
গত ১২ জুন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ইলন মাস্কের রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ৮৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। এর মাত্র চার দিন পর প্রতিষ্ঠানটি ৬০ বিলিয়ন ডলারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) কোডিং স্টার্টআপ ‘কার্সর’ কিনবে বলে জানায়। একই দিনে চীনের এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিপসিক জানায়, তারা ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থায়ন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের উত্থান, বিপুল করপোরেট নগদ অর্থ, সরকারি নীতির পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সুযোগে কয়েকটি বিশাল কোম্পানি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত আরও বড় হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন উঠছে, এতে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হলেও, বিশ্ব অর্থনীতি কি ক্রমেই অল্প কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে?
তথ্যপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিলজিকের বরাতে ইকোনমিস্ট বলছে, চলতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বড় বড় একীভূতকরণ (মার্জার) ও অধিগ্রহণের মোট মূল্য সব চুক্তির ৪৮ শতাংশ।
স্টার্টআপে বিনিয়োগও এখন বড় অঙ্কের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। চলতি বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের বিনিয়োগ মোট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বিনিয়োগে কোনো না কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে পিচবুক নামে আরেকটি তথ্যপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
শুধু স্টার্টআপ নয়, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রকল্পেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের নতুন এফডিআই প্রকল্প মোট প্রকল্পের ৪২ শতাংশ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে এই হার ছিল ২৮ শতাংশ।
ইকোনমিস্ট বলছে, এসব বড় অঙ্কের বিনিয়োগের কেন্দ্র এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের নতুন এফডিআই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় গন্তব্য এবং সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাওয়া ১৫টি স্টার্টআপের মধ্যে ১৪টিই যুক্তরাষ্ট্রের। আর ২০২৫ সালের শুরু থেকে হওয়া ৭১টি বড় মার্জার চুক্তির মধ্যে ৪৪টির ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও যুক্তরাষ্ট্রের।

এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রকল্পের দ্বিতীয় বড় উৎস ছিল তাইওয়ান। এরপর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও বড় অঙ্কের স্টার্টআপ বিনিয়োগ হচ্ছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠান ডেওয়ান জুনে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। আর যুক্তরাজ্যের এনস্কেল মার্চে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে।
বড় বড় বিনিয়োগ ও অধিগ্রহণের ঢেউ আগেও এসেছে। তবে এবার একটি বিশেষ বিষয় হলো, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় একই সময়ে এমন বড় চুক্তি হচ্ছে এবং এগুলোর বড় অংশই কয়েকটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে। এতে ঝুঁকিও বাড়ছে।
কেন এত বড় বিনিয়োগ হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ, কোম্পানিগুলোর হাতে প্রচুর অর্থ রয়েছে। সুদের হার আগের তুলনায় বাড়লেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে নগদ অর্থের ঘাটতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে থাকা কোম্পানিগুলোর হাতে এখন প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ রয়েছে। তাদের মুনাফাও ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ফলে কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য বেড়েছে, আর এতে তারা সহজেই অন্য প্রতিষ্ঠান কিনতে বা নতুন করে ঋণ ও শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ তুলতে পারছে।
দ্বিতীয় কারণ, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান। অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মেটা, মাইক্রোসফট ও ওরাকলের মতো পাঁচটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এ বছর ডেটা সেন্টার তৈরিতে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে। একই সঙ্গে তারা এআই স্টার্টআপগুলোতেও বড় বিনিয়োগ করছে।
এআই খাতের এই উত্থান বড় বড় করপোরেট চুক্তিও বাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ কোম্পানি ডমিনিয়ন ও নেক্সটইরা একীভূত হয়েছে। আবার সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাইবারআর্ককে কিনে নিয়েছে পালো অল্টো নেটওয়ার্কস।
বিশ্লেষকরা বলেন, তৃতীয় কারণ হলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকার বড় কোম্পানির একীভূত হওয়ার বিষয়ে আগের সরকারের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও মনে করছে, তাদের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে। তাই তারাও বড় কোম্পানির একীভূত হওয়া সহজ করতে নিয়ম শিথিল করেছে।

এদিকে অনেক দেশ নিজেদের শিল্প দেশে ফিরিয়ে আনতে শুল্ক ও ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে বড় কোম্পানিগুলো বিদেশে নতুন কারখানা গড়তে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। যেমন, তাইওয়ানের টিএসএমসি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় চিপ কারখানা নির্মাণ করছে। আবার চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি হাঙ্গেরিতে নতুন কারখানা গড়ছে।
চতুর্থ কারণ, অনিশ্চয়তা। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যবসার পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। তাই অনেক কোম্পানি মনে করছে, প্রতিষ্ঠান যত বড় হবে, ঝুঁকি সামলানো তত সহজ হবে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসির জেক হেনরি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, অনেক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে এখন একটি কথাই বেশি শোনা যায়, ‘বড় হওয়াই ভালো।’ বিনিয়োগকারীরাও যেন একই ধারণা পোষণ করছেন। আগে ছোট ও বড় প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের ব্যবধান কম ছিল। এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফাকে বাজার অনেক বেশি মূল্য দিচ্ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাদ দিলেও একই চিত্র দেখা যায়।
তবে ঝুঁকিও আছে
বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিগুলোর এই বড় হওয়ার প্রতিযোগিতা ঝুঁকিমুক্ত নয়। গবেষকদের মতে, বড় কোনো প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছোট অধিগ্রহণের চেয়ে বেশি নয়। সফল বা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০-৫০।
কিন্তু বড় চুক্তি ব্যর্থ হলে ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইন বলছে, গত বছরের প্রায় অর্ধেক বড় মার্জারের ক্ষেত্রে যে কোম্পানিকে কেনা হয়েছে, তার মূল্য ছিল ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্যের অর্ধেকেরও বেশি। এমন বড় চুক্তি করতে সাধারণত বিপুল পরিমাণ ঋণও নিতে হয়।

উদ্বেগের বিষয় শুধু বড় বড় কোম্পানির একীভূত হওয়া নয়। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো (হাইপারস্কেলার) ডেটা সেন্টার নির্মাণে নিজেদের ব্যবসা থেকে আয় করা অর্থই ব্যবহার করত। কিন্তু এখন তারা বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে। ফলে তাদের ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। যেমন, অ্যামাজনের ঋণের বোঝা ২০১৯ সালের তুলনায় এখন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে থাকা কোম্পানিগুলোর গড়ের চার গুণেরও বেশি।
এর প্রভাব শুধু কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
ডয়চে ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ১০ শতাংশ কোম্পানির দখলে মোট বাজারমূল্যের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি। গত ১০০ বছরে এত বেশি কেন্দ্রীভূত বাজার আর দেখা যায়নি। এর অর্থ, ঋণের ভারে থাকা এমন কোনো বড় কোম্পানি যদি বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে, তাহলে পুরো আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় কোম্পানির সংখ্যা ও প্রভাব বাড়ার আরও কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এতে ভোক্তা, কর্মচারী ও ছোট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এসব বিশাল কোম্পানির শক্তিশালী লবিংয়ের কারণে সরকারও তাদের প্রভাবের মধ্যে চলে যেতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থান আরও বাড়তে পারে।
জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ বড় কোম্পানিগুলোর ওপর আস্থা রাখেন। তারমানে, বড় প্রতিষ্ঠান হওয়ার অনেক সুবিধা থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভালোবাসা বা বিশ্বাস পাওয়ার বিষয়টি আলাদা।

বর্তমানে হাজার কোটি বা লাখ কোটি টাকার অঙ্ক শুনতে শুনতে মানুষ অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বিশাল অঙ্কের নতুন চুক্তির খবর আসে।
গত ১২ জুন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ইলন মাস্কের রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ৮৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। এর মাত্র চার দিন পর প্রতিষ্ঠানটি ৬০ বিলিয়ন ডলারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) কোডিং স্টার্টআপ ‘কার্সর’ কিনবে বলে জানায়। একই দিনে চীনের এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিপসিক জানায়, তারা ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থায়ন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের উত্থান, বিপুল করপোরেট নগদ অর্থ, সরকারি নীতির পরিবর্তন ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সুযোগে কয়েকটি বিশাল কোম্পানি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত আরও বড় হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন উঠছে, এতে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হলেও, বিশ্ব অর্থনীতি কি ক্রমেই অল্প কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে?
তথ্যপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিলজিকের বরাতে ইকোনমিস্ট বলছে, চলতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বড় বড় একীভূতকরণ (মার্জার) ও অধিগ্রহণের মোট মূল্য সব চুক্তির ৪৮ শতাংশ।
স্টার্টআপে বিনিয়োগও এখন বড় অঙ্কের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। চলতি বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের বিনিয়োগ মোট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ বিনিয়োগে কোনো না কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে বলে জানিয়েছে পিচবুক নামে আরেকটি তথ্যপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
শুধু স্টার্টআপ নয়, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রকল্পেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের নতুন এফডিআই প্রকল্প মোট প্রকল্পের ৪২ শতাংশ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে এই হার ছিল ২৮ শতাংশ।
ইকোনমিস্ট বলছে, এসব বড় অঙ্কের বিনিয়োগের কেন্দ্র এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের নতুন এফডিআই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় গন্তব্য এবং সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাওয়া ১৫টি স্টার্টআপের মধ্যে ১৪টিই যুক্তরাষ্ট্রের। আর ২০২৫ সালের শুরু থেকে হওয়া ৭১টি বড় মার্জার চুক্তির মধ্যে ৪৪টির ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও যুক্তরাষ্ট্রের।

এই প্রবণতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছর ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রকল্পের দ্বিতীয় বড় উৎস ছিল তাইওয়ান। এরপর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও বড় অঙ্কের স্টার্টআপ বিনিয়োগ হচ্ছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডেটা সেন্টার প্রতিষ্ঠান ডেওয়ান জুনে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। আর যুক্তরাজ্যের এনস্কেল মার্চে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে।
বড় বড় বিনিয়োগ ও অধিগ্রহণের ঢেউ আগেও এসেছে। তবে এবার একটি বিশেষ বিষয় হলো, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় একই সময়ে এমন বড় চুক্তি হচ্ছে এবং এগুলোর বড় অংশই কয়েকটি বিশাল প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে। এতে ঝুঁকিও বাড়ছে।
কেন এত বড় বিনিয়োগ হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ, কোম্পানিগুলোর হাতে প্রচুর অর্থ রয়েছে। সুদের হার আগের তুলনায় বাড়লেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে নগদ অর্থের ঘাটতি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে থাকা কোম্পানিগুলোর হাতে এখন প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার নগদ অর্থ রয়েছে। তাদের মুনাফাও ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ফলে কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য বেড়েছে, আর এতে তারা সহজেই অন্য প্রতিষ্ঠান কিনতে বা নতুন করে ঋণ ও শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ তুলতে পারছে।
দ্বিতীয় কারণ, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান। অ্যালফাবেট, অ্যামাজন, মেটা, মাইক্রোসফট ও ওরাকলের মতো পাঁচটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এ বছর ডেটা সেন্টার তৈরিতে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে। একই সঙ্গে তারা এআই স্টার্টআপগুলোতেও বড় বিনিয়োগ করছে।
এআই খাতের এই উত্থান বড় বড় করপোরেট চুক্তিও বাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ কোম্পানি ডমিনিয়ন ও নেক্সটইরা একীভূত হয়েছে। আবার সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাইবারআর্ককে কিনে নিয়েছে পালো অল্টো নেটওয়ার্কস।
বিশ্লেষকরা বলেন, তৃতীয় কারণ হলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকার বড় কোম্পানির একীভূত হওয়ার বিষয়ে আগের সরকারের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও মনে করছে, তাদের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে। তাই তারাও বড় কোম্পানির একীভূত হওয়া সহজ করতে নিয়ম শিথিল করেছে।

এদিকে অনেক দেশ নিজেদের শিল্প দেশে ফিরিয়ে আনতে শুল্ক ও ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে বড় কোম্পানিগুলো বিদেশে নতুন কারখানা গড়তে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। যেমন, তাইওয়ানের টিএসএমসি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় চিপ কারখানা নির্মাণ করছে। আবার চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি হাঙ্গেরিতে নতুন কারখানা গড়ছে।
চতুর্থ কারণ, অনিশ্চয়তা। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যবসার পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। তাই অনেক কোম্পানি মনে করছে, প্রতিষ্ঠান যত বড় হবে, ঝুঁকি সামলানো তত সহজ হবে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসির জেক হেনরি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, অনেক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে এখন একটি কথাই বেশি শোনা যায়, ‘বড় হওয়াই ভালো।’ বিনিয়োগকারীরাও যেন একই ধারণা পোষণ করছেন। আগে ছোট ও বড় প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের ব্যবধান কম ছিল। এখন বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফাকে বাজার অনেক বেশি মূল্য দিচ্ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাদ দিলেও একই চিত্র দেখা যায়।
তবে ঝুঁকিও আছে
বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিগুলোর এই বড় হওয়ার প্রতিযোগিতা ঝুঁকিমুক্ত নয়। গবেষকদের মতে, বড় কোনো প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছোট অধিগ্রহণের চেয়ে বেশি নয়। সফল বা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫০-৫০।
কিন্তু বড় চুক্তি ব্যর্থ হলে ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইন বলছে, গত বছরের প্রায় অর্ধেক বড় মার্জারের ক্ষেত্রে যে কোম্পানিকে কেনা হয়েছে, তার মূল্য ছিল ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্যের অর্ধেকেরও বেশি। এমন বড় চুক্তি করতে সাধারণত বিপুল পরিমাণ ঋণও নিতে হয়।

উদ্বেগের বিষয় শুধু বড় বড় কোম্পানির একীভূত হওয়া নয়। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো (হাইপারস্কেলার) ডেটা সেন্টার নির্মাণে নিজেদের ব্যবসা থেকে আয় করা অর্থই ব্যবহার করত। কিন্তু এখন তারা বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে। ফলে তাদের ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। যেমন, অ্যামাজনের ঋণের বোঝা ২০১৯ সালের তুলনায় এখন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে থাকা কোম্পানিগুলোর গড়ের চার গুণেরও বেশি।
এর প্রভাব শুধু কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
ডয়চে ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ১০ শতাংশ কোম্পানির দখলে মোট বাজারমূল্যের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি। গত ১০০ বছরে এত বেশি কেন্দ্রীভূত বাজার আর দেখা যায়নি। এর অর্থ, ঋণের ভারে থাকা এমন কোনো বড় কোম্পানি যদি বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে, তাহলে পুরো আর্থিক বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় কোম্পানির সংখ্যা ও প্রভাব বাড়ার আরও কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এতে ভোক্তা, কর্মচারী ও ছোট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এসব বিশাল কোম্পানির শক্তিশালী লবিংয়ের কারণে সরকারও তাদের প্রভাবের মধ্যে চলে যেতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থান আরও বাড়তে পারে।
জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বর্তমানে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ বড় কোম্পানিগুলোর ওপর আস্থা রাখেন। তারমানে, বড় প্রতিষ্ঠান হওয়ার অনেক সুবিধা থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভালোবাসা বা বিশ্বাস পাওয়ার বিষয়টি আলাদা।