Advertisement Banner

সিলেটকে ‘মুলতান’ হতে দিতে চাইবে না বাংলাদেশ

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
সিলেটকে ‘মুলতান’ হতে দিতে চাইবে না বাংলাদেশ
সিলেটকে কিছুতেই ‘মুলতান’ হতে দিতে চাইবে না বাংলাদেশ। ছবি: বিসিবি

২০০৩ সালের মুলতান টেস্টের শেষ দিনের খেলা শুরুর আগেই বাংলাদেশে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ক্রিজে ইনজামাম-উল-হকের মতো ব্যাটসম্যান থাকলেও পাকিস্তান যে ম্যাচটা জিতে যেতে পারে, সেই বাস্তবতা যেন সবাই ভুলেই গিয়েছিল। তবে ক্যারিয়ার বাঁচানো এক সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশকে কাঁদিয়ে সেদিন বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়েন ইনজামাম। ২৩ বছর পর, সিলেট টেস্টের পঞ্চম দিনেও প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এবার পথের কাঁটা হয়ে আছেন মোহাম্মদ রিজওয়ান।

মুলতানে সেদিন পঞ্চম দিনে ইনজামাম ছিলেন কঠিন পরীক্ষার সামনে। ব্যর্থ হলেই ক্যারিয়ার শেষ। হাতে ছিল ৩ উইকেট, আর জয়ের জন্য দরকার ১১৩ রান। সেখান থেকে বীরোচিত ব্যাটিংয়ে খালেদ মাহমুদ-খালেদ মাসুদদের কাঁদিয়ে বোলারদের নিয়েই পাকিস্তানকে জেতান তিনি। বাংলাদেশ এরপর অনেক জয় পেলেও মুলতানে তীরে এসে তরী ডোবার তেতো স্মৃতি আজও তরতাজা। কোনোভাবেই তাই সিলেটে এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাইবেন না বাংলাদেশের সমর্থকেরা।

অথচ তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার পর সবার মনে প্রশ্ন ছিল একটাই—কত রানের ব্যবধানে জিতবে বাংলাদেশ? ৪৩৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করে পাকিস্তান জিতে যাবে, ক্রিকেটের অনিশ্চয়তা মাথায় রেখেও সেটি প্রায় অবাস্তবই মনে হচ্ছিল। আর সেটা কেনই বা হবে না? বাবর আজম ছাড়া এই দলে ‘কাইল মায়ার্স’ হয়ে ওঠার মতো সামর্থ্য কারও যে নেই। তার ওপর পেস ও স্পিন—দুই বিভাগেই বাংলাদেশের শক্তি বিবেচনায় হেরে যাওয়াটাই বরং বিস্ময়কর হওয়ার কথা।

কিন্তু প্রথম তিন দিনে শ্রেয়তর দল হওয়ার পরও এখন কিছুটা হলেও হারের শঙ্কা চেপে বসেছে নাজমুল হোসেনের দলের কাঁধে। তাহলে কোথায় ভুল করল বাংলাদেশ?

গোটা ম্যাচে যদি ভুল খুঁজতে হয়, তাহলে সেটি মূলত প্রথম ইনিংসেই। ব্যাটিংয়ের জন্য দারুণ উইকেটেও বাংলাদেশ করতে পেরেছিল ২৭৮ রান। লিটন দাস সেঞ্চুরি করলেও টপ অর্ডার ছিল ব্যর্থ। এরপরও সুযোগ ছিল অন্তত ৭০-৮০ রানের লিড নেওয়ার। কিন্তু কিছু বেহিসেবি বোলিংয়ে সেটি নেমে আসে ৪৬ রানে। ফলে দ্বিতীয় ইনিংসে বিশাল লক্ষ্য দাঁড় করিয়েও পঞ্চম দিনের আগে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারেনি স্বাগতিকেরা।

২৩ বছর আগে মুলতান টেস্টে ইনজামাম–উল–হক একাই হৃদয় ভেঙেছিলেন বাংলাদেশের। ছবি: সংগৃহীত
২৩ বছর আগে মুলতান টেস্টে ইনজামাম–উল–হক একাই হৃদয় ভেঙেছিলেন বাংলাদেশের। ছবি: সংগৃহীত

টেস্ট ক্রিকেটকে বলা হয় সেশন বাই সেশনের খেলা। অর্থাৎ পাঁচ দিনে ব্যাট-বলের লড়াইয়ে প্রতিটি সেশনেই প্রতিপক্ষের চেয়ে ভালো খেলতে হয়। সেই হিসেবে প্রথম দিনের প্রথম দুই সেশন ছিল পাকিস্তানের। তবে লিটন দাসের অসাধারণ সেঞ্চুরিতে শেষ সেশন নিজেদের করে নেয় বাংলাদেশ। এরপর প্রথম ইনিংসে ৪৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় দিনের তিন সেশনেই আধিপত্য দেখায় নাজমুল হোসেনের দল।

তৃতীয় দিনেও চিত্রটা ছিল একই। মুশফিকুর রহিম করেন সেঞ্চুরি, লিটন দাস পান ফিফটি। তাতে ভর করে দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট হওয়ার আগে পাকিস্তানের সামনে রেকর্ড লক্ষ্য দাঁড় করায় বাংলাদেশ। পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে ৩৯৫ রান তাড়া করে দানবীয় ব্যাটিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দিয়েছিলেন কাইল মায়ার্স। সেটি মাথায় রেখেও পাকিস্তানের জয়ের পক্ষে বাজি ধরার লোক খুব বেশি ছিল না।

উইকেট যতই ফ্ল্যাট হোক, টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে ৪০০-এর বেশি রান তাড়া করে জেতা প্রতিদিনের ঘটনা নয়। দেড়শ বছরের ইতিহাসে টেস্টে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ৪১৮। সেটিও হয়েছিল সেই ২০০৩ সালে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের। আর সফরকারী দল হিসেবে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য তাড়া করে জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই।

তাই পাকিস্তান ৭ উইকেটে ৩১৬ রান করে ফেললেও ম্যাচ এখনো বাংলাদেশের দিকেই হেলে আছে। সেটা রিজওয়ান ক্রিজে থাকার পরও। সেটা মুলতানের স্মৃতি মাথায় থাকার পরও। কেন? কারণ এই বাংলাদেশ দলটা এখন লাল বলের ক্রিকেটে কাউকে সহজে ছাড় দেয় না। বোলিং যখন পুরোপুরি কাজ করছে না, তখন আছে উর্দু ভাষায় স্লেজিংও! নাজমুল-লিটনদের বারবার রিজওয়ানকে বিরক্ত করার চেষ্টা তারই অংশ। সামান্য মনোযোগ হারালেই যে মিলতে পারে সুযোগ।

জয়ের পথে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা রিজওয়ান। ছবি: বিসিবি
জয়ের পথে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা রিজওয়ান। ছবি: বিসিবি

রিজওয়ান অবশ্য সেই পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত উতরে গেছেন। তবে শেষ দিন সকালে নতুন বলে তিনি কী করেন, সেটাই হবে তার ব্যাটসম্যানশিপের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই ফরম্যাটে তার শেষ সেঞ্চুরি এসেছিল সেই ২০২৪ সালে, আর সেটিও ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষেই। ১৭১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেও সেবার দলকে জেতাতে পারেননি। এবার তার সামনে সুযোগ শুধু ম্যাচ জেতানোর নয়, অনেকটা ইনজামামের মতোই নিজের ক্যারিয়ারে নতুন গতি এনে দেওয়ারও।

দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হলেও নিজ দেশেই সম্প্রতি সমালোচনার মুখে পড়েছেন রিজওয়ান। আগের টেস্টে তাকে তাতিয়ে দিতে লিটন উইকেটের পেছন থেকে এমনও বলেছিলেন—মারতে গিয়ে আউট হলে পাকিস্তানে ফিরতে পারবেন না।

প্রকৃতি রিজওয়ানকে দিয়েছে ‘নায়ক’ হওয়ার সুযোগ। ইতিহাসে যা আগে কখনও হয়নি, সেটি যদি তার ব্যাটেই সম্ভব হয়, তাহলে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবেই তাকে বরণ করবে ফুল দিয়েই। নাহিদ রানার গতি, তাইজুল-মিরাজের ঘূর্ণি সামলে তিনি কি পারবেন অসম্ভবকে সম্ভব করতে? নাকি শেষ হাসিটা হাসবে বাংলাদেশই?

সম্পর্কিত