Advertisement Banner

ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে ডলারের বারোটা বাজাচ্ছেন ট্রাম্প

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে ডলারের বারোটা বাজাচ্ছেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ—তা যত দ্রুতই শেষ হোক বা দীর্ঘস্থায়ী হোক না কেন—বিশ্ব অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। টোকিও-ভিত্তিক সাংবাদিক ও বিশ্লেষক উইলিয়াম পেসেক ‘এশিয়া টাইমস’-এ প্রকাশিত তার এক লেখায় দেখিয়েছেন, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাত নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আস্থা, ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

১. অর্থনৈতিক আস্থার ভাঙন

পেসেকের মতে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে অর্থনৈতিক আস্থার ওপর। ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধের ঝুঁকি এখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের স্থায়ী উপাদানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি একটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে—যেখানে আকস্মিক যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাজারকে তীব্রভাবে নড়বড়ে করে দিতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই যুদ্ধ ইতিমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম প্রবৃদ্ধি এবং বাজার অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

২. ‘আলোচনার জানালা’র পরিবর্তন

পেসেক এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ব্যবহার করেছেন—‘ওভারটন উইন্ডো’ বা আলোচনার জানালা। (ওভারটন উইন্ডো হলো যেকোনো নির্দিষ্ট সময়ে মূলধারার জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নীতি বা ধারণার পরিসর, যাকে প্রায়শই 'আলোচনার জানালা' বলা হয়।)। অর্থাৎ, কোন ধরনের ঘটনা বা সিদ্ধান্তকে ‘সম্ভব’ মনে করা হবে, তার সীমা। ট্রাম্প প্রশাসন মাত্র ১৪ মাসে এই সীমা এতটাই বিস্তৃত করেছে যে, এখন বিনিয়োগকারীরা ভাবছেন—পরবর্তী অপ্রত্যাশিত বড় ঘটনাটি কী হতে পারে! এটি একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন, কারণ বাজারের স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে পূর্বাভাসযোগ্যতার ওপর।

৩. অনিশ্চয়তার অর্থনীতি

এই যুদ্ধের কারণে অজানা ঝুঁকির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে বিনিয়োগ কমবে, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হবে এবং শেয়ারবাজার ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অস্থিরতা বাড়বে। যুদ্ধের পাশাপাশি ট্রাম্পের শুল্ক ও অভিবাসন নীতিও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ধাক্কা দিয়েছে, যা অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলছে।

৪. দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি: ডলারের প্রতি আস্থা হ্রাস

পেসেকের বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—ডলার ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের প্রতি আস্থার সম্ভাব্য ক্ষয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ সুবিধা ভোগ করে আসছে, যাকে বলা হয় ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ । এর অর্থ হলো, বিশ্বজুড়ে ডলারের একক আধিপত্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র সহজে ঋণ নিতে পারে এবং কম সুদে বন্ড বিক্রি করতে পারে।

কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধকেন্দ্রিক নীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপের কারণে এই সুবিধা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। এসবের ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে ডলারের বিকল্প খুঁজতে শুরু করতে পারে।

আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মুদ্রানীতি দুর্বল হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং ডলারের প্রতি আস্থা কমবে। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মুদ্রানীতি দুর্বল হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং ডলারের প্রতি আস্থা কমবে। ছবি: রয়টার্স

৫. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ এবং আর্থিক ঝুঁকি

পেসেক সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি ফেডারেল রিজার্ভকে (যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক) রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বয়ে আনবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মুদ্রানীতি দুর্বল হবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং ডলারের প্রতি আস্থা কমবে। এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।

৬. বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন

পেসেকের মতে, এই যুদ্ধ শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়—এটি ভূ-রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যও বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে:

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স

চীন নিজেকে বিকল্প অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।

ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়ছে।

ডলার এখনো শক্তিশালী, কিন্তু এর ভবিষ্যৎ আর আগের মতো সুরক্ষিত নয়।

৭. যুদ্ধের অর্থনৈতিক বাস্তবতা

ইরান যুদ্ধের বাস্তব প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান: তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ধাক্কা লাগা। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। এই পথ কোনোভাবে বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে।

৮. রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক মূল্য

পেসেক দেখিয়েছেন, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক নয়—এর পেছনে গভীর অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ঋণ বৃদ্ধি, শুল্ক যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর মতো পদক্ষেপগুলো খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

৯. ভবিষ্যৎ কী?

সবশেষে পেসেক একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন—বিশ্ব কি ডলার-কেন্দ্রিক অর্থনীতি থেকে সরে আসছে? এর তাৎক্ষণিক উত্তর—‘না’। এখনই হয়তো ডলারের পতন হচ্ছে না, তবে ডলারের ওপর আস্থা নিশ্চিতভাবেই কমছে, এর বিকল্প তৈরি হচ্ছে এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি ঘনীভূত হচ্ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

সম্পর্কিত