এক ঢিলে তিন পাখি মারতে চান পুতিন

এক ঢিলে তিন পাখি মারতে চান পুতিন
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

‘জুয়া খেলাটা’ যখন বিরল মৃত্তিকা নিয়ে, তখন জুয়াড়িদের মধ্যে প্রথম কাতারে অবধারিতভাবেই থাকবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম। ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে বিরল এসব মহামূল্যবান খনিজ পদার্থগুলোর যোগসূত্র তো তার হাত ধরেই। আর এ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন রাজনীতি, যাতে ফাঁদে পড়েছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এই বিরল মৃত্তিকা নিয়েই নতুন এক খেলা শুরু করছেন পুতিন। এই খেলায় মিত্র রাষ্ট্ররাত্ত থাকবে। আর তাতে এক ঢিলে তিন পাখি মারার ফন্দি এঁটেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।

যতদূর জানা গেছে, রাশিয়ার বিরল মৃত্তিকা খাতের উন্নয়নে একটি সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে অনুমোদিত হতে পারে। এ ছাড়া এই রোডম্যাপ পেশও হবে। গত ৪ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মন্ত্রিসভার প্রতি এমন নির্দেশই ছিল।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি রাশিয়ার নিজেদের ব্যাপার। কিন্তু এর লক্ষ্য শুধুই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়। এটি একটি সুচিন্তিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে মস্কো এক ঢিলে তিন পাখি মারতে চাইছে।

এর মূল লক্ষ্য আসলে তিনটি—নিজেদের সম্পদে স্বায়ত্তশাসন ফেরানো, পশ্চিমা জোটের ঐক্য দুর্বল করা এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে অসম অংশীদারত্বের পুনর্বিন্যাস।

এগুলোর মানে আসলে কী?

প্রথমে আসা যাক সম্পদে স্বায়ত্তশাসন ফেরানোর দিকটিতে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, রাশিয়া বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকার মজুতকারী দেশ; পরিমাণ প্রায় ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, এই মজুত আরও অনেক বেশি; প্রায় ১৫ প্রকার বিরল মৃত্তিকা ধাতু মিলিয়ে মোট ২৮৭ লাখ মেট্রিক টন।

কিন্তু এই বিপুল ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও, রাশিয়া বর্তমানে বছরে মাত্র ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন উৎপাদন করে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের ১ শতাংশেরও কম। তাদের এই উৎপাদন কেবল কোলা উপদ্বীপের লোভোজেরো খনি এবং ইউরালের সোলিকামৎস্ক ম্যাগনেসিয়াম প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল।

প্রযুক্তির এই যুগে এত সম্পদ নিয়েও বসে থাকার কোনো মানে হয় না। এ কারণে এই অবস্থাকে বলা হচ্ছে রাশিয়ার ‘সম্পদের অভিশাপ’। দ্রুত এই পরিস্থিতি কাটাতে চাইছে দেশটি। পুতিন চাইছেন সেই পথেই হাঁটতে।

trump and putin

প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাম্প্রতিক নির্দেশের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে, বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার একটি জরুরি অংশ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এর প্রমাণ হিসেবে সম্প্রতি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত তেল সংস্থা রোজনেফ্ট বিশ্বের অন্যতম ধনী প্রতিষ্ঠান নায়োবিয়াম ও বিরল মৃত্তিকার ক্ষেত্র টোমটোর খনিটি অধিগ্রহণ করেছে।

একসময় টোমটোর প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় পুতিন তার পূর্ববর্তী অপারেটরের সমালোচনা করেছিলেন এবং দ্রুত বিনিয়োগের নির্দেশ দেন। ইয়াকুটিয়ায় অবস্থিত এই টোমটোর খনিটিতে প্রায় ১৭ লাখ টন বিরল মৃত্তিকা অক্সাইড এবং ৭ লাখ টন নায়োবিয়াম অক্সাইডের মজুত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টোমটোর প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিরল মৃত্তিকার বিশ্ববাজারকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে এবং রাশিয়াকে এই খাতে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

পুতিন কী চায়?

২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী বিরল মৃত্তিকা উৎপাদনে শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক বাজারের ১২ শতাংশ পর্যন্ত অংশীদারত্ব অর্জন করাই রাশিয়ার লক্ষ্য।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক কলামে চীনের থিংকট্যাংক চারহার ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো হাও ন্যান বলেন, নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন রাশিয়া। তাদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি পর্যন্ত–সব অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত এই খনিজগুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা কেবল একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়। এটি কৌশলগত সার্বভৌমত্বের জন্য এক অপরিহার্য শর্ত।

এই রোডম্যাপের মাধ্যমে রাশিয়া কার্যত চীনের ওপর তার নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। বর্তমানে চীন বিশ্বের বিরল মৃত্তিকা পরিশোধন শিল্পের প্রায় ৬৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও রাশিয়া এই মুহূর্তে চীনের সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) প্রসারিত করেছে। তবে তারা নিজেদের মধ্য-প্রবাহ ও নিম্ন-প্রবাহের সক্ষমতা তৈরি করতে না পারলে কেবল কাঁচামালের সরবরাহকারী হয়ে থাকার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

পুতিন একইসঙ্গে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পরিবহন ও লজিস্টিকস অবকাঠামো, বিশেষ করে নতুন মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস হাব এবং রেলসেতু তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে এশিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর বাণিজ্যের মাধ্যমে এই কৌশলগত সম্পদকে কাজে লাগানোর পথে সহায়ক হবে।

rare earth mineral

রাশিয়া কোন পথে?

মোদ্দাকথা, রাশিয়া পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরল খনিজ নিয়ে প্রধানত ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং নিজস্ব সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করতে চাইছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও চীনের বাজার একচেটিয়া করে রাখার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া এই কৌশল নিয়েছে।

সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়া খনিজসমৃদ্ধ কিছু এলাকা (যেমন দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন এবং জাপোরিঝঝিয়া) দখল করেছে। ইউক্রেনের ভূমিতে থাকা বিরল খনিজের মজুত নিয়ন্ত্রণ করা রাশিয়ার একটি সামরিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য ছিল।

যদিও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে অগ্রগতি হয়নি। তথাপি পুতিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে রাশিয়ার বিরল খনিজ প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে রাশিয়া তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিল। এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

বিরল খনিজ ছাড়াও, রাশিয়া ইউরেনিয়ামের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর তার নির্ভরতাকে একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো রাশিয়া থেকে আসে।

মূলত, রাশিয়া বিরল খনিজকে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে। এটি তাদের পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের অবস্থান মজবুত করতে সাহায্য করবে। আর পুতিন এগিয়ে যাচ্ছেন সেই পথেই।

সম্পর্কিত