গণতন্ত্রের সংকট এখন আর শুধু রাষ্ট্র, সরকার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার। মানুষের মনোযোগ, তথ্য পাওয়ার পদ্ধতি, সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের ক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও প্রযুক্তির নতুন ব্যবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মারিয়া রেসার কথায়, এই পরিবর্তনকে শুধু প্রযুক্তিগত বিপ্লব হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক গভীরতা বোঝা যাবে না। তার মতে, বিগ টেকের ব্যবসায়িক মডেল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা গণতন্ত্রের জন্য এমন একটি সংকট তৈরি করছে, যার প্রভাব ব্যক্তি থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন গণমাধ্যম ফরেন পলিসির প্রধান সম্পাদক রবি আগরওয়ালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রেসা প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে তিনটি পর্যায়ে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, প্রথম পর্যায় শুরু হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের মধ্য দিয়ে। মেশিন লার্নিং মানুষের আচরণ ও পছন্দকে বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে তথ্য ও বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। রেসার ভাষায়, এটি ছিল মাইক্রো-টার্গেটিংয়ের যুগ। দ্বিতীয় পর্যায় আসে ২০২২ ও ২০২৩ সালের দিকে, যখন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
চ্যাটবটের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সামনে তথ্য উপস্থাপনের পদ্ধতিই বদলে দিতে থাকে। তৃতীয় পর্যায় এখনকার এজেন্ট ও মাল্টি-এজেন্ট ব্যবস্থার উত্থান। এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু তথ্য দেয় না; ব্যবহারকারীর অনুমতি নিয়ে তার হয়ে কাজও করতে পারে।
রেসার বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের ‘এজেন্সি’ বা নিজের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মনোযোগকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তার পরের ধাপে বড় ভাষা মডেল তথ্য ও জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পাল্টেছে। এখন এআই এজেন্ট মানুষের হয়ে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করছে। অর্থাৎ প্রযুক্তির প্রভাব মানুষের মনোযোগ থেকে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করছে। রেসার মতে, এটি কেবল প্রযুক্তির উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নয়; মানুষের আচরণ ও সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রযুক্তির প্রভাবের গভীরতর পর্যায়।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে আরেকটি সমস্যা যুক্ত হয়েছে—তথ্যের সত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। রেসা মনে করিয়ে দিয়েছেন, লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে তিনি মৌলিকভাবে সম্ভাব্যতাভিত্তিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন, যা সব সময় তথ্যগতভাবে নির্ভুল নয়। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি ও বিতরণ করছে, তখন সত্য, মিথ্যা, অনুমান ও বিভ্রান্তিকর বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, এখন শুধু তথ্যের অভাব নয়, তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ‘এআই স্লপ’—অর্থাৎ এমন কনটেন্ট, যার গুণমান বা সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।
রেসা মনে করেন, সমস্যাটি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত এক দশক ধরে প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা ও সতর্কতা রয়েছে, কিন্তু সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক এআই প্যানেলের সঙ্গে নিজের কাজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন। তার মতে, প্যানেলটি এআই-সংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছে যে নতুন প্রজন্মের এআই এজেন্ট ও মাল্টি-এজেন্ট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও সামঞ্জস্যহীনতার ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাইয়ে প্যানেলটির প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এবং পরে এআই এজেন্টের ঝুঁকি নিয়ে একটি বিষয়ভিত্তিক ব্রিফ প্রকাশ করা হয়।
রেসার বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই সংকটকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখার বিরোধিতা। তার মতে, এআই নিয়ে বিশ্বে এমন একটি বয়ান তৈরি হয়েছে যে একটি দেশ যদি আগে এগিয়ে না যায়, তাহলে অন্য দেশ এগিয়ে যাবে। ফলে প্রতিযোগিতার যুক্তি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের যুক্তিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। রেসা এটিকে ‘ন্যারেটিভ ওয়ারফেয়ার’ হিসেবে দেখেছেন এবং সাংবাদিকদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, কোনো মিথ্যা তথ্যকে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।
এই প্রসঙ্গে তিনি ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের সময় নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তার দাবি, দুতার্তে বারবার মিথ্যা বললে তিনি এবং তার প্রতিষ্ঠান তা প্রকাশ্যে মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর পরিণতিতে তিনি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও আইনি চাপের মুখে পড়েছেন বলেও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। তবে রেসার বক্তব্যের মূল বিষয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; বরং তথ্যের সত্যতা নিয়ে সাংবাদিকতার অবস্থান। তার মতে, গণতন্ত্রের জন্য সত্যের প্রশ্নটি এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গাতেই তিনি গণতন্ত্রের সংকটকে তিনটি পরস্পরসংযুক্ত সংকট হিসেবে দেখেছেন-বিশ্বাসের সংকট, শৃঙ্খলা বা ব্যবস্থার সংকট এবং জবাবদিহির সংকট। তার যুক্তি হলো, যখন মিথ্যা তথ্য সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষের মধ্যে তথ্যের ওপর আস্থা কমে। তথ্যের ওপর আস্থা কমলে সত্য নিয়ে সামাজিক ঐকমত্য দুর্বল হয়। আর যখন একটি সমাজের মানুষের মধ্যে বাস্তবতা সম্পর্কে কোনো অভিন্ন ধারণা থাকে না, তখন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রেসা এ ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) একটি গবেষণার উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে মিথ্যা তথ্য সত্য তথ্যের তুলনায় ছয় গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি মনে করেন, এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিবর্তিত পরিবেশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর কনটেন্টের বিস্তার তথ্যের পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
তবে রেসার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি এই সংকটকে অনিবার্য ধ্বংস হিসেবে উপস্থাপন করতে চান না। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে ঘটনাকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে। কী ঘটেছে, তা কী নির্দেশ করে, এর প্রবণতা কোথায় যাচ্ছে, কোন বিষয় সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই এবং একটি দায়িত্বশীল সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কী করতে পারে—এসব পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ তার দৃষ্টিতে তথ্যের সংকট মোকাবিলার প্রথম শর্ত হলো নির্ভুল, স্বচ্ছ ও বোধগম্য তথ্য পরিবেশন।
জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও রেসার বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্বীকার করেন, জাতিসংঘ নিয়ে হতাশা রয়েছে। কিন্তু তার যুক্তি, কোনো একটি দেশ একা প্রযুক্তির এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা অনেক বিষয়কে আটকে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে দেশগুলো নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে। রেসা জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক এআই প্যানেল এবং এআই গভর্ন্যান্স নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তার মতে, বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই উদ্যোগে দেশভিত্তিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে অভিন্ন নীতিগত অবস্থান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে রেসার একটি বড় বার্তা হলো-এআই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তিবিদদের হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষকে আলোচনায় থাকতে হবে। তিনি উল্লেখ করেছেন, প্যানেলের সদস্যরা ৩৬টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করতেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিলেন বিগ টেকের সঙ্গে যুক্ত। তারপরও তার দাবি, আলোচনার কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও প্রযুক্তির মধ্যকার সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা।
রেসা বিশেষভাবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তার বক্তব্য, কোনো সরকার যদি মনে করে যে তারা নিজের দেশে অত্যাধুনিক এআই তৈরি করছে না, তাই এআই নিয়ন্ত্রণ তাদের বিষয় নয়, তাহলে তারা ভুল করবে। কারণ সীমান্ত অতিক্রম করে প্রযুক্তি মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। তিনি মারিয়েতিয়ে স্কাখের দ্য টেক ক্যু বইয়ের প্রসঙ্গ এনে বলেছেন, সরকার যত দিন প্রযুক্তি খাতকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখে, তত দিন রাষ্ট্রের ক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। তার ভাষ্যে, প্রযুক্তির উত্থান ও রাষ্ট্রের ক্ষমতার সম্পর্ক তাই শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতারও প্রশ্ন।