১৯ জুলাই ২০২৪। ঘড়িতে রাত প্রায় আটটা। পঙ্গু হাসপাতালের রাতের অ্যাডমিশন শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত কয়েকজন রেসিডেন্ট ও একজন মেডিকেল অফিসার ডিউটিতে থাকতেন। পরিস্থিতি খারাপ হলে সহকারী রেজিস্ট্রার, আবাসিক সার্জন, কনসালট্যান্ট কিংবা সহকারী অধ্যাপকদেরও প্রয়োজনমতো ডাকা হতো।
খাতা-কলমে তখন আমি আবাসিক সার্জন। কিন্তু প্রশাসনিক বাস্তবতায় আমার অবস্থা ছিল অনেকটা—নাম আছে, ক্ষমতা নেই; দায়িত্ব আছে, কর্তৃত্ব নেই। আবাসিক সার্জনের পদে হাসপাতাল পরিচালনার বেশ কিছু দায়িত্ব ও ক্ষমতা থাকার কথা। রোগীর ভর্তি অ্যাম্বুলেন্স সেবাসহ কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব আবাসিক সার্জনের দায়িত্বে থাকলেও আমাকে রাখা হয়েছিল অনেকটা নিধিরাম সর্দারের মতো। তলোয়ার নেই, ঢাল নেই—তবু পদবি আছে!
যাই হোক, সেদিন হাসপাতালে যাওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ ছিল না। কোনো অফিসিয়াল ফোনও আসেনি। তবু ভেতর থেকে এক ধরনের তাড়না অনুভব করছিলাম। সেটি ছিল দায়িত্বের তাড়না, পেশার তাড়না, সবচেয়ে বড় কথা, বিবেকের তাড়না।
বাইরে তখন কারফিউ। ঢাকা শহরকে মনে হচ্ছিল এক বিশাল পরিত্যক্ত নগরী। রাস্তায় কোনো গাড়ি নেই, মানুষের চলাচল নেই। অনেকক্ষণ পরপর সাইরেন বাজিয়ে দু-একটি পুলিশ বা সেনাবাহিনীর গাড়ি চলে যাচ্ছে। চারদিকে এমন এক থমথমে পরিবেশ, যেন শহর নিজেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে—পরের মুহূর্তে কী ঘটবে!
সিভিল পোশাকে বের হলে পুলিশ আন্দোলনকারী ভেবে ধরে নিয়ে যেতে পারে—এমন ভয়ও ছিল। তাই হাসপাতালের পরিচয়পত্রটি গলায় ঝুলিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। ভেবেছিলাম বাইরে গিয়ে হয়তো কোনো গাড়ি পাওয়া যাবে।
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও কিছু পেলাম না। অগত্যা হাঁটতে শুরু করলাম। বাসা থেকে আমার প্রাইভেট চেম্বারের দূরত্ব প্রায় ১০ মিনিটের পথ। ভাবলাম, সেখানে হয়তো হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যেতে পারে।
চেম্বারের হাসপাতালে গিয়ে জানতে চাইলাম, অ্যাম্বুলেন্স আছে কি না। জানানো হলো, অ্যাম্বুলেন্স একজন ডাক্তারকে বাসায় পৌঁছে দিতে গেছে। ফিরতে দেরি হবে। তাছাড়া বাইরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের কড়াকড়ি, তাই খুব প্রয়োজন ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স বের করাও কঠিন।
আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলামম, এই মুহূর্তে পঙ্গু হাসপাতালে যাওয়া আমার জন্য জরুরি। সেখানে অনেক আহত মানুষ পড়ে আছে, চিকিৎসক ও জনবল সীমিত। আমার মতো একজন অর্থোপেডিক সার্জন সেখানে উপস্থিত থাকলে অন্তত কিছু মানুষের উপকার হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত জানা গেল, ওই হাসপাতালের আরও কয়েকজন ডাক্তার বিভিন্ন গন্তব্যে বাসায় ফিরবেন। তাদের সঙ্গে গেলে পথে আমাকে পঙ্গু হাসপাতালে নামিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর সেই সুযোগ হলো। আমাকে পঙ্গু হাসপাতালের সামনে নামিয়ে দেওয়া হলো।
জুলাই আন্দোলনের সময় উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: চরচা
হাসপাতালে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম, সেটি আজও চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে। ইমার্জেন্সির সামনে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন রোগীর ফাইল জমা পড়ে আছে। অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে আরও ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী। অধিকাংশই আন্দোলনে আহত। কারও পায়ে গুলি, কারও হাতে, কারও হাড় চূর্ণ, কারও রক্তক্ষরণ থামছে না। হাসপাতাল তখন শুধু হাসপাতাল নয়—একটি যুদ্ধক্ষেত্র।
চারদিকে মানুষের আর্তনাদ, স্বজনদের উদ্বিগ্ন মুখ, রক্তমাখা কাপড়, স্ট্রেচারের শব্দ আর চিকিৎসকদের বিরামহীন ছুটে চলা। কেউ সময় জিজ্ঞেস করছিল না। কেউ খাবারের কথা ভাবছিল না। কেউ নিজের ক্লান্তির হিসাব রাখছিল না।
আমরা সারা রাত একের পর এক রোগী অপারেশন করেছি। যতজনকে সম্ভব, অপারেশন থিয়েটার থেকে সরাসরি চিকিৎসা দিয়েছি। কারও জীবন বাঁচাতে জরুরি অস্ত্রোপচার করেছি। কারও ক্ষেত্রে বুলেট তাৎক্ষণিকভাবে না বের করে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষত পরিষ্কার, অস্থায়ী স্থিতিশীলতা এবং প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরবর্তী চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়েছি।
একসঙ্গে এত রোগী, এত কম জনবল এবং এত অল্প সময়—পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত হাসপাতালেও হয়তো সবাইকে তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতো না। তারপরও আমরা চেষ্টা করেছি। যতটুকু শক্তি ছিল, তার চেয়ে একটু বেশি দিয়েছি। যতটুকু সামর্থ্য ছিল, তার শেষ সীমা পর্যন্ত গিয়েছি।
সকাল সাতটার দিকে হাসপাতাল থেকে বের হলাম।
সারা রাতের পরিশ্রমে শরীর ভেঙে পড়েছে, চোখ ঝাপসা, মাথা ভার। ভেবেছিলাম, রাতের তুলনায় সকাল হয়তো কিছুটা স্বাভাবিক হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রাস্তার উল্টো পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। উদ্দেশ্য, একটি সিএনজি, একটি গাড়ি, এমনকি তিন চাকার যেকোনো যানবাহন পাওয়া গেলেই বেইলি রোডে ফিরব।
প্রায় এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোনো গাড়ি নেই। শুধু মাঝেমধ্যে সাইরেন বাজিয়ে সেনাবাহিনীর গাড়ি চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, ঢাকা শহরের সব যানবাহন বুঝি সম্মিলিতভাবে আমাকে বয়কট করেছে।
একপর্যায়ে ঠিক করলাম, হয়তো হেঁটেই বাসায় ফিরতে হবে। আগারগাঁওয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুদূর গিয়ে একটি সিএনজি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সম্ভবত একজন যাত্রীকে নামাতে এসেছিল। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, বেইলি রোড যাবে কি না। সে প্রথমে এমনভাবে ‘না’ বলল, যেন আমি তাকে বেইলি রোড নয়, সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে যেতে বলেছি। বললাম, ভাড়া বেশি দেব। তবু রাজি নয়।
শেষে নিজের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি বোঝালাম। তখন সে ৮০০ টাকা চাইল। সাধারণ সময়ে যে পথের ভাড়া তার তুলনায় অনেক কম, কিন্তু সেই মুহূর্তে দর-কষাকষির মতো মানসিক বা শারীরিক শক্তি কোনোটিই ছিল না। রাজি হয়ে উঠে পড়লাম।
কিন্তু যাত্রা শুরু হতেই বোঝা গেল, এটি বেইলি রোডগামী সিএনজি ভ্রমণ নয়—এ যেন ঢাকার অলিগলি ঘুরে দুর্গম পথভ্রমণ।
আগারগাঁও চার রাস্তার কাছে চেকপোস্টে আটকাল। বলা হলো, সামনে যাওয়া যাবে না। ইউটার্ন নিয়ে আবার ফিরলাম। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের গলিতে ঢুকলাম। কিছুদূর গিয়ে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে আবার ব্যারিকেড। সেখান থেকেও ফিরিয়ে দেওয়া হলো। আবার পঙ্গু হাসপাতালের দিক, তারপর শ্যামলী, মোহাম্মদপুরের অলিগলি, অজানা-অচেনা পথ—অবশেষে প্রায় সাত কিলোমিটারের পথ ১৪ কিলোমিটার ঘুরে বেইলি রোডে পৌঁছালাম।
সিএনজি থেকে নামার সময় ড্রাইভারটির জন্য খারাপ লাগল। ৮০০ টাকার চুক্তি হলেও লোকটি সত্যিই অনেক ঘুরেছে। তাই তাকে এক হাজারের একটা নোট ধরিয়ে দিলাম।
বাড়িতে ফিরে একবার মনে হলো, চিকিৎসকদের আনা-নেওয়ার জন্য পঙ্গু হাসপাতালের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থাকার কথা। আর সেটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও তো আবাসিক সার্জনের অধীনেই থাকার কথা।
কিন্তু নির্মম পরিহাস হলো, আমি তখন খাতা-কলমে আবাসিক সার্জন হয়েও হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে চড়তে পারিনি। সেই রাতে আমি কারও নির্দেশে হাসপাতালে যাইনি। কোনো গাড়ি পাঠানো হয়নি। কোনো বিশেষ সুবিধাও পাইনি। গিয়েছিলাম শুধু বিবেকের তাড়নায়।
আজ যখন সেই রাতের কথা মনে পড়ে, তখন ক্লান্তি, ভয়, রক্ত, মানুষের আর্তনাদ—সবকিছুর মাঝে নিজের দায়িত্ববোধের তৃপ্তিও অনুভব করি। কারণ চিকিৎসকের জীবনে কিছু রাত থাকে, যেগুলোর কোনো ডিউটি রোস্টার থাকে না, কোনো অতিরিক্ত ভাতা থাকে না, কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও থাকে না। শুধু নিজের বিবেকের খাতায় লেখা থাকে—সেদিন মানুষ বিপদে ছিল, যতটুকু পেরেছি, পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।
শেখ সাদীউল ইসলাম: সহকারী অধ্যাপক (স্পাইন সার্জারি), জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)।