ads

ট্রাম্প কি শেষ জায়নবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন?

ডেভিড হার্স্ট
ডেভিড হার্স্ট
ট্রাম্প কি শেষ জায়নবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে
চলেছেন?
ছবি: রয়টার্স।

কথায় আছে, অবহেলিত বা প্রত্যাখ্যাত ইসরায়েলের ক্রোধের মতো ভয়ংকর আর কিছু হতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের বিশাল টাইমলাইনে মাত্র কয়েক সপ্তাহ–যা চোখের পলকের মতোই সংক্ষিপ্ত–তার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলে এতটাই জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব থেকে এক হামলায় সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন, যা অবিশ্বাস্য।

একসময় ট্রাম্প নিজেই অহংকার করে বলেছিলেন যে, তিনি চাইলে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। আর আজ পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে তিনি ইসরায়েলের চিরশত্রু 'আমালেক'-এর তালিকায় স্থান পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছেন। ইসরায়েলের সরকারপন্থী গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা ট্রাম্পের ওপর ক্ষোভ উগরে দিতে কোনো কার্পণ্য করছেন না।

ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-এর একটি প্রাইমটাইম শোর উপস্থাপক ইনন মাগাল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি একজন ‘লুজার’ বা ব্যর্থ ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্টিভ উইটকফকে ‘ছোট ইহুদি’ বলে কটূক্তি করতেও ছাড়েননি। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াকভ বারদুগো তো আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন যে, ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কার্যত আধুনিক যুগের ‘চেম্বারলেন’-এ পরিণত হচ্ছেন। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন ১৯৩৮ সালে হিটলারকে তোষণ করার নীতির জন্য ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত চ্যানেল ১২ এবং ইসরায়েল হায়োম-এর প্রধান রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিত সেগাল মন্তব্য করেছেন যে, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দিয়ে ট্রাম্প কার্যত সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছেন। চ্যানেল ১৪-এর আরেকজন বিখ্যাত সঞ্চালক শিমোন রিকলিন এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থানে রয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতির পর বিশ্বের কোনো দেশই আর আমেরিকার মিত্র হতে চাইবে না।

নেতানিয়াহুর এই মুখপাত্রদের সম্মিলিত সুর পরিবর্তনের এই ঘটনাটি অত্যন্ত নাটকীয়। তারা এখন সেই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেই বিষোদগার করছেন, যিনি তার প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলকে এমন কিছু দিয়েছিলেন যা পূর্ববর্তী কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেওয়ার সাহস করেননি। ট্রাম্পই অধিকৃত গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব এবং জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি কট্টর বসতি স্থাপনকারী ও জায়নবাদী আদর্শের সমর্থক ডেভিড ফ্রিডম্যানকে ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন, যিনি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি এলাকা সিলওয়ানের নিচে সুড়ঙ্গ উদ্বোধনের সময় স্লেজহ্যামার দিয়ে আঘাত করে আমেরিকার তথাকথিত নিরপেক্ষতার মুখোশ সম্পূর্ণ উন্মোচন করেছিলেন। ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প ধনকুবের মিরিয়াম অ্যাডেলসনকে তার প্রচারে তৃতীয় বৃহত্তম অনুদানকারী হিসেবে গ্রহণ করেন। হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগের জন্য নেতানিয়াহুকে কখনো বেগ পেতে হয়নি। কারণ জ্যারেড কুশনারের মতো ব্যক্তিরা সবসময় ট্রাম্পের কানে কানে ইসরায়েলের স্বার্থের কথা ফিসফিস করতেন।

অথচ আজ সেই ট্রাম্পকেই ইসরায়েলিরা ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করছে। ট্রাম্প গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন ও গণহত্যার পাশে শুরু থেকেই শক্তভাবে দাঁড়িয়েছিলেন এবং এখনো আছেন। কুশনার ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে গাজাকে ভূমধ্যসাগরীয় বিচ রিসোর্টে রূপান্তরের এক পরাবাস্তব ও নিষ্ঠুর পরিকল্পনা করেছিলেন। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে নেতানিয়াহু ও মোসাদের তৎকালীন পরিচালক ডেভিড বার্নিয়ার দেওয়া ব্রিফিংয়ের পরেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধংদেহী অবস্থান নেন, যা মার্কিন ইতিহাসে কোনো বিদেশি নেতার সিচুয়েশন রুমে প্রবেশের প্রথম ঘটনা ছিল। এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নেতার দ্বারা এতটা প্রভাবিত হননি। আর আজ সেই পরম মিত্রকেই তারা খলনায়ক বানাচ্ছে।

মূল প্রশ্ন হলো, এই ফাটল কতটা গভীর এবং এটি কি স্থায়ী? ট্রাম্প তো ইসরায়েলকে তাদের অন্তহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি দিয়েছিলেন। তাহলে কি ট্রাম্পই হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের শেষ জায়নবাদী বা ইসরায়েলের অন্ধ সমর্থক প্রেসিডেন্ট?

জায়নবাদের ইতিহাসে অবশ্য এই ধরনের ফাটল বা বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও জায়নবাদীরা তাদের ওপর ভরসা করা বা তাদের সাহায্য করা পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন আড়াই লাখ ইহুদি শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল এবং ব্রিটেন ফিলিস্তিনে এক লাখ ইহুদির অভিবাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে অস্বীকার করেছিল, তখন ইহুদি আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপগুলো একজোট হয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ইরগুন ও স্টার্ন গ্যাংয়ের (লেহি) মতো ইহুদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হামলায় ৭৮০ জনেরও বেশি ব্রিটিশ সেনা, পুলিশ এবং বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। অথচ এই ব্রিটেনই ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে আরবদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে ব্রিটিশ প্রশাসনিক সদর দপ্তরে বোমা হামলা চালিয়ে ৯১ জনকে হত্যা করা হয়, যার মধ্যে ২৮ জন ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। আজ পর্যন্ত ইসরায়েল সেই নিহত ব্রিটিশদের সমাধিকে সম্মান জানায়নি, অথচ সেই হোটেলের বোমাবাজদের তারা বীরের মর্যাদা দেয়।

এমনকি হলোকস্ট বা ইহুদি নিধনযজ্ঞের সময় অনন্য সাহসিকতা দেখানো ব্যক্তিদেরও রেহাই দেয়নি এই ইহুদি চরমপন্থীরা। স্টার্ন গ্যাং সুইডিশ কূটনীতিক কাউন্ট ফোক বার্নাডোটকে হত্যা করেছিল, যিনি যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে ৪ হাজারের বেশি ইহুদি বন্দিকে মুক্ত করেন। যুদ্ধের পর তিনি ফিলিস্তিনি ও নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের মধ্যে জাতিসংঘের প্রথম আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছিলেন এবং একটি যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছিলেন। আর এটাই ছিল জায়নবাদীদের চোখে তার সবচেয়ে বড় অপরাধ।

এই একই আচরণের শিকার হন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। তিনি ইসরায়েলকে ১০ বছর মেয়াদে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছিলেন, যা ছিল মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম সহায়তা প্যাকেজ। কিন্তু ইসরায়েলি ঐতিহাসিক আভি শ্লাইম লিখেছেন, নেতানিয়াহু ওবামার এই উদারতার প্রতিদান দিয়েছিলেন চরম অবজ্ঞা এবং অপমানের মাধ্যমে।

নেতানিয়াহু ওবামাকে আক্রমণ করার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করেননি। ২০১২ সালের মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন, মার্কিন কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে ওবামাকে অপমান করেন এবং ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের জন্য লবিং করেন। ওবামার পর জো বাইডেনও, যিনি নিজেকে একজন আজন্ম ‘লিবারেল জায়নবাদী’ মনে করেন, নেতানিয়াহুর কাছ থেকে একই রকম অকৃতজ্ঞতা পেয়েছেন। ইসরায়েলি জেনারেল আমোস গিলাদ লিখেছেন যে, বাইডেনের মতো পরম বন্ধুর প্রতি নেতানিয়াহুর এই আক্রমণ ইসরায়েলের জন্য একটি প্রথম সারির কৌশলগত ব্যর্থতা।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এর মাধ্যমে জায়নবাদ তার আসল আধিপত্যবাদী ও বর্ণবাদী চেহারাটিই বিশ্বের সামনে উন্মোচন করছে। এমনকি নেতানিয়াহু সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালোনও একটি সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ধর্মীয় জায়নবাদী আন্দোলনের একাংশ মূলত ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ আদর্শ ধারণ করে। ইয়ালোন একে হিটলারের 'মাইন কাম্ফ'-এর বিপরীত সংস্করণ বা ‘ইহুদি সংস্করণ’ বলে অভিহিত করেন। আজ ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতিতে এই ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদের চর্চা চরম আকার ধারণ করেছে। ট্রাম্পের সাথে ইসরায়েলের এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ আসলে এটিই– একটি বসতি স্থাপনকারী কলোনি যখন বুঝতে পারে যে তারা তাদের মূল অভিভাবক বা জন্মদাত্রী পরাশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র) ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, তখন তারা এই ধরনের ধাক্কা খায়। যেমনটা অতীতে আলজেরিয়ায় ফরাসি বসতি স্থাপনকারীরা চার্লস ডি গলের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে অনুভব করেছিল, কিংবা উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইউনিয়নিস্টরা মার্গারেট থ্যাচারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে অনুভব করেছিল।

ইসরায়েলের ভেতরে যা-ই ঘটুক না কেন, আটলান্টিকের ওপারে অর্থাৎ খোদ যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো গণহত্যা, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যর্থ সামরিক নীতি এবং সিরিয়া ও লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার ইসরায়েলি জেদ যুক্তরাষ্ট্রের একটি পুরো প্রজন্মের সমর্থনকে চিরতরে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

পিউ রিসার্চের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলেই ৫০ বছরের কম বয়সী মার্কিন নাগরিকদের সিংহভাগই এখন ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখে। ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব গত বছরের ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সামগ্রিকভাবে, ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক এখন ইসরায়েলের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করেন এবং ৫৯ শতাংশ মানুষের নেতানিয়াহুর বিশ্ব রাজনীতির সিদ্ধান্তের ওপর কোনো আস্থা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের জনমতের এই পরিবর্তন এখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি ডায়াসপোরা বা প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা নিউইয়র্কে আইপ্যাক (AIPAC) বা ইসরায়েলপন্থী শক্তিশালী লবির সমর্থনপুষ্ট তিনজন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য এবং পাঁচটি স্থানীয় আসনে আইপ্যাকের প্রার্থীরা মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থিত প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছেন। কলরাডোর ডেনভারে মেলত কিরোসের মতো একজন তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ ও মানবাধিকার কর্মী আইপ্যাকের কাছ থেকে ১.৬ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অনুদান পাওয়া ৩০ বছরের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ডায়ানা ডিগেটকে প্রাইমারিতে পরাজিত করে ইতিহাস তৈরি করেছেন। ‘জেউইশ ভয়েস ফর পিস’ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভোটাররা এখন গণহত্যা সমর্থনকারী নেতাদের প্রত্যাখ্যান করছে এবং আইপ্যাক এখন একটি ‘টক্সিক বা বিষাক্ত ব্র্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে।

অবশ্য মার্কিন রাজনীতিতে এই পরিবর্তন রাতারাতি ইসরায়েল-বিরোধী বা সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনপন্থী নীতিতে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়েছে। ড্যানিয়েল লেভির মতো মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইসরায়েলের সাথে তার সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের দীর্ঘ যাত্রার শুরুতে রয়েছে। আইপ্যাক ও ইসরায়েলি লবির শিকড় মার্কিন প্রশাসনের গভীরে প্রোথিত। তবে এটি স্পষ্ট যে, ফিলিস্তিন ইস্যুটি এখন আর মার্কিন রাজনীতির প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়, এটি এখন মূলধারার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এমনকি মার্কিন রক্ষণশীল শক্তির একটি অংশও এখন ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত সম্পদ ভাবার চেয়ে বড় বোঝা বা দায় হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরায়েলের এই প্রকাশ্য বুড়ো আঙুল দেখানো এবং হাজার হাজার শিশু ও বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের তথাকথিত মানবাধিকারের ভাবমূর্তির সাথে মেলাতে কষ্ট হচ্ছে খোদ মার্কিন নাগরিকদেরই।

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এমন একটি পথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে প্রথম ধাপে ফিলিস্তিনিদের কষ্টের প্রতি সহানুভূতি বাড়বে, দ্বিতীয় ধাপে ইসরায়েলের চিরস্থায়ী যুদ্ধের নীতির প্রতি মার্কিনীদের ঘৃণা জন্মাবে এবং চূড়ান্ত ধাপে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের যে কোনো জবাবদিহিতা ছাড়া বিশেষ সুবিধা বা ‘এক্সেপশনালিজম’ পাওয়ার যে সংস্কৃতি ছিল, তার অবসান ঘটবে। এই পরিবর্তন সম্পূর্ণ হতে হয়তো আরও কয়েকটি নির্বাচনী চক্র লেগে যেতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহু বা তার উত্তরসূরিদের জন্য মার্কিন ডানপন্থীদের কাছে ইসরায়েলকে পুনরায় গ্রহণযোগ্য করে তোলা মোটেও সহজ হবে না।

নেতানিয়াহু যদি তার ক্ষমতার চেয়ার টেকাতে কট্টর ডানপন্থীদের সন্তুষ্ট করতে গাজায় আবারও নতুন করে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেন, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মনে ইসরায়েলের প্রতি ঘৃণার আগুন আরও বাড়িয়ে দেবে। ইসরায়েল এত দিন যে লবিং বা অর্থের জোরে মার্কিন রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করত, তা হয়তো এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তবে, যতদিন যাবে, ইসরায়েলকে সমর্থন করা মার্কিন রাজনীতিকদের জন্য একটি অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে একটি গলার কাঁটা বা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আর ঠিক তখনই জায়নবাদের পতন ত্বরান্বিত হবে।

ডেভিড হার্স্ট: সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক, মিডল ইস্ট আই।

(এই লেখাটি মিডল ইস্ট আই-এর সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)

সম্পর্কিত