তরুণ চক্রবর্তী

ছিল কেরালা, হলো কেরলম। মালয়ালম ভাষায় কেরলম শব্দের অর্থ ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’। ছবির মতো সুন্দর দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। রাজ্যের পশ্চিমে আরব সাগর ও পূর্বে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সৌন্দর্যের মতোই কেরলমের মিশ্র সংস্কৃতি এবং স্থানীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পর্যটকদের কাছে বাড়তি পাওয়া। সাক্ষরতার হারেও কেরলম ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজ্য।
এই রাজ্যে বিধানসভার ভোট ৯ এপ্রিল। চলছে তুমূল প্রস্তুতি। ১৯৮০ সাল থেকে কেরলমে একটাই রীতি, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সেখানে সরকার বদলায়। কাউকে বেশিদিন ক্ষমতায় রাখতে চান না তারা। কিন্তু ২০২১ সালে সেই রীতি ভাঙে। কর্মদক্ষতা বিচার করে সিপিএমের নেতৃত্বে সেখানকার বাম গণতান্ত্রিক জোটকে (এলডিএফ) ক্ষমতায় রেখে দেন রাজ্যবাসী। এবারের বিধানসভা ভোটের আগে বিভিন্ন জরিপ অবশ্য বলছে, ফের ক্ষমতায় ফিরছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। বিজেপিও ভোটের লড়াইতে রয়েছে। গতবার খাতা খুলতে না পারলেও এবার তারা মরিয়া বিধানসভায় খাতা খুলতে। তারাও জোট করেছে, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এনডিএ)। গত লোকসভা নির্বাচনে তাদের প্রার্থী সুরেশ গোপী জিতে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর বিজেপিও ভালো ফলের আশা করছে। ফলে ত্রিমুখী লড়াইয়ে জমজমাট কেরলম।
ভারতে তো বটেই, দুনিয়াতেই প্রথম কেরলমে তৈরি হয় কমিউনিস্টদের নির্বাচিত সরকার। ইএমএস নাম্বুরিদিবাদের নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি ভোটে জিতে সরকার গঠন করে। তবে সেই সরকার বেশি দিন টেকেনি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কিছুদিন পরেই ভেঙে দেন সেই সরকার। তারপরও কমিউনিস্টরা কেরলমে বেশ দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করছে। ১৯৮০ সাল থেকে কেরলমে পরম্পরা হয়ে উঠেছে পাঁচ বছর এলডিএফ, তো পাঁচ বছর ইউডিএফ! গোটা ভারতেই বেশ জনপ্রিয় কেরলম-মডেল। কিন্তু গতবার তার ব্যতিক্রম ঘটে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন টানা দশ বছর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে রেকর্ড গড়েছেন। এক সময় পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতেও সিপিএমের নেতৃত্বাধীন সরকার থাকলেও এখন শিবরাত্রির সলতের মতো জ্বলছে শুধু কেরলমে। সেই দেউটিও কি নিভতে চলেছে? কংগ্রেস আশাবাদী। আত্মবিশ্বাসীও।
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ও বামেরা হরিহর আত্মা হলেও কেরলমে লড়াই কিন্তু সেয়ানে সেয়ানে। রাহুল গান্ধী এক সময় কেরলমের ওয়ানানাড কেন্দ্রে বামেদের হারিয়ে জাতীয় সংসদে নিজের সদস্যপদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদরাও সেই আসন থেকেই প্রথমবার হয়েছেন জাতীয় সংসদের সদস্য। গোটা দেশে সিপিএমসহ বামেদের সঙ্গে ‘দোস্তি’ হলেও কেরলমে কিন্তু ‘কুস্তি’ এখনো বহাল রয়েছে। কংগ্রেস ও বামেরা প্রচারে একে অন্যের বিরুদ্ধে গালি দিতেও কার্পণ্য করছেন না, সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন। আঞ্চলিক রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় জাতীয় স্বার্থ আপাতত স্থগিত। তাই বিজেপির কটাক্ষ হজম করতে হচ্ছে দুই প্রতিপক্ষকেই। গতবার একটি আসন না পেলেও এবার বিজেপি দু-একটি আসন পাবেই, এমনটাই উঠে আসছে বিভিন্ন জরিপে।
কেরলমে মোট ভোটার ২ কোটি ৬৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৪। ১৪টি জেলা থেকে ১৪০ জন বিধায়ক নির্বাচিত হবেন। ২০১৬ সালে এলডিএফ ৯১টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ইউডিএফ পেয়েছিল ৪৭টি আসন। বিজেপি জিতেছিল মাত্র একটি আসনে। ২০২১ সালে বিজেপি কোনো আসন পায়নি। আসন বাড়ে এলডিএফের, কমে কংগ্রেসের জোট ইউডিএফের। এলডিএফ পায় ৯৯টি এবং ইউডিএফ ৪১টি। ভোটের হার ছিল এলডিএফের ৪৫.৪৩, ইউডিএফের ৩৯.৪৭ এবং এনডিএর ১২.৪১ শতাংশ।

কিন্তু ২০২৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে রাজ্যটি কংগ্রেসকে দারুণ সাফল্য এনে দেয়। ২০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস একাই পায় ১৮টি। সিপিএম জেতে মাত্র একটি আসন। তবে একটি মাত্র আসন পেয়েও উল্লসিত বিজেপি। কারণ বহুদিন ধরে চেষ্টা করে, চিত্রতারকা সুরেশ গোপীকে প্রার্থী করে জিতিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে একাধিকবার গোপীর হয়ে প্রচার করেন। কেরলমে লোকসভা ভোটে মাত্র একটি আসন জিতেও তাই উল্লসিত বিজেপি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি শুধু আসন নয়, ভোটের হারও বাড়িয়ে নেয়। এনডিএর প্রাপ্ত ভোট দাঁড়ায় ১২.৪১ থেকে বেড়ে ১৯.২ শতাংশে। কংগ্রেসের ইউডিএফ ৪৫.৪ এবং এলডিএফের ৩৩.৩ শতাংশ ভোট প্রাপ্তি রাজ্যে পরিবর্তনের পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। জয়ের গন্ধ পেয়ে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কংগ্রেস। ইতিহাস বলছে, কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দলীয় কোন্দল। কেরলমেও তার ব্যতিক্রম নেই। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা শশী থারুরও আক্রান্ত হয়েছেন।

মিশ্র জনবসতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেরলমের বিশেষ ঐতিহ্য। মন্দির, মসজিদ ও গীর্জার সহউপস্থিতি গোটা রাজ্যকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের ৫৪.৭ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ইসলাম ধর্মের মানুষ আছেন ২৬.৬ শতাংশ এবং খ্রিস্টান ১৮.৪ শতাংশ। সাক্ষরতায় ভারতে তৃতীয় কেরলম। সরকারি জরিপে বলা হচ্ছে ৯৫.৩ থেকে ৯৬.২ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। সাধারণ মানুষ ধর্মেও আছেন, আবার রাজনীতিতেও। তেমনি দুই প্রধান প্রতিপক্ষের জোটও বেশ আকর্ষণীয়। কংগ্রেসের জোটে রয়েছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ, কেরালা কংগ্রেস বা রেভিলিউশনারি সোসালিস্ট পার্টির মতো কমিউনিস্ট পার্টিও। আবার সিপিএমের এলডিএফ জোটে রয়েছে একঝাঁক বিক্ষুব্ধ কংগ্রেসিদের দল। বিজেপি এবার জোট করেছে ‘টোয়েন্টি২০’ পার্টির সঙ্গে। নামের মতোই বেশ আকর্ষণীয় দলটি। তাদের নির্বাচনী প্রতীক কাঁঠাল। আগে স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনে আম, আনারস প্রভৃতি চিহ্ণে দাঁড়িয়েছে। জনগণকে ‘ফল খাওয়ানো’ দলটি আসলে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির হাত ধরে উঠে এসেছে।
কেরলমের রাজনীতিতে বর্ণময় চরিত্রের অভাব নেই। পিনারাই বিজয়ন অবশ্যই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে পরিচিত মুখ। সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মরিয়াম আলেকজেন্ডার বেবিও কেরলমের। কোভিড অতিমারির সময় বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘে প্রশংসিত হয়েছিলেন কেরলমের সিপিএম নেত্রী কে কে শৈলজা। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পিনারাইয়ের সঙ্গে বিবাদে তিনি এখন প্রচারের অন্তরালে। বিবাদ তো কংগ্রেসেরও নিত্যসঙ্গী। প্রবীণ কংগ্রেস নেতা, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে সৎ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য পরিচিত মুখ এ কে অ্যান্টনির মতোই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী উম্মন চন্ডি, কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কোঝুম্মাল চাট্টাডি ভেনুগোপাল, সাবেক কূটনীতিক শশী থারুর প্রমুখ রয়েছেন কংগ্রেসের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে। বিজেপির কেরলমের মুখ সুরেশ গোপী।

ভোটে মূল ইস্যু প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া। সঙ্গে রয়েছে দুর্নীতি, বেকার সমস্যা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ইত্যাদি। তবে এবারের নির্বাচনে মেসিও একটা ফ্যাক্টর। হ্যাঁ, লিওনেল মেসি কেরলমের ভোটে বড় বিষয়। এলডিএফ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ফুটবল পাগল রাজ্যটিতে মার্চ মাসেই মেসিসহ আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে নিয়ে আসবে। কিন্তু পারেনি। এখন কেরলমের ক্রীড়ামন্ত্রী ভি আবদুরহিমান মেসিদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলতেই মেসি-ভক্তরা আরও ক্ষেপে গিয়েছেন। তাই পিনারাইদের চিন্তার ভাঁজ বাড়ছে। আর বাড়ছে কংগ্রেসিদের জয়ের আশা ও ভরসা।
কেরলমে ভোটের হার বাড়াতে বেশ সক্রিয় নির্বাচন কমিশনও। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৭৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সেটাই কমে দাঁড়ায় ৭২.২৪ শতাংশ। তরুণ ভোটারদের বুথমুখী হওয়ার হারও ছিল কম। তাই এবার নির্বাচন কমিশন তরুণদের আকৃষ্ট করতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে। এবার ভোটার তালিকায় নাম তোলা ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভোটারদের ভোটদানের পর বুথে বুথে টিফিন দেওয়া হবে। মাত্র এক রুপির বিনিময়ে টিফিনে মিলবে সেখানকার জনপ্রিয় চালের আটার রুটি আর হালুয়া। শুধু তাই নয়, গাড়ি ভাড়াও দেওয়া হবে তরুণদের। এখন দেখার, এতে কতটা উৎসাহিত হন ভোটাররা। আর কারাই বা হাসেন শেষ হাসি। প্রথমটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। পরের প্রশ্নের জবাব মিলবে ৪ মে, ইভিএম ভোটগণনায়। ওই দিন জানা যাবে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাডু ও পুদুচেরির ভবিষ্যৎ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

ছিল কেরালা, হলো কেরলম। মালয়ালম ভাষায় কেরলম শব্দের অর্থ ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’। ছবির মতো সুন্দর দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যটি পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। রাজ্যের পশ্চিমে আরব সাগর ও পূর্বে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সৌন্দর্যের মতোই কেরলমের মিশ্র সংস্কৃতি এবং স্থানীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পর্যটকদের কাছে বাড়তি পাওয়া। সাক্ষরতার হারেও কেরলম ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজ্য।
এই রাজ্যে বিধানসভার ভোট ৯ এপ্রিল। চলছে তুমূল প্রস্তুতি। ১৯৮০ সাল থেকে কেরলমে একটাই রীতি, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সেখানে সরকার বদলায়। কাউকে বেশিদিন ক্ষমতায় রাখতে চান না তারা। কিন্তু ২০২১ সালে সেই রীতি ভাঙে। কর্মদক্ষতা বিচার করে সিপিএমের নেতৃত্বে সেখানকার বাম গণতান্ত্রিক জোটকে (এলডিএফ) ক্ষমতায় রেখে দেন রাজ্যবাসী। এবারের বিধানসভা ভোটের আগে বিভিন্ন জরিপ অবশ্য বলছে, ফের ক্ষমতায় ফিরছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। বিজেপিও ভোটের লড়াইতে রয়েছে। গতবার খাতা খুলতে না পারলেও এবার তারা মরিয়া বিধানসভায় খাতা খুলতে। তারাও জোট করেছে, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এনডিএ)। গত লোকসভা নির্বাচনে তাদের প্রার্থী সুরেশ গোপী জিতে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর বিজেপিও ভালো ফলের আশা করছে। ফলে ত্রিমুখী লড়াইয়ে জমজমাট কেরলম।
ভারতে তো বটেই, দুনিয়াতেই প্রথম কেরলমে তৈরি হয় কমিউনিস্টদের নির্বাচিত সরকার। ইএমএস নাম্বুরিদিবাদের নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি ভোটে জিতে সরকার গঠন করে। তবে সেই সরকার বেশি দিন টেকেনি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কিছুদিন পরেই ভেঙে দেন সেই সরকার। তারপরও কমিউনিস্টরা কেরলমে বেশ দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করছে। ১৯৮০ সাল থেকে কেরলমে পরম্পরা হয়ে উঠেছে পাঁচ বছর এলডিএফ, তো পাঁচ বছর ইউডিএফ! গোটা ভারতেই বেশ জনপ্রিয় কেরলম-মডেল। কিন্তু গতবার তার ব্যতিক্রম ঘটে। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন টানা দশ বছর মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে রেকর্ড গড়েছেন। এক সময় পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতেও সিপিএমের নেতৃত্বাধীন সরকার থাকলেও এখন শিবরাত্রির সলতের মতো জ্বলছে শুধু কেরলমে। সেই দেউটিও কি নিভতে চলেছে? কংগ্রেস আশাবাদী। আত্মবিশ্বাসীও।
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ও বামেরা হরিহর আত্মা হলেও কেরলমে লড়াই কিন্তু সেয়ানে সেয়ানে। রাহুল গান্ধী এক সময় কেরলমের ওয়ানানাড কেন্দ্রে বামেদের হারিয়ে জাতীয় সংসদে নিজের সদস্যপদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদরাও সেই আসন থেকেই প্রথমবার হয়েছেন জাতীয় সংসদের সদস্য। গোটা দেশে সিপিএমসহ বামেদের সঙ্গে ‘দোস্তি’ হলেও কেরলমে কিন্তু ‘কুস্তি’ এখনো বহাল রয়েছে। কংগ্রেস ও বামেরা প্রচারে একে অন্যের বিরুদ্ধে গালি দিতেও কার্পণ্য করছেন না, সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন। আঞ্চলিক রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় জাতীয় স্বার্থ আপাতত স্থগিত। তাই বিজেপির কটাক্ষ হজম করতে হচ্ছে দুই প্রতিপক্ষকেই। গতবার একটি আসন না পেলেও এবার বিজেপি দু-একটি আসন পাবেই, এমনটাই উঠে আসছে বিভিন্ন জরিপে।
কেরলমে মোট ভোটার ২ কোটি ৬৯ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৪। ১৪টি জেলা থেকে ১৪০ জন বিধায়ক নির্বাচিত হবেন। ২০১৬ সালে এলডিএফ ৯১টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। ইউডিএফ পেয়েছিল ৪৭টি আসন। বিজেপি জিতেছিল মাত্র একটি আসনে। ২০২১ সালে বিজেপি কোনো আসন পায়নি। আসন বাড়ে এলডিএফের, কমে কংগ্রেসের জোট ইউডিএফের। এলডিএফ পায় ৯৯টি এবং ইউডিএফ ৪১টি। ভোটের হার ছিল এলডিএফের ৪৫.৪৩, ইউডিএফের ৩৯.৪৭ এবং এনডিএর ১২.৪১ শতাংশ।

কিন্তু ২০২৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে রাজ্যটি কংগ্রেসকে দারুণ সাফল্য এনে দেয়। ২০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস একাই পায় ১৮টি। সিপিএম জেতে মাত্র একটি আসন। তবে একটি মাত্র আসন পেয়েও উল্লসিত বিজেপি। কারণ বহুদিন ধরে চেষ্টা করে, চিত্রতারকা সুরেশ গোপীকে প্রার্থী করে জিতিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে একাধিকবার গোপীর হয়ে প্রচার করেন। কেরলমে লোকসভা ভোটে মাত্র একটি আসন জিতেও তাই উল্লসিত বিজেপি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি শুধু আসন নয়, ভোটের হারও বাড়িয়ে নেয়। এনডিএর প্রাপ্ত ভোট দাঁড়ায় ১২.৪১ থেকে বেড়ে ১৯.২ শতাংশে। কংগ্রেসের ইউডিএফ ৪৫.৪ এবং এলডিএফের ৩৩.৩ শতাংশ ভোট প্রাপ্তি রাজ্যে পরিবর্তনের পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। জয়ের গন্ধ পেয়ে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কংগ্রেস। ইতিহাস বলছে, কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দলীয় কোন্দল। কেরলমেও তার ব্যতিক্রম নেই। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা শশী থারুরও আক্রান্ত হয়েছেন।

মিশ্র জনবসতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেরলমের বিশেষ ঐতিহ্য। মন্দির, মসজিদ ও গীর্জার সহউপস্থিতি গোটা রাজ্যকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের ৫৪.৭ শতাংশ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ইসলাম ধর্মের মানুষ আছেন ২৬.৬ শতাংশ এবং খ্রিস্টান ১৮.৪ শতাংশ। সাক্ষরতায় ভারতে তৃতীয় কেরলম। সরকারি জরিপে বলা হচ্ছে ৯৫.৩ থেকে ৯৬.২ শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। সাধারণ মানুষ ধর্মেও আছেন, আবার রাজনীতিতেও। তেমনি দুই প্রধান প্রতিপক্ষের জোটও বেশ আকর্ষণীয়। কংগ্রেসের জোটে রয়েছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ, কেরালা কংগ্রেস বা রেভিলিউশনারি সোসালিস্ট পার্টির মতো কমিউনিস্ট পার্টিও। আবার সিপিএমের এলডিএফ জোটে রয়েছে একঝাঁক বিক্ষুব্ধ কংগ্রেসিদের দল। বিজেপি এবার জোট করেছে ‘টোয়েন্টি২০’ পার্টির সঙ্গে। নামের মতোই বেশ আকর্ষণীয় দলটি। তাদের নির্বাচনী প্রতীক কাঁঠাল। আগে স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনে আম, আনারস প্রভৃতি চিহ্ণে দাঁড়িয়েছে। জনগণকে ‘ফল খাওয়ানো’ দলটি আসলে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির হাত ধরে উঠে এসেছে।
কেরলমের রাজনীতিতে বর্ণময় চরিত্রের অভাব নেই। পিনারাই বিজয়ন অবশ্যই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে পরিচিত মুখ। সিপিএমের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক মরিয়াম আলেকজেন্ডার বেবিও কেরলমের। কোভিড অতিমারির সময় বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘে প্রশংসিত হয়েছিলেন কেরলমের সিপিএম নেত্রী কে কে শৈলজা। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পিনারাইয়ের সঙ্গে বিবাদে তিনি এখন প্রচারের অন্তরালে। বিবাদ তো কংগ্রেসেরও নিত্যসঙ্গী। প্রবীণ কংগ্রেস নেতা, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে সৎ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য পরিচিত মুখ এ কে অ্যান্টনির মতোই সাবেক মুখ্যমন্ত্রী উম্মন চন্ডি, কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কোঝুম্মাল চাট্টাডি ভেনুগোপাল, সাবেক কূটনীতিক শশী থারুর প্রমুখ রয়েছেন কংগ্রেসের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে। বিজেপির কেরলমের মুখ সুরেশ গোপী।

ভোটে মূল ইস্যু প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া। সঙ্গে রয়েছে দুর্নীতি, বেকার সমস্যা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ইত্যাদি। তবে এবারের নির্বাচনে মেসিও একটা ফ্যাক্টর। হ্যাঁ, লিওনেল মেসি কেরলমের ভোটে বড় বিষয়। এলডিএফ সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ফুটবল পাগল রাজ্যটিতে মার্চ মাসেই মেসিসহ আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে নিয়ে আসবে। কিন্তু পারেনি। এখন কেরলমের ক্রীড়ামন্ত্রী ভি আবদুরহিমান মেসিদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলতেই মেসি-ভক্তরা আরও ক্ষেপে গিয়েছেন। তাই পিনারাইদের চিন্তার ভাঁজ বাড়ছে। আর বাড়ছে কংগ্রেসিদের জয়ের আশা ও ভরসা।
কেরলমে ভোটের হার বাড়াতে বেশ সক্রিয় নির্বাচন কমিশনও। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৭৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সেটাই কমে দাঁড়ায় ৭২.২৪ শতাংশ। তরুণ ভোটারদের বুথমুখী হওয়ার হারও ছিল কম। তাই এবার নির্বাচন কমিশন তরুণদের আকৃষ্ট করতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে। এবার ভোটার তালিকায় নাম তোলা ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী ভোটারদের ভোটদানের পর বুথে বুথে টিফিন দেওয়া হবে। মাত্র এক রুপির বিনিময়ে টিফিনে মিলবে সেখানকার জনপ্রিয় চালের আটার রুটি আর হালুয়া। শুধু তাই নয়, গাড়ি ভাড়াও দেওয়া হবে তরুণদের। এখন দেখার, এতে কতটা উৎসাহিত হন ভোটাররা। আর কারাই বা হাসেন শেষ হাসি। প্রথমটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। পরের প্রশ্নের জবাব মিলবে ৪ মে, ইভিএম ভোটগণনায়। ওই দিন জানা যাবে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাডু ও পুদুচেরির ভবিষ্যৎ।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

অনিরাপদ বিশ্ব নিরাপদ হবে না যতদিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারীর ক্ষমতা খর্ব না হয়। সেটি সম্ভব-যদি Balance of Terror প্রতিষ্ঠিত হতো। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভারতের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের সমর্থনে বলেছিলেন, ‘Strength respects strength’। জানি না কতদিনে বিশ্বের এই একতরফা ক্ষমতার অবাসন হবে?