জাতীয় সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের কোনো যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার বিন্যাস এবং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
সংসদের কাঠামোগত ও আচরণগত চরিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার প্রকৃত রূপ কি কেবল সংখ্যাভিত্তিক, নাকি অংশীদারত্বমূলক–তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
এই পটভূমিতে আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমাদের জাতীয় সংসদের চরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গিতে কি গুণগত রূপান্তর ঘটছে, নাকি আমরা এখনো পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছি?
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সংকট এর অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। ঐতিহাসিকভাবে আমরা যুক্তরাজ্য থেকে ওয়েস্টমিনস্টার মডেল ধার করেছি, যা মূলত ‘বিজয়ীই সব পাবে’–এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এ ব্যবস্থায় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, যেখানে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রায়শই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। স্বাধীনতার পর সংসদীয় রাজনীতির নামে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে গভীর রাষ্ট্র সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা কেবল এই সংখ্যাগুরুবাদী মডেল দিয়ে ধারণ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র সংস্কারের এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন কনসেনসাস ডেমোক্রেসি বা সমঝোতাভিত্তিক অংশীদারত্বমূলক গণতন্ত্র।
ওয়েস্টমিনস্টার মডেল: গাণিতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা গভীর বিভাজিত সমাজে দীর্ঘমেয়াদে বৈধতার সংকট তৈরি করতে পারে।
কনসেনসাস মডেল: সংসদীয় কাঠামোর ভেতরেই দলমত নির্বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তে বিরোধীদের অংশীদার করে। এটি রাজনৈতিক বিজয়ীর একক সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই ও অংশগ্রহণমূলক।
কাঠামোগত বিতর্ক: ১২ ও ১৭ সদস্যের সমীকরণ
সম্প্রতি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যবিশিষ্ট ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত এ বিশেষ কমিটিতে বর্তমানে ১২ জন সদস্য রয়েছেন। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটিকে ১৭ সদস্যে পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
কমিটিতে বিএনপি দলীয় সদস্যরা হলেন–স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (কক্সবাজার-১), চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি (বরগুনা-২), আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (ঝিনাইদহ-১), জয়নুল আবেদীন (বরিশাল-৩), প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (চট্টগ্রাম-৫), প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন (নাটোর-১), মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩) এবং সংরক্ষিত মহিলা আসন-৮-এর সদস্য শাকিলা ফারজানা।
অন্য সদস্যরা হলেন–গণসংহতি আন্দোলনের নেতা ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালীব রহমান (ভোলা-১), গণঅধিকার পরিষদের নেতা ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক (পটুয়াখালী-৩) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলি উল্লাহ (বরগুনা-১)।
বিলের ওপর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিরোধী দলের ‘দুই শপথ’ প্রসঙ্গের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত হয়েছে এবং সংসদের অধিবেশনও সেই সংবিধান অনুসারেই আহ্বান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “যদি কেউ বলে তারা দুইবার শপথ নিয়েছেন, আমরা তেমন কোনো দ্বিতীয় শপথ নিইনি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত ভিত্তি নেই।”
সুতরাং প্রশ্নটি কেবল সালাহউদ্দিন আহমদের ব্যক্তিগত অবস্থানের নয়; প্রশ্নটি হলো–গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ যে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, সেই ক্ষমতার রাজনৈতিক ও নৈতিক স্বীকৃতি যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে সেই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান পুনর্গঠনের নেতৃত্ব কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
সংবিধান সংশোধন কোনো নিছক কারিগরি প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দর্শন, ক্ষমতার কাঠামো এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক নির্ধারণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
ফলে গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সংবিধান সংস্কারের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের থাকা প্রয়োজন, যারা সেই অভ্যুত্থানের জনগণের সার্বভৌম ম্যান্ডেটকে স্বীকার করেন এবং পুরনো ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তে একটি নতুন গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
অন্যথায় আশঙ্কা থেকেই যায়, সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র রূপান্তরের পথ প্রশস্ত না করে পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সীমাবদ্ধতাকেই নতুন আঙ্গিকে বহন করতে পারে।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি এবং ১৭ সদস্যবিশিষ্ট বৃহত্তর কাঠামোর পাঁচটি পদ শূন্য রাখার সিদ্ধান্তটি এই তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বেরই একটি বাস্তব উদাহরণ। এই পাঁচটি শূন্য পদ কেবল কোনো সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
১. অন্তর্ভুক্তির সদিচ্ছা: সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি বিরোধী কণ্ঠস্বরকে যুক্ত করার একটি উন্মুক্ত সুযোগ বা স্পেস।
২. নক-আউট প্রশ্ন: বিরোধী শিবিরের অবস্থান হলো–এই শূন্য পদ পূরণের পদ্ধতি, তাদের মতামতের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা বা সিদ্ধান্তের ওপর প্রকৃত প্রভাব কতটুকু থাকবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে: এটি কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্তের ওপর বিরোধীদের সম্মতির সিলমোহর দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা, নাকি প্রকৃত অংশীদারত্ব?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ছবি: চরচা
নৈতিক ম্যান্ডেট বনাম সংসদীয় বৈধতা:
এখানেই যুক্ত হচ্ছে আরেকটি জটিল কিন্তু অপরিহার্য মাত্রা–গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ম্যান্ডেট বনাম প্রথাগত সংসদীয় বৈধতা।
একটি সাধারণ নির্বাচন সরকারকে শাসন করার আইনি বা সংসদীয় বৈধতা দেয়। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক জনবিস্ফোরণ রাষ্ট্রকে দেয় এক বিশেষ নৈতিক ম্যান্ডেট, যা প্রচলিত নিয়মতান্ত্রিকতার চেয়েও ব্যাপক ও গভীর।
গণঅভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট কোনো একক দলের ম্যান্ডেট নয়; এটি একটি যৌথ জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। তাই এই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যখন কোনো বিশেষ কমিটি বা সংসদীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন তার বৈধতা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার গাণিতিক যুক্তিতে অর্জিত হতে পারে না।
এর জন্য প্রয়োজন সর্বজনীন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সম্মতি। অন্যথায় নৈতিক ম্যান্ডেটের সঙ্গে সংসদীয় প্রক্রিয়ার দূরত্ব তৈরি হলে তা রাষ্ট্র সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো–সংসদের ভেতরে অর্থপূর্ণ সংলাপের অনুপস্থিতি বারবার রাজপথকে রাজনীতির মূল ক্ষেত্র বানিয়ে তুলেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই বৃত্ত ভাঙার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে।
আজকের মূল প্রশ্নটি তাই কেবল সংসদে কার আসন কত বেশি, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো–জাতীয় সংসদ কি রাষ্ট্রের সকল ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ধারাকে ধারণ করার মতো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিসরে পরিণত হতে পারছে?
বাংলাদেশের পরবর্তী গণতান্ত্রিক অধ্যায় নির্ধারিত হবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের আসনসংখ্যা দিয়ে নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কারের মতো মৌলিক প্রশ্নে বিরোধী ও ভিন্নমতের জন্য কতটুকু নীতিগত ও কাঠামোগত রাজনৈতিক স্থান সৃষ্টি করা যাচ্ছে–তারই মাধ্যমে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাময়িকভাবে শাসনক্ষমতা প্রদান করে, কিন্তু অংশীদারত্ব, অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় ঐকমত্যই একটি রাষ্ট্রকে দেয় ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব এবং গভীরতর বৈধতা।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সেই সম্ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী রূপ দেওয়ার প্রধান পরীক্ষাগার এখন জাতীয় সংসদ।
জাতীয় সংসদ যদি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ না হয়ে জনগণের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, সংলাপ ও ঐকমত্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবেই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
অন্যথায় ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণ আরেকটি ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
লেখক:গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সংসদ। ছবি: বাসস
জাতীয় সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের কোনো যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার বিন্যাস এবং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
সংসদের কাঠামোগত ও আচরণগত চরিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার প্রকৃত রূপ কি কেবল সংখ্যাভিত্তিক, নাকি অংশীদারত্বমূলক–তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
এই পটভূমিতে আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমাদের জাতীয় সংসদের চরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গিতে কি গুণগত রূপান্তর ঘটছে, নাকি আমরা এখনো পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছি?
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সংকট এর অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ। ঐতিহাসিকভাবে আমরা যুক্তরাজ্য থেকে ওয়েস্টমিনস্টার মডেল ধার করেছি, যা মূলত ‘বিজয়ীই সব পাবে’–এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এ ব্যবস্থায় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, যেখানে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রায়শই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। স্বাধীনতার পর সংসদীয় রাজনীতির নামে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে গভীর রাষ্ট্র সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা কেবল এই সংখ্যাগুরুবাদী মডেল দিয়ে ধারণ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র সংস্কারের এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন কনসেনসাস ডেমোক্রেসি বা সমঝোতাভিত্তিক অংশীদারত্বমূলক গণতন্ত্র।
ওয়েস্টমিনস্টার মডেল: গাণিতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা গভীর বিভাজিত সমাজে দীর্ঘমেয়াদে বৈধতার সংকট তৈরি করতে পারে।
কনসেনসাস মডেল: সংসদীয় কাঠামোর ভেতরেই দলমত নির্বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্তে বিরোধীদের অংশীদার করে। এটি রাজনৈতিক বিজয়ীর একক সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই ও অংশগ্রহণমূলক।
কাঠামোগত বিতর্ক: ১২ ও ১৭ সদস্যের সমীকরণ
সম্প্রতি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যবিশিষ্ট ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত এ বিশেষ কমিটিতে বর্তমানে ১২ জন সদস্য রয়েছেন। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটিকে ১৭ সদস্যে পুনর্গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
কমিটিতে বিএনপি দলীয় সদস্যরা হলেন–স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (কক্সবাজার-১), চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মণি (বরগুনা-২), আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (ঝিনাইদহ-১), জয়নুল আবেদীন (বরিশাল-৩), প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন (চট্টগ্রাম-৫), প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন (নাটোর-১), মাহমুদুল হক রুবেল (শেরপুর-৩) এবং সংরক্ষিত মহিলা আসন-৮-এর সদস্য শাকিলা ফারজানা।
অন্য সদস্যরা হলেন–গণসংহতি আন্দোলনের নেতা ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালীব রহমান (ভোলা-১), গণঅধিকার পরিষদের নেতা ও প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক (পটুয়াখালী-৩) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলি উল্লাহ (বরগুনা-১)।
বিলের ওপর আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিরোধী দলের ‘দুই শপথ’ প্রসঙ্গের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচিত হয়েছে এবং সংসদের অধিবেশনও সেই সংবিধান অনুসারেই আহ্বান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “যদি কেউ বলে তারা দুইবার শপথ নিয়েছেন, আমরা তেমন কোনো দ্বিতীয় শপথ নিইনি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত ভিত্তি নেই।”
সুতরাং প্রশ্নটি কেবল সালাহউদ্দিন আহমদের ব্যক্তিগত অবস্থানের নয়; প্রশ্নটি হলো–গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ যে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, সেই ক্ষমতার রাজনৈতিক ও নৈতিক স্বীকৃতি যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে সেই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান পুনর্গঠনের নেতৃত্ব কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
সংবিধান সংশোধন কোনো নিছক কারিগরি প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দর্শন, ক্ষমতার কাঠামো এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক নির্ধারণের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
ফলে গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সংবিধান সংস্কারের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের থাকা প্রয়োজন, যারা সেই অভ্যুত্থানের জনগণের সার্বভৌম ম্যান্ডেটকে স্বীকার করেন এবং পুরনো ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তে একটি নতুন গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
অন্যথায় আশঙ্কা থেকেই যায়, সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ জনগণের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র রূপান্তরের পথ প্রশস্ত না করে পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সীমাবদ্ধতাকেই নতুন আঙ্গিকে বহন করতে পারে।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি এবং ১৭ সদস্যবিশিষ্ট বৃহত্তর কাঠামোর পাঁচটি পদ শূন্য রাখার সিদ্ধান্তটি এই তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বেরই একটি বাস্তব উদাহরণ। এই পাঁচটি শূন্য পদ কেবল কোনো সংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
১. অন্তর্ভুক্তির সদিচ্ছা: সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি বিরোধী কণ্ঠস্বরকে যুক্ত করার একটি উন্মুক্ত সুযোগ বা স্পেস।
২. নক-আউট প্রশ্ন: বিরোধী শিবিরের অবস্থান হলো–এই শূন্য পদ পূরণের পদ্ধতি, তাদের মতামতের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা বা সিদ্ধান্তের ওপর প্রকৃত প্রভাব কতটুকু থাকবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে: এটি কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সিদ্ধান্তের ওপর বিরোধীদের সম্মতির সিলমোহর দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা, নাকি প্রকৃত অংশীদারত্ব?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ছবি: চরচা
নৈতিক ম্যান্ডেট বনাম সংসদীয় বৈধতা:
এখানেই যুক্ত হচ্ছে আরেকটি জটিল কিন্তু অপরিহার্য মাত্রা–গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ম্যান্ডেট বনাম প্রথাগত সংসদীয় বৈধতা।
একটি সাধারণ নির্বাচন সরকারকে শাসন করার আইনি বা সংসদীয় বৈধতা দেয়। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক জনবিস্ফোরণ রাষ্ট্রকে দেয় এক বিশেষ নৈতিক ম্যান্ডেট, যা প্রচলিত নিয়মতান্ত্রিকতার চেয়েও ব্যাপক ও গভীর।
গণঅভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট কোনো একক দলের ম্যান্ডেট নয়; এটি একটি যৌথ জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। তাই এই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যখন কোনো বিশেষ কমিটি বা সংসদীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন তার বৈধতা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার গাণিতিক যুক্তিতে অর্জিত হতে পারে না।
এর জন্য প্রয়োজন সর্বজনীন রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সম্মতি। অন্যথায় নৈতিক ম্যান্ডেটের সঙ্গে সংসদীয় প্রক্রিয়ার দূরত্ব তৈরি হলে তা রাষ্ট্র সংস্কারের পুরো প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো–সংসদের ভেতরে অর্থপূর্ণ সংলাপের অনুপস্থিতি বারবার রাজপথকে রাজনীতির মূল ক্ষেত্র বানিয়ে তুলেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই বৃত্ত ভাঙার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে।
আজকের মূল প্রশ্নটি তাই কেবল সংসদে কার আসন কত বেশি, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো–জাতীয় সংসদ কি রাষ্ট্রের সকল ভিন্নমত ও রাজনৈতিক ধারাকে ধারণ করার মতো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিসরে পরিণত হতে পারছে?
বাংলাদেশের পরবর্তী গণতান্ত্রিক অধ্যায় নির্ধারিত হবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের আসনসংখ্যা দিয়ে নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কারের মতো মৌলিক প্রশ্নে বিরোধী ও ভিন্নমতের জন্য কতটুকু নীতিগত ও কাঠামোগত রাজনৈতিক স্থান সৃষ্টি করা যাচ্ছে–তারই মাধ্যমে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাময়িকভাবে শাসনক্ষমতা প্রদান করে, কিন্তু অংশীদারত্ব, অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় ঐকমত্যই একটি রাষ্ট্রকে দেয় ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব এবং গভীরতর বৈধতা।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সেই সম্ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী রূপ দেওয়ার প্রধান পরীক্ষাগার এখন জাতীয় সংসদ।
জাতীয় সংসদ যদি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ না হয়ে জনগণের বহুমাত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, সংলাপ ও ঐকমত্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবেই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
অন্যথায় ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণ আরেকটি ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।