রাজধানীর রাস্তায় যেন সবাই রাজা!

রাজধানীর রাস্তায় যেন সবাই রাজা!
রাজধানীতে তীব্র যানজট। ফাইল ছবি: চরচা

ঘটনা ১: রাজধানীর একটি ব্যস্ত চৌরাস্তা। তাতে বাস আছে, ট্রাক আছে। আবার আছে পায়ে টানা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশাও। মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেলও আছে বটে। আর সবাই মিলে চলছিল ঠুসোঠুসি করে রাস্তার মোড় পার হওয়ার চেষ্টা। কেউ কাউকে জায়গা দিতে চায় না। ফাঁক পেলেই ঢুকে পড়তে চায়। আর এই অবস্থায় সেই মোড় পার হতেই লেগে গেল প্রায় ৩০ মিনিট!

ঘটনা ২: যাত্রীবাহী বাস চলছিল রাস্তার মাঝ বরাবর। চলতে চলতে হঠাৎ কি হলো, কথা নেই বার্তা নেই, বাতি জ্বালিয়ে সংকেত দেওয়া নেই, চালক বাসটিকে চাপাতে থাকলেন রাস্তার বামে। ওদিকে রাস্তার বামের লেনে ছিল ধীর গতির যান রিকশা, বাইসাইকেল। এদের সবার যাওয়ার পথ আটকে দিল বাসের সামনের অংশটি। আর বাসের পেছনের অংশের কারণে আটকে গেল এর পেছনে থাকা সকল ধরনের যানবাহনের গতিপথ, ব্রেক কষতে হলো কষে।

road safety

কী ভাবছেন? রাস্তাঘাটের কোনো জরুরি পরিস্থিতির কথা? না, না। এক যাত্রী রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে স্রেফ হাত তুলেছিলেন যাওয়ার জন্য। ওমনি পুরো বাস রাস্তায় থাকা সবাইকে আটকে এভাবেই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সেই জট ছুটতে লেগেছিল প্রায় ২০ মিনিট।

এভাবেই রাজধানী শহর ঢাকার রাস্তায় সব যানই যেন রাজা বনে যায়। চলে যে যার ইচ্ছেমতো। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উপরের ঘটনাগুলোর উল্লেখ করলেও, এমনটা ঢাকার বিভিন্ন সড়কে অহরহ ঘটে। এতে একদিকে যেমন যানজট সৃষ্টি হয়, তেমনি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও তৈরি হয়। দুর্ঘটনা ঘটেও প্রায় সময়। কারও কারও প্রাণটাও যায়। তবে ঢাকার সড়কের এমন আদি–অকৃত্রিম চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয় না। এর সঙ্গে আছে আবার বাসের চালক ও চালকের সহকারীর অযাচিত ব্যবহার এবং বাসভাড়ার ন্যায্যতার প্রসঙ্গে। সেরের ওপর সোয়া সেরের মতো এসবের সাথে যদি ঢাকার সড়কে চলা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনার বিষয়টিও যুক্ত করা হয়, তবে অসহায় বোধ করতে সময় লাগে না খুব বেশি।

আমরা যারা বিত্তের হিসাবে নিম্ন ও মধ্য নামের গোত্রভুক্ত, তারা মাত্রই এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। বাসের ভাড়ার হিসাব করতে বসলে দেখবেন, ভাড়ার ন্যায্যতা কিংবা বাসের চালক ও তার সহকারীর আচরণের প্রতিবাদ করা বা সে ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা মানেই হলো যেচে ঝামেলায় জড়ানো। এর ফলাফল হিসেবে যেমন আপনার বাক্যক্ষয় হবে, তেমনি শারীরিকভাবেও আক্রমণের শিকার হতে পারেন। আর গালিগালাজ তো আছেই। ঢাকায় পা রাখা ইস্তক প্রায় ১৬/১৭ বছর ধরে এই শহরের যাত্রীবাহী বাসগুলোর এসব সমস্যা প্রত্যক্ষ করা হচ্ছে। একই অবস্থা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনার ক্ষেত্রেও। কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত চক্ষুগোচর হয়নি। উল্টো দিনকে দিন এসবের তীব্রতা যেন বাড়ছেই। এসব দেখভালের জন্য রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ। কিন্তু তাদের উত্তরও দায়সারা।

এসব ক্ষেত্রে যে অনিয়মগুলো হচ্ছে, তা অনেকদিন ধরেই সবাই জানে, শোনে। কিন্তু পকেট কাটা বা ভোগান্তির ক্ষেত্রে শিকার যেহেতু শুধুই সাধারণ জনগণ, তাই এসবের কোনো সমাধানই হয় না। মাঝে মাঝে হুংকার আসে অবশ্য। তবে ওই পর্যন্তই। নৈরাজ্য দূরীভূত হয় না, ভোগান্তিও কমে না। কারণ, জনতার নোট নষ্ট হলে কার কী যায় আসে! আর যে নোট নষ্ট হয়, তা কারও না কারও সৌভাগ্যের কারণ তো অবশ্যই। এটি দিনের আলোর মতোই সত্য, অনিয়মের ক্ষতি কারও না কারও সৌভাগ্যের হেতু। বাংলা প্রবাদেই তো আছে, ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’।

রাজধানীতে যেমন যানজট সৃষ্টি হয়, তেমনি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও তৈরি হয়। ফাইল ছবি: চরচা

তাই পরিস্থিতি কেবল খারাপ থেকে খারাপই হচ্ছে। এত ধরনের অনিয়মে জেরবার ঢাকার সড়কে যানের জট হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ বলছে, বিশ্বের ১৫২টি দেশের ১ হাজার ২০০ শহরের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির শহর ঢাকা। বিশ্বব্যাংক ও বুয়েটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ঢাকার সড়কে গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। অর্থাৎ, যাত্রা কেবলই ক্রমাবনতির দিকে। এতে আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে ব্যাপকভাবে। কিছুদিন আগে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী নেতারাই জানিয়েছিলেন যে, ঢাকার যানজটের কারণে দিনে ক্ষতি হয় প্রায় ১৪০ কোটি টাকার। এবার তবে বছরের হিসাব করে ফেলুন। অঙ্কটা বের করে চমকে যাবেন নিশ্চিত। আর এর সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক হ্যাপার বিষয়টি যোগ করলে নিদারুণ হতাশায় ডুবে যাওয়া ছাড়া মনে হয় গত্যন্তর নেই।

এসব সমস্যা কি সমাধানের অযোগ্য? না, কখনোই নয়। সমাধান করার সৎ চেষ্টা থাকলে, এই পৃথিবীতে সব সমস্যারই সমাধান করা সম্ভব। এর জন্য প্রকৃত ইচ্ছা থাকতে হবে।

কিন্তু এই ঢাকায় এতদিন ধরে চলে আসা এমন সংকটের স্বরূপ অবলোকন করতে করতে মনে হতেই পারে যে, সমাধানের বদলে সংকট টিকিয়ে রাখতেই আসলে শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ হচ্ছে হয়তো! নইলে কি আর এমন নৈরাজ্য দিনের পর দিন চলে? নইলে কি আর রাজধানীর রাস্তায় সবাই রাজা বনে যায়!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত