আমরা এখন খুব ভালো আছি। এতটাই ভালো আছি যে ভালো থাকার ভারে কোমর বেঁকে যাওয়ার উপক্রম। দেশের মানুষ না খেয়ে আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের পেট ভরা। নাগরিকের পকেট ফাঁকা, কিন্তু রাষ্ট্রের স্বপ্নে ডলারের অভাব নেই। বাজারে চালের দাম জিজ্ঞেস করে মানুষ যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্র হিসাব করে আরও কয়টি উড়োজাহাজ কেনা যায়। একে বলে উন্নত শ্রমবিভাজন। জনগণ দীর্ঘশ্বাস ফেলবে, রাষ্ট্র আকাশে উড়বে। পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে? যেতে দিন। যার ডানা গজিয়েছে, সে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে উন্নয়নের গতি কমে যেতে পারে।
আমরা নাকি আর কারও গোলাম নই। একেবারেই নই। শুধু একটি চুক্তি করতে আমরা ভুলে যাই, নিজের নাগরিকের সঙ্গে। সেই চুক্তিতে লেখা থাকবে, নাগরিক ভোট দিক বা না দিক, সে মানুষ হিসেবে বাঁচবে; তার জীবন, সম্পদ, নিরাপত্তা ও সম্মানের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে। কিন্তু এই চুক্তির বড় সমস্যা হলো, এতে ফিতা কাটার সুযোগ নেই, উদ্বোধনী মঞ্চ নেই, ব্যানার টাঙানোর জায়গা নেই। তাই প্রকল্পটি বহুদিন ধরে পর্যালোচনাধীন।
রাষ্ট্রের হাতে বড় প্রকল্পের ঋণ নেওয়ার সাহস আছে, কিন্তু হাসপাতালের শয্যা বাড়াতে গেলেই কলমের নিব শুকিয়ে যায়। আকাশে বিমান নামানোর পরিকল্পনা পাকা, অথচ জ্বরে কাঁপা শিশুর জন্য একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার খুঁজতে মায়ের রাত কেটে যায়। অবশ্য অভিযোগ করার কিছু নেই। শয্যা ছিল, ডাক্তার ছিল, ওষুধ ছিল, ব্যবস্থা ছিল। সবই ছিল। কাগজে ছিল, প্রতিবেদনে ছিল, বক্তৃতায় ছিল, উদ্বোধনী ফলকে ছিল। শুধু যে মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, সেই মুহূর্তটিতেই ছিল না। দোষ তাই ব্যবস্থার নয়, সময়ের। শিশুরা কেন যে অসুস্থ হওয়ার জন্য এত ভুল সময় বেছে নেয়!
এই দেশে সবকিছুরই চমৎকার নাম আছে। ক্ষুধা এখন সাময়িক চাপ। বেকারত্ব পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময়। মূল্যবৃদ্ধি বাজারের স্বাভাবিক সমন্বয়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মানুষের ভয় গুজব। আর নাগরিকের অসহায়ত্ব? সেটার নাম এখনো ঠিক হয়নি। নামকরণ কমিটি গঠনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন। কমিটির সভার জন্য চা, বিস্কুট ও সিঙাড়ার বরাদ্দ অনুমোদিত হলেই কাজ শুরু হবে।
বাড়ি দখলের কথাই ধরা যাক। সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে গড়া ঘর, দেয়ালে সন্তানের উচ্চতার দাগ, বারান্দায় স্ত্রীর হাতে লাগানো গাছ, রান্নাঘরে মায়ের পুরোনো হাঁড়ি। একদিন কয়েকজন এসে জানিয়ে দিলেন, বাড়িটি আর আপনার নয়। প্রতিবাদ করলেন। তারপর শুরু হলো নাগরিকত্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পরীক্ষা। আপনাকেই প্রমাণ করতে হবে বাড়িটি আপনার। আপনাকেই প্রমাণ করতে হবে আপনি ভয় পেয়েছেন। আপনাকেই প্রমাণ করতে হবে কেন ভয় পেয়েছেন। দখলদারের হাতে সাহসের সনদ, আর মালিকের হাতে দলিল। ব্যবস্থাপনায় দুটির মূল্য যে সমান নয়, তা বুঝতে আইনজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্য সম্পূর্ণ বহাল আছে। বলুন, যত খুশি বলুন। শুধু এমন কিছু বলবেন না, যাতে কেউ অস্বস্তি বোধ করে। প্রশ্ন করুন, তবে প্রশ্নের ধার যেন ক্ষমতার দরজায় গিয়ে ভোতা হয়ে যায়। প্রশংসা করলে আপনি দেশপ্রেমিক। প্রশ্ন করলে সন্দেহজনক। প্রতিবাদ করলে বিশৃঙ্খলাকারী। চুপ থাকলে আদর্শ নাগরিক। অর্থাৎ স্বাধীনতা আছে, ব্যবহারবিধিও আছে। শুধু ব্যবহারবিধিটা নাগরিককে পড়ানো হয় না। কারণ স্বাধীনতার সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবহার হলো সেটি ব্যবহার না করা। এখানে সবচেয়ে নিরাপদ নাগরিক সে, যে সব দেখে, কিছু বোঝে, কিন্তু কিছু বলে না এবং সময়মতো হাততালি দিতে জানে। অত্যন্ত ভালো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুল শব্দ, একটি ভুল প্রতিক্রিয়া, একটি ভুল ছবি, একটি ভুল প্রশ্ন কখন যে আপনার পুরোনো দিনের সঙ্গী হয়ে যায়, আপনি টেরও পান না। এ হলো স্বাধীনতার নতুন সংস্করণ। নাম দেওয়া যেতে পারে স্বাধীনতা ২.০। এখানে কথা বলার অধিকার আছে, তবে কথার ফল ভোগ করার দায়ও আপনার। গলায় দড়ি থাকলেও বলতে হবে, এটি আসলে গণতন্ত্রের মালা।
বিচারের প্রশ্নেও আমরা বড়ই উদার। ন্যায়বিচার চাই না, চাই আমার পক্ষের জয়। কার বাড়ি ভাঙল, সেটা গৌণ। বাড়ির মালিক কোন পক্ষের, সেটাই মুখ্য। কে অন্যায় করল, সেটা তুচ্ছ। অন্যায়কারী আমার লোক কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। নিজের লোক অন্যায় করলে সেটা ষড়যন্ত্রের শিকার; অন্যের লোক একই কাজ করলে সেটা জাতির সর্বনাশ। একই অপরাধ, শুধু পতাকার রং আলাদা। এইভাবে আমরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সভ্য ঘোষণা করি। সভ্যতা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবির মতো। বাইরে ঝকঝকে ফিল্টার, ভেতরে যা আছে থাক।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমরা ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। আগে পাশের বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ এলে দরজা খুলে ছুটে যেতাম। এখন জানালা বন্ধ করি। কোনো শিশুর মৃত্যুর খবর শুনলে আগে দেখি সে কোন পরিবারের, কোন মতের, কোন পক্ষের। তারপর ঠিক করি শোক প্রকাশ করা যাবে কি না। যেন মৃত্যুরও দলীয় পরিচয়পত্র আছে। সমাজ এভাবেই ভাঙে। সবসময় বিস্ফোরণের শব্দ হয় না। অনেক সময় সমাজ ভাঙে নীরবে, কাঠের ভেতর ঘুণ ধরার মতো। বাইরে আসবাব অটুট, ভেতরে ফাঁপা।
পতাকা ঠিকই ওড়ে, জাতীয় সংগীত ঠিকই বাজে, সভা হয়, চুক্তি হয়, প্রকল্প হয়, নতুন ভবন ওঠে, নতুন বিমান আসে। শুধু মানুষের ভেতরের মানুষটি একটু একটু করে মারা যায়। ফলে হিসাবের খাতায় মানুষটি এখনো জীবিত।
আমাদের আরেকটি অসাধারণ ক্ষমতা আছে। আমরা যেকোনো ব্যর্থতাকে সাফল্যের ভাষায় অনুবাদ করতে পারি। সমস্যা? চ্যালেঞ্জ। ব্যর্থতা? শিক্ষা। ক্ষতি? বিনিয়োগ। বেকারত্ব? সম্ভাবনার অপেক্ষা। নিরাপত্তাহীনতা? সতর্ক থাকার সুযোগ। মূল্যবৃদ্ধি? বাজারের গতিশীলতা। নাগরিকের কান্না? আবেগ। অভিধানটি বদলে ফেললেই বাস্তবতাও যেন বদলে যায়। পেট খালি থাকলেও শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ থাকলে মানুষ নাকি ভালো থাকে।
তারপর একদিন দেখা যায়, চারদিকে সবাই বলছে, সব ঠিক আছে। কে বলছে? যে চাকরি হারিয়েছে, সে নয়। যে হাসপাতালে শয্যা পায়নি, সে নয়। যে বাড়ি হারিয়েছে, সে নয়। যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে, সে নয়। যারা ঠিক থাকার ঘোষণা দিচ্ছেন, তারা ঠিক আছেন। ফলে রাষ্ট্রও ঠিক আছে, প্রতিবেদনও ঠিক আছে, পরিসংখ্যানও ঠিক আছে। শুধু মানুষটির জীবনটাই কোথায় যেন ঠিক নেই।
প্রশ্ন করলেই সমস্যা। কেন এত ভয়? কেন এত অনিশ্চয়তা? কেন এত মানুষ অসহায়? কেন নাগরিককে বারবার নিজের অধিকার প্রমাণ করতে হবে? প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে প্রশ্নকারীকে খুঁজে বের করা সহজ। প্রশ্নকে মোকাবিলা করার চেয়ে প্রশ্নের উৎস বন্ধ করা সুবিধাজনক। ফলে আমরা সমস্যার চিকিৎসা করি না, সমস্যার শব্দ কমিয়ে দিই। জ্বর কমে না, থার্মোমিটারটাই সরিয়ে রাখা হয়।
এর মধ্যেই কেউ যদি বলে, ভাই, আমরা তো বেশ ভালো আছি, তাকে দোষ দেওয়া যায় না। কারণ ভালো থাকার সংজ্ঞাটাই আমরা এমনভাবে লিখেছি যে তাতে মানুষ না থাকলেও চলে। ভবন থাকবে, সেতু থাকবে, উড়োজাহাজ থাকবে, মহাসড়ক থাকবে, উদ্বোধনী ফলক থাকবে। থাকবে বক্তৃতা, থাকবে প্রতিশ্রুতি, থাকবে আশ্বাস। শুধু নাগরিকটি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটি জানতে চাওয়া অভদ্রতা।
পরিশেষে একটি উপকথা।
এক বাসায় কুকুর আর বিড়ালের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রতিদিন ঝগড়া হতো। বিড়াল বলত, আমি মাছ, মাংস, দুধ খাই। বিছানায় ঘুমাই। আমার চলাফেরায় আভিজাত্য আছে। কাজেই আমিই শ্রেষ্ঠ। কুকুরকে দেখিয়ে সে বলত, তুমি ডাস্টবিনের খাবার খাও, নর্দমায় ঘোরো, মাটিতে ঘুমাও। তোমার চেয়ে নিকৃষ্ট আর কে আছে?
একদিন বাড়ির গিন্নি মুড়িঘণ্ট রান্না করবেন বলে রুই মাছের মাথা ভেজে রেখে অন্য কাজে গেলেন। ফিরে এসে দেখলেন, মাছের মাথা নেই। বিড়ালটি নিশ্চিন্তে বসে আছে। গিন্নি রেগে গিয়ে তার গলায় দড়ি বেঁধে কাজের ছেলেকে বললেন, এটাকে নদীতে ফেলে দিয়ে এসো।
দড়ি ধরে বিড়ালকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কুকুরটি দূর থেকে বলল, এত দিন শুনেছিলাম তোমার মুখে বড় বড় কথা, মরার দড়ি গলায় দিয়ে যাচ্ছ কোথা?
বিড়াল ঘাড় উঁচু করে উত্তর দিল, যার যেখানে মন, তুলসি মালা গলায় দিয়ে চলেছি বৃন্দাবন।
এই হচ্ছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় কৌশল। গলায় দড়ি থাকলেও সেটিকে তুলসি মালা বলা। নদীর দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে তীর্থযাত্রী ভাবা। ক্ষুধাকে উন্নয়ন বলা, ভয়কে স্থিতিশীলতা বলা, ব্যর্থতাকে সাফল্য বলা, আর নাগরিকের অসহায়তাকে ধৈর্যের পরীক্ষা বলা।
আমরা সেই পরীক্ষাতেই বসে আছি।
গলায় দড়ি, বলছি তুলসি মালা!
আমরা আসলেই খুব ভালো আছি।
শুধু ভালো থাকার সংজ্ঞা থেকে মানুষটাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
চিররঞ্জন সরকার: কলাম লেখক ও গবেষক