শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের বিকল্প কী

শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের বিকল্প কী
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স

শেখ হাসিনা কি ভারতের জন্য কূটনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন? মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার দু’দিন পর শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সামনে সম্ভাব্য বিকল্পগুলো ঠিক কী-এ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে আমার এই প্রশ্নে কিছুটা যেন অস্বস্তিতে পড়েছিলেন ড. শ্রীরাধা দত্ত। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেন যে কজন, দিল্লির ওপি জিন্দাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই অধ্যাপক তাদের অন্যতম। সামলে নিয়ে জবাব দিলেন, “ভারত কখনই শেখ হাসিনাকে বোঝা হিসাবে দেখবে না, সে যে দলই দিল্লির ক্ষমতায় আসুক না কেন।”

ড. ইউনূসের সরকার ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে হত্যা নির্যাতনের জন্য শেখ হাসিনার বিচার ও দণ্ড দেওয়ার জন্য তাকে প্রত্যর্পণের যে দাবি দিল্লির কাছে করছে, তা মেনে নেওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করলেন ড. দত্ত। তার কথায়, শেখ হাসিনা ভারতের কাছে একটি ‘লয়ালটি টেস্ট’ অর্থাৎ আনুগত্যের পরীক্ষা। নিরাপত্তাসহ ভারতের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক অগ্রাধিকারকে শেখ হাসিনা যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা তার ভাষায়, “ভারত কখনোই ভুলবে না…ভারত তার বন্ধুদের কীভাবে দেখে, এটা তারই একটা পরীক্ষা।”

আনুগত্যের এই পরীক্ষায় শুধু শেখ হাসিনা নন, তার দলের বিভিন্ন পর্যায়ের বহু নেতা-কর্মীকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে। সংখ্যা জানা নেই, তবে কয়েক হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা যায়।

গত ১৫ বছর ধরে ভারত একমাত্র শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখেছে। দিল্লি ধরেই নিয়েছিল, তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য ট্রানজিটসহ বাংলাদেশের যে সহযোগিতা দরকার, তার গ্যারান্টি একমাত্র শেখ হাসিনাই দিতে পারেন। সেজন্য গণতান্ত্রিক দেশ হয়েও প্রতিবেশি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়া নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখা যায়নি ভারতের।

এমন পরিণতি যে হতে পারে, সেই সাবধান বাণী এমনকি ভারতীয় অনেক বিশ্লেষক বেশ অনেক দিন ধরেই দিচ্ছিলেন। শ্রীরাধা দত্ত-ও তাদের একজন। দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর সঙ্গে বিজেপি সরকারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি তারাও ২০২৩ সাল থেকেই মোদি সরকারকে সাবধান করেছে, ভারতের বাংলাদেশ নীতি একটি দল এবং একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান হর্ষ ভি পন্থ, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার এক নিবন্ধে সাবধান করেছিলেন, কোনো দেশের একজন বা দু’জন রাজনীতিকের সঙ্গে নৈকট্যেই সে দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে টেকসই করতে পারে না।

নরেন্দ্র মোদির সরকার এসব পরামর্শে কান দেয়নি। ফলে তার অবধারিত পরিণতি হয়েছে। দেড় দশক ধরে শেখ হাসিনার আনুগত্য নির্ভর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন এক কঠিন সংকটে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এই দুই প্রতিবেশির সম্পর্ক এতটা খারাপ সম্ভবত আর কখনোই হয়নি।

বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ অনেকের মধ্যেও শেখ ‍হাসিনা বিরোধিতা এখন ভারত বিরোধিতার সঙ্গে সমার্থক হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বহু লোক মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, দেশের গণতান্ত্রিক অধঃপতনের মূলে ছিল ভরত। স্থিতিশীলতার যুক্তিতে ভারতই বাংলাদেশের বারোটা বাজিয়েছে।

বাংলাদেশে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই মনোভাব রাজনৈতিক বৈধতা পাবে। কারণ যে সরকারই বাংলাদেশে এখন ক্ষমতায় আসুক, তাদেরকে এই জাতীয়তাবাদী, এই পপুলার ন্যারেটিভকে ধারণ করতেই হবে।

ভারত কি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন?

শ্রীরাধা দত্ত বললেন, ভারত কখনোই বলেনি বাংলাদেশের গুরুত্ব তাদের কাছে নেই। তার কথা–বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারতকে শেখ হাসিনাসহ সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অবস্থানের একটা ব্যাখ্যা হয়ত দিতে হবে। কারণ, ব্যাখ্যা না দিয়ে চুপ করে থাকলে অভিযোগ বাড়বে যে, ভারত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে।

হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর তার প্রত্যর্পণ চেয়ে ঢাকার কাছ থেকে নতুন করে অনুরোধ পাঠানোর বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্রের বক্তব্য ছিল, সরকার (প্রত্যর্পণ চুক্তির) আইনগত বিষয় খতিয়ে দেখছে। তবে একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণে, সে দেশের শান্তি, গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতার প্রতি আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অংশীদারিত্ব রয়েছে, স্বার্থ জড়িত–এমন সব পক্ষের সাথে গঠনমূলক সংলাপ অব্যাহত রাখব।” এটা একেবারেই গতানুগতিক কূটনৈতিক ভাষা। তারপরও এর মধ্যে একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশে নতুন নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে ভারত।

কিন্তু বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের যেকোনো আলাপ-আলোচনাতেও শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ এড়ানো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বা যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ২০০৪ সালের গণবিক্ষোভের রায় বাস্তবায়নের চাপ সেই দলকে জাতীয় সংসদের বাইরে ও ভেতরে ক্রমাগত সহ্য করে যেতে হবে। ভারত সরকারও খুব ভালোই তা বুঝতে পারছে।

ভারতেরই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, দিল্লিকে এখন বলতে হবে শেখ হাসিনাকে আশ্রয়ের বিষয়টি নেহাতই মানবিক। রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার পথে গেলে পরিস্থিতি হিতে-বিপরীত হতে পারে। সম্প্রতি ভারতের মনোহর পারিকার ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের (আইডিএসএ) এক আলোচনা সভায় অনেক বক্তা সাবধান করেন, ভারত বাংলাদেশে খোলাখুলি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে এবং ভবিষ্যৎ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হতে পারে।

অন্য বিকল্প হতে পারে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কে ধীরে ধীরে দূরত্ব সৃষ্টি করা, যাতে বাংলাদেশে মানুষ ভরসা পায়, ভারত এখন থেকে শুধু আওয়ামী লীগের চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখবে না।

কীভাবে ভারত সেটা করতে পারে

একটা হতে পারে–শেখ হাসিনাকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া বা সে ব্যাপারে তাকে পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু কোনো দেশে কী তাকে এখন জায়গা দিতে চাইবে? বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় এবং দণ্ড যার ঘাড়ে আছে, এমন একজনকে!

আরেকটি বিকল্প হতে পারে, তাকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি অবসর নিয়ে দলের নেতৃত্ব অন্যদের হাতে ছেড়ে দিতে পরামর্শ দেওয়া। তাহলে হয়ত তার ব্যাপারে বাংলাদেশে ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। ড. শ্রীরাধা দত্ত বললেন, তিনি নিজেও মনে করেন, অন্তত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের স্বার্থে শেখ হাসিনার উচিত দলের নেতৃত্ব ছেড়ে অবসরে চলে যাওয়া। কিন্তু ভারত সরকার কী তাকে সে কথা মুখের ওপর বলবে? ড. দত্ত মনে করেন, ভারত শেখ হাসিনার ওপর কোনো চাপ দেবে না। “পরিস্থিতি বুঝে তাকে নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

শেখ হাসিনা তেমন পথের কথা ভাবছেন নাকি তার রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের ছক কাটছেন তার স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত এখনও নেই।

ভারতের বিকল্প সীমিত হয়ে আসছে

ভারতের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এটা প্রমাণ করা যে, এখন থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এক-দু’জন নেতা এবং রাজনৈতিক দলের ঊর্ধ্বে থাকবে। পুরোনো রাজনৈতিক মিত্রকে রক্ষার চেয়ে তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, রাজনৈতিক পরিবর্তনের বাস্তবতা মেনে নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ। এ ব্যাপারে অস্পষ্টতার রাস্তা তেমন নেই। কারণ, ঢাকার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছাড়া ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার যেমন: আঞ্চলিক সংযোগ, ট্রানজিট মতো বিষয়গুলো ঝুঁকিতে পড়বে।

শাকিল আনোয়ার : পরামর্শক সম্পাদক, চরচা।

সম্পর্কিত