ইরান থেকে গ্রিনল্যান্ড: সংকটগুলো কি একই সুতোয় গাঁথা?

জুলিয়েন শেইস
জুলিয়েন শেইস
ইরান থেকে গ্রিনল্যান্ড: সংকটগুলো কি একই সুতোয় গাঁথা?
হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

গত ১২ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিকভাবে কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো এই ঘটনাগুলোর মধ্যে কি কোনো সাধারণ যোগসূত্র আছে?

খালি চোখে দেখলে ইরান, পানামা, ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ডের ঘটনাগুলো আলাদা মনে হয়। প্রতিটির নেপথ্যে রয়েছে নিজস্ব কুশীলব, অজুহাত এবং সংবাদ শিরোনাম। কিন্তু যে বিষয়টি এদের এক সুতোয় গেঁথেছে, তা কোনো আদর্শ বা রাজনৈতিক ভাষা নয় বরং তা হলো মানচিত্র।

ইরান অবস্থিত হরমুজ প্রণালীর পাশে, যা পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানি প্রবাহের প্রধান চোক পয়েন্ট। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, চোক পয়েন্ট হলো এমন একটি সরু বা সংকীর্ণ ভৌগোলিক পথ (যেমন কোনো জলপথ বা স্থলপথ), যা দিয়ে যাতায়াত করা ছাড়া বিকল্প কোনো সহজ উপায় থাকে না।

পানামা অবস্থান করছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের কেন্দ্রে। ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব তাদের ভারী অপরিশোধিত তেল রপ্তানির কারণে। আর গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব বাড়ছে কারণ আর্কটিক অঞ্চল ধীরে ধীরে নতুন নৌপথ ও সামরিক ক্ষেত্র হিসেবে উন্মুক্ত হচ্ছে।

এই বিন্দুগুলোকে একসঙ্গে দেখলে একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে আমরা কি কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সংকট দেখছি, নাকি এগুলো আসলে রুট, বন্দর, তেল এবং আধিপত্য দখলের বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ?

তাৎক্ষণিক ফলাফলের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। চীনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি তেলের উৎস—ভেনেজুয়েলা ও ইরানে কৌশলগতভাবে চাপে পড়ছে। পুরো এশিয়া জুড়ে পণ্য পরিবহনের ঝুঁকি বেড়েছে এবং বিমা খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার সামনে চীনে অপরিশোধিত তেল বিক্রির সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে। এগুলো তাত্ত্বিক ফল নয়; বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব, যা ইতোমধ্যে অনুভূত হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ। ছবি: রয়টার্স
ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ। ছবি: রয়টার্স

এই প্রভাব কেবল চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর চাপ পড়ছে পুরো এশিয়ার ওপর। কারণ এশিয়াই এমন একটি অঞ্চল যেখানে বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন একত্রে মিলিত হয়েছে। একদিকে এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় তেলের বড় গন্তব্য। ফলে যাতায়াতের পথ সংকুচিত হলে এশিয়াকে দ্বিগুণ মূল্য দিতে হয়—একবার পরিবহন ব্যয়ে, আরেকবার জ্বালানির দামে।

বেইজিং অবশ্য নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে বসে নেই। চীন তেলের মজুত বাড়িয়েছে এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে। সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় রাষ্ট্রগুলো সাধারণত যা করে থাকে, চীনও তাই করছে। এটি কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও চোক পয়েন্টের ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের কৌশলগত উপলব্ধির প্রতিফলন।

এই কারণেই ইরান সংকটকে শুধু পারমাণবিক ইস্যু হিসেবে দেখা ভুল হবে। পারমাণবিক বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চারপাশের জলসীমাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীর ওপর যেকোনো হুমকি সরাসরি ট্যাঙ্কার চলাচল, বিমা ব্যয়, পরিবহন হার এবং পণ্য পৌঁছানোর সময়কে প্রভাবিত করে। এর প্রভাব শুধু ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল প্রতিটি আমদানিকারক দেশই এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এশিয়ার দেশগুলো এ তালিকায় প্রথম সারিতে।

পানামাও একই যুক্তির অংশ। একটি খাল মানে শুধু কংক্রিট, লক গেট ও টোল নয়; এটি ভূরাজনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। খালের সঙ্গে যুক্ত বন্দরগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিয়ন্ত্রণ মানেই যে আনুষ্ঠানিক মালিকানা হতে হবে তা নয়; এর অর্থ হতে পারে চাপ প্রয়োগ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং কার যাতায়াত নির্বিঘ্ন হবে তা নির্ধারণের ক্ষমতা। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর অর্থ বিলম্ব, দীর্ঘ পথ ঘুরে আসা এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা।

লোহিত সাগরও এই একই মানচিত্রের অংশ। বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে যেকোনো বিঘ্ন কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, ইউরোপ–এশিয়া সমুদ্রপথকে দীর্ঘায়িত করে এবং একটি আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে চাপিয়ে দেয়। দীর্ঘ যাত্রাপথ মানেই বেশি জ্বালানি ব্যয়, উচ্চতর বিমা খরচ এবং পণ্য খালাসের বাড়তি ব্যয়। এশীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

একই মানচিত্রে না বসানো পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডকে বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। কিন্তু ভূরাজনীতিতে এর গুরুত্ব স্পষ্ট। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনার মূলে রয়েছে আর্কটিক অঞ্চল। সেখানে যার প্রভাব শক্তিশালী হবে, সে শুধু বরফ বা পাথরের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাবে না; বরং সংক্ষিপ্ত নৌপথ, নৌচলাচল এবং সম্ভাব্য কাঁচামালের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আর্কটিকের নৌযাত্রা এখনও সীমিত হলেও তা দ্রুত বাড়ছে, যা গ্রিনল্যান্ডকে আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ভেনেজুয়েলা এই ধারাবাহিকতাকে আরও স্পষ্ট করে। চীন সেখানে সস্তায় অপরিশোধিত তেল পাওয়ার একটি উৎস হারিয়েছে এবং এখন ইরানেও একই ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এটি কোনো তাত্ত্বিক ক্ষতি নয়; এটি বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বাস্তবতা। সস্তা তেলের ব্যারেল কমে গেলে শোধনাগারগুলোর সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত আসে এবং বিকল্প সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে।

এসব ঘটনা যে একটি নির্দিষ্ট ঘরে বসে পরিকল্পিত হয়েছে, এমন দাবি করা কঠিন। আসলে তার প্রয়োজনও নেই। বিষয়টি আরও সরল। যখন একটি সংকট পানামা খালের প্রবেশপথকে স্পর্শ করে, অন্যটি ভারী অপরিশোধিত তেলকে আঘাত করে, তৃতীয়টি হরমুজ প্রণালীর ওপর প্রভাব ফেলে এবং চতুর্থটি আর্কটিক অঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করে—তখন পুরো ঘটনাপ্রবাহকে নিছক কাকতালীয় বলা কঠিন।

পুরোনো অভ্যাস হলো পানামা, ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড, ইরান সংকটকে আলাদা করে দেখা। কিন্তু এগুলোকে একটি একক মানচিত্রের বিভিন্ন বিন্দু হিসেবে দেখলে ভিন্ন একটি গল্প সামনে আসে।

সেই গল্পটি হলো এই লড়াই এখন আর কেবল সীমান্ত বা শাসনব্যবস্থা নিয়ে নয়; এটি প্রবেশদ্বার নিয়ন্ত্রণের লড়াই। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে কোনো রাষ্ট্রের দখলে কতটুকু ভূখণ্ড আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কতগুলো প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং কতক্ষণ তা ধরে রাখতে পারে।

২০২৬ সালের ভূরাজনীতিতে লড়াইটি আর কাউকে প্রভাবিত করার নয়; এটি এখন চলাচলের পথ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা। পরাশক্তিগুলো এই পথগুলোর চাবিকাঠি নিজেদের হাতে নিতে চায়।

লেখক: সিটি ইউনিভার্সিটি অফ হংকং-এর আইনের অধ্যাপক এবং আরজিসি সিনিয়র রিসার্চ ফেলো

নিবন্ধটি সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত