কেনাকাটা মানেই হচ্ছে প্রয়োজন মেটানো। অন্তত এই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে কেনাকাটা মানে সেটাই। কথা হলো, প্রয়োজনটা কোন ঘরানার আসলে। বিত্তভেদে এই দেশের বেশির ভাগ মানুষ অতীব বা আবশ্যিক প্রয়োজন মেটাতেই বাজারে যায়। যদিও বিত্তবানদের হিসাব আলাদা।
বিত্তবানদের যেটা প্রয়োজন, সেটা এই দেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে স্বপ্নে দেখা বিলাসিতা। আবার সাধারণের মানুষের কাছে যেই প্রয়োজন মেটানো আবশ্যিক, সেই প্রয়োজন মেটানোর চিন্তা হয়তো বিত্তবানদের মাথায় কখনও আসেই না। এটা অবশ্য পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতিরই একটি বাস্তবতা। যখন কোনো দেশ বা রাষ্ট্র এই ব্যবস্থায় চলে, তখন এমন বাস্তবতা মেনে নিয়েই চলতে হয়। তবে সেই বাস্তবতা যেন ক্রূর হয়ে না ওঠে, সেটি দেখার দায়িত্ব থাকে সরকারের।
এবার চলুন, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের প্রাত্যহিক বাস্তবতা কি, তা একটু বুঝে নেওয়া যাক।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় সরকার। তেলের দাম ও পরিবহন পরিচালনা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এই নতুন ভাড়া কার্যকর বলে গণ্য হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির জেরে বাসের পর বাড়ানো হয়েছে লঞ্চের ভাড়াও। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২০ পয়সা। এর ফলে যাত্রীদের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ টাকা।
তো, জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়বে পুরো পণ্যবাজারে। সেই সাথে সরাসরি খরচ বাড়বে সাধারণ মানুষের। এটা ব্যয় বৃদ্ধির এমন এক চেইন রিঅ্যাকশন, যাতে সাধারণ জীবনযাত্রার এমন কোনো খাত নেই, যেগুলোতে প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ, ব্যয় বাড়বেই।
এই ব্যয় বেড়ে যাওয়াতে কী হবে? টানা সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়েনি। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে।
ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। সীমিত আয়ের মানুষের এখন টানাটানির সংসার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। এতে করে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত আর ‘জীবনযুদ্ধ’ থেকে বের হতে পারছে না। সংগ্রাম বরং আরও বহুমাত্রিক হচ্ছে, মানিয়ে নেওয়ার লড়াই চালিয়েই যেতে হচ্ছে। তা এমন পরিস্থিতিতে যখন ব্যয় আরও বাড়বে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের সংকট আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিই তাই চাপে আছে। চাপ কেমন, তার একটা ধারণা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তরফেও মিলছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবির সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) আপডেট-এ কিছু পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমার আশঙ্কা করছে এডিবি। সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল এডিবি। অর্থাৎ, পূর্বাভাসে ধারাবাহিকভাবেই এক ধরনের পতনের চিত্র দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপই হচ্ছে।
এডিবি মনে করে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতিতে প্রধান বাধা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছে এডিবি।
সুতরাং, আমাদের দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো না। সেটি অবশ্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ স্বীকারও করছে, বার বার বলছেও। বর্তমান সরকারের নীতিই তো হচ্ছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। ফলে দেশের মানুষের সাধারণ প্রয়োজন প্রাধান্য পাওয়ার আশা করাই যায়। সেই অনুপাতে সামাজিক সুরক্ষামূলক বিভিন্ন কার্ডের সুবিধা, গ্যাস–তেল আমদানিসহ নানা উদ্যোগের কথা শোনাও যাচ্ছে। এবং এগুলো প্রয়োজনীয় উদ্যোগও। কারণ এতে একেবারে আমজনতার উপকার সম্পৃক্ত। এই কঠিন অর্থনৈতিক অবস্থায়, এসব পদক্ষেপে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাওয়ার কথা সাধারণ মানুষের, যদি ঠিকঠাক সব কাজ হয় আর কি।
এর বাইরে গত কয়েক মাস ধরেই গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটে আছে সাধারণ মানুষ। গ্যাস না পেলেও সরকারি সংস্থা টাকা ঠিকই কাটছে। আবার ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল মানুষের ঘাড়ে চাপার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে তাই নানাবিধ সংকট আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থাও ভালো না। লাগাতার খুনখারাবি, ছিনতাই–রাহাজানি, নারী নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়। কোনো নাগরিকের পক্ষে তাই সার্বিকভাবে নিরাপদ বোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও খানিকটা অস্থির। অনেকটা ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা সাধারণ মানুষের।
এর মধ্যেই কিছুদিন আগে এসেছিল ১৮ কোটি মানুষের দেশে ৩৩ লাখ সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীর বেতন বাড়ানোর খবর। একইভাবে এবার এসেছে বোয়িং প্লেন কেনার খবর। সরকার দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশে। সরকারি তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এর আগে গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ কিনতে বোয়িংয়ের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি করেছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আগের চুক্তিতে বাংলাদেশের গুনতে হবে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এই এয়ারক্রাফটগুলো বিমানকে সরবরাহ করবে বোয়িং। নতুন চুক্তির ১১টি উড়োজাহাজের দাম জানা যায়নি। হয়তো আরও ৩০ বা ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো হবে। সব মিলিয়ে বিমানের বহরে বোয়িংয়ের নতুন ২৫টি উড়োজাহাজ যোগ হচ্ছে।
অবশ্য এটাই শেষ কথা না। সরকারি তরফে আরও জানানো হয়েছে যে, ভবিষ্যতে এয়ারবাসের সঙ্গেও প্লেন কেনা নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনা হতে পারে। অর্থাৎ, প্লেন কেনা বন্ধ হচ্ছে না। বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ থেকে বোঝাই যাচ্ছে যে, সরকারের দাবি অনুযায়ী আমাদের দেশে বিমান পরিবহন খাত নিশ্চয়ই অত্যন্ত অভাবনীয় হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে! নইলে খান পঁচিশেক বোয়িং কেনার পরও এয়ারবাস হিসাবে থাকে কীভাবে?
এখন কিছু প্রশ্ন তোলা যাক। আপনারা একটু উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবেন, প্লিজ।
প্রথমত, এই দেশের কত শতাংশ মানুষ আসলে দেশের ভেতরে নিয়মিত যাতায়াতে উড়োজাহাজ ব্যবহার করেন?
দ্বিতীয়ত, এরাও কি সব সময় উড়োজাহাজের ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন?
তৃতীয়ত, দেশের বাইরে থাকা বিমান–এর রুটে যেসব বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভ্রমণ করেন, তারা কি এর সেবাতে খুব সন্তুষ্ট?
চতুর্থত, দেশের বাইরে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কি বাংলাদেশে হুট করেই খুব বেড়ে গেছে?
পঞ্চমত, উড়োজাহাজ কেনার বাইরে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আর কোন কোন খাতে ঘাটতি? নাকি সবকিছু বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থায় আছে?
নিরপেক্ষভাবে খুঁজলে দেখা যাবে, ওপরের কোনো প্রশ্নের উত্তরেই খুব একটা ইতিবাচক কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এই দেশে উড়োজাহাজের অভাবের চেয়েও আরও বড় বড় অভাবী খাত আছে। কিন্তু আমরা কিনতে যাচ্ছি উড়োজাহাজ। হ্যাঁ, বলাই যায় যে, সরকারকে দূরদর্শী হয়ে আগেভাগেই অনেক খাতে খরচ করতে হয়। অবশ্যই হয়। তবে উড়োজাহাজের অভাব কি খুব একটা অতি প্রয়োজনীয় পূরণযোগ্য অভাব? কে জানে! আমাদের মতো আদার ব্যাপারী রূপের সাধারণ জনতার পক্ষে জাহাজের মর্ম বোঝা কিছুটা কঠিনই বটে।
অথচ, এই দেশে এখনও সড়কে বছরে হাজার হাজার প্রাণ ঝরে। মানুষ খিদার জ্বালায় ভিক্ষা করে হরহামেশা। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া শিশুদের মৃত অবস্থায় বেওয়ারিশ হিসেবে মেলে। হামে, ডেঙ্গুতে বয়স নির্বিশেষে মানুষ মরে নির্বিচারে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। খুন, রাহাজানি হয় দিনে–দুপুরেও। মানুষ সরকারি সেবা পেতে চরকির মতো ঘোরে, অসহায় বোধ করে ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
‘ইত্যাদি’ শব্দটি আরও কয়েক হাজার লেখা যেত। কারণ ওইরকম উদাহরণ আছে ঢের। লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হতেই পারে। যদিও সেই ক্লান্তি আমাদের দণ্ডমুন্ডের কর্তাদের ছোঁয় না। তার কারণ এটিই হতে পারে যে, হয়তো তারা কেবলই আকাশকে পাখির চোখ করেছেন। তাই হয়তো মাটিতে থাকা সাধারণ মানুষগুলোর নিত্যকার সমস্যার চেয়ে আকাশে ঘুরে বেড়ানো উড়োজাহাজের ‘অভাব’ সংক্রান্ত সমস্যা বেশি অনুভূত হয়।
কিন্তু প্রধান সমস্যা একটাই। সেটি হলো, আমজনতার পেট। কারণ খালি পেটই যত অস্থিরতার উৎসস্থল। এ কারণেই আজও এই দেশে বেশি ভাত খেয়ে ফেলার অপরাধে মানুষ খুন হয়। তাই আশায় বেঁচে থাকা চাষার মতোর মনে কিছু প্রশ্ন জাগে। আচ্ছা, এতগুলো বোয়িং দিয়ে কি সাধারণ মানুষের পেট ভরানোর উপায় বের করা যাবে? তাদের শাঁখের করাতের মতো সংকটময় জীবনে কি একটু স্বস্তি আনা যাবে?
আনা গেলে আরও বেশি বেশি বোয়িং কেনাই উচিত। এয়ারবাসকেও কেনার খাতায় তোলাই উচিত। তাই নয় কি?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা