বাতাবি লেবু এ দেশের বহুল পরিচিত একটি ফল। অন্তত গত ১০ বছরের বাংলাদেশে তো অবশ্যই। এটিই এ দেশের একমাত্র ফল, যেটির মাঠের বাম্পার ফলনের চেয়ে ভার্চুয়াল ফলনেই মানুষের আগ্রহ বেশি ছিল বলা যায়!
এই বাতাবি লেবু আদতে একটি খুবই সাধারণ ফল। বাতাবি লেবু ফল হিসেবে খুবই উপকারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে মানবশরীরের প্রভূত উপকার সাধিত হয়ে থাকে। তবে আমাদের এই বাংলাদেশে বাতাবি লেবু মানবমনের জন্য একইসাথে প্রবল পীড়াদায়ক, এবং অন্যদিকে ঠাট্টা–মশকরার উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল।
কারণ, বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলন একটি দেশের জাতীয় টেলিভিশনে তখনই হয়, যখন সরকারি শাসন একচেটিয়া হয়ে ওঠে, শুধুই একটি দলের হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভিতেও তাই হয়ে ছিল এক বা দেড় বছর আগেও। বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের খবর সেখানে দেখতে দেখতে মানুষ ভুলে যেত নিত্যকার নানা রাষ্ট্রীয় বা সরকারি ভুল বা অন্যায়ের খতিয়ান। বাজারে আগুন লাগলেও বিটিভি আমাদের মনে করিয়ে দিত যে, বাতাবি লেবু কিন্তু আছে!
এভাবে বাতাবি লেবু হয়ে ওঠে একচেটিয়া বা ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম লক্ষণচিহ্ন। চব্বিশের আগস্টের শুরুতে প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী সরকারের অবসানের পর অন্যান্য স্বস্তির সাথে এটিও ছিল যে, এখন হয়তো বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলন আর হবে না। তবে বিধি বাম! তাই পঁচিশের আগস্ট পার হওয়ার আগেই আমাদের আবারও শুনতে হচ্ছে বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের উপাখ্যান। এবার আর শুধু বিটিভিতে নয়, সাথে আছে ফেসবুকসহ অন্যান্য মাধ্যমও।
বাতাবি লেবু এ দেশের বহুল পরিচিত একটি ফল। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিবর্তমানের বাংলাদেশে বাতাবি লেবুর মতোই হরেদরে শোনা যায় ‘ফ্যাসিবাদ’, ‘ফ্যাসিস্ট’ নামগুলোও। যার ইচ্ছা, যাকে ইচ্ছা ফ্যাসিবাদী বা ফ্যাসিবাদের দোসর বলে দেওয়াটা এখন আমাদের দেশের অন্যতম ফ্যাশন। এর পেছনে থাকে শুধুই ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতি। আর ফ্যাসিবাদকে এভাবে খেলো করে ফেলাতে হয়তো সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা এই জাতিরই হলো!
এই প্রসঙ্গের শুরুতেই উদারবাদী গণতন্ত্র নিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলা একটি দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় ওঠা একটি মন্তব্যের দিকে দৃষ্টি ফেলা যাক। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা চলার সময় পদপ্রার্থী কমলা হ্যারিস আরেক পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্পকে বেশ স্পষ্টভাবে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলেন কমলা। তবে ট্রাম্পও তো থেমে থাকার মানুষ নন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি উল্টো কমলা হ্যারিসকে উদ্দেশ করে বলে দিলেন, আসলে কমলাই ফ্যাসিস্ট। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল এমন–‘আমি নাৎসি নই। আমি নাৎসিবিরোধী। তিনি (কমলা) নাৎসি, ওকে? তিনি নাৎসি।’
ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কিনা—এই বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে বিস্তর আলাপ–আলোচনা চলেছে এবং এখনও চলছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে ক্যাপিটল হিলে হওয়া মবের আক্রমণে নেতৃত্ব দেওয়ার পর এই আলোচনার পালে আরও হাওয়া লাগে। ফ্যাসিবাদে প্রবল প্রতাপশালী ক্যারিশমাটিক নেতার আবির্ভাবের যে বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, তার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিল পাওয়া যায় অনেকটাই। ‘হাউ ফ্যাসিজম ওয়ার্কস’ নামের বইয়ের লেখক জেসন স্ট্যানলি ২০১৮ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাই এক কথাতেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, ‘ট্রাম্প ফ্যাসিবাদী রাজনীতিরই চর্চা করেন। তবে এর মানে এই নয় যে, তার সরকার ফ্যাসিবাদী। তবে হ্যাঁ, তিনি ফ্যাসিবাদী নানা কৌশল ব্যবহার করে থাকেন।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সঅর্থাৎ, পুরো সরকার ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী না বানিয়েও নেতা ফ্যাসিবাদী হতে পারেন। এমন নেতারা বিভিন্ন কৌশলে নিজেকে ‘অনিবার্য ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন এবং পুরো সরকার ব্যবস্থা যেন তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়, সেটি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালান। তবে এ ধরনের নেতারাও কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলেরই অংশ থাকেন। তাই ওই নেতার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পরিক্রমায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের দায়ও কম নয়। কারণ, ব্যক্তিকে দলেরও ঊর্ধ্বে স্থান নেওয়ার সুযোগ করে দেয় রাজনৈতিক দলই। দলীয় প্রতিনিধি হিসেবে ব্যক্তির সরকারি ক্ষমতা একচেটিয়া হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দল বাধা দেয় না বলেই ব্যক্তি ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পারে। অথচ দলের সেখানে ভারসাম্য রচনা করার কথা।
দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে ইতালি ও জার্মানিতে যে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল, সেটি সৃষ্টিতেও এই অভাব দায়ী ছিল। ওই সময় ইতালি ও জার্মানির দেখাদেখি ইউরোপ, লাতিন ও নর্থ আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও ফ্যাসিবাদী নীতির প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ফ্যাসিবাদ ব্যাপকভাবে কোণঠাসা হয়ে যায়। ধীরে ধীরে ‘ফ্যাসিবাদী’–এই অভিধাটিই চরম রাজনৈতিক অপমানের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক রবার্ট প্যাক্সটন মনে করেন, এই ফ্যাসিবাদী অভিধাটি অনেকদিন ধরেই বহুল ব্যবহৃত এবং অনেক ক্ষেত্রেই কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্যই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে এর আক্ষরিক ও কার্যকর ব্যবহার প্রায় দেখাই যায় না। তবে তাই বলে নব্যফ্যাসিবাদীদের উত্থান বা কর্মকাণ্ড থেমে নেই। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া—বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই ফ্যাসিবাদী ধরন দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে। গত কয়েক দশক ধরেই এটি একটি নিয়মিত চিত্র। এবং এটি নিজেদের আসল রূপ ধারণ করছে জনতুষ্টিবাদের আড়ালে। এ ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনে অভিজাতদের ছাপিয়ে জনতার বিজয় অর্জনের লক্ষ্যকে বাহ্যিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে বোঝানো হচ্ছে যে, জয় হচ্ছে সাধারণ মানুষের। কিন্তু দিনশেষে তৈরি করা হচ্ছে ফ্যাসিবাদের জাঁতাকল।
সাংবাদিক শেন বারলে মনে করেন, বর্তমানের বেশির ভাগ ফ্যাসিবাদী আন্দোলনই আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল ছাড়াই গড়ে উঠছে। রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থেকেই উদ্ভূত হচ্ছে এসব আন্দোলন। এগুলো শুরু হচ্ছে সামাজিক আন্দোলনের আকারে। প্রাথমিকভাবে সব ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করা হয়। এতে প্রাথমিকভাবে মনেই হবে যে—এটি তো একটি সামাজিক আন্দোলন, সমাজের ভালোর জন্যই করা হচ্ছে সব! এ ক্ষেত্রে এসব ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের নেতারা নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে সূক্ষ্ম দ্যোতনার এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা দিয়ে নানা অর্থ বোঝানো সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার বাম আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দগুচ্ছ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সাধারণের সম্মতি আদায়ের লক্ষ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে এসব ব্যবহার করা হয় এবং বিভ্রান্তি উৎপাদনের সুযোগ রাখা হয়।
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবে চর্চা হয়েছে ফ্যাসিবাদের। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে এটি ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। মূলত ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির মোড়কে ফিরে আসতে থাকে ফ্যাসিবাদ। পশ্চিম ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন আন্দোলন জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। ফ্রান্সে যেমন মারি লা পেনের দল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জার্মানিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারছে ইসলামবিরোধী হিসেবে খ্যাত উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’। আমেরিকাতেও ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদের ঘাঁটি শক্ত হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প শীর্ষক আলোচনায় খানিকটা হয়তো তা বোঝাও হয়ে গেছে।
মোদ্দা কথা হলো, জনতুষ্টিবাদী নেতাদের কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে এখনকার ফ্যাসিবাদের চর্চা। এদেরকে আপনি স্পষ্টভাবে ‘ফ্যাসিস্ট’ বললে, কিছু বিভ্রান্তি রয়েই যাবে। কারণ ফ্যাসিবাদের সবগুলো লক্ষণ যে তাদের মধ্যে সব সময় পাওয়া যায় না। তবে এসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ফ্যাসিবাদের নানা বৈশিষ্ট্য খণ্ডিতভাবে হলেও ধারণ করেন এবং সেসবের চর্চাও করেন প্রবলভাবে। ট্রাম্প ছাড়াও এঁদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, বেলারুশের একসময়ের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো, ব্রাজিলের জইর বোলসোনারো, ভারতের নরেন্দ্র মোদি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নামের সুপ্রিম লিডারশিপ বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেন প্রমুখ।
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবে চর্চা হয়েছে ফ্যাসিবাদের। ছবি: পেক্সেলসঅর্থাৎ, যেখানেই উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে উসকে দিয়ে অতীত সমৃদ্ধশালী অবস্থা পুনরায় অর্জনের স্বপ্ন দেখানো নেতা বা আন্দোলনের আবির্ভাব পরিলক্ষিত হয়, সেখানেই ফ্যাসিবাদের আতঙ্কের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি হয়। আমূল সংস্কারের নামে সেখানে আসলে ফ্যাসিবাদকে রাজসিংহাসনে বসানোর কাজ শুরু হয়। তাই যেসব গবেষক মনে করেন যে, দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদেরও সমাপ্তি হয়েছে, তারা আসলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। কারণ, বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্রমাগত ক্ষয়ের এই যুগে ফ্যাসিবাদ ফিরে এসেছে বিচিত্র রূপে। কেবল অন্য দেশে সামরিক আক্রমণ চালাচ্ছে না বলে বা সামরিক আগ্রাসনের দৃশ্যমানতা পরিলক্ষিত না হলেই কাউকে ‘ফ্যাসিবাদী নয়’ বলে প্রশংসাপত্র দেওয়ার দিন শেষ। উল্টো এখন পরিস্থিতি হয়ে পড়েছে আরও জটিল। রাজনৈতিক ও নাগরিক স্বাধীনতা বর্তমানে বিশ্বের নানা অঞ্চলেই ক্রমশ ফিকে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে দেশে ‘পারটিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’–এর উত্থান ঘটছে বলে জোর ধারণা আছে। এই ধারণার প্রবক্তা রবার্ট হিগস। তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ের সিনিয়র ফেলো ছিলেন। এ ছাড়া ইনডিপেনডেন্ট জার্নাল–এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও ছিলেন। তিনি ‘ক্রাইসিস অ্যান্ড লেভিয়াথান’ নামে একটি বই লিখেছিলেন, যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে এবং সংশ্লিষ্ট নানা নিবন্ধে রবার্ট হিগস অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদের বিস্তৃত ধারণা দিয়েছেন। তার কথায়, বিশ্বের অনেক দেশেই এখন এই ঘরানার ফ্যাসিবাদ ডানা মেলছে।
রবার্ট হিগসের মতে, ‘পারটিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’ একটি সুনির্দিষ্ট শব্দবন্ধ। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিমালিকানাকে সীমিত আকারে সমর্থন দিয়ে সার্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করায়ত্ত করা হয়। নানা উপায়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে থাকে নিয়মিত বিরতিতে। বিশেষ করে নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের আয়োজন হয় হইহই রইরই ভঙ্গিতে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এভাবে জনগণের মধ্যে এই ভাব সঞ্চারিত করার চেষ্টা চলে যে, জনগণই আসলে সরকার চালাচ্ছে! কিন্তু ভেতরে ভেতরে পুরো ব্যবস্থাই থাকে ত্রুটিপূর্ণ এবং সেই ব্যবস্থায় ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক আদর্শ যা চায়, তাই শেষ পর্যন্ত হয়। এভাবে জনগণের মধ্যে ‘দেশ নিয়ন্ত্রণ করার’ একটি ভ্রমাত্মক বোধের জন্ম দেওয়া হয়। কারণ এই বোধটি যদি মোড়ক হিসেবেও না থাকে, তবে সরকারকে কর দেবে কে? কারা সরকারি নিষ্পেষণমূলক আইন মেনে চলবে? কারা সাধারণ জনতা হিসেবে নিয়ত অপমানিত হবে? আর এসবের বলির পাঁঠা হিসেবে জনগণকে ব্যবহার করেই এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যেখানে শোষিত হওয়ার পরও বিদ্রোহে শামিল হয় না সাধারণ জনতা। কারণ তাদের যে নিয়ন্ত্রণের রিমোট কন্ট্রোলের মালিক হওয়ার লেবেঞ্চুষ খাওয়ানো হয়! আর এভাবেই তলে তলে চলতে থাকে ফ্যাসিবাদের ইঞ্জিন।
গবেষকদের মতে, বর্তমানের শাসকদের কাছে অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ সবচেয়ে আদরনীয় পন্থা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরিগবেষকদের মতে, বর্তমানের শাসকদের কাছে এই অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ সবচেয়ে আদরনীয় পন্থা। কারণ, এতে সাপও মরে, কিন্তু লাঠিও ভাঙে না। এই ব্যবস্থায় একদিকে সমাজে প্রবল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, অন্যদিকে বিভ্রান্ত জনতাকে বোকাও বানানো যায় এবং ব্যবহারও করা যায়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, বিশ্বের বেশির ভাগ আর্থ–রাজনৈতিক কাঠামোই এখন অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ আত্তীকরণ করছে। কারণ এতে গাছেরটাও খাওয়া যায়, আবার তলারটাও কুড়ানো যায়।
রবার্ট হিগস মনে করেন, সমাজতন্ত্রের তুলনায় ‘পারটিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’–এর দুটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
প্রথমত, সমাজতন্ত্রে উৎপাদনের সকল ব্যবস্থাই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। এর মালিকানা ও কর্মপরিচালন—দুটোই হয় রাষ্ট্রের মাধ্যমে। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদে ব্যক্তিমালিকানাকে স্বল্প পরিসরে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়। মালিকগোষ্ঠীর কতিপয় সদস্য এখানে উদ্ভাবন, উন্নতি এবং পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চাকা ঘোরানোর সুযোগ পান। এই কতিপয় সদস্যকে নিয়েই একটি অভিজাত গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়। সরকার যদিও সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা অব্যাহত রাখে। এ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের মাত্রা বেশি হলে অর্থনৈতিক উন্নতির গতি কমে আসে, আবার কখনো কখনো স্বল্প সময়ের জন্য চটকদার উন্নতিও দেখা যায়। এভাবে অভিজাত মালিকগোষ্ঠীর সহায়তায় ফ্যাসিবাদ তার দেদার অর্থনৈতিক লুণ্ঠনকে বেগবান করে। অবশ্যই এটি ঠিক যে, একেবারে মুক্ত অর্থনীতি যেভাবে বেড়ে উঠতে পারে, ফ্যাসিবাদী অর্থনীতি সেভাবে পারে না। কিন্তু ফ্যাসিবাদের শৃঙ্খলিত অর্থনীতিতে লুণ্ঠনের ও নিয়ন্ত্রণের যে অবাধ সুযোগ রাজনৈতিক নেতারা উপভোগ করতে পারেন, সেটি অন্য যেকোনো ব্যবস্থায় বিরল। আর এই কারণেই ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্ব একটি তুলনায় ধীর গতির উন্নতির শৃঙ্খলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বেছে নিতে চান, যেখানে লুণ্ঠনের সুযোগ অবারিত থাকে। পাশাপাশি মেকি উন্নয়নের যে রঙচঙা মোড়ক দেখা যায়, সেটিতে আপাত মুগ্ধ হওয়া জনতা মনে করতে থাকে, ‘এ তো আমাদেরই অর্জন’! রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় জনতার কিছু মিছে ও পোশাকি অংশগ্রহণে তাদের মনে হতে থাকে, নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তাদেরই হাতে। এভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সমতা লাভের একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়। যদিও শাসক ও তার সমর্থকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাটিকে ভেতরে ভেতরে নানাভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতযুক্ত করে রাখা হয়, কিন্তু একে বাইরে থেকে দেখলে সেটি মনে হয় না। আবার এমন শাসকের শাসনকে স্তালিন বা হিটলার বা মুসোলিনির মতো একনায়কের সঙ্গে বহিরাবরণে মেলানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদে মানুষ বিশ্বাস করে যে, তারা স্বাধীন। অথচ তাদের সেই স্বাধীনতাকে যে দিনকে দিন কত শত কোপে ছিন্ন–বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে নিয়মিত, সেটি তারা অনুধাবনে ব্যর্থ হয় নিদারুণভাবে।
দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থাটির মজা হলো, যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়, যদি গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হয়, তবে ফ্যাসিবাদী সরকার ও এর মদদপুষ্ট অভিজাত মালিকগোষ্ঠী বাজার ব্যবস্থার টিকে থাকা অবশিষ্ট উপাদানগুলোর ওপর নির্দ্বিধায় দোষ চাপিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে সবচেয়ে ধনী গোষ্ঠীর ওপরও অদৃশ্য দোষ চাপানো যায়। সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে যত সমস্যারই উদ্ভব হোক না কেন, বাজার ব্যবস্থার অবশিষ্ট স্বাধীন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর সেই দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়। বড় বড় ব্যাংকার ও শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তাদের এই দোষ দেওয়া হয়। এতে করে ফ্যাসিবাদী শাসকের আর কোনো দোষ থাকে না। সব দোষ চলে যায় অন্যদের কাঁধে, আর পবিত্র থেকে যায় ফ্যাসিবাদী শাসক ও তার অনুগত মালিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। ফলে ‘পারটিসিপেটরি ফ্যাসিজম’ বা ‘অংশগ্রহণমূলক ফ্যাসিবাদ’–এ একটি স্বয়ংক্রিয় ও অতিউত্তম সুরক্ষা না চাইতেই পেয়ে যায় ফ্যাসিবাদী শাসক ও গোষ্ঠী। এমন দায়মুক্তি পাওয়ার উপায় থাকলে সেই ব্যবস্থাকে পছন্দ না করার কি কোনো কারণ আছে?
পাঠক, ঠিক এই প্রসঙ্গে আপনারা কি দেশের কোনো কিছুর মিল পাচ্ছেন? একটু ভাবতে থাকুন। এ নিয়ে আলাপ থাকছে পরের পর্বে।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা