প্রায় এক বছরের পথ চলা শেষ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ধৈর্য ধরে টানা আলোচনা করে জুলাই জাতীয় সনদ দেওয়ায় কমিশনকে অভিনন্দন জানানো উচিত। কিন্তু কথায় বলে, শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। সেই শেষটা কি ভালো করল কমিশন? নাকি আরেকটি সংকটের আহ্বান জানাল?
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসে রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব উদ্যোগ নেয় সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার সম্বলিত জুলাই জাতীয় সনদ গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয়। এই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে কমিশনের কিছু করার কথা ছিল না। সনদেও কিছু লেখা নেই। কিন্তু দলগুলোর অনৈক্যের কারণে কমিশনকে এ কাজে হাত দিতে হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মতভিন্নতার কারণে আলাদাভাবে আলোচনা করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে ঐকমত্য কমিশন তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করে। সেই সুপারিশমালা গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার কাছে সুপারিশমালা তুলে দেওয়া আসলে একটি আনুষ্ঠানিকতা ছিল। কারণ এই কমিশনের সভাপতি খোদ মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবারই তার সভাপতিত্বে কমিশনের শেষ বৈঠক হয়।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সাংবিধানিক আদেশ জারি করে গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। আর বিএনপিসহ কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করছিল।
শেষ পর্যন্ত গণভোটের বিষয়ে ‘ঐকমত্য’ হয়েছে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হলেও সেই গণভোট কবে, কীভাবে হবে তা নিয়ে দলগুলোর মতভিন্নতা ছিল।
জামায়াতসহ কয়েকটি দল ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে আগামী নভেম্বরেই গণভোট চায়। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতেও তারা আন্দোলন করছে। অন্যদিকে এ দুই বিষয়ে প্রবল আপত্তি আছে বিএনপির। নভেম্বরে গণভোটের দাবির মধ্যে ‘অন্য কোনো মাস্টারপ্ল্যান’ আছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন বিএনপি নেতারা।
দলগুলোর এরকম অবস্থানের মধ্যেই ঐকমত্য কমিশন এমন কিছু বিষয় সামনে আনল যা দেখে মনে হতে পারে তাদের সব সন্দেহ আগামী সংসদকে ঘিরে।
কমিশন তার সুপারিশে বলেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একসঙ্গে আইনসভা ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ করবে। বিষয়টি একটু অদ্ভুতই। কারণ, সারা পৃথিবীতে এটা স্বীকৃত যে আইনসভা সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার করবে। নতুন সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি সংবিধান পরিষদ, গণপরিষদ বা এরকম কোনো বডি গঠন করা হয়। ১৯৭২ সালে যেটি করা ছিল, গণপরিষদ গঠন করে। দেশের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করে তার কাজ শেষ করেছিল। এরপর দেশে যতবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে তা সংসদের মাধ্যমেই হয়েছে এবং সেটাই বাঞ্ছনীয়। সংশোধনীগুলো নিয়ে অনেকেরই আপত্তি, পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান ছিল এবং আছে। তবুও যা হওয়ার তা হয়েছে সংসদের মাধ্যমে।
আর এখানটাতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বলল, নির্বাচিত সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে এবং এমপিরা আলাদাভাবে শপথ নেবে। এর থেকে এরকম অর্থ করা যেতেই পারে, নির্বাচিত সংসদকে আগে থেকেই অবিশ্বাসের খাতায় তুলে রেখেছে ঐকমত্য কমিশন। ভাবার দরকার নেই যে, হুট করে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে। এখানে আরও কিছু কথা আছে।
প্রধান উপদেষ্টার কাছে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমালা তুলে দেওয়া আসলে আনুষ্ঠানিকতাঐকমত্য কমিশন তার সুপারিশে বলেছে, ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে কাজ শেষ করতে হবে। যদি করতে না পারে তাহলে জুলাই সনদে যেসব বিষয় আছে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। তার সহ-নেতৃত্বের কমিশন কীভাবে এই বিষয়টি ভাবল তা জানার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এই লেখকের অপরিমেয় কৌতূহল। কিংবা যেসব বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তারা কথা বলেছে, তাদের মতামত জানারও কৌতূহল আছে বটে।
কমিশন, নির্বাচনের দিন কিংবা আগে গণভোট করে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার সুপারিশ করেছে। গণভোট নিয়ে দলগুলোর অবস্থান আমরা জানি। বিএনপি বারবারই বলছে, সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট করতে হবে। আর এনসিপি-জামায়াত বলছে, আগে গণভোট করতে হবে।
গণভোট ছাড়া আর কোনো পথ কেউ দেখাতে পারেনি। এই পথ যৌক্তিক। তবে একটু ‘কিন্তু’ থেকে যায়। বিএনপির দাবি ছিল, তাদের যেসব বিষয়ে আপত্তি ছিল সেগুলি সনদে উল্লেখ থাকতে হবে। স্বাক্ষরিত সনদে ছিলও তাই। কিন্তু কমিশন বাস্তবায়ন আদেশে যেভাবে সামনে আনল তাতে মনে হচ্ছে এনসিপিরও কথাই তারা শুনতে বাধ্য হয়েছে। কিংবা তারা এনসিপির সঙ্গে ‘সহমত ভাই’।
আবার এনসিপি আপত্তির বিষয়গুলো সনদে রাখতে চায়নি। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত দেখে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকা এনসিপির সই শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত করতে চাইছে কমিশন। রাজনীতিতে দর-কষাকষিতে নানা শর্তের খেলা চলে। কিন্তু শর্তকে অলঙ্ঘনীয় বানিয়ে ফেলাটা রাজনৈতিক অপরিপক্বতা। কমিশন অপরিক্কতার দিকে হাঁটল না কি এনসিপি, সে উত্তর সময় দেবে।
এদিকে, কমিশন যেভাবে সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি একটি প্রশ্নের মাধ্যমে জনগণের রায় নিতে চাইছে সেখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে ৪৮টি বিষয় কীভাবে এক প্রশ্নে সমাধান হবে? বিকল্প হিসেবে একটি বিলও ব্যালটের সঙ্গে দিতে বলেছে। আর তাতেও প্রশ্ন ওই একটিই। প্রস্তাবিত ব্যালটে প্রশ্ন হিসেবে থাকবে, “আপনি কি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ইহার তফসিল-১ এ থাকা সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?”
আরেকটি খসড়ায় প্রস্তাবিত ব্যালটে প্রশ্ন হিসেবে থাকবে, “আপনি কি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ইহার তফসিল-১ এ থাকা সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত খসড়া বিলের প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?”
৪৮টি বিষয়, যেগুলো সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সম্পর্কে সেগুলো এরকম একটি প্রশ্নের মাধ্যমে রায় নেওয়া হাস্যকর নয়?
গণভোট নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সংবাদ সম্মেলনে আলী রীয়াজ বলেন, “যখন কেউ আমাকে বলেন যে, জনগণ এটা বুঝবেন না। আমি এটাতে খুব অস্বস্তিবোধ করি, ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব অস্বস্তিবোধ করি।” খুব স্বাভাবিক আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথাই তুলে ধরেছেন আলী রীয়াজ। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। তার রায় সবার ওপরে। কিন্তু যেই জনগণ ভোট দিয়ে একটি সংসদ গঠন করবে সেই সংসদের ওপর কমিশনের এত সন্দেহ কেন? এই কমিশনের সভাপতি একবার বিদেশে গিয়ে এক অনুষ্ঠানে ভোটারদের ওপর আস্থা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “তুমি আমাকে কিছু টাকা দাও, আমি তোমাকে ভোট দেব, এটাই সব, সব ভোটকেই এমন বলা যায়।”
তাহলে কমিশন কী এখানে নিশ্চিত যে, গণভোটে সবাই সংবিধান বুঝে ভোট দেবে। আর যে রায় দেবে সেটা পরের সংসদকে মানতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ওই সংসদই ২৭০ দিন জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা করবে। একমত হতে না পারলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে বসে যাবে!
আজকের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারকারীর নির্দেশনা অনুযায়ী চলে। কখনো কখনো সে নিজে কিছু করে ফেলে। এআই নিয়ে মানুষেরা ভয় ঠিক এখানেই। মানুষ চায় তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। কিন্তু সে যখন নিজে সিদ্ধান্ত নেয় তখন বিপত্তি ঘটে। সংবিধানের স্বয়ংক্রিয় সংস্কারের বিষয়টিও যেন যেন তেমন। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যদি সংবিধান সংস্কার হয়ে যায়, তাহলে পরিষদ গঠনের কাজ কী? বলে দিলেই ভালো হতো এটাই মানতে হবে। একটা অধ্যাদেশ করে দিলেই হয়। গণভোটের দরকারই বা কী আর সেটা সংসদে রেক্টিফাই করা প্রয়োজনই বা কী। সংসদের অনুমোদন যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে দেশের আইনসভাকে বিশ্বাস করতে হবে। আইনসভাকে তার মতো করে কাজ করতে দিতে হবে। তাকে সন্দেহ করার অর্থ জনগণকে সন্দেহ করা।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ অনেক ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। যেগুলো সমাধানে কাজ করার কথা সরকারের কাছ থেকে শোনা গেছে। কিছু হয়ত দেখাও যাচ্ছিল। কিন্তু একদম শেষে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে যেভাবে ইতি টানার চেষ্টা হলো তাতে আশঙ্কা হতেই পারে, ঐকমত্য কমিশন কি নতুন করে অনৈক্যের দ্বার ফের খুলে দিল?
লেখক: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চরচা