Advertisement Banner

সাকিবের ‘ভাগ্য নির্ধারণ’ কবে?

সাকিবের ‘ভাগ্য নির্ধারণ’ কবে?
সাকিব আল হাসান। ছবি: বিসিবি

মাস তিনেক আগেও বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাকিব আল হাসান অধ্যায়ের শেষটা দেখে ফেলেছিলেন অনেকেই। রাজনৈতিক পরিচিত আর হত্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলার কারণে তিনি দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে আছেন জাতীয় দলের বাইরে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আর দেশে ফেরেননি সাকিব।

সরকার পতনের পর ভারত ও পাকিস্তানের মাটিতে দুটি সিরিজ খেলেছিলেন কিছুটা নীরবেই। তবে এরপর তাকে বাংলাদেশ দলের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে। কার্যত সেখানেই দেশের ক্রিকেটে সাকিবের শেষটা দেখে ফেলেছিলেন অনেকেই।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এসেছে কিছুটা পরিবর্তন। আলোচিত হচ্ছে দেশের ক্রিকেটে সাকিবের ফেরার বিষয়টি। জাতীয় দলের জার্সিতে তাকে আবার দেখা যাবে কিনা, সেটি নিয়েও চলছে জোর আলোচনা। কিন্তু সাকিব ফিরলে, সেটা কবে? এ নিয়ে জল্পনা–কল্পনাও আছে। কেউ কেউ মনে করছেন সাকিবের ভাগ্য হয়তো নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগেই নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সাকিবের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত নেতিবাচক কিছু শোনা যায়নি। বরং সরকার গঠনের পর বিএনপির বেশ কয়েকজন সংশ্লিষ্ট নেতা আভাস দিয়েছেন যে তারা সাকিবকে আবার বাংলাদেশ দলে দেখতে চান। সাকিবের মামলাগুলোর ব্যাপারে নমনীয় অবস্থানের বিষয়টিও বলেছেন তারা। যুব ও ক্রীড়াপ্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক কয়েকবারই বলেছেন, সাকিব যদি মামলাগুলোর আইনি জটিলতা নিজেই সুরাহা করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে তার ফেরা নিয়ে কোনো বাধা থাকবে না।

সাকিব–ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাদের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসে মূলত ফেব্রুয়ারিতে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের পর থেকেই। বিসিবি পরিচালক আসিফ আকবর সবার আগে জানান, বোর্ড সাকিবকে আবার দলে ফেরাতে ইচ্ছুক। এরপর তিনি একই কথা বলেছেন কয়েকবারই। একই সময়ে বিসিবির অন্য কয়েকজন কর্তাও ইতিবাচক সুরে কথা বলেছেন সাকিবকে নিয়ে।

মাঠে অনুশীলনের সময় সাকিব। ছবি: বিসিবি
মাঠে অনুশীলনের সময় সাকিব। ছবি: বিসিবি

তবে তারা এ-ও বলেছেন, ফিট থাকলে এবং দেশে ফিরে খেলতে পারবেন—এই নিশ্চয়তা পেলে তবেই সাকিবকে জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা করবেন নির্বাচকেরা। যথারীতি সেখানেও উঠে আসে সাকিবের আইনি জটিলতার বিষয়টি। তবে এবার অবশ্য সাকিবের হয়ে মামলার নথিপত্র সংগ্রহ করে তা যথাযথ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করেছে বিসিবি।

জাতীয় দলের নির্বাচক প্যানেলের সদস্য ও সাবেক পেসার হাসিবুল হোসেন মনে করছেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখনও সাকিব অধ্যায় শেষ হয়ে যায়নি। চরচা-কে তিনি বলেছেন, “নির্বাচক হিসেবে আমাদের কাজ সেরা দল বেঁছে নেওয়া। সাকিব যে মাপের খেলোয়াড়, ফিট থাকলে তাকে আপনি দলে রাখতে চাইবেনই। আমরা শেষ সময় পর্যন্ত দেখব, যদি সাকিবকে বিবেচনা করার সুযোগ থাকে, তাহলে তাকে নিউজিল্যান্ড সিরিজে দেখা যেতেই পারে। তবে এই সিরিজে না খেললেই যে জাতীয় দলে সাকিবের অধ্যায় শেষ, এটা বলা ঠিক হবে না।”

বিশ্বকাপের পরই পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ থাকায় ধারণা করা হচ্ছিল, হয়তো এই সিরিজেই সাকিবকে ফেরাতে পারে বিসিবি। কিন্তু সেটা হয়নি। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম দেশের বাইরে লম্বা ছুটিতে থাকায় এই ব্যাপারে বোর্ডের অন্যরাও সেভাবে সরাসরি কিছু বলতে পারেননি।

সম্প্রতি আসিফ আকবর সাকিবের জন্মদিনের দিন কেক কেটে উদ্‌যাপন করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই উদ্‌যাপনের ভিডিও ছড়িয়েছে। তিনি এক জায়গায় বলেছেন, নিউজিল্যান্ড সিরিজকে সামনে রেখে নাকি প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাকিব।

সম্প্রতি সাকিব যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এক সমর্থকের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “খুব শিগগিরই ফিরব।”

তবে এর মধ্যেই অনিশ্চয়তা ছড়াচ্ছে সাকিবের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো। সে সব মামলার নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। মামলা নিষ্পত্তি না হলে বিসিবি কিংবা সাকিবের ইচ্ছা থাকলেও পুরো বিষয়টিই অনিশ্চিত হয়ে থাকবে।

ক্রিকেটীয় দিক থেকে সাকিবের জন্য কাজটা বেশ কঠিন হতে পারে। বয়স হয়েছে ৩৯, তাই সেরা সময়ের সাকিব যেভাবে ব্যাটে-বলে সার্ভিস দিতেন, সেটা আর পাওয়া যাবে না। ২০২৪ সালের পর থেকে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট বা লিস্ট ‘এ’ ম্যাচও খেলেননি। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এই সময়ে সাকিবের ব্যস্ততা মূলত ১০ বা ২০ ওভারের ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টকে ঘিরেই। ফলে লম্বা বিরতির পর টেস্ট বা ওয়ানডেতে সাকিব কীভাবে মানিয়ে নেবেন, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

মাঠে অনুশীলন শেষে ফিরছেন সাকিব। ছবি: বিসিবি
মাঠে অনুশীলন শেষে ফিরছেন সাকিব। ছবি: বিসিবি

২০২৭ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশ দলের মূল মনোযোগ এখন থেকে থাকবে ওয়ানডের দিকেই। মেহেদি হাসান মিরাজ অধিনায়ক হওয়ায় তিনি অলরাউন্ডার হিসেবে দলে থাকবেন নিশ্চিতভাবেই। অন্যদিকে বিশ্বকাপ আফ্রিকায় হওয়ায় সেখানে পেসাররাই দাপট দেখাবেন। সেদিক থেকে চিন্তা করলে মিরাজ যদি সাত নম্বরে ব্যাট করেন, তাহলে প্রায় প্রতি ম্যাচেই তিনিই হতে পারেন দলের একমাত্র স্পিনার। সে ক্ষেত্রে সাকিবকে ছয় নম্বর পজিশনে খেলানোর সুযোগ থাকলেও বোলার হিসেবে তার কার্যকারিতা দলের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে।

অবশ্য সাকিবকে যদি স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ, যিনি ৪-৫ ওভার বোলিং করতে পারবেন, তাহলে ওয়ানডেতে ছয় নম্বরে অনায়াসেই তিনি জায়গা করে নিতে পারেন। তবে সাকিবকে দলে নেওয়া মানেই এখনও তার কাছ থেকে দলের প্রত্যাশা থাকবে ১০ ওভার বোলিংয়ের। ফলে নিউজিল্যান্ড সিরিজের ঠিক আগমুহূর্তে দেশে ফিরেই সরাসরি ৫০ ওভারের ক্রিকেটে খেলা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

সাকিবের জন্য টেস্টের বাস্তবতা আরও কঠিন। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সাকিবকে দলে না রাখার কারণ হিসেবে তৎকালীন প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন বলেছিলেন, সাকিবকে তারা স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচনা করবেন না। ফলে এই সংস্করণে দলে ফিরতে হলে সাকিবকে আগে নিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি টেস্টে ৪০-৫০ ওভার বোলিংয়ের জন্য যথেষ্ট ফিট আছেন।

সাকিব যে মাপের ক্রিকেটার, তাতে এই বয়সেও এসব চ্যালেঞ্জ উতরে যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে তার। তবে আইনি জটিলতা এমন এক বাস্তবতা, যেখানে সাকিবেরও করার আছে সামান্যই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমনিতেই মামলা-মোকদ্দমার সুরাহা বেশ জটিল প্রক্রিয়া। সেখানে সাকিবের নামে রয়েছে হত্যা মামলাও। ফলে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া দুই সপ্তাহের মধ্যে তার পক্ষে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ খেলা তো দূরের কথা, দেশে ফেরাটাও প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে সেই হস্তক্ষেপটা তরান্বিত হবে কিনা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সম্পর্কিত