ads

টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় ‘ফিমেল জোন’: ডাকসুর ভণ্ডামি নাকি প্রয়োজন?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় ‘ফিমেল জোন’: ডাকসুর ভণ্ডামি নাকি প্রয়োজন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ‘ফিমেল জোন’ চালু নিয়ে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে পক্ষে ও বিপক্ষে জোর বিতর্কে জড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর প্রশ্ন, নারী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের যে দাবি–স্যানিটেশন, ওয়াশরুম ও নিরাপত্তা-সংকট, সেগুলো সমাধানের আগে কেন এই ‘ফিমেল জোন’ চালু করায় অগ্রাধিকার দিল ডাকসু? দীর্ঘদিনের দাবিগুলোর দিকে নজর না দিয়ে ফিমেল জোন চালু করাকে ডাকসুর ‘ভণ্ডামি’ বলছেন তারা।

Advertisement

তবে এর পক্ষেও আছেন অনেক শিক্ষার্থী। তারা মনে করেন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ।

গত বৃহস্পতিবার টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় খাবারের নতুন মেনুর পাশাপাশি ‘ফিমেল জোন’ উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয়ে যায় বিতর্ক।

ওই উদ্যোগটি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের আপত্তি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এই উদ্যোগ নিয়ে নয়। বরং তারা সমালোচনা করছেন ডাকসুর অগ্রাধিকার নির্ধারণ নিয়ে। তাদের মতে, টিএসসির নারী ওয়াশরুমের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিনের অকার্যকারিতা, হ্যান্ডওয়াশের সংকট এবং পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থার অভাবের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর এখনো সমাধান হয়নি। কিন্তু সেসব না করে ডাকসু এই ‘ফিমেল জোন’কে অগ্রাধিকার দেওয়া এক ধরনের ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়।

ফিমেল জোনের সমালোচনায় যা বলছেন শিক্ষার্থীরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচা-কে বলেন, ‘‘আমি মনে করি ডাকসুর এই উদ্যোগ একটি পরিষ্কার ভণ্ডামি। কারণ হলো– আপনি যদি নারী ওয়াশরুম, নারীদের নিরাপত্তার দিকে তাকান, তাহলে সেগুলোই তো ছিল আনুষঙ্গিক অত্যাবশ্যকীয় কাজ! কিন্তু সেদিকে ডাকসুর কোনো নজর নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীদের ওপর কয়েকদিন পরপর ছিনতাই হচ্ছে, সেটা নিয়ে কোনো উদ্যোগ তো আমরা দেখিনি।”

তিনি আরো বলেন, ‘‘টিএসসির ভেতরে নারীদের কোনো নিরাপত্তা নেই। টিএসসির ওয়াশরুমগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় কোনটি অগ্রাধিকার ছিল। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রগতিশীল জায়গায় ফিমেল কর্নার নাম দিয়ে মূলত একটি সংগঠনের মদদপুষ্টদের সবার একটি জায়গা করে দেওয়া হয়েছে বলে আমি মনে করি। যা একটি ভণ্ডামি। এটি কোনো অর্ন্তভুক্তিমূলক কাজ হতেই পারে না!”

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ‘হুমাইরা উপন্যাস’ নামের আইডি থেকে আরেক নারী শিক্ষার্থী লিখেছেন, “একটু স্ট্রাকচারাল কথায় আসি। ফিমেল ইনিশিয়েটিভের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো ছিল মেয়েদের হাইজিন নিয়ে কাজ করা এবং রেস্ট লাউঞ্জের ব্যবস্থা করা। বিগত এক বছরে টিএসসির ওয়াশরুমগুলো স্কিবিডি স্পুকি ওয়াশরুম হয়ে আছে। না আছে কোনো হ্যান্ডওয়াশ, না টিস্যু! ইভেন স্যানিটারি ন্যাপকিন-এর ভেন্ডিং মেশিনটাও অথর্ব।”

আরও লিখেছেন, ‘‘যখনই সমস্যা নিয়ে আমরা কথা বলি, তখনই আপনারা ধরে নেন শিবিরকে পাড়া মারতে চলে আসি। এমন চিন্তাভাবনা ধারণ করলে কোনো হল সংসদ কাজ করত না ডাকসুর সাথে কো-অরডিনেট করে। কলাভবনের দুইটা কমনরুম। মেয়েরা এবং কিছু সন্তানসহ নারী শিক্ষার্থীরাও একটু বিশ্রামের জন্য সেখানে আসে। সেখানে কি বিগত এক বছরে দুইটা এসি প্রতিস্থাপন করা যেত না? ইভেন কোনো ছোট্ট একটা ব্রেস্টফিডিং জোনও নাই। ফিমেল জোন কী জিনিস তা আসলে জানার কোনো ইচ্ছা নাই। তবে এই যে সমস্যাগুলো, এগুলো চাইলেই সমাধানে আনা যেত। তাও দেখেন যা ভালো মনে করেন....!”

আরেক নারী শিক্ষার্থী উর্মি ইয়াহ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘নারী কর্নার নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই, কারণ যদি এতে কিছু নারীরও উপকার হয়, তাহলে তা ভালো। কিন্তু কথা হচ্ছে, এটা ছাড়া কি নারীবন্ধব আর কোনো কাজ ডাকসুর লোকেদের চোখে পড়ে না? নাকি সে বেলায় তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই?

১. ছবিতে দেখা যাচ্ছে উদ্বাস্তুদের যাত্রী ছাউনি, যেটা আবার টাকা ঢেলে টাইলস্ বাঁধানো হয়েছে ইদানিং! আমি নিজে একবার উদ্বাস্তুদের দ্বারা থুথু নিক্ষেপের শিকার হয়েছি এখানে দুপুর বেলায় হেঁটে যাবার সময়। শামসুন নাহার হলের এতগুলা মেয়ে প্রতিদিন এই জায়গা দিয়ে বাধ্য হয়ে যায়, কারণ অন্য পথ নেই ও নির্বাচিত ডাকসু ও প্রশাসনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই!

২. পাশেই আছে আরেকটি নিত্যব্যবহার্য যাত্রী ছাউনি, যা প্রতিদিন শত শত স্টুডেন্ট ব্যবহার করে। অথচ তাতে একটু ভালো বসার ব্যবস্থাও নেই, বৃষ্টির সময় দাঁড়ানোর ব্যবস্থাও নেই, পানি পড়ে!

৩. সেন্ট্রাল লাইব্রেরির ২ ও ৩ তলায় নারীদের আলাদা পড়ার ব্যবস্থা থাকলেও শত শত নারীদের জন্য টয়লেট শুধু ২টি, ৩ তলায় কোনো টয়লেট নেই! লাইনের কথা না-ই বলি!

৪. কলা ভবনে মেয়েদের টয়লেটের কথা কী আর বলব! হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া ব্যবস্থা নেই। ২, ৩ তলার লোকেদের নিচ তলার বা ৪ তলার কমনরুমে যেতে হয় বা ৬ তলায়! টয়লেট পরিষ্কার তো করা হয় না বললেই চলে।

৫. লেকচার থিয়েটার বিল্ডিং-এ কোনো নারী টয়লেট নেই! যা একটা আছে, তাতে সারাদিন তালা দেওয়া থাকে। আর ৪ তলার টয়লেট ব্যবহারযোগ্য না! সেই কলা ভবনে আসা ছাড়া উপায় নেই! এসে আবার লাইন ধরা লাগে টয়লেটের জন্য।

এগুলায় বেলায় কেন নারীবান্ধব পরিবেশের কথা ভাবা হয় না? এগুলার দরকার নেই? ডাকসু ও ছাত্রী সংস্থার নেতা-নেত্রীরা এসব চোখে দেখে না, নাকি জানে না?

ছাত্রীদের আলাদা কর্নারের প্রয়োজন থাকলে এসবের প্রয়োজন নেই?”

স্মোকিং জোনের দাবিও আছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘‘টিএসসিতে নারীদের জন্য যে আলাদা একটি কর্নার তৈরি করা হয়েছে, আমি মনে করি, এটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে তার পাশাপাশি টিএসসিতে একটি স্মোকিং জোনও করা উচিত। এবং কাপলদের নিয়ে বসার জন্যও একটি স্কোপ থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ টিএসসিতে স্মোকিং নিষিদ্ধ, সেখানে ক্লাবিং হয়। তাই এসব বিষয়ও নজর দেয়া উচিত।”

ফিমেল জোনের পক্ষেও আছে শিক্ষার্থীরা

ফিমেল জোনের পক্ষেও আছে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তারাও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ সক্রিয়। তাদের একজন নারী শিক্ষার্থী সায়মা খান ফেসবুকে এক মন্তব্যে লিখেছেন, “যে আপনার সাথে পর্দাই করবে, সে আপনার সাথে আড্ডা দিতে কেন যাবে? ফ্রি মিক্সিং-কে বৈধ ডিক্লেয়ার দিতেছেন? ক্যাম্পাসে কোথায় পর্দা করা মেয়েদের খাওয়ার জায়গা আছে? নাকি তাদের পেটে আসমান থেকে মান্না সালওয়া ঢুকে যায়, তাদের খাওয়া লাগে না! বাইরে থাকা অবস্থায় ক্ষুধা লাগলে খাবার কিনলেও খেতে পারি না। নিকাবের নিচ থেকে কী-ইবা খাওয়া যায়! টিএসসিতে সবাই আড্ডা দিতে যান ভালো কথা। আপনার যে ফ্রেন্ড পর্দা করে না, তারা তো ফিমেইল জোনে গিয়ে খাবে না। যার দরকার তারাই ওখানে খাবে। এত চুলকায় কেন এটা নিয়ে! আপনাকে বা আপনার মেয়ে বন্ধুকে কি কেউ বাধ্য করতেছে ওই জোনে খাওয়ার জন্য? নিজেরা নিজেদের দিকই দেখলেন। ক্যাম্পাসে শত শত মেয়ে আছে যারা ছেলেদের সাথে আড্ডাবাজি করে না, নিজের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে, এদের নিয়ে কী ভাবলেন? নাকি এরা পর্দা করে বলে বাইরে খাইতেও পারবে না? এরকম নষ্ট মন মানসিকতা নিয়ে ভার্সিটিতে আসছেন কেন!”

ডাকসু কী বলছে

অন্য সমস্যা বাদ দিয়ে কেন ‘ফিমেল জোন’ করা হলো, এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ক্যাফেটেরিয়া ও রিডিং রুম সম্পাদক উম্মে সালমা চরচা-কে বলেন, ‘‘আমার কাজের পরিধি অনেক বেশি। কমন রুম নিয়ে আমি কাজ করেছি। সবগুলো কমনরুমে সংস্কার কাজ আমরা চালিয়েছি। হলের রিডিংরুমগুলোতে এসি দিয়েছি। আজকেও আমি এই কাজ করে আসলাম।”

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, ‘‘ডাকসুতে আমি আমার পদে কাজ করছি, কিন্তু এখানে তো প্রায় ১৩ জন সদস্য আছে। আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়াশরুম-কেন্দ্রিক সমস্যা, পানি ও হলের সমস্যা এসব নিয়ে এই সদস্যদের বেশি অংশগ্রহণ করা উচিত। তারাও তো কাজ করতে পারেন।”

তিনি বলেন, ‘‘আসলে আমরা চাই মেয়েদের যা যা দরকার, সবকিছুই এখানে থাকুক। কলাভবন ক্যাফেটেরিয়াতেই কিন্তু মেয়েদের আলাদা করে একটি কক্ষ আছে। সেক্ষেত্রে আমরা চাই, এটাতেও (টিএসসি) মানসম্মত কক্ষ থাকুক।”

টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় ‘ফিমেল জোন’ নিয়ে জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) এজিএস মুহা. মহিউদ্দীন খানকে চরচা একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।

সম্পর্কিত