দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবারের সদস্য সংখ্যা কমানো এবং পরিচালকদের একটানা পদে থাকার মেয়াদ সীমিত করার যে কঠোর প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল, সেখান থেকে সরে আসছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় ‘ব্যাংক-কোম্পানী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় একাধিক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করা মূল খসড়ায় পরিচালকের সংখ্যা ও মেয়াদ কমানোর প্রস্তাব থাকলেও ব্যাংক মালিকদের দাবির প্রেক্ষিতে সেখানে ছাড় দেওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংশোধনীর খসড়াটি পুনর্বিবেচনা করে খুব শিগগিরই অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি চরচাকে বলেন, “ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় পরিবারভিত্তিক কর্তৃত্বের সুযোগ বহাল থাকলে অতীতের মতোই ব্যাংকগুলো আবারও ‘পারিবারিক ব্যাংকে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত।”
অন্যদিকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতারা বলছেন, যেটাই হোক দেশের জন্য, ব্যাংক খাতের জন্য ভালোই হবে।
ব্যাংক পর্ষদে পরিবারতন্ত্র ও মেয়াদের কড়াকড়ি শিথিল
ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে এবং পর্ষদে কোনো একক পরিবার বা গোষ্ঠীর আধিপত্য কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ‘ব্যাংক-কোম্পানী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে অনুষ্ঠিত খসড়া পর্যালোচনা সভায় ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) সহ অন্যান্য অংশীজনের সুপারিশের ভিত্তিতে বেশ কিছু মূল ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ওই পর্যালোচনা সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, খসড়া আইনের ১৫ (১০) ধারায় পরিচালনা পর্ষদে একক পরিবারের প্রতিনিধিত্ব কমানোর যে প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে সরে আসার চিন্তা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের খসড়ায় পর্ষদে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন পরিচালক রাখার কথা বলেছিল। তবে পর্যালোচনায় আগের নিয়ম বহাল রেখে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক রাখার বিষয়টি আবার বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে পর্ষদে পরিচালকদের একটানা দায়িত্ব পালনের মেয়াদেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ১৫ ধারায় পরিচালকের মেয়াদ ছয় বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু এতে অভিজ্ঞ পরিচালনা পর্ষদের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, মালিকপক্ষের এমন যুক্তিতে মেয়াদ ৯ বছর করার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। বিদ্যমান আইনে একটানা ১২ বছর পরিচালক পদে থাকার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছয় বছরের প্রস্তাবের বিপরীতে শেষ পর্যন্ত তা ৯ বছরে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এই পরিবর্তনগুলো কেবল পরিচালকদের সংখ্যা বা মেয়াদের বিষয় নয়, এর সঙ্গে ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর প্রশ্নও জড়িত। একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার যাতে একটি ব্যাংককে নিজেদের সম্পত্তি মনে করতে না পারে, সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতেই মূল খসড়ায় কঠোর বিধান আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।”
আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে দলসমর্থিত ব্যাংক মালিকদের সুবিধা দিতে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে আইন পরিবর্তন করে একই পরিবারের তিন সদস্যের পর্ষদে থাকার এবং একজন পরিচালকের টানা ১২ বছর পদে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক তখনও এ ধরনের সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিল না।”
সাবেক এই গভর্নরের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো শিথিল হলে অতীতের সেই কাঠামোই নতুন করে ফিরে আসতে পারে। তিনি বলেন, “আগে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করেছে, ভবিষ্যতে বিএনপি-সমর্থিত ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করলে একই ধরনের সমস্যা থেকে যাবে। এতে ব্যাংকগুলো আবারও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।”
ঋণ সমন্বয় ও পারিবারিক কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক
ব্যাংক পরিচালকদের ঋণ ও অগ্রিম সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শিথিলতা বন্ধের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। খসড়া আইনের ১৭(৫) ধারায় ব্যাংক পরিচালকদের নেওয়া অগ্রিম বা ঋণ সমন্বয়ের জন্য যে কঠোর বিধান আনা হয়েছিল, তা আরও পর্যালোচনা করে সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সভা।
ব্যাংক মালিকানা ও পরিচালনায় একই পরিবার বা গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো একটি পরিবার পর্ষদে অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠলে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ, পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, “ব্যাংককে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে পরিচালনার সুযোগ বন্ধ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হবে। ব্যাংকের মালিকানা থাকলেও একজন মালিক বা পরিবার যেন পুরো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে না পারে, সেটিই আইন সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।”
কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ বৃদ্ধি
ব্যাংক-কোম্পানি আইনের সংশোধনীতে পর্ষদের ভেতরের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বহিরাগত ও কৌশলগত অর্থায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। নথির তথ্য অনুযায়ী, ১৪ ধারায় কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ধারণ বা বিনিয়োগের সীমা শিথিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ‘সরকারের অনুমোদনক্রমে’ শর্তটি যুক্ত করার পরিকল্পনা চলছে।
ব্যাংকিং খাতের মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে দেশি-বিদেশি বড় প্রাতিষ্ঠানিক ও কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার স্বার্থেই এই নমনীয়তা আনা হচ্ছে। এতে মূলধন সংকট মোকাবিলায় সুবিধা হতে পারে। তবে সরকারি অনুমোদন বাধ্যতামূলক রাখার ফলে এ ধরনের বিনিয়োগ কতটা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
খসড়া আইন পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, “ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণে এই বিভাগের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার আলোচনা একাধিকবার হয়েছে এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বিভাগটি বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। ব্যাংক খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আইন পরিবর্তন করলেই সুশাসন নিশ্চিত হবে না।”
অন্য আইনি জটিলতা নিরসন ও চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়া
খসড়া পর্যালোচনায় শুধু পরিবারভিত্তিক প্রতিনিধিত্বই নয়, আইনের বেশ কিছু কৌশলগত ও কারিগরি দিকও সংশোধন করা হচ্ছে। আইনের ২ ধারায় প্রস্তাবিত ‘আইনের প্রাধান্য’ সংক্রান্ত বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে অন্যান্য কোম্পানি বা আর্থিক আইনের সঙ্গে ব্যাংক আইনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
এছাড়া, ৩৩৯ ধারায় উল্লেখিত ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) প্রস্তাব এবং ৪৭ ধারার সংশোধনীগুলোও পুনরায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর অডিট ও আর্থিক বিবরণীতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কাঠামো কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিও সংশোধিত খসড়ায় স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং ও বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতে সংশোধনীর চূড়ান্ত খসড়া তৈরি করবে। নতুন খসড়াটি দ্রুতই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হবে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও মন্ত্রিসভার অনুমোদন শেষে তা সংসদে উত্থাপনের প্রক্রিয়ায় যাবে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও পূবালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান চরচাকে বলেন, “প্রথমে একটি খসড়া সংশোধন করা হয়েছে। এরপর তা স্টেকহোল্ডারদের (সংশ্লিষ্ট পক্ষ) সাথে আলোচনা করতে হয়। স্টেকহোল্ডারদের সাথে এখনো সেই আলোচনা চলছে, তা শেষ হয়নি। এই আলোচনা শেষ হওয়ার পর সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) এটি ক্যাবিনেটে (মন্ত্রিসভা) পাঠাবে। ক্যাবিনেটে পাস হলে তা পার্লামেন্টে যাবে। এরপর পার্লামেন্ট আবার এটি পার্লামেন্টারি কমিটি অন ফাইন্যান্সের কাছে পাঠাবে এবং তারা তা পুনরায় যাচাই-বাছাই করবে। এরপর পূর্ণাঙ্গ পার্লামেন্টে গিয়ে এটি পাস হবে।”
‘যেটাই হোক সেটা অবশ্যই ভালো হবে’ উল্লেখ করে মনজুরুর রহমান বলেন, “দেশের স্বার্থে ব্যাংকিং খাতের আইন ভালোই হবে। ব্যাংক খাতের জন্য সরকার সবসময় বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত বা আইন প্রণয়ন করবে।”
তবে ব্যাংক খাতের সংস্কারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, মূল খসড়ার কঠোর বিধানগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা বহাল থাকবে। এক পরিবারের পরিচালকের সংখ্যা তিনজনে রাখা এবং পরিচালকের একটানা মেয়াদ ছয় বছরের পরিবর্তে ৯ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাবিত সংস্কারের বড় একটি অংশই শিথিল হয়ে যাবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবারভিত্তিক আধিপত্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালকদের প্রভাব কমানো না গেলে ঋণ বিতরণ, সুশাসন ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। রাজনৈতিক বা ব্যবসায়ীক আনুগত্যের ভিত্তিতে মালিকানা ও পর্ষদ নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি বদলানো না গেলে শুধু মালিকের পরিচয় বদলাবে, ব্যাংক পরিচালনার পুরনো কাঠামোই থেকে যাবে।