ঢাকা-১৪: ত্রিভুজ লড়াইয়ে ‘সহানুভূতি’ খেলা

ঢাকা-১৪: ত্রিভুজ লড়াইয়ে ‘সহানুভূতি’ খেলা
সানজিদা ইসলাম (তুলি) ও আবু বকর সিদ্দিক সাজুর পোস্টার। ছবি: চরচা

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একজন নিজেই গুমের শিকার হয়েছিলেন। আরেকজনের ভাই; যার খোঁজ এখনো মেলেনি। ঢাকা-১৪ নির্বাচনী আসনে ভোটের আলোচনায় তাই ‘গুম’ বেশ আলোচিত বিষয়। এলাকার মানুষজন বলছেন, এই আসনে সহানুভূতির পাল্লা যার দিকে ঝুঁকবে, তিনি জয়ী হবেন।

মিরপুর, শাহ আলী ও দারুসসালাম এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসনে এবার ১২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর দিন থেকে প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। নিজেদের এলাকার সমস্যা সমাধানসহ নানা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। এক ডজন প্রার্থী থাকলেও তাদের মধ্য থেকে তিনজনের একটা ত্রিভুজ লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আর এ লড়াইয়ের মূলে রয়েছে সহানুভূতির গল্প।

ত্রিভুজ লড়াইয়ের তিন প্রার্থী হলেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম (তুলি)। তিনি গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সংগঠক। তার ভাই বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন।

একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী গুমের শিকার মীর আহমাদ বিন কাসেম, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামেই বেশি পরিচিত। আরমানের বাবা মীর কাসেম আলী ছিলেন জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রথম সভাপতি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আদালতের রায়ে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।

অন্যদিকে এই লড়াইয়ে কিছুটা রোমাঞ্চ যোগ করেছেন বিএনপির স্থানীয় আরেক মনোনয়ন বঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থী দারুসসালাম থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক সাজু।
মাঠের হিসাবের ফলাফল ভোটের পর পাওয়া গেলেও কাগজে-কলমে বোঝা যাচ্ছে সহানুভূতি একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।

এই আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু ইউসুফ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) রিয়াজ উদ্দিন, গণফোরামের মো. জসিম উদ্দিন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির মো. সোহেল রানা, এবি পার্টির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির নুরুল আমিন, জাতীয় পার্টির মো. হেলাল উদ্দীন, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. ওসমান আলী।
আসনটি ঢাকা জেলার সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন, বনগাঁও ইউনিয়ন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৩২ হাজার ৬৬, নারী দুই লাখ ২৩ হাজার সাত ও হিজড়া চারজন।

আজ মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর-১, ২, চিড়িয়াখানা রোড, শাহ আলী বাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার ব্যানার বেশি দেখা গেছে। এ ছাড়া মাঝেমধ্যেই বিদ্রোহী প্রার্থী সাজুর ফুটবল মার্কার ব্যানার দেখা গেছে। তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসালামী মনোনীত দুই প্রার্থীর নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়–এমন রঙিন পোস্টার ও ব্যানারও দেখা গেছে।

চিড়িয়াখানা রোডের দোকানি জিয়া হাসান বলেন, “এবার ভোটের আমেজ ভালোই। এই আসনের প্রার্থীরাও ভালো। ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার নেতাকর্মীদের নিয়মিত রাস্তা দিয়ে যাইতে দেখি। এ ছাড়া হাতপাখা ও ফুটবলের লোকজনকেও দেখি।”

মিরপুর-১ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা রাজু ইসলাম বলেন, “এবার ভোটে এই আসনে সবেচেয় ভালো প্রচার-প্রচারণা দেখতেছি। কারো মধ্যে সেভাবে ঝামেলাপূর্ণ মনোভাব দেখছি না। আশা করি কোনো ঝামেলা ছাড়াই এবার এই এলাকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেমের পোস্টার। ছবি: চরচা
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেমের পোস্টার। ছবি: চরচা

যেভাবে চলছে ত্রিভুজ লড়াই
এলাকার ভোটাররা জানিয়েছে, জামায়াতের আরমান এবং বিএনপির তুলিকে মনোনয়ন দেওয়াকে দল দুটির ‘সুচিন্তিত’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে তারা। কারণ, তারা দুজনেই গুমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী। এই আসনে সহানুভূতি ও আবেগের বিষয়কে কাজে লাগিয়ে জয়লাভ করতেই বিএনপির স্থানীয় নেতা আবু বকর সিদ্দিক সাজুকে মনোনয়ন বঞ্চিত করেছে দলটি।

ভোটের মাঠে আরমান শুধু জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং গুম হয়ে ফিরে আসার একটি মানবিক গল্পের চরিত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। বিগত সরকারের সময়ে ‘অন্যায় ও জুলুমের’ শিকার হওয়ায় সহানুভূতিও পাচ্ছেন তিনি।

প্রায় একই অবস্থা বিএনপি প্রার্থী তুলির। যিনি প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক পরিচিয়ের বাইরে গিয়ে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে করা সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সংগঠক হিসেবে বেশি আলোচিত। তার ভাই গুমের শিকার হয়ে এখনো ফেরেননি।

এ ছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাজু স্থানীয় হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন। তাকে ওই এলাকার অনেক স্থানীয় বাসিন্দা যোগ্য প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। ফলে বিএনপির ভোট ব্যাংকের একটা অংশ এই বিদ্রোহী প্রার্থীর দিকে যেতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। ‘মনোনয়ন বঞ্চিত’ হওয়ার সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে একটা বড় অংশের ভোট পেতে পারেন তিনি।

বিএনপির এই দুই প্রার্থীর লড়াই যত বেশি হবে, তত বেশি লাভবান হবেন জামায়াতের প্রার্থী। তবে যার সহানুভূতির অংশ যত ভারী হবে, তিনিই শেষ হাসি হাসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত রোববার বিকেলে শাহ আলী বাগ এলাকার চা দোকানি মঞ্জিল মিয়া বলেন, “এই আসনের সব প্রার্থীই ভালা। এখানে সাজু ভাইয়ের কার্ড পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাইছে তুলি আপা। উনি ভালা মানুষ হিসেবে হুনতেছি। এ ছাড়া জামায়াতের প্রার্থীও ভালা মানুষ।”

মিরপুর ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য আনিসুল হক বলেন, “এই আসনে যোগ্য মানুষ হিসেবে তুলি আপা মনোনয়ন পেয়েছে। উনি সংগঠক হিসেবে যেমন ভালো, মানুষ হিসেবেও চমৎকার। আমরা দল ও প্রার্থীর পক্ষে নিয়মিত প্রচার করছি। ওয়ার্ডের সব জায়গার মানুষ খুবই ভালো সাড়া দিচ্ছে। আশা করি আমরা জয়ী হব।”

মিরপুর-১ এলাকার ৩০ বছরের স্থায়ী বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, “এই আসনে এবার নির্বাচনী আমেজ খুবই ভালো। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা নিজেদের মতো প্রচার চালাচ্ছেন। তবে মূল লড়াই হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে। কারণ এই আসনে বড় দুই দলের প্রার্থী গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবার। ফলে অতীতের জুলুম ও নির্যাতনের শিকারের সহানুভূতি যে প্রার্থী বেশি পাবেন, তিনিই আসলে জয়ী হবেন।”

শাহ আলীবাগ এলাকার জামায়াত কর্মী মো. হাকিম বলেন, “আমাদের ভাই আরমান কী পরিমাণ নির্যাতন ও জুলুমের শিকার হয়েছেন, এটা দেশবাসী জানেন। উনি নির্যাতিত মানুষ তাই এলাকার সাধারণ মানুষদের দুঃখ-কষ্ট সবচেয়ে ভালো বুঝবেন। আমরা ফজরের নামাজ থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে ছুটছি। সবাই আরমান ভাইয়ের ব্যাপারে ভালো সাড়া দিচ্ছেন। ইনশাআল্লাহ আমাদের বিজয় হবে।”

নাগরিক সমস্যা ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপট
মিরপুর থেকে সাভার পর্যন্ত বিশাল এলাকার ভোটারদের মধ্যে রয়েছে মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, ভাড়াটে ও স্থায়ী বাসিন্দা। এলাকাজুড়ে ছোট-বড় গার্মেন্টসের বর্জ্য সমস্যা, গ্যাস সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাসহ কিশোর গ্যাংয়ের দাপট রয়েছে। তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থীরা নাগরিক সমস্যা ও সংকট মোকাবিলায় নিয়মিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন।

মিরপুর-১ বাস স্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা সিদ্দিক হোসেন বলেন, “এলাকায় বর্তমানে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। আমরা দীর্ঘ দিন এই এলাকায় ব্যবসা করি। খুব বড় সমস্যা নেই। তবে কিছু ছোট ছেলে মাঝে মাঝে ঝামেলা করে। অবশ্যই বড় কেউ তাদের সাহস না দিলে এসব করতে পারত না।” এসব বিষয়ের সমাধান চান তিনি।

গার্মেন্টসের চাকরিজীবী মনির আলী বলেন, “আমি এই এলাকায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে থাকি। কিন্তু এলাকার বর্জ্য পরিষ্কার, রাস্তা সংস্কারসহ ছোট ছোট কিছু কাজ অনেক দিন হয় না। এসব হলেই সাধারণ নাগরিকরা সুফল পাবে।”

সম্পর্কিত