চরচা ডেস্ক

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত এটি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছে। গত ৭ মে ফরেন পলিসি সাময়িকীতে প্রকাশিত সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ ডাস এবং ড্যান্ডেলিয়ন ওয়ার্কসের গবেষণা প্রধান জুরি লিনেটস্কির এক নিবন্ধে এমনটাই মন্তব্য করেছেন।
২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসের লনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইসরায়েল, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সই করার অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, তখন তিনি একে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্যের উদয়’ হয়েছে বলে ঘোষণা করেছিলেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ডেনিস রস থেকে শুরু করে জো বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন পর্যন্ত সকলেই এই চুক্তিকে আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। ব্লিংকেন ২০২২ সালের নেগেভ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে, এই চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মানুষের জীবনকে আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করবে।
তবে ম্যাথিউ ডাস ও জুরি লিনেটস্কি তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, এই দাবিগুলো ছিল নিছক কল্পনাপ্রসূত। তাদের মতে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে তথাকথিত ‘আউটসাইড-ইন’ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়েছে। এটি কেবল শান্তি আনতেই ব্যর্থ হয়নি, বরং ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যা চালানো এবং ইরানের বিরুদ্ধে একটি বেপরোয়া যুদ্ধ শুরু করার রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।
নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের গোপন লক্ষ্য ছিল ইরানকে মোকাবিলা করা। ২০২১ সালে মার্কিন কংগ্রেসের ‘ইসরায়েল রিলেশনস নরমালাইজেশন অ্যাক্ট’ এবং ২০২২ সালে ‘ডিফেন্স অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে এই লক্ষ্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইসরায়েলকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) আওতাভুক্ত করা হয়, যা আগে ইউরোপীয় কমান্ডের অধীনে ছিল। এই পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েল, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীগুলো একই কমান্ডের অধীনে কাজ করার সুযোগ পায়, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
এই নতুন কৌশল কেবল ইসরায়েলের সুরক্ষাই নিশ্চিত করেনি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার শক্তি জুগিয়েছে। বাণিজ্যিক দিক থেকেও এই চুক্তির সুফল ছিল মূলত সমরাস্ত্র বিক্রিতে। ২০২১ সালে ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানি ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যার একটি বড় অংশ ছিল আব্রাহাম অ্যাকর্ডসভুক্ত দেশগুলো। ২০২৪ সাল নাগাদ ইসরায়েলের মোট অস্ত্র বিক্রির ১২ শতাংশই ছিল এই দেশগুলোর কাছে, যার মূল্য ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।

লবিট সিস্টেমের মতো ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো আমিরাতের বিমান বাহিনীকে এভিয়নিক্স সরবরাহ করার চুক্তি পায় এবং দুই দেশ মিলে ড্রোন ও সাইবার নজরদারি প্রযুক্তিতে সহযোগিতা শুরু করে। এমনকি ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপে আমিরাতি অর্থায়নে নির্মিত সামরিক কেন্দ্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু হওয়ার তথ্যও নিবন্ধটিতে উঠে এসেছে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো ২০২০ সালে মধ্যপ্রাচ্যে স্বাক্ষরিত একগুচ্ছ কূটনৈতিক চুক্তি, যার মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এই চুক্তিগুলো হয়। ‘আব্রাহাম’ নামটি নেওয়া হয়েছে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান– তিন ধর্মেরই গুরুত্বপূর্ণ নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নাম থেকে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, তিন ধর্মের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক একটি যৌথ ভিত্তি আছে।
এই চুক্তিতে যুক্ত হয়ে ২০২০ সালে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। পরে যুক্ত হয় সুদান ও মরক্কো। চুক্তির মূল বিষয়গুলো ছিল আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। পরস্পরের দেশে দূতাবাস খোলা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ এবং সরকারি সফর শুরু করা। ২. বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যবসা, প্রযুক্তি, পর্যটন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্রুত বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। ৩. ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এই চুক্তির বড় চালিকাশক্তি ছিল। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ে। ৪. সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। বহু আরব নাগরিক প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ইসরায়েল সফর শুরু করেন।
নিবন্ধটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দামেস্কে ইরানি জেনারেলের হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরানি দূতাবাসে বোমা হামলার ঘটনায় যে রকেট ও ড্রোন যুদ্ধ শুরু হয়, তাতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। ইরান যখন পাল্টা আক্রমণ করে, তখন সৌদি আরব এবং আমিরাত ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য ও রাডার ট্র্যাকিং দিয়ে সরাসরি সহায়তা করেছিল।
বাইডেন প্রশাসন এই সংঘাতের মধ্যেও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে সমর্থন দিয়ে গেছেন, যা প্রকারান্তরে ট্রাম্পের আসন্ন যুদ্ধকে আরও সহজতর করে তুলেছে। কিন্তু লেখকেরা প্রশ্ন তুলেছেন–এই নিরাপত্তা সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত কী বয়ে এনেছে? উত্তরটি হলো: মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি নয়, বরং আরও বিশৃঙ্খলা। চুক্তির ছয় বছর পর বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি অশান্ত।
ইসরায়েল এখন লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে, দক্ষিণ লেবাননে দখলদারিত্ব কায়েম করছে এবং গাজায় মানবিক সাহায্য বন্ধ করে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের দাবিয়ে রাখা এবং স্বৈরশাসকদের সঙ্গে জোট বেঁধে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে ভ্রান্ত ধারণা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভিত্তি ছিল, তা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইসরায়েল এখন এই অঞ্চলের এক অস্থিতিশীল আধিপত্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার কর্মকাণ্ড কেবল তার প্রতিবেশীদের জন্যই নয়, বরং মার্কিন স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিবন্ধের শেষ পর্যায়ে প্রাক্তন ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইরানের শাসনের পরিবর্তন হলেও সমস্যার সমাধান হবে না যতক্ষণ না ফিলিস্তিন ইস্যুটির ফয়সালা হচ্ছে। ডাস ও লিনেটস্কি মনে করেন, অস্ত্র বিক্রি ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কোনো শান্তি পরিকল্পনা সফল হতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এই চুক্তির পিছু ছাড়বে না, কিন্তু ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনগুলোর বোঝা উচিত যে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধির কোনো বাস্তবসম্মত পথ নয়। ফরেন পলিসির এই বিস্তারিত বিশ্লেষণটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সংঘাতের মূল কারণগুলোকে পাশ কাটিয়ে সামরিক জোট গঠন করলে তা কেবল নতুন ধ্বংসযজ্ঞের পথই তৈরি করে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত এটি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছে। গত ৭ মে ফরেন পলিসি সাময়িকীতে প্রকাশিত সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ ডাস এবং ড্যান্ডেলিয়ন ওয়ার্কসের গবেষণা প্রধান জুরি লিনেটস্কির এক নিবন্ধে এমনটাই মন্তব্য করেছেন।
২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসের লনে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইসরায়েল, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সই করার অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, তখন তিনি একে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্যের উদয়’ হয়েছে বলে ঘোষণা করেছিলেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ডেনিস রস থেকে শুরু করে জো বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন পর্যন্ত সকলেই এই চুক্তিকে আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। ব্লিংকেন ২০২২ সালের নেগেভ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে, এই চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মানুষের জীবনকে আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ করবে।
তবে ম্যাথিউ ডাস ও জুরি লিনেটস্কি তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, এই দাবিগুলো ছিল নিছক কল্পনাপ্রসূত। তাদের মতে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে তথাকথিত ‘আউটসাইড-ইন’ পদ্ধতি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়েছে। এটি কেবল শান্তি আনতেই ব্যর্থ হয়নি, বরং ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যা চালানো এবং ইরানের বিরুদ্ধে একটি বেপরোয়া যুদ্ধ শুরু করার রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।
নিবন্ধটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের গোপন লক্ষ্য ছিল ইরানকে মোকাবিলা করা। ২০২১ সালে মার্কিন কংগ্রেসের ‘ইসরায়েল রিলেশনস নরমালাইজেশন অ্যাক্ট’ এবং ২০২২ সালে ‘ডিফেন্স অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে এই লক্ষ্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইসরায়েলকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) আওতাভুক্ত করা হয়, যা আগে ইউরোপীয় কমান্ডের অধীনে ছিল। এই পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েল, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীগুলো একই কমান্ডের অধীনে কাজ করার সুযোগ পায়, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
এই নতুন কৌশল কেবল ইসরায়েলের সুরক্ষাই নিশ্চিত করেনি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনার শক্তি জুগিয়েছে। বাণিজ্যিক দিক থেকেও এই চুক্তির সুফল ছিল মূলত সমরাস্ত্র বিক্রিতে। ২০২১ সালে ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানি ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যার একটি বড় অংশ ছিল আব্রাহাম অ্যাকর্ডসভুক্ত দেশগুলো। ২০২৪ সাল নাগাদ ইসরায়েলের মোট অস্ত্র বিক্রির ১২ শতাংশই ছিল এই দেশগুলোর কাছে, যার মূল্য ছিল প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।

লবিট সিস্টেমের মতো ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো আমিরাতের বিমান বাহিনীকে এভিয়নিক্স সরবরাহ করার চুক্তি পায় এবং দুই দেশ মিলে ড্রোন ও সাইবার নজরদারি প্রযুক্তিতে সহযোগিতা শুরু করে। এমনকি ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপে আমিরাতি অর্থায়নে নির্মিত সামরিক কেন্দ্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু হওয়ার তথ্যও নিবন্ধটিতে উঠে এসেছে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো ২০২০ সালে মধ্যপ্রাচ্যে স্বাক্ষরিত একগুচ্ছ কূটনৈতিক চুক্তি, যার মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এই চুক্তিগুলো হয়। ‘আব্রাহাম’ নামটি নেওয়া হয়েছে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান– তিন ধর্মেরই গুরুত্বপূর্ণ নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নাম থেকে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, তিন ধর্মের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক একটি যৌথ ভিত্তি আছে।
এই চুক্তিতে যুক্ত হয়ে ২০২০ সালে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। পরে যুক্ত হয় সুদান ও মরক্কো। চুক্তির মূল বিষয়গুলো ছিল আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। পরস্পরের দেশে দূতাবাস খোলা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ এবং সরকারি সফর শুরু করা। ২. বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যবসা, প্রযুক্তি, পর্যটন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্রুত বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। ৩. ইরানকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এই চুক্তির বড় চালিকাশক্তি ছিল। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ে। ৪. সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। বহু আরব নাগরিক প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ইসরায়েল সফর শুরু করেন।
নিবন্ধটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দামেস্কে ইরানি জেনারেলের হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরানি দূতাবাসে বোমা হামলার ঘটনায় যে রকেট ও ড্রোন যুদ্ধ শুরু হয়, তাতে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। ইরান যখন পাল্টা আক্রমণ করে, তখন সৌদি আরব এবং আমিরাত ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য ও রাডার ট্র্যাকিং দিয়ে সরাসরি সহায়তা করেছিল।
বাইডেন প্রশাসন এই সংঘাতের মধ্যেও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে সমর্থন দিয়ে গেছেন, যা প্রকারান্তরে ট্রাম্পের আসন্ন যুদ্ধকে আরও সহজতর করে তুলেছে। কিন্তু লেখকেরা প্রশ্ন তুলেছেন–এই নিরাপত্তা সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত কী বয়ে এনেছে? উত্তরটি হলো: মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি নয়, বরং আরও বিশৃঙ্খলা। চুক্তির ছয় বছর পর বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি অশান্ত।
ইসরায়েল এখন লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করছে, দক্ষিণ লেবাননে দখলদারিত্ব কায়েম করছে এবং গাজায় মানবিক সাহায্য বন্ধ করে দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের দাবিয়ে রাখা এবং স্বৈরশাসকদের সঙ্গে জোট বেঁধে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে ভ্রান্ত ধারণা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভিত্তি ছিল, তা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। ইসরায়েল এখন এই অঞ্চলের এক অস্থিতিশীল আধিপত্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার কর্মকাণ্ড কেবল তার প্রতিবেশীদের জন্যই নয়, বরং মার্কিন স্বার্থ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিবন্ধের শেষ পর্যায়ে প্রাক্তন ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইরানের শাসনের পরিবর্তন হলেও সমস্যার সমাধান হবে না যতক্ষণ না ফিলিস্তিন ইস্যুটির ফয়সালা হচ্ছে। ডাস ও লিনেটস্কি মনে করেন, অস্ত্র বিক্রি ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কোনো শান্তি পরিকল্পনা সফল হতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এই চুক্তির পিছু ছাড়বে না, কিন্তু ভবিষ্যতের মার্কিন প্রশাসনগুলোর বোঝা উচিত যে, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধির কোনো বাস্তবসম্মত পথ নয়। ফরেন পলিসির এই বিস্তারিত বিশ্লেষণটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সংঘাতের মূল কারণগুলোকে পাশ কাটিয়ে সামরিক জোট গঠন করলে তা কেবল নতুন ধ্বংসযজ্ঞের পথই তৈরি করে।