প্রবীন সাহানি

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতীক অনেক সময় নীতির চেয়েও শক্তিশালী বার্তা বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম পরিবর্তন করে আবার ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ করা এমনই একটি ঘটনা। কাগজে-কলমে সামরিক দায়িত্বের ক্ষেত্র অপরিবর্তিত থাকলেও এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
২০১৮ সালে যখন ‘প্যাসিফিক কমান্ড’-এর সঙ্গে ‘ইন্দো’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল, তখন সেটিকে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল চীনের উত্থান মোকাবিলায় ভারতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ করা। ভারতও সেই কৌশলকে স্বাগত জানিয়েছিল। বিশেষ করে মোদি সরকারের আমলে ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার নিরাপত্তা অগ্রাধিকারকে আরও সংকুচিত ও নির্দিষ্ট করেছে। তাদের প্রধান মনোযোগ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, তাইওয়ান প্রণালি, দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরকে ঘিরে। অর্থাৎ ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে যে বৃহৎ কৌশলগত কাঠামোর কথা বলা হয়েছিল, তার গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে এসেছে।
এই পরিবর্তন ভারতের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করছে। গত কয়েক বছরে দিল্লি তার পররাষ্ট্রনীতির বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছিল। কোয়াড, মালাবার নৌ-মহড়া এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই নীতিরই অংশ। কিন্তু যদি ওয়াশিংটন নিজেই ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমিয়ে আনে, তাহলে ভারতের সেই কৌশলগত বিনিয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন তার আনুষ্ঠানিক সামরিক মিত্রদের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইন তাদের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নেই। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি ক্রমশ বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অস্ত্র ক্রয়ের দিকে সরে যাচ্ছে।
এখানেই ভারতের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে এসেছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, উচ্চ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে মার্কিন নির্ভরতা যত বাড়ছে, সেই স্বায়ত্তশাসন ততই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সহযোগিতা ও নির্ভরতার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সেই ভারসাম্য রক্ষা করা এখন ভারতের জন্য একটি বড় নীতিগত পরীক্ষা।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সার্ক কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পর ভারত বিমসটেককে বিকল্প হিসেবে সামনে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সে কি দক্ষিণ এশিয়ায় তার ঐতিহ্যগত নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে? কারণ কোনো দেশ বৈশ্বিক শক্তি হওয়ার আগে সাধারণত নিজের প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে। যদি সেই ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকে, তাহলে বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে এটাও সত্য যে ভারতের অবস্থানকে একমাত্র ব্যর্থতার গল্প হিসেবে দেখা যাবে না। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে দেশটি এখনো বৈশ্বিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্রিকস, জি-২০, কোয়াড এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো ভিন্নধর্মী প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে সক্রিয় থাকার সক্ষমতা ভারতের কূটনৈতিক নমনীয়তারই প্রমাণ।
তবু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ একটি বাস্তব শিক্ষা সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই; আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। যে কারণে একটি দেশের কৌশল যদি অতিমাত্রায় অন্য কোনো শক্তির নীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই নীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো কৌশলও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ থেকে ‘প্যাসিফিক’-এ প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি নাম পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তি-সমীকরণের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি ভারতের জন্যও একটি সতর্কবার্তা–বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আগে নিজের আঞ্চলিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
লেখক: ভারতের একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ।
(এই লেখাটি লেখকের ইউটিউব ভিডিও চ্যানেলের প্রচারিত ভিডিও বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হলো।)

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতীক অনেক সময় নীতির চেয়েও শক্তিশালী বার্তা বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম পরিবর্তন করে আবার ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ করা এমনই একটি ঘটনা। কাগজে-কলমে সামরিক দায়িত্বের ক্ষেত্র অপরিবর্তিত থাকলেও এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
২০১৮ সালে যখন ‘প্যাসিফিক কমান্ড’-এর সঙ্গে ‘ইন্দো’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল, তখন সেটিকে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল চীনের উত্থান মোকাবিলায় ভারতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ করা। ভারতও সেই কৌশলকে স্বাগত জানিয়েছিল। বিশেষ করে মোদি সরকারের আমলে ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তার নিরাপত্তা অগ্রাধিকারকে আরও সংকুচিত ও নির্দিষ্ট করেছে। তাদের প্রধান মনোযোগ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, তাইওয়ান প্রণালি, দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব চীন সাগরকে ঘিরে। অর্থাৎ ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে যে বৃহৎ কৌশলগত কাঠামোর কথা বলা হয়েছিল, তার গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে এসেছে।
এই পরিবর্তন ভারতের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করছে। গত কয়েক বছরে দিল্লি তার পররাষ্ট্রনীতির বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছিল। কোয়াড, মালাবার নৌ-মহড়া এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই নীতিরই অংশ। কিন্তু যদি ওয়াশিংটন নিজেই ইন্দো-প্যাসিফিক ধারণার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমিয়ে আনে, তাহলে ভারতের সেই কৌশলগত বিনিয়োগ কতটা ফলপ্রসূ হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন তার আনুষ্ঠানিক সামরিক মিত্রদের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইন তাদের নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ভারত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নেই। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তব ভিত্তি ক্রমশ বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও অস্ত্র ক্রয়ের দিকে সরে যাচ্ছে।
এখানেই ভারতের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে এসেছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, উচ্চ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে মার্কিন নির্ভরতা যত বাড়ছে, সেই স্বায়ত্তশাসন ততই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সহযোগিতা ও নির্ভরতার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সেই ভারসাম্য রক্ষা করা এখন ভারতের জন্য একটি বড় নীতিগত পরীক্ষা।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সার্ক কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পর ভারত বিমসটেককে বিকল্প হিসেবে সামনে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি বাড়িয়েছে। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
এই বাস্তবতায় ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সে কি দক্ষিণ এশিয়ায় তার ঐতিহ্যগত নেতৃত্বের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে? কারণ কোনো দেশ বৈশ্বিক শক্তি হওয়ার আগে সাধারণত নিজের প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে। যদি সেই ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকে, তাহলে বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে এটাও সত্য যে ভারতের অবস্থানকে একমাত্র ব্যর্থতার গল্প হিসেবে দেখা যাবে না। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে দেশটি এখনো বৈশ্বিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্রিকস, জি-২০, কোয়াড এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো ভিন্নধর্মী প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে সক্রিয় থাকার সক্ষমতা ভারতের কূটনৈতিক নমনীয়তারই প্রমাণ।
তবু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ একটি বাস্তব শিক্ষা সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই; আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ। যে কারণে একটি দেশের কৌশল যদি অতিমাত্রায় অন্য কোনো শক্তির নীতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই নীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো কৌশলও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ থেকে ‘প্যাসিফিক’-এ প্রত্যাবর্তন তাই শুধু একটি নাম পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তি-সমীকরণের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি ভারতের জন্যও একটি সতর্কবার্তা–বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আগে নিজের আঞ্চলিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
লেখক: ভারতের একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ।
(এই লেখাটি লেখকের ইউটিউব ভিডিও চ্যানেলের প্রচারিত ভিডিও বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হলো।)