চরচা ডেস্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযান ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে যতক্ষণ না ইরান হার মেনে নেয়। অথবা তাদের লড়াই করার ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তাদের সামরিক বাহিনী যতদিন প্রয়োজন লড়াই চালিয়ে যাবে এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনায় তাদের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভক্স-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জশুয়া কিটিং-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা কেবল ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি মূলত সক্ষমতার প্রশ্ন। এই সংঘাত কতদিন স্থায়ী হতে পারে তার পেছনে একটি অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো—লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত গোলাবারুদ উভয় পক্ষের কাছে আছে কি না। বর্তমানে এটি ইরানের মিসাইল ও ড্রোন এবং সেগুলোকে প্রতিহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর পাল্টা ব্যবস্থার মধ্যকার এক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। যদিও তাদের সামরিক সক্ষমতা সংক্রান্ত তথ্যাবলি কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়, তবুও উভয় পক্ষই যে চাপের মুখে রয়েছে—তার লক্ষণ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

প্রথাগত সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, ইরানের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রধান মাধ্যম এখন কেবল তাদের মিসাইল এবং ড্রোনের মজুত।
ইসরায়েলি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আইএনএসএস-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ইরান ১৩টি দেশে হাজার হাজার মিসাইল এবং কামিকাজে ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যাতে অন্তত ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন মার্কিন সেনাসদস্যও রয়েছেন। ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে শুরু করে দুবাইয়ের বিলাসবহুল হোটেল এবং অ্যামাজনের ডেটা সেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত পরিসরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। গত বুধবার, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হওয়া তিনটি জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে; যা মূলত বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রধান সংযোগস্থল বন্ধ করে দেওয়ার ইরানি প্রচেষ্টার একটি অংশ।
তবে এসবের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর চালানো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, সেখানে ১২০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
কিন্তু ইরানের এই হামলাগুলো পুরো অঞ্চলের জন্য আরও ভয়াবহ হতে পারত, যদি আক্রান্ত দেশগুলোর মিসাইল ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা এত শক্তিশালী না হতো। যে দেশগুলোকে ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশ ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
কিটিংয়ের মতে এই কাজ মোটেও সহজ নয়। ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক এবং উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন অস্ত্র, আর এই সফল প্রতিরোধের চেষ্টায় ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
এই যুদ্ধের প্রথম পাঁচ দিনেই যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে, যার প্রতিটির খরচ প্রায় চার মিলিয়ন ডলার। গত জুনের সংঘাতের সময়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের থাড ইন্টারসেপ্টরের মোট মজুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার করেছিল, যা একটি মোবাইল অ্যান্টি-মিসাইল ব্যাটারি থেকে নিক্ষেপ করা হয়। এমন ইন্টারসেপ্টর বছরে মাত্র ১১টি তৈরি করা হয় এবং ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান যুদ্ধেও এগুলো ব্যবহারের হার প্রায় একই রকম।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের স্যাম লেয়ার বলেন, “যদি আপনাকে শুরুতেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে আপনি খরচের হিসাবের ভুল দিকে আছেন। এ ধরনের যুদ্ধ এভাবেই চলে—এটাই বাস্তবতা। ইন্টারসেপ্টরগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, এগুলোর মজুত খুব সীমিত এবং প্রতি বছর খুব অল্প পরিমাণ উৎপাদিত হয়।”
এই ধরনের ইন্টারসেপ্টরগুলোকে বর্তমানের মিসাইল ও ড্রোন-নির্ভর যুদ্ধের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের প্রভাব এখন এই অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়েছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টরগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে তার একটি বড় লক্ষণ হলো- যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শক্তিশালী ‘থাড’ ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের অংশবিশেষ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে আনছে বলে খবর পাওয়া গেছে; আর এটি এমন এক সপ্তাহে ঘটছে যখন উত্তর কোরিয়া তাদের সর্বশেষ যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করছে।
আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুদের বিষয়টি তুলনামূলক কম উদ্বেগের হলেও এটিও এখন একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, টমাহক মিসাইলের ঘাটতি পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের হয়তো কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ম্যাকেঞ্জি ইগলেন বলেন, “বছরের পর বছর ধরে সামরিক বাহিনীর সব শাখা তাদের প্রতিস্থাপন হারের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের মজুদ ব্যবহার করে ফেলছে।”
ইরান আর কতক্ষণ হামলা চালিয়ে যেতে পারবে?
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণ তাদের হামলা চালানোর প্রাথমিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, সংঘাতের শুরু থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের হার ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলার হার ৮৩ শতাংশ কমে গেছে; যাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সক্ষমতা হ্রাসের জোরালো প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই হামলার হার কমে যাওয়া আসলে প্রমাণ করে যে ইরান দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের কথা মাথায় রেখে তাদের অস্ত্রাগারের কিছু অংশ জমিয়ে রাখছে। তবে প্রচলিত যেকোনো মানদণ্ডেই এটা বলা নিরাপদ যে, ইরান এই মিসাইল যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে।
কিটিং তার প্রতিবেদনে বলেছেন, ইরানের নেতাদের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে পরাজিত করা নয় এবং এ নিয়ে কখনোই কোনো সন্দেহ ছিল না। তাদের মূল লক্ষ্য হলো আঘাত অব্যাহত রাখা, যাতে করে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম, টালমাটাল অর্থনীতি, জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং মিত্রদের অসন্তোষের মুখে পড়ে ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর চাপ উপেক্ষা করেন।
তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী হলেও, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানি বন্ধ রাখার ইরানি প্রচেষ্টায় এই ড্রোনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই অভিযানে ইরান সম্ভবত তাদের ইয়েমেনি মিত্রদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছে, যারা গাজা যুদ্ধের সময় লোহিত সাগরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য তুলনামূলকভাবে অল্প সংখ্যক ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহার করেছিল।
এই যুদ্ধে ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের বিষয়টি কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কুপোকাত করতে সেখানে একযোগে বিশাল হামলা চালানো হবে। কিন্তু বাস্তবে হামলাগুলো অনেক বেশি ছড়ানো-ছিটানো ছিল; ইসরায়েলের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে প্রায় ২০ গুণ বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর আংশিক কারণ হতে পারে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ড কাঠামোর ওপর চালানো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। ইরানি রণকৌশল অনুযায়ী, তেহরান থেকে কোনো নির্দেশ না পেলে ক্ষেপণাস্ত্র কমান্ডাররা নিজেদের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা পান।
সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক ডেকার এভেলেথ বলেন, “এটি ছিল মূলত ৩০ জন ভিন্ন ভিন্ন আইআরজিসি কমান্ডারের খেয়াল-খুশিমতো কাজ। আর এ কারণেই আমরা তাদের ওমানের মতো দেশের ওপর হামলা চালাতে দেখেছি, যা কারোর কাছেই বোধগম্য ছিল না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ওমান এমন একটি দেশ যারা যুদ্ধের প্রাক্কালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি পারমাণবিক চুক্তির মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেছিল।

ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার আরেকটি কারণ হতে পারে যে, তাদের কাছে এখন এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই বেশি অবশিষ্ট আছে। ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে আঘাত হানার জন্য তারা তাদের দূরপাল্লার অনেক অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছিল। অন্যদিকে, মূলত উপসাগরীয় দেশ এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে রাখা স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল এবং এই যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে সেগুলোর ওপর খুব বেশি বোমাবর্ষণ করা হয়নি। তবে গত কয়েক দিনে এগুলোর ওপর হামলার তীব্রতা বেড়েছে।
সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তে বিমানবন্দর এবং হোটেলগুলোতে আঘাত হেনে ইরান সম্ভবত স্থানীয় জনগণের মনোবল ভেঙে দিতে এবং তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাইছে—ঠিক যেমনটি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি শহরগুলোতে চালানো হামলার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, “তারা অনেক বেশি বেসামরিক এলাকায় আঘাত হানতে শুরু করেছে। এটি ইসরায়েলিদের জন্য চড়া মনস্তাত্ত্বিক মূল্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণ জনগণের জন্য এই হামলা ছিল বেশ আতঙ্কজনক।”
ইরানের আশা হতে পারে যে, আঞ্চলিক দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যাতে তাদের সরকারগুলো যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে; যদিও এর একটি বিপরীত প্রভাবও হতে পারে, যা তাদের সরাসরি এই সংঘাতের মধ্যে টেনে আনতে পারে।
খোদ ইসরায়েলের ক্ষেত্রে, ইরান এখন এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে শুরু করেছে যেগুলোতে ‘ক্লাস্টার মিউনিশন’ (গুচ্ছ বোমা) যুক্ত করা হয়েছে। এগুলো অনেক উঁচুতে বিস্ফোরিত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বোমা চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। শক্তিশালী সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে খুব একটা কার্যকর না হলেও, এদের বড় সুবিধা হলো এগুলো প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। উল্লেখ্য, ১২০টিরও বেশি দেশ এই ধরনের অস্ত্র নিষিদ্ধ করেছে, কারণ অবিস্ফোরিত বোমাগুলো যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরেও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মারাত্মক বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একটি সংখ্যার খেলা
প্রতিরোধের উচ্চ হার সত্ত্বেও, এমন কিছু লক্ষণ দেখা গেছে যা ইঙ্গিত দেয় যে এই অঞ্চলে ইরানের এমন অতর্কিত আক্রমণ মোকাবিলা করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি ছিল না।
কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন যে, গত ১ মার্চ কুয়েতে নিহত ছয় মার্কিন সেনা কেন একটি অস্থায়ী অপারেশন সেন্টারে কাজ করছিলেন। বিশেষ করে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যুদ্ধের সময়কাল নির্ধারণ করেছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস রিপোর্ট করেছে যে, গত বছর ইউক্রেন তাদের নিজস্ব ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তি বিক্রির প্রস্তাব দিলেও মার্কিন কর্মকর্তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অথচ এখন যুদ্ধের ময়দানে সেই একই প্রযুক্তি বসানো হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে এমন খবরও এসেছিল যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ইন্টারসেপ্টর মজুদ বিপজ্জনকভাবে ফুরিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে তাদের আরও সরঞ্জাম সরবরাহের চেষ্টা করছে।
সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্যাট্রিয়ট এবং থাড-এর মতো উন্নত মার্কিন সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। এগুলো অত্যন্ত কার্যকর হলেও যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি বিপুল সংখ্যক সস্তা মিসাইল ও ড্রোন মোকাবিলা করার জন্য এগুলো খুব একটা উপযোগী নয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত কম খরচে ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহারে সাফল্য পেয়েছে। এছাড়া ইউক্রেন-যে দেশটি এখন ইরানি ড্রোন এবং মিসাইল ভূপাতিত করার বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ-সেখান থেকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের জন্য এই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, ইরানি হামলার সংখ্যা কমে আসায় ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এখন কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে, তারা এবার তাদের ইন্টারসেপ্টের হার জনসমক্ষে প্রকাশ করছে না, যাতে তাদের মজুদের পরিমাণ অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দেশটির অস্ত্রের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল।
ইরান এখনো কিছু মিসাইল এবং ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। গত ১০ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ছোড়া ড্রোনগুলোর ২৫ শতাংশেরও বেশি লক্ষ্যভেদে সফল হয়েছে, যা আগের দিনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এছাড়া ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাডার স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে মনে হচ্ছে, যেগুলো আগত ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
আধুনিক ইন্টারসেপ্টরগুলো হয়তো এই যুদ্ধে মার্কিন সৈন্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলোর দিকে ইরানের ছোড়া অধিকাংশ অস্ত্রই আপাতত রুখে দিতে পারছে। কিন্তু এর প্রকৃত প্রভাব হয়তো পরবর্তী কোনো যুদ্ধে অনুভূত হবে। আর ইরানের কাছে যদি এই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলার মতো যথেষ্ট সম্পদ অবশিষ্ট না-ও থাকে, তবুও তারা হয়তো আশা করছে যে, এই হুমকির ধারা এমন এক সময় পর্যন্ত বজায় রাখা যাবে, যখন এর ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযান ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে যতক্ষণ না ইরান হার মেনে নেয়। অথবা তাদের লড়াই করার ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, তাদের সামরিক বাহিনী যতদিন প্রয়োজন লড়াই চালিয়ে যাবে এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনায় তাদের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ভক্স-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জশুয়া কিটিং-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা কেবল ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি মূলত সক্ষমতার প্রশ্ন। এই সংঘাত কতদিন স্থায়ী হতে পারে তার পেছনে একটি অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো—লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত গোলাবারুদ উভয় পক্ষের কাছে আছে কি না। বর্তমানে এটি ইরানের মিসাইল ও ড্রোন এবং সেগুলোকে প্রতিহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর পাল্টা ব্যবস্থার মধ্যকার এক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। যদিও তাদের সামরিক সক্ষমতা সংক্রান্ত তথ্যাবলি কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়, তবুও উভয় পক্ষই যে চাপের মুখে রয়েছে—তার লক্ষণ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

প্রথাগত সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, ইরানের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রধান মাধ্যম এখন কেবল তাদের মিসাইল এবং ড্রোনের মজুত।
ইসরায়েলি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আইএনএসএস-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ইরান ১৩টি দেশে হাজার হাজার মিসাইল এবং কামিকাজে ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যাতে অন্তত ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন মার্কিন সেনাসদস্যও রয়েছেন। ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে শুরু করে দুবাইয়ের বিলাসবহুল হোটেল এবং অ্যামাজনের ডেটা সেন্টার পর্যন্ত বিস্তৃত পরিসরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। গত বুধবার, হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হওয়া তিনটি জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে; যা মূলত বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রধান সংযোগস্থল বন্ধ করে দেওয়ার ইরানি প্রচেষ্টার একটি অংশ।
তবে এসবের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর চালানো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, সেখানে ১২০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামোর একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
কিন্তু ইরানের এই হামলাগুলো পুরো অঞ্চলের জন্য আরও ভয়াবহ হতে পারত, যদি আক্রান্ত দেশগুলোর মিসাইল ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা এত শক্তিশালী না হতো। যে দেশগুলোকে ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশ ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
কিটিংয়ের মতে এই কাজ মোটেও সহজ নয়। ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক এবং উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন অস্ত্র, আর এই সফল প্রতিরোধের চেষ্টায় ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ।
এই যুদ্ধের প্রথম পাঁচ দিনেই যুক্তরাষ্ট্র আনুমানিক ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলেছে, যার প্রতিটির খরচ প্রায় চার মিলিয়ন ডলার। গত জুনের সংঘাতের সময়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের থাড ইন্টারসেপ্টরের মোট মজুদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার করেছিল, যা একটি মোবাইল অ্যান্টি-মিসাইল ব্যাটারি থেকে নিক্ষেপ করা হয়। এমন ইন্টারসেপ্টর বছরে মাত্র ১১টি তৈরি করা হয় এবং ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমান যুদ্ধেও এগুলো ব্যবহারের হার প্রায় একই রকম।
জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের স্যাম লেয়ার বলেন, “যদি আপনাকে শুরুতেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে আপনি খরচের হিসাবের ভুল দিকে আছেন। এ ধরনের যুদ্ধ এভাবেই চলে—এটাই বাস্তবতা। ইন্টারসেপ্টরগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল, এগুলোর মজুত খুব সীমিত এবং প্রতি বছর খুব অল্প পরিমাণ উৎপাদিত হয়।”
এই ধরনের ইন্টারসেপ্টরগুলোকে বর্তমানের মিসাইল ও ড্রোন-নির্ভর যুদ্ধের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের প্রভাব এখন এই অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়েছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টরগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে তার একটি বড় লক্ষণ হলো- যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শক্তিশালী ‘থাড’ ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের অংশবিশেষ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে আনছে বলে খবর পাওয়া গেছে; আর এটি এমন এক সপ্তাহে ঘটছে যখন উত্তর কোরিয়া তাদের সর্বশেষ যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করছে।
আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুদের বিষয়টি তুলনামূলক কম উদ্বেগের হলেও এটিও এখন একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, টমাহক মিসাইলের ঘাটতি পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের হয়তো কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ম্যাকেঞ্জি ইগলেন বলেন, “বছরের পর বছর ধরে সামরিক বাহিনীর সব শাখা তাদের প্রতিস্থাপন হারের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী অস্ত্রের মজুদ ব্যবহার করে ফেলছে।”
ইরান আর কতক্ষণ হামলা চালিয়ে যেতে পারবে?
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণ তাদের হামলা চালানোর প্রাথমিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, সংঘাতের শুরু থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের হার ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলার হার ৮৩ শতাংশ কমে গেছে; যাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সক্ষমতা হ্রাসের জোরালো প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই হামলার হার কমে যাওয়া আসলে প্রমাণ করে যে ইরান দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের কথা মাথায় রেখে তাদের অস্ত্রাগারের কিছু অংশ জমিয়ে রাখছে। তবে প্রচলিত যেকোনো মানদণ্ডেই এটা বলা নিরাপদ যে, ইরান এই মিসাইল যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে।
কিটিং তার প্রতিবেদনে বলেছেন, ইরানের নেতাদের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে পরাজিত করা নয় এবং এ নিয়ে কখনোই কোনো সন্দেহ ছিল না। তাদের মূল লক্ষ্য হলো আঘাত অব্যাহত রাখা, যাতে করে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম, টালমাটাল অর্থনীতি, জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং মিত্রদের অসন্তোষের মুখে পড়ে ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর চাপ উপেক্ষা করেন।
তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী হলেও, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রপ্তানি বন্ধ রাখার ইরানি প্রচেষ্টায় এই ড্রোনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই অভিযানে ইরান সম্ভবত তাদের ইয়েমেনি মিত্রদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছে, যারা গাজা যুদ্ধের সময় লোহিত সাগরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য তুলনামূলকভাবে অল্প সংখ্যক ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহার করেছিল।
এই যুদ্ধে ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের বিষয়টি কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন যে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কুপোকাত করতে সেখানে একযোগে বিশাল হামলা চালানো হবে। কিন্তু বাস্তবে হামলাগুলো অনেক বেশি ছড়ানো-ছিটানো ছিল; ইসরায়েলের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে প্রায় ২০ গুণ বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এর আংশিক কারণ হতে পারে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কমান্ড কাঠামোর ওপর চালানো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। ইরানি রণকৌশল অনুযায়ী, তেহরান থেকে কোনো নির্দেশ না পেলে ক্ষেপণাস্ত্র কমান্ডাররা নিজেদের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বাধীনতা পান।
সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক ডেকার এভেলেথ বলেন, “এটি ছিল মূলত ৩০ জন ভিন্ন ভিন্ন আইআরজিসি কমান্ডারের খেয়াল-খুশিমতো কাজ। আর এ কারণেই আমরা তাদের ওমানের মতো দেশের ওপর হামলা চালাতে দেখেছি, যা কারোর কাছেই বোধগম্য ছিল না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ওমান এমন একটি দেশ যারা যুদ্ধের প্রাক্কালে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি পারমাণবিক চুক্তির মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেছিল।

ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার আরেকটি কারণ হতে পারে যে, তাদের কাছে এখন এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রই বেশি অবশিষ্ট আছে। ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে আঘাত হানার জন্য তারা তাদের দূরপাল্লার অনেক অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছিল। অন্যদিকে, মূলত উপসাগরীয় দেশ এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে রাখা স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল এবং এই যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে সেগুলোর ওপর খুব বেশি বোমাবর্ষণ করা হয়নি। তবে গত কয়েক দিনে এগুলোর ওপর হামলার তীব্রতা বেড়েছে।
সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তে বিমানবন্দর এবং হোটেলগুলোতে আঘাত হেনে ইরান সম্ভবত স্থানীয় জনগণের মনোবল ভেঙে দিতে এবং তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাইছে—ঠিক যেমনটি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি শহরগুলোতে চালানো হামলার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, “তারা অনেক বেশি বেসামরিক এলাকায় আঘাত হানতে শুরু করেছে। এটি ইসরায়েলিদের জন্য চড়া মনস্তাত্ত্বিক মূল্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণ জনগণের জন্য এই হামলা ছিল বেশ আতঙ্কজনক।”
ইরানের আশা হতে পারে যে, আঞ্চলিক দেশগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যাতে তাদের সরকারগুলো যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে; যদিও এর একটি বিপরীত প্রভাবও হতে পারে, যা তাদের সরাসরি এই সংঘাতের মধ্যে টেনে আনতে পারে।
খোদ ইসরায়েলের ক্ষেত্রে, ইরান এখন এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে শুরু করেছে যেগুলোতে ‘ক্লাস্টার মিউনিশন’ (গুচ্ছ বোমা) যুক্ত করা হয়েছে। এগুলো অনেক উঁচুতে বিস্ফোরিত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বোমা চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। শক্তিশালী সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে খুব একটা কার্যকর না হলেও, এদের বড় সুবিধা হলো এগুলো প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। উল্লেখ্য, ১২০টিরও বেশি দেশ এই ধরনের অস্ত্র নিষিদ্ধ করেছে, কারণ অবিস্ফোরিত বোমাগুলো যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরেও বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মারাত্মক বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
একটি সংখ্যার খেলা
প্রতিরোধের উচ্চ হার সত্ত্বেও, এমন কিছু লক্ষণ দেখা গেছে যা ইঙ্গিত দেয় যে এই অঞ্চলে ইরানের এমন অতর্কিত আক্রমণ মোকাবিলা করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি ছিল না।
কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন যে, গত ১ মার্চ কুয়েতে নিহত ছয় মার্কিন সেনা কেন একটি অস্থায়ী অপারেশন সেন্টারে কাজ করছিলেন। বিশেষ করে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যুদ্ধের সময়কাল নির্ধারণ করেছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস রিপোর্ট করেছে যে, গত বছর ইউক্রেন তাদের নিজস্ব ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তি বিক্রির প্রস্তাব দিলেও মার্কিন কর্মকর্তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অথচ এখন যুদ্ধের ময়দানে সেই একই প্রযুক্তি বসানো হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে এমন খবরও এসেছিল যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ইন্টারসেপ্টর মজুদ বিপজ্জনকভাবে ফুরিয়ে আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে তাদের আরও সরঞ্জাম সরবরাহের চেষ্টা করছে।
সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য প্যাট্রিয়ট এবং থাড-এর মতো উন্নত মার্কিন সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। এগুলো অত্যন্ত কার্যকর হলেও যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি বিপুল সংখ্যক সস্তা মিসাইল ও ড্রোন মোকাবিলা করার জন্য এগুলো খুব একটা উপযোগী নয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত কম খরচে ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহারে সাফল্য পেয়েছে। এছাড়া ইউক্রেন-যে দেশটি এখন ইরানি ড্রোন এবং মিসাইল ভূপাতিত করার বিষয়ে বেশ অভিজ্ঞ-সেখান থেকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের জন্য এই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, ইরানি হামলার সংখ্যা কমে আসায় ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এখন কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে।
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে, তারা এবার তাদের ইন্টারসেপ্টের হার জনসমক্ষে প্রকাশ করছে না, যাতে তাদের মজুদের পরিমাণ অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে খবর পাওয়া গিয়েছিল যে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে দেশটির অস্ত্রের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে গিয়েছিল।
ইরান এখনো কিছু মিসাইল এবং ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে। গত ১০ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ছোড়া ড্রোনগুলোর ২৫ শতাংশেরও বেশি লক্ষ্যভেদে সফল হয়েছে, যা আগের দিনগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এছাড়া ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাডার স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে মনে হচ্ছে, যেগুলো আগত ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
আধুনিক ইন্টারসেপ্টরগুলো হয়তো এই যুদ্ধে মার্কিন সৈন্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলোর দিকে ইরানের ছোড়া অধিকাংশ অস্ত্রই আপাতত রুখে দিতে পারছে। কিন্তু এর প্রকৃত প্রভাব হয়তো পরবর্তী কোনো যুদ্ধে অনুভূত হবে। আর ইরানের কাছে যদি এই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলার মতো যথেষ্ট সম্পদ অবশিষ্ট না-ও থাকে, তবুও তারা হয়তো আশা করছে যে, এই হুমকির ধারা এমন এক সময় পর্যন্ত বজায় রাখা যাবে, যখন এর ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।