রাগীব আনজুম

আগামী ৭ মে-এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির মধ্যকার এই তীব্র মেরুকরণের লড়াইয়ে সীমান্তের ওপারের ঘটনাবলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একটি বৈদেশিক খবর হিসেবে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সীমান্তের প্রভাব ও নিরাপত্তা ভাবনা
বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ ও জনবহুল সীমান্ত রয়েছে, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় সীমানাকে ছাপিয়ে যায়। এই আবহে ভারতের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) সংক্রান্ত বিতর্ক এবং রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর খুব সহজেই বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলিমদের সন্দেহের তালিকায় ফেলে দেয়। ফলে এদেশের নির্বাচনকে এখন কেবল একটি বহিরাগত ঘটনা হিসেবে না দেখে, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার নিরিখে বিচার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমে একটি পরিচিত চিত্র দেখা যাচ্ছে: বাংলাদেশের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর জয়ী আসনগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সাথে দাবি করা হচ্ছে যে, সীমান্তে ‘মৌলবাদ’ বাড়ছে এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
অনুপ্রবেশ ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের বয়ান
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্ব বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যবহার করে তাদের দীর্ঘদিনের ‘অনুপ্রবেশ’ তত্ত্বকে আরও জোরাল করার চেষ্টা করছে। এই রাজনৈতিক ভাষ্যের এক চরম পর্যায়ে দাবি করা হচ্ছে যে, এই ধরনের অভিবাসন পশ্চিমবঙ্গের জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে, যা পরোক্ষভাবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলকেও প্রভাবিত করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ‘সিকিউরিটাইজেশন’ বা নিরাপত্তার মোড়কে রাজনীতিকরণের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। যেখানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো কোনো একটি বিষয়কে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরে এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপের জন্য জনসমর্থন আদায় করতে চায়, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিতর্কিত হতে পারত। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্বাচনের ভূগোল ও জনতাত্ত্বিক পরিসংখ্যানকে সীমান্ত পাহারা জোরদার করা, স্থানীয় বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং ‘নাগরিকত্ব উদ্বেগ’-এর রাজনীতিকে উসকে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২৬ নির্বাচনের নতুন সমীকরণ
২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেও ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে দুটি নতুন দিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে:
বেকারত্ব ও শিল্পায়ন: পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি এখন বেকারত্ব এবং শিল্পের অভাবকে অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছে। মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী মোদির একটি জনসভার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে তারা ‘খয়রাতি’ বা অনুদান হিসেবে কটাক্ষ করছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর): নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। এমনকি এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় অসদাচরণের অভিযোগে কমিশন কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে-যা এই পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা স্পর্শকাতর ও রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে তারই বহিঃপ্রকাশ।
জনকল্যাণ বনাম নিরাপত্তা
এই প্রেক্ষাপটে, জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের বিতর্ক এবং ‘কার নাম ভোটার তালিকায় থাকবে’ সংক্রান্ত আলোচনাটি ঠিক সেখানেই মিলিত হয়েছে, যেখানে আমদানিকৃত একটি ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’র বয়ান নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সহায়ক হয়ে ওঠে। যখনই বাংলাদেশকে একটি ‘হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন জনমানসে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং ভোটার ব্যবস্থাপনার মধ্যবর্তী রেখাটি অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি হয়ে ওঠে বিদ্রোহী অনুপ্রবেশকারী, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাজ্যের সীমিত সম্পদ ‘বহিরাগতদের’ হাতে চলে যাওয়ার সমার্থক।
বাংলাদেশের ২০২৬ নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্ররা বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেদেশের জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের মিত্ররা ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট জিতেছে ৭৭টি আসনে, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি আসন-যা দলটির ইতিহাসে এ যাবৎকালের সেরা ফলাফল। এ ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জিতেছে ছয়টি আসনে।
এই পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ পুরোপুরি জামায়াতী হয়ে যাচ্ছে-এই দাবিটি সঠিক নয়। জামায়াতের এই উত্থান বাস্তব হলেও এটি কোনো দেশব্যাপী অভিন্ন জোয়ার নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট কিছু আঞ্চলিক শক্তিকেন্দ্র, বিরোধী শিবিরের বিভাজন এবং ভোট হস্তান্তরের প্রতিফলন।
রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন
এক সময় জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চলে ২০২৬ সালে দলটির ভিত্তি ধসে পড়েছে। সেখানে জামায়াত (এবং কিছুটা এনসিপি) গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলো দখল করেছে। এটি কোনো আকস্মিক আদর্শিক বিপ্লব নয়। এর মূলে রয়েছে এরশাদ আমলের ইসলামপন্থী জোট এবং তার শাসনামলে নেওয়া বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে। রক্ষণশীল ভোটের এই পুনর্বিন্যাস মূলত পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোরই একটি পরিবর্তন।
‘ভয়ের ভূগোল’ ও নির্বাচনী কৌশল
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া, মালদা এবং আলিপুরদুয়ারের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর ঠিক ওপারে জামায়াতের জয়কে বিশেষভাবে তুলে ধরছে। এটি নির্বাচনী প্রচারণার উপযোগী একটি ‘ভয়ের ভূগোল’ তৈরি করেছে। সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকাটা অযৌক্তিক নয়, কিন্তু সমস্যা হলো একটি জটিল নির্বাচনী ফলাফলকে যখন কেবল একটি নিরাপত্তা ঝুঁকির মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থানীয় রাজনৈতিক কারণগুলো আড়ালে চলে যায় এবং সেগুলোর স্থান নেয় অস্তিত্ব রক্ষার বাগাড়ম্বর।
২০২৫ সালের শেষের দিকে ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে কিছু কথিত ‘অবৈধ’ অভিবাসীর বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ঘটনাটি ২০২৬-এর নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই একটি রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে অনুপ্রবেশ এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে শত্রুতা আরও তীব্র হয়। এই ঘটনার সময়কালটি লক্ষ্যণীয়, ঠিক যখন নির্বাচনী প্রচার এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ তুঙ্গে, তখনই অনুপ্রবেশের এই বয়ানটিকে শক্তিশালী করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ প্রভাব ও সংখ্যালঘু সংকট
রাজনীতি যখন নিরাপত্তার চশমায় দেখা হয়, তখন বাইরের হুমকি প্রায়শই দেশের অভ্যন্তরে থাকা সংখ্যালঘুদের ওপর নজরদারির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলিমরা, বিশেষ করে যারা দরিদ্র এবং কাজের সূত্রে যাযাবর, তাদের ওপর সন্দেহভাজন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। কারণ এক্ষেত্রে ভাষা এবং ধর্মকে নাগরিকত্বের বিকল্প মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয় যা ইতিপূর্বেও পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে।
রাজনীতিকরণ, নির্বাচনী ফলাফলের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
এই কারণেই ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) বিতর্কটিকে বাংলাদেশের সমীকরণ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যখন বাংলাদেশকে একটি নিরাপত্তা সংকটের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা নথিপত্র যাচাইয়ের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রবেশকারী মুক্তকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি হয়। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং এর ফলে সাধারণ নাগরিকরাও অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার হতে পারেন।
এই কৌশল কি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণ করবে?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কৌশলটি কাজ করতে পারে, তবে তা কেবল একদিকে নয়। নিরাপত্তাকে রাজনীতির মূল বিষয় করে তোলা -মূলত ভোটারদের মেরুকরণ এবং নিজেদের পক্ষে টানার একটি কৌশল। সীমান্ত সংলগ্ন এবং সাম্প্রদায়িক দিক থেকে সংবেদনশীল আসনগুলোতে বিজেপির মূল বক্তব্য হলো, তৃণমূল কংগ্রেস বাংলাকে নিরাপদ রাখতে পারবে না; কেবল একটি কঠোর ডাবল ইঞ্জিন সরকারই তা করতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানচিত্রকে একটি প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দেখতে বস্তুনিষ্ঠ মনে হলেও আসলে আতঙ্ক ছড়ানোর সহায়ক।
তবে পশ্চিমবঙ্গ বারবার প্রমাণ করেছে যে, অতি-সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে-বিশেষ করে যখন ভোটাররা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা এবং স্থানীয় সুশাসনকে বেশি গুরুত্ব দেন। ২০২৫ সালের জুনে নদিয়ার কালীগঞ্জ উপ-নির্বাচনের ফলাফল থেকে পর্যবেক্ষকরা দেখেছেন যে, বিজেপির উচ্চকণ্ঠের সাম্প্রদায়িক প্রচার সব সময় ভোটে রূপান্তরিত হয় না। সেই নির্বাচনে তৃণমূল বড় ব্যবধানে আসনটি ধরে রেখেছিল এবং ২০২১ সালের তুলনায় বিজেপির ভোটের হারও কমে গিয়েছিল।
বহুমুখী লড়াই ও জাতীয় রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সাধারণত একটি মাত্র বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় না। নিরাপত্তার এই বয়ান ভোটারদের একটি অংশকে প্রভাবিত করলেও, এটি একই সঙ্গে বাঙালি পরিচয়, বহুত্ববাদ এবং হয়রানির আশঙ্কায় পাল্টা জনমত তৈরি করতে পারে। এটি পুলিশের অতি-সক্রিয়তা বা আমলাতান্ত্রিক বঞ্চনার বিরুদ্ধেও জনরোষ তৈরি করতে পারে এবং প্রচারের অভিমুখকে চাকরি, মূল্যবৃদ্ধি ও জনকল্যাণের মতো সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যার দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে—যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস লড়াই করতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
তবে এই নিরাপত্তার রাজনীতি কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি যখন তাদের অবস্থান কঠোর করছে, তখন তৃণমূল কংগ্রেসের লক্ষ্য হলো সীমান্তের ওপারে একটি সাংস্কৃতিক সুসম্পর্ক ও আত্মবিশ্বাসের বার্তা দেওয়া। বাংলাদেশের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন করে অভিনন্দন জানানোকে সেই প্রতীকী প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ
জাতীয় স্তরে ২০২৬ সালে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এমন কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে যার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও উত্তেজনা প্রশমন প্রয়োজন। বিশেষ করে গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি পার্লামেন্টে জানিয়েছে যে, এই চুক্তি নবায়নের আলোচনা এখনো প্রক্রিয়াধীন। যদি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় শত্রুতা এবং অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত বয়ানকে উসকে দেয়, তবে বাস্তবমুখী ও কূটনৈতিক আলোচনার পথ সংকীর্ণ হয়ে আসবে।
পশ্চিমবঙ্গে একটি বিদেশি নির্বাচনকে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ ‘নিরাপত্তা জরুরি অবস্থা’ তৈরির চেষ্টা চলছে, যা প্রকারান্তরে কঠোর শাসনকে বৈধতা দেয় এবং একই ভাষা ও ধর্মের ভারতীয় নাগরিকদের প্রতি সন্দেহের আঙুল তোলে। মে মাসের শুরুতে বিধানসভা নির্বাচন এবং ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে, এই নিরাপত্তা চক্র নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশিত।
লেখক: রাগিব আনজুম। ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স (ডাইরা)-এর গবেষণা সহকারী। তিনি ধর্ম, আদর্শ এবং রাজনীতির পারস্পরিক প্রভাব নিয়ে কাজ করেন।

আগামী ৭ মে-এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির মধ্যকার এই তীব্র মেরুকরণের লড়াইয়ে সীমান্তের ওপারের ঘটনাবলি এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একটি বৈদেশিক খবর হিসেবে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সীমান্তের প্রভাব ও নিরাপত্তা ভাবনা
বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ ও জনবহুল সীমান্ত রয়েছে, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় সীমানাকে ছাপিয়ে যায়। এই আবহে ভারতের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) সংক্রান্ত বিতর্ক এবং রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর খুব সহজেই বাংলাদেশের বাংলাভাষী মুসলিমদের সন্দেহের তালিকায় ফেলে দেয়। ফলে এদেশের নির্বাচনকে এখন কেবল একটি বহিরাগত ঘটনা হিসেবে না দেখে, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার নিরিখে বিচার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমে একটি পরিচিত চিত্র দেখা যাচ্ছে: বাংলাদেশের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর জয়ী আসনগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সাথে দাবি করা হচ্ছে যে, সীমান্তে ‘মৌলবাদ’ বাড়ছে এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এখন চরম ঝুঁকির মুখে।
অনুপ্রবেশ ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের বয়ান
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্ব বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যবহার করে তাদের দীর্ঘদিনের ‘অনুপ্রবেশ’ তত্ত্বকে আরও জোরাল করার চেষ্টা করছে। এই রাজনৈতিক ভাষ্যের এক চরম পর্যায়ে দাবি করা হচ্ছে যে, এই ধরনের অভিবাসন পশ্চিমবঙ্গের জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে, যা পরোক্ষভাবে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলকেও প্রভাবিত করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে ‘সিকিউরিটাইজেশন’ বা নিরাপত্তার মোড়কে রাজনীতিকরণের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। যেখানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো কোনো একটি বিষয়কে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরে এমন কিছু কঠোর পদক্ষেপের জন্য জনসমর্থন আদায় করতে চায়, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিতর্কিত হতে পারত। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্বাচনের ভূগোল ও জনতাত্ত্বিক পরিসংখ্যানকে সীমান্ত পাহারা জোরদার করা, স্থানীয় বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং ‘নাগরিকত্ব উদ্বেগ’-এর রাজনীতিকে উসকে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২৬ নির্বাচনের নতুন সমীকরণ
২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেও ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে দুটি নতুন দিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে:
বেকারত্ব ও শিল্পায়ন: পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি এখন বেকারত্ব এবং শিল্পের অভাবকে অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছে। মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী মোদির একটি জনসভার প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে তারা ‘খয়রাতি’ বা অনুদান হিসেবে কটাক্ষ করছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর): নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। এমনকি এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় অসদাচরণের অভিযোগে কমিশন কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে-যা এই পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা স্পর্শকাতর ও রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে তারই বহিঃপ্রকাশ।
জনকল্যাণ বনাম নিরাপত্তা
এই প্রেক্ষাপটে, জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের বিতর্ক এবং ‘কার নাম ভোটার তালিকায় থাকবে’ সংক্রান্ত আলোচনাটি ঠিক সেখানেই মিলিত হয়েছে, যেখানে আমদানিকৃত একটি ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’র বয়ান নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সহায়ক হয়ে ওঠে। যখনই বাংলাদেশকে একটি ‘হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন জনমানসে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং ভোটার ব্যবস্থাপনার মধ্যবর্তী রেখাটি অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি হয়ে ওঠে বিদ্রোহী অনুপ্রবেশকারী, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাজ্যের সীমিত সম্পদ ‘বহিরাগতদের’ হাতে চলে যাওয়ার সমার্থক।
বাংলাদেশের ২০২৬ নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের মিত্ররা বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেদেশের জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপট পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত বক্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং তাদের মিত্ররা ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট জিতেছে ৭৭টি আসনে, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি আসন-যা দলটির ইতিহাসে এ যাবৎকালের সেরা ফলাফল। এ ছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) জিতেছে ছয়টি আসনে।
এই পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ পুরোপুরি জামায়াতী হয়ে যাচ্ছে-এই দাবিটি সঠিক নয়। জামায়াতের এই উত্থান বাস্তব হলেও এটি কোনো দেশব্যাপী অভিন্ন জোয়ার নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট কিছু আঞ্চলিক শক্তিকেন্দ্র, বিরোধী শিবিরের বিভাজন এবং ভোট হস্তান্তরের প্রতিফলন।
রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তন
এক সময় জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চলে ২০২৬ সালে দলটির ভিত্তি ধসে পড়েছে। সেখানে জামায়াত (এবং কিছুটা এনসিপি) গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলো দখল করেছে। এটি কোনো আকস্মিক আদর্শিক বিপ্লব নয়। এর মূলে রয়েছে এরশাদ আমলের ইসলামপন্থী জোট এবং তার শাসনামলে নেওয়া বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে। রক্ষণশীল ভোটের এই পুনর্বিন্যাস মূলত পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোরই একটি পরিবর্তন।
‘ভয়ের ভূগোল’ ও নির্বাচনী কৌশল
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া, মালদা এবং আলিপুরদুয়ারের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর ঠিক ওপারে জামায়াতের জয়কে বিশেষভাবে তুলে ধরছে। এটি নির্বাচনী প্রচারণার উপযোগী একটি ‘ভয়ের ভূগোল’ তৈরি করেছে। সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকাটা অযৌক্তিক নয়, কিন্তু সমস্যা হলো একটি জটিল নির্বাচনী ফলাফলকে যখন কেবল একটি নিরাপত্তা ঝুঁকির মোড়কে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থানীয় রাজনৈতিক কারণগুলো আড়ালে চলে যায় এবং সেগুলোর স্থান নেয় অস্তিত্ব রক্ষার বাগাড়ম্বর।
২০২৫ সালের শেষের দিকে ‘ইকোনমিক টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে কিছু কথিত ‘অবৈধ’ অভিবাসীর বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ঘটনাটি ২০২৬-এর নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই একটি রাজনৈতিক অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে অনুপ্রবেশ এবং ভোটার তালিকা নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে শত্রুতা আরও তীব্র হয়। এই ঘটনার সময়কালটি লক্ষ্যণীয়, ঠিক যখন নির্বাচনী প্রচার এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ তুঙ্গে, তখনই অনুপ্রবেশের এই বয়ানটিকে শক্তিশালী করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ প্রভাব ও সংখ্যালঘু সংকট
রাজনীতি যখন নিরাপত্তার চশমায় দেখা হয়, তখন বাইরের হুমকি প্রায়শই দেশের অভ্যন্তরে থাকা সংখ্যালঘুদের ওপর নজরদারির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলিমরা, বিশেষ করে যারা দরিদ্র এবং কাজের সূত্রে যাযাবর, তাদের ওপর সন্দেহভাজন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। কারণ এক্ষেত্রে ভাষা এবং ধর্মকে নাগরিকত্বের বিকল্প মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয় যা ইতিপূর্বেও পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে।
রাজনীতিকরণ, নির্বাচনী ফলাফলের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
এই কারণেই ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) বিতর্কটিকে বাংলাদেশের সমীকরণ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যখন বাংলাদেশকে একটি নিরাপত্তা সংকটের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা নথিপত্র যাচাইয়ের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রবেশকারী মুক্তকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ তৈরি হয়। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং এর ফলে সাধারণ নাগরিকরাও অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার হতে পারেন।
এই কৌশল কি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণ করবে?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কৌশলটি কাজ করতে পারে, তবে তা কেবল একদিকে নয়। নিরাপত্তাকে রাজনীতির মূল বিষয় করে তোলা -মূলত ভোটারদের মেরুকরণ এবং নিজেদের পক্ষে টানার একটি কৌশল। সীমান্ত সংলগ্ন এবং সাম্প্রদায়িক দিক থেকে সংবেদনশীল আসনগুলোতে বিজেপির মূল বক্তব্য হলো, তৃণমূল কংগ্রেস বাংলাকে নিরাপদ রাখতে পারবে না; কেবল একটি কঠোর ডাবল ইঞ্জিন সরকারই তা করতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানচিত্রকে একটি প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দেখতে বস্তুনিষ্ঠ মনে হলেও আসলে আতঙ্ক ছড়ানোর সহায়ক।
তবে পশ্চিমবঙ্গ বারবার প্রমাণ করেছে যে, অতি-সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে-বিশেষ করে যখন ভোটাররা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা এবং স্থানীয় সুশাসনকে বেশি গুরুত্ব দেন। ২০২৫ সালের জুনে নদিয়ার কালীগঞ্জ উপ-নির্বাচনের ফলাফল থেকে পর্যবেক্ষকরা দেখেছেন যে, বিজেপির উচ্চকণ্ঠের সাম্প্রদায়িক প্রচার সব সময় ভোটে রূপান্তরিত হয় না। সেই নির্বাচনে তৃণমূল বড় ব্যবধানে আসনটি ধরে রেখেছিল এবং ২০২১ সালের তুলনায় বিজেপির ভোটের হারও কমে গিয়েছিল।
বহুমুখী লড়াই ও জাতীয় রাজনীতি
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সাধারণত একটি মাত্র বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় না। নিরাপত্তার এই বয়ান ভোটারদের একটি অংশকে প্রভাবিত করলেও, এটি একই সঙ্গে বাঙালি পরিচয়, বহুত্ববাদ এবং হয়রানির আশঙ্কায় পাল্টা জনমত তৈরি করতে পারে। এটি পুলিশের অতি-সক্রিয়তা বা আমলাতান্ত্রিক বঞ্চনার বিরুদ্ধেও জনরোষ তৈরি করতে পারে এবং প্রচারের অভিমুখকে চাকরি, মূল্যবৃদ্ধি ও জনকল্যাণের মতো সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যার দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে—যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস লড়াই করতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
তবে এই নিরাপত্তার রাজনীতি কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি যখন তাদের অবস্থান কঠোর করছে, তখন তৃণমূল কংগ্রেসের লক্ষ্য হলো সীমান্তের ওপারে একটি সাংস্কৃতিক সুসম্পর্ক ও আত্মবিশ্বাসের বার্তা দেওয়া। বাংলাদেশের নির্বাচনের পর বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোন করে অভিনন্দন জানানোকে সেই প্রতীকী প্রচেষ্টারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ
জাতীয় স্তরে ২০২৬ সালে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এমন কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে যার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও উত্তেজনা প্রশমন প্রয়োজন। বিশেষ করে গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি পার্লামেন্টে জানিয়েছে যে, এই চুক্তি নবায়নের আলোচনা এখনো প্রক্রিয়াধীন। যদি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় শত্রুতা এবং অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত বয়ানকে উসকে দেয়, তবে বাস্তবমুখী ও কূটনৈতিক আলোচনার পথ সংকীর্ণ হয়ে আসবে।
পশ্চিমবঙ্গে একটি বিদেশি নির্বাচনকে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ ‘নিরাপত্তা জরুরি অবস্থা’ তৈরির চেষ্টা চলছে, যা প্রকারান্তরে কঠোর শাসনকে বৈধতা দেয় এবং একই ভাষা ও ধর্মের ভারতীয় নাগরিকদের প্রতি সন্দেহের আঙুল তোলে। মে মাসের শুরুতে বিধানসভা নির্বাচন এবং ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে, এই নিরাপত্তা চক্র নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশিত।
লেখক: রাগিব আনজুম। ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স (ডাইরা)-এর গবেষণা সহকারী। তিনি ধর্ম, আদর্শ এবং রাজনীতির পারস্পরিক প্রভাব নিয়ে কাজ করেন।