চরচা ডেস্ক

আমেরিকা ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন সবার ধারণা ছিল ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেবে। কিন্তু এর দুই মাসও পেরোয়নি– ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় যাতায়াতকারী জাহাজ লক্ষ্য করে নিজস্ব অবরোধ আরোপ করলেন, যা ১৩ এপ্রিল কার্যকর হয়। বোমাবর্ষণে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্পের হিসাব হলো, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করলে হয়তো ইরান প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট একে বর্ণনা করেছে এক বিপজ্জনক জুয়া হিসেবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও গভীর করতে পারে এবং নতুন সংঘাতের পথ খুলে দিতে পারে।
আমেরিকার যুক্তি সহজ। ইরানের হুমকিতে হরমুজ দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কিন্তু ইরান নিজের তেল রপ্তানি করে যাচ্ছে–কম মাত্রায় হলেও। এ ছাড়া কিছু জাহাজকে শুল্ক দিলে যেতে দেওয়া হচ্ছে। ১১ এপ্রিল দুটি বড় চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত ট্যাংকার ইরাকি ও সৌদি তেল নিয়ে প্রণালি পার হয়েছে, একটি লাইবেরিয়ান পতাকাবাহী ট্যাংকারও পেরিয়েছে। ট্রাম্পের বার্তা হলো–নিরপেক্ষ পণ্যবাহী জাহাজ যদি বাধামুক্তভাবে যেতে না পারে, তাহলে ইরানের জাহাজও পারবে না। অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি বলেছেন, পরিকল্পনার সামরিক দিক একেবারে কার্যকর। আমেরিকা জাহাজ থামিয়ে জব্দ করতে পারে, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভেনেজুয়েলার সাথে সংযুক্ত দশটি ট্যাংকার ইতিমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। প্রতিটি জাহাজ ধরতে হবে না, বার্তাটি পাঠাতে কয়েকটিই যথেষ্ট।
তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক অনেক বেশি জটিল। লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দিয়ে বিশেষত পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে শান্তি আলোচনায় ছাড় আদায় করা। তাত্ত্বিকভাবে ইরান ঝুঁকিতে আছে। ডেটা প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সার আর্নেস্ট সেনসিয়ারের হিসাবে, বর্তমান অপরিশোধিত তেলের মজুত পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকর পূর্ণ অবরোধ শুরুর ২০ দিনের মধ্যে ইরানকে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে, এমনকি ১০ দিনের মধ্যেও। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবিন ব্রুকস যুক্তি দিয়েছেন, ইরানের তেল রপ্তানি ভেঙে পড়লে আমদানির জন্য অর্থ থাকবে না, অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হবে, মুদ্রার মান পড়বে এবং হাইপারইনফ্লেশন শুরু হবে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, এতে মোল্লারা সত্যিকারের আলোচনায় আসতে বাধ্য হবে।
কিন্তু সবাই এতটা আশাবাদী নন। বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এসফান্দিয়ার বাটমান্গেলিজ বলেছেন, ইরান ধরেই নিয়েছিল তার তেল রপ্তানি ব্যাহত হবে। যুদ্ধকালীন যেকোনো রপ্তানি ছিল বাড়তি পাওয়া। ২০২০ সালে ট্রাম্পের আগের অর্থনৈতিক চাপের সময় ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ২০১৮ সালের ২২ লাখ ব্যারেল থেকে নেমে ৪ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনে ঠেকেছিল। ইরান তখনো টিকে ছিল। এবারো মালয়েশিয়া ও চীনের উপকূলে ভাসমান স্টোরেজে রাখা প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রি করে, অর্থ ছাপিয়ে এবং আমদানিকারকদের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক ঋণ নিয়ে ছয় মাস পর্যন্ত চাপ সহ্য করতে পারবে।

ইরানের কিছু সমুদ্রপথনির্ভর আমদানি আছে। আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তার গমের পঞ্চমাংশ আসত। ব্রাজিল ও ইউক্রেন থেকে বেশির ভাগ ভুট্টা আসে উপসাগরের বন্দর দিয়ে। কিছু শস্য ক্যাস্পিয়ান বন্দর বা তুরস্ক ও মধ্য এশিয়া হয়ে রাশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে আসতে পারে, তবে বেশি খরচে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সয়াবিন–ইরানের প্রায় সমস্ত পশুখাদ্য ও উদ্ভিজ্জ তেল আমদানি করা উপকরণ থেকে তৈরি। যেকোনো বাধায় খাদ্যমূল্য রকেটের গতিতে বাড়বে, যা ইতিমধ্যে মার্চে এক বছর আগের তুলনায় ১১০ শতাংশ বেড়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব নিয়ে ইকোনমিস্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। ইরানি উৎপাদনের একা ক্ষতি বিপর্যয়কর নয়। কিন্তু প্রণালী প্রায় বন্ধ থাকায় আটকে পড়া উপসাগরীয় সরবরাহের বিশাল পরিমাণের সাথে যোগ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন। যুদ্ধবিরতি নড়বড়ে হয়ে পড়ায় ইরানের প্রণালী খুলে দেওয়ার কোনো প্রণোদনা নেই। বরং নিরপেক্ষ জাহাজে হামলা আবার শুরু করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ইরাক ৫ এপ্রিল যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো একটি জাহাজ মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাঠিয়েছে–এরকম দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি সংকটজনক হবে। এপ্রিলের শেষে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। সৌদি, ইউএই ও অন্যান্য উপসাগরীয় উৎপাদন স্থাপনায় ইরানি হামলার ঝুঁকি এবং ইয়েমেনের হুতিদের লোহিত সাগরে হামলার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিলে এই অবরোধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরেকটি বিশাল মূল্যবৃদ্ধি না ঘটিয়ে টিকে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

কূটনৈতিক জটিলতাও কম নয়। ভারত বলেছে তারা ইরানকে কোনো ফি দেয়নি– কিন্তু সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে অবরোধ সব দেশের জাহাজের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে প্রযোজ্য হবে, যা আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজনীয়তা। চীন, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডের তেলবাহী জাহাজও যুদ্ধবিরতির পর প্রণালী পেরিয়েছে। ফ্রান্স ও তুরস্ক–দুটিই মার্কিন মিত্র–আগে জাহাজ পাঠিয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি জাহাজ থামালেই হয়তো অন্যরা নিরুৎসাহিত হবে, কিন্তু তাতেও কিছু বন্ধু দেশ বিরক্ত হতে পারে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, চীন এই অবরোধ মেনে নেবে, কিন্তু তা মেনে নিলে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে–চীন দীর্ঘদিন ধরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের পরিস্থিতিতে মালাক্কা প্রণালী অবরোধের আশঙ্কা করে আসছে।
দ্য ইকোনমিস্ট তাদের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গভীর যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছে তা হলো আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। ট্রাম্প এক পর্যায়ে ইরানের সাথে যৌথভাবে হরমুজ নিয়ন্ত্রণের ধারণাও ব্যক্ত করেছিলেন, যা এই জলপথ পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক আইনকে সম্পূর্ণ উল্টে দিত। রয়্যাল নেভির সাবেক থিঙ্কট্যাংক প্রধান ও আরইউএসআই জার্নালের সম্পাদক কেভিন রোল্যান্ডসের কথায়, এটি নিয়মভিত্তিক শৃঙ্খলা বা আন্তর্জাতিক আইন বলে কিছু আছে এই ভাবনার কফিনে আরেকটি পেরেক। তিনি আরও বলেছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদী নাকি কিছুই না– এক সপ্তাহের জন্য কেউ অবরোধ করে না।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী মনে করে যুদ্ধে ইচ্ছাশক্তির প্রথম পরীক্ষায় তারা জিতেছে–বেঁচে আছে, পারমাণবিক উপকরণ ধরে রেখেছে এবং হরমুজের ওপর শক্ত মুঠো বজায় রেখেছে। তারা বিশ্বাস করে এবারও ট্রাম্পকে পরাজিত করতে পারবে। দ্য ইকোনমিস্টের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, যদি ট্রাম্প ইরানে মুদ্রার সরবরাহ বন্ধ করে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারেন, একই সাথে তেলের মূল্যের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, সামরিক উত্তেজনা সীমিত রাখতে পারেন এবং বহুজাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে জটিল কূটনীতি সামলাতে পারেন–তাহলেই কেবল আলোচনায় ভালো অবস্থানে ফিরতে পারবেন। কিন্তু এই সব শর্ত একসাথে পূরণ করা কার্যত অসম্ভবের কাছাকাছি।

আমেরিকা ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন সবার ধারণা ছিল ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেবে। কিন্তু এর দুই মাসও পেরোয়নি– ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় যাতায়াতকারী জাহাজ লক্ষ্য করে নিজস্ব অবরোধ আরোপ করলেন, যা ১৩ এপ্রিল কার্যকর হয়। বোমাবর্ষণে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্পের হিসাব হলো, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করলে হয়তো ইরান প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট একে বর্ণনা করেছে এক বিপজ্জনক জুয়া হিসেবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও গভীর করতে পারে এবং নতুন সংঘাতের পথ খুলে দিতে পারে।
আমেরিকার যুক্তি সহজ। ইরানের হুমকিতে হরমুজ দিয়ে ট্যাংকার চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কিন্তু ইরান নিজের তেল রপ্তানি করে যাচ্ছে–কম মাত্রায় হলেও। এ ছাড়া কিছু জাহাজকে শুল্ক দিলে যেতে দেওয়া হচ্ছে। ১১ এপ্রিল দুটি বড় চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত ট্যাংকার ইরাকি ও সৌদি তেল নিয়ে প্রণালি পার হয়েছে, একটি লাইবেরিয়ান পতাকাবাহী ট্যাংকারও পেরিয়েছে। ট্রাম্পের বার্তা হলো–নিরপেক্ষ পণ্যবাহী জাহাজ যদি বাধামুক্তভাবে যেতে না পারে, তাহলে ইরানের জাহাজও পারবে না। অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি বলেছেন, পরিকল্পনার সামরিক দিক একেবারে কার্যকর। আমেরিকা জাহাজ থামিয়ে জব্দ করতে পারে, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভেনেজুয়েলার সাথে সংযুক্ত দশটি ট্যাংকার ইতিমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। প্রতিটি জাহাজ ধরতে হবে না, বার্তাটি পাঠাতে কয়েকটিই যথেষ্ট।
তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক অনেক বেশি জটিল। লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দিয়ে বিশেষত পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে শান্তি আলোচনায় ছাড় আদায় করা। তাত্ত্বিকভাবে ইরান ঝুঁকিতে আছে। ডেটা প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সার আর্নেস্ট সেনসিয়ারের হিসাবে, বর্তমান অপরিশোধিত তেলের মজুত পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকর পূর্ণ অবরোধ শুরুর ২০ দিনের মধ্যে ইরানকে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে পারে, এমনকি ১০ দিনের মধ্যেও। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবিন ব্রুকস যুক্তি দিয়েছেন, ইরানের তেল রপ্তানি ভেঙে পড়লে আমদানির জন্য অর্থ থাকবে না, অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হবে, মুদ্রার মান পড়বে এবং হাইপারইনফ্লেশন শুরু হবে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, এতে মোল্লারা সত্যিকারের আলোচনায় আসতে বাধ্য হবে।
কিন্তু সবাই এতটা আশাবাদী নন। বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এসফান্দিয়ার বাটমান্গেলিজ বলেছেন, ইরান ধরেই নিয়েছিল তার তেল রপ্তানি ব্যাহত হবে। যুদ্ধকালীন যেকোনো রপ্তানি ছিল বাড়তি পাওয়া। ২০২০ সালে ট্রাম্পের আগের অর্থনৈতিক চাপের সময় ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ২০১৮ সালের ২২ লাখ ব্যারেল থেকে নেমে ৪ লাখ ব্যারেল প্রতিদিনে ঠেকেছিল। ইরান তখনো টিকে ছিল। এবারো মালয়েশিয়া ও চীনের উপকূলে ভাসমান স্টোরেজে রাখা প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রি করে, অর্থ ছাপিয়ে এবং আমদানিকারকদের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক ঋণ নিয়ে ছয় মাস পর্যন্ত চাপ সহ্য করতে পারবে।

ইরানের কিছু সমুদ্রপথনির্ভর আমদানি আছে। আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তার গমের পঞ্চমাংশ আসত। ব্রাজিল ও ইউক্রেন থেকে বেশির ভাগ ভুট্টা আসে উপসাগরের বন্দর দিয়ে। কিছু শস্য ক্যাস্পিয়ান বন্দর বা তুরস্ক ও মধ্য এশিয়া হয়ে রাশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে আসতে পারে, তবে বেশি খরচে। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সয়াবিন–ইরানের প্রায় সমস্ত পশুখাদ্য ও উদ্ভিজ্জ তেল আমদানি করা উপকরণ থেকে তৈরি। যেকোনো বাধায় খাদ্যমূল্য রকেটের গতিতে বাড়বে, যা ইতিমধ্যে মার্চে এক বছর আগের তুলনায় ১১০ শতাংশ বেড়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব নিয়ে ইকোনমিস্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। ইরানি উৎপাদনের একা ক্ষতি বিপর্যয়কর নয়। কিন্তু প্রণালী প্রায় বন্ধ থাকায় আটকে পড়া উপসাগরীয় সরবরাহের বিশাল পরিমাণের সাথে যোগ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন। যুদ্ধবিরতি নড়বড়ে হয়ে পড়ায় ইরানের প্রণালী খুলে দেওয়ার কোনো প্রণোদনা নেই। বরং নিরপেক্ষ জাহাজে হামলা আবার শুরু করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ইরাক ৫ এপ্রিল যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো একটি জাহাজ মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাঠিয়েছে–এরকম দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি সংকটজনক হবে। এপ্রিলের শেষে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। সৌদি, ইউএই ও অন্যান্য উপসাগরীয় উৎপাদন স্থাপনায় ইরানি হামলার ঝুঁকি এবং ইয়েমেনের হুতিদের লোহিত সাগরে হামলার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিলে এই অবরোধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আরেকটি বিশাল মূল্যবৃদ্ধি না ঘটিয়ে টিকে থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

কূটনৈতিক জটিলতাও কম নয়। ভারত বলেছে তারা ইরানকে কোনো ফি দেয়নি– কিন্তু সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে অবরোধ সব দেশের জাহাজের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে প্রযোজ্য হবে, যা আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজনীয়তা। চীন, পাকিস্তান, থাইল্যান্ডের তেলবাহী জাহাজও যুদ্ধবিরতির পর প্রণালী পেরিয়েছে। ফ্রান্স ও তুরস্ক–দুটিই মার্কিন মিত্র–আগে জাহাজ পাঠিয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি জাহাজ থামালেই হয়তো অন্যরা নিরুৎসাহিত হবে, কিন্তু তাতেও কিছু বন্ধু দেশ বিরক্ত হতে পারে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, চীন এই অবরোধ মেনে নেবে, কিন্তু তা মেনে নিলে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে–চীন দীর্ঘদিন ধরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের পরিস্থিতিতে মালাক্কা প্রণালী অবরোধের আশঙ্কা করে আসছে।
দ্য ইকোনমিস্ট তাদের বিশ্লেষণে সবচেয়ে গভীর যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছে তা হলো আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। ট্রাম্প এক পর্যায়ে ইরানের সাথে যৌথভাবে হরমুজ নিয়ন্ত্রণের ধারণাও ব্যক্ত করেছিলেন, যা এই জলপথ পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক আইনকে সম্পূর্ণ উল্টে দিত। রয়্যাল নেভির সাবেক থিঙ্কট্যাংক প্রধান ও আরইউএসআই জার্নালের সম্পাদক কেভিন রোল্যান্ডসের কথায়, এটি নিয়মভিত্তিক শৃঙ্খলা বা আন্তর্জাতিক আইন বলে কিছু আছে এই ভাবনার কফিনে আরেকটি পেরেক। তিনি আরও বলেছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদী নাকি কিছুই না– এক সপ্তাহের জন্য কেউ অবরোধ করে না।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী মনে করে যুদ্ধে ইচ্ছাশক্তির প্রথম পরীক্ষায় তারা জিতেছে–বেঁচে আছে, পারমাণবিক উপকরণ ধরে রেখেছে এবং হরমুজের ওপর শক্ত মুঠো বজায় রেখেছে। তারা বিশ্বাস করে এবারও ট্রাম্পকে পরাজিত করতে পারবে। দ্য ইকোনমিস্টের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, যদি ট্রাম্প ইরানে মুদ্রার সরবরাহ বন্ধ করে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারেন, একই সাথে তেলের মূল্যের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, সামরিক উত্তেজনা সীমিত রাখতে পারেন এবং বহুজাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে জটিল কূটনীতি সামলাতে পারেন–তাহলেই কেবল আলোচনায় ভালো অবস্থানে ফিরতে পারবেন। কিন্তু এই সব শর্ত একসাথে পূরণ করা কার্যত অসম্ভবের কাছাকাছি।