Advertisement Banner

ট্রাম্পের চীন সফর কেবলই ‘মুখ রক্ষার’ চেষ্টা

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্পের চীন সফর কেবলই ‘মুখ রক্ষার’ চেষ্টা
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরটি আসলে ওয়াশিংটনের নিজস্ব ভুল পররাষ্ট্রনীতির কারণে সৃষ্ট সংকট থেকে ‘মুখ রক্ষা’ করার একটি মরিয়া চেষ্টা মাত্র। বিশিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইউটিউব হোস্ট ড্যানি হাইফং রুশ সংবাদমাধ্যম আরটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতেই ট্রাম্প বেইজিংয়ের শরণাপন্ন হয়েছেন।

বর্তমানে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ময়দানে চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের বিপর্যস্ত অর্থনীতি এবং ক্ষয়িষ্ণু বৈশ্বিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে ওয়াশিংটন এখন বেইজিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর ১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ট্রাম্পের এই বহুল আলোচিত চীন সফর অনুষ্ঠিত হলেও, গত শুক্রবার সফর শেষে কোনো বড় ধরনের চুক্তি বা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, যা হাইফং-এর এই দাবিকে আরও জোরালো করে তুলেছে।

আরটি-র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে গত কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তপ্ত। বিশেষ করে গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের কারণে দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে সাময়িক চুক্তির মাধ্যমে কিছুটা শিথিল হয়। ড্যানি হাইফং আরটি-র কাছে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, মার্কিন প্রতিনিধিদল মূলত চীনে এসেছিল তাদের নিজেদের তৈরি করা সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশায়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ইরান হামলা বিশ্বজুড়ে যে ভয়াবহ সংকটের জন্ম দিয়েছে, তার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকেই।

ইরানের এই যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই সরবরাহ লাইন অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। হাইফং-এর মতে, ট্রাম্প নিজেই এই বৈঠকের জন্য বেইজিংয়ের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, কারণ এই উত্তপ্ত ও বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে ঠান্ডা করার জন্য চীনের সহযোগিতা ছাড়া মার্কিন প্রশাসনের কাছে আর কোনো বিকল্প ছিল না।

বিশ্লেষক হাইফং আরটি-র সাথে আলাপে আরও বলেছেন যে, এই হাই-প্রোফাইল সফরে ট্রাম্প একা আসেননি, বরং তার সাথে স্পেসএক্স ও টেসলার ইলন মাস্ক এবং বোয়িংয়ের কেলি অর্টবার্গের মতো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন করপোরেট নির্বাহীদের একটি বিশাল দল ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন এবং এই শীর্ষ ব্যবসায়ীরা মূলত চীনের কাছে হাত পাততে এসেছিলেন, যেন চীন এমন কিছু বাণিজ্য সুবিধা বা চুক্তি দেয় যা মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করতে পারে।

তবে পুরো সম্মেলনটি মার্কিন জনগণের চোখে শক্তি প্রদর্শনের একটি সাজানো নাটক বা ‘অপটিক্স’ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হাইফং মনে করেন, ওয়াশিংটন যদি তার আক্রমণাত্মক সামরিক মনোভাব ও হুমকি-ধমকি বন্ধ না করে এবং বড় ধরনের নীতিগত ছাড় না দেয়, তবে দুই দেশের সম্পর্কের কোনো প্রকৃত উন্নতি হবে না। আরটি-র কাছে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে গেছে; যুক্তরাষ্ট্র এখন অত্যন্ত দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং চীন অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে নিজের অস্তিত্ব টেকানোর স্বার্থেই ট্রাম্পকে চীনের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হচ্ছে।

অবশ্য আরটি-র প্রতিবেদনে দেখা যায়, সফর শেষে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে এই তিক্ততার বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে এই আলোচনাকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সি চিনপিং জানিয়েছেন যে, দুই পক্ষ আগামী বছরগুলোর জন্য একটি ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, এই আলোচনার মাধ্যমে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব হয়েছে। তবে এই বাহ্যিক সৌজন্যতার আড়ালে গভীর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আরটি-র তথ্যমতে, সি চিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, তাইওয়ান ইস্যুতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে তা সরাসরি সংঘাত ও সশস্ত্র সংঘর্ষের দিকে রূপ নিতে পারে। স্বশাসিত এই দ্বীপটিকে চীন নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করলেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে একে সামরিক অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে, যা বেইজিংয়ের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

সামগ্রিকভাবে, আরটি-তে প্রকাশিত ড্যানি হাইফং-এর এই বিশ্লেষণটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ট্রাম্পের এই চীন সফর কোনো দ্বিপাক্ষিক শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়া একটি পরাশক্তির আত্মরক্ষার মরিয়া চেষ্টা। ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি হয়েছে, তা থেকে মার্কিন অর্থনীতিকে বাঁচাতে বেইজিংয়ের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ছাড়ের প্রয়োজন ছিল ওয়াশিংটনের।

কিন্তু চীন তাইওয়ান ইস্যু সহ নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করায় ট্রাম্প প্রশাসনকে বড় কোনো চুক্তি ছাড়াই খালি হাতে বা নিছক কিছু কূটনৈতিক আশ্বাস নিয়ে ফিরতে হয়েছে। আরটি-র এই প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে মার্কিন আধিপত্যের দিন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে এবং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে চীন এখন অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে।

সম্পর্কিত