আল জাজিরার বিশ্লেষণ
চরচা ডেস্ক

গত বছরের মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় সেখানকার নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই অঞ্চলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন যুগের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এই নীতি কোনো দেশ বা তার শাসনব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর বা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে না।
তার পূর্বসূরি ‘যুদ্ধবাজ নেতাদের’ সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, তথাকথিত ‘জাতি-নির্মাতারা’ দেশ গড়ার চেয়ে তা ধ্বংসই করেছেন বেশি। আর ওই হস্তক্ষেপকারীরা এমন সব জটিল সমাজের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছিলেন, যা তারা নিজেরাও ঠিকমতো বুঝতেন না।”
এক বছরের কম সময়ের ব্যবধানেই ট্রাম্প ইরানে এক ভয়াবহ হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। এই অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে তিনি দেশটিতে ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। মজার ব্যাপার হলো, তিনি ঠিক সেই সব রক্ষণশীল নেতাদের (যেমন: সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ) ভাষা ব্যবহার করেন, যাদের তিনি সারাজীবন সমালোচনা করে এসেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের নিজের আদর্শ, নীতি বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সাথে মোটেও খাপ খায় না।
বরং বেশ কয়েকজন ইরান বিশেষজ্ঞ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে এমন এক যুদ্ধ লড়ছেন, যা কেবল ইসরায়েল এবং এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুরই উপকারে আসবে।
ওয়াশিংটনের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’-র সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, “এটি আসলে ইসরায়েলের প্ররোচনায় আমেরিকার শুরু করা একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ। মূলত ইসরায়েলেরই যুদ্ধ, যা আমেরিকা লড়ছে। গত দুই দশক ধরে ইসরায়েল আমেরিকাকে দিয়ে ইরানে হামলা করানোর চেষ্টা করছিল, অবশেষে তারা সফল হলো।”
মোর্তাজাভি আরও মনে করিয়ে দেন, ট্রাম্প একসময় তার পূর্বসূরিদের কড়া সমালোচনা করতেন। কারণ তারা ভিনদেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ বাধাতেন। তিনি আল জাজিরাকে আরও বলেন, “বিষয়টি বেশ বিদ্রূপাত্মক। কারণ এই প্রেসিডেন্টই নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে দাবি করেন।”
ইরানের ‘হুমকি’ নিয়ে সতর্কবার্তার ইতিহাস
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তিনি গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের এক যুদ্ধে আমেরিকা ইরানের প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলা চালায়। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধূলিসাৎ’ হয়ে গেছে। এরপরই নেতানিয়াহু ইরানের তথাকথিত নতুন এক হুমকির দিকে নজর ঘোরান; আর তা হলো—তেহরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র।
অক্টোবরে ইসরায়েলপন্থী পডকাস্টার বেন শাপিরোকে নেতানিয়াহু বলেন, “ইরান আমেরিকার যেকোনো শহরকে জিম্মি করতে পারে। মানুষ এটা বিশ্বাস করতে চায় না, কিন্তু ইরান ৮ হাজার কিলোমিটার পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর সাথে আরও ৩ হাজার কিলোমিটার যোগ করলেই তারা আমেরিকার পূর্ব উপকূলে পৌঁছে যাবে।”

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ট্রাম্প তার ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে এই একই দাবির পুনরাবৃত্তি করেন। যদিও তেহরান এই দাবি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে এবং এর স্বপক্ষে কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ বা পরীক্ষার খবরও পাওয়া যায়নি।
ইরানিদের নিয়ে ট্রাম্প বলেন, “তারা ইতিমধ্যেই এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা ইউরোপ এবং আমাদের বিদেশি ঘাঁটিগুলোর জন্য হুমকি। এখন তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর কাজ করছে যা খুব শীঘ্রই খোদ আমেরিকায় আঘাত হানতে পারবে।”
গত জুনের সংঘাতের পর থেকেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড়সড় যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করছেন এবং বারবার দেশটিতে আবারও বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন।
অথচ গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’-এ বলা হয়েছিল যে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যকে আর আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হবে না; বরং পশ্চিম গোলার্ধের দিকে বেশি নজর দেওয়া হবে।
এদিকে, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আমেরিকার সাধারণ মানুষও নতুন কোনো বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ে বেশ সতর্ক। জনমত জরিপ বলছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার ঘোর বিরোধী। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পাল্টা জবাব দিতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর ফলে পুরো অঞ্চল এক চরম অরাজকতার মধ্যে পড়ে যায়।
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, এই লড়াইয়ে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটতে পারে। শনিবার তিনি বলেন, “যুদ্ধে এমনটা প্রায়ই ঘটে। তবে আমরা এটা বর্তমানের কথা ভেবে করছি না, করছি ভবিষ্যতের জন্য। আর এটি একটি মহৎ উদ্দেশ্য।”
অধিকাংশ আমেরিকানের মতামতকে তোয়াক্কা না করা
চলতি মাসের শুরুর দিকে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় বসে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসার একটি আভাস দিয়েছিল।
গত এক সপ্তাহে আমেরিকা ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে তিন দফা বৈঠক হয়। সেখানে ইরান জোর দিয়ে জানায় যে, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যেকোনো ধরনের কঠোর তদারকি বা পরিদর্শনের অনুমতি দিতে রাজি আছে।
ওমানি মধ্যস্থতাকারী এবং ইরানি কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবারের শেষ ধাপের আলোচনাকে ‘ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এই বৈঠক থেকে বেশ বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধটিও শুরু হয়েছিল আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলাকালীন সময়ে, যার সূত্রপাত করেছিল ইসরায়েল—তাও কোনো উসকানি ছাড়াই।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি আল জাজিরাকে বলেন, “নেতানিয়াহুর লক্ষ্য সবসময়ই ছিল কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দেওয়া। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে, ট্রাম্প হয়তো সত্যিই কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে সিরিয়াস। তাই আলোচনার মাঝপথে এই যুদ্ধ শুরু হওয়াটা তার জন্য একটি বড় সাফল্য, ঠিক গত জুনের মতোই।”

আবদি আরও বলেন, “ট্রাম্পের মুখে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ বুলি মূলত নেতানিয়াহুরই জয় এবং আমেরিকান জনগণের জন্য পরাজয়। কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে যে, আমেরিকা হয়তো দীর্ঘস্থায়ী এবং অনিশ্চিত এক অর্থহীন সামরিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ছে।”
শনিবার হামলার ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, তার মূল লক্ষ্য হলো ইরান যাতে আমেরিকা এবং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল স্বার্থগুলোর জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা।
তবে ট্রাম্পের নিজস্ব ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (সবার আগে আমেরিকা) আন্দোলনের অনেক সমর্থক এবং মার্কিন সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে থাকা ইরান আমেরিকার জন্য কোনো বড় হুমকিই নয়।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি রক্ষণশীল ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে বলেছিলেন, “ইরান না থাকলে হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব থাকত না; আর লেবানন সীমান্তে আমাদের কোনো সমস্যাও হতো না।”
জবাবে কার্লসন বলেন, “লেবানন সীমান্তে আবার কীসের সমস্যা? আমি একজন আমেরিকান। লেবানন সীমান্ত নিয়ে আমার বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই। আমি মেইন অঙ্গরাজ্যে থাকি।”
শনিবার কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তলাইব জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ট্রাম্প মার্কিন রাজনৈতিক উচ্চবিত্ত শ্রেণি এবং ইসরায়েলি বর্ণবাদী সরকারের সংঘাতময় কল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করছেন। তিনি সেই বিশাল সংখ্যক আমেরিকানদের কথা পাত্তাই দিচ্ছেন না, যারা পরিষ্কারভাবে বলছেন, “আর কোনো যুদ্ধ নয়।”

গত বছরের মে মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় সেখানকার নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই অঞ্চলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন যুগের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এই নীতি কোনো দেশ বা তার শাসনব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর বা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হবে না।
তার পূর্বসূরি ‘যুদ্ধবাজ নেতাদের’ সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, তথাকথিত ‘জাতি-নির্মাতারা’ দেশ গড়ার চেয়ে তা ধ্বংসই করেছেন বেশি। আর ওই হস্তক্ষেপকারীরা এমন সব জটিল সমাজের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছিলেন, যা তারা নিজেরাও ঠিকমতো বুঝতেন না।”
এক বছরের কম সময়ের ব্যবধানেই ট্রাম্প ইরানে এক ভয়াবহ হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। এই অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে তিনি দেশটিতে ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। মজার ব্যাপার হলো, তিনি ঠিক সেই সব রক্ষণশীল নেতাদের (যেমন: সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ) ভাষা ব্যবহার করেন, যাদের তিনি সারাজীবন সমালোচনা করে এসেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের নিজের আদর্শ, নীতি বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সাথে মোটেও খাপ খায় না।
বরং বেশ কয়েকজন ইরান বিশেষজ্ঞ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে এমন এক যুদ্ধ লড়ছেন, যা কেবল ইসরায়েল এবং এর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুরই উপকারে আসবে।
ওয়াশিংটনের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’-র সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, “এটি আসলে ইসরায়েলের প্ররোচনায় আমেরিকার শুরু করা একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ। মূলত ইসরায়েলেরই যুদ্ধ, যা আমেরিকা লড়ছে। গত দুই দশক ধরে ইসরায়েল আমেরিকাকে দিয়ে ইরানে হামলা করানোর চেষ্টা করছিল, অবশেষে তারা সফল হলো।”
মোর্তাজাভি আরও মনে করিয়ে দেন, ট্রাম্প একসময় তার পূর্বসূরিদের কড়া সমালোচনা করতেন। কারণ তারা ভিনদেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ বাধাতেন। তিনি আল জাজিরাকে আরও বলেন, “বিষয়টি বেশ বিদ্রূপাত্মক। কারণ এই প্রেসিডেন্টই নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে দাবি করেন।”
ইরানের ‘হুমকি’ নিয়ে সতর্কবার্তার ইতিহাস
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তিনি গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির একেবারে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের এক যুদ্ধে আমেরিকা ইরানের প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলা চালায়। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ওই হামলায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধূলিসাৎ’ হয়ে গেছে। এরপরই নেতানিয়াহু ইরানের তথাকথিত নতুন এক হুমকির দিকে নজর ঘোরান; আর তা হলো—তেহরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র।
অক্টোবরে ইসরায়েলপন্থী পডকাস্টার বেন শাপিরোকে নেতানিয়াহু বলেন, “ইরান আমেরিকার যেকোনো শহরকে জিম্মি করতে পারে। মানুষ এটা বিশ্বাস করতে চায় না, কিন্তু ইরান ৮ হাজার কিলোমিটার পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর সাথে আরও ৩ হাজার কিলোমিটার যোগ করলেই তারা আমেরিকার পূর্ব উপকূলে পৌঁছে যাবে।”

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ট্রাম্প তার ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে এই একই দাবির পুনরাবৃত্তি করেন। যদিও তেহরান এই দাবি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে এবং এর স্বপক্ষে কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ বা পরীক্ষার খবরও পাওয়া যায়নি।
ইরানিদের নিয়ে ট্রাম্প বলেন, “তারা ইতিমধ্যেই এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা ইউরোপ এবং আমাদের বিদেশি ঘাঁটিগুলোর জন্য হুমকি। এখন তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর কাজ করছে যা খুব শীঘ্রই খোদ আমেরিকায় আঘাত হানতে পারবে।”
গত জুনের সংঘাতের পর থেকেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড়সড় যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করছেন এবং বারবার দেশটিতে আবারও বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন।
অথচ গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল’-এ বলা হয়েছিল যে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যকে আর আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হবে না; বরং পশ্চিম গোলার্ধের দিকে বেশি নজর দেওয়া হবে।
এদিকে, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আমেরিকার সাধারণ মানুষও নতুন কোনো বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ে বেশ সতর্ক। জনমত জরিপ বলছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার ঘোর বিরোধী। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২১ শতাংশ মানুষ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পাল্টা জবাব দিতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর ফলে পুরো অঞ্চল এক চরম অরাজকতার মধ্যে পড়ে যায়।
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে, এই লড়াইয়ে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটতে পারে। শনিবার তিনি বলেন, “যুদ্ধে এমনটা প্রায়ই ঘটে। তবে আমরা এটা বর্তমানের কথা ভেবে করছি না, করছি ভবিষ্যতের জন্য। আর এটি একটি মহৎ উদ্দেশ্য।”
অধিকাংশ আমেরিকানের মতামতকে তোয়াক্কা না করা
চলতি মাসের শুরুর দিকে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায় বসে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসার একটি আভাস দিয়েছিল।
গত এক সপ্তাহে আমেরিকা ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে তিন দফা বৈঠক হয়। সেখানে ইরান জোর দিয়ে জানায় যে, তারা তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যেকোনো ধরনের কঠোর তদারকি বা পরিদর্শনের অনুমতি দিতে রাজি আছে।
ওমানি মধ্যস্থতাকারী এবং ইরানি কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবারের শেষ ধাপের আলোচনাকে ‘ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এই বৈঠক থেকে বেশ বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধটিও শুরু হয়েছিল আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলাকালীন সময়ে, যার সূত্রপাত করেছিল ইসরায়েল—তাও কোনো উসকানি ছাড়াই।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি আল জাজিরাকে বলেন, “নেতানিয়াহুর লক্ষ্য সবসময়ই ছিল কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করে দেওয়া। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে, ট্রাম্প হয়তো সত্যিই কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে সিরিয়াস। তাই আলোচনার মাঝপথে এই যুদ্ধ শুরু হওয়াটা তার জন্য একটি বড় সাফল্য, ঠিক গত জুনের মতোই।”

আবদি আরও বলেন, “ট্রাম্পের মুখে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ বুলি মূলত নেতানিয়াহুরই জয় এবং আমেরিকান জনগণের জন্য পরাজয়। কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে যে, আমেরিকা হয়তো দীর্ঘস্থায়ী এবং অনিশ্চিত এক অর্থহীন সামরিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ছে।”
শনিবার হামলার ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, তার মূল লক্ষ্য হলো ইরান যাতে আমেরিকা এবং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল স্বার্থগুলোর জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা।
তবে ট্রাম্পের নিজস্ব ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (সবার আগে আমেরিকা) আন্দোলনের অনেক সমর্থক এবং মার্কিন সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে থাকা ইরান আমেরিকার জন্য কোনো বড় হুমকিই নয়।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি রক্ষণশীল ধারাভাষ্যকার টাকার কার্লসনকে বলেছিলেন, “ইরান না থাকলে হিজবুল্লাহর অস্তিত্ব থাকত না; আর লেবানন সীমান্তে আমাদের কোনো সমস্যাও হতো না।”
জবাবে কার্লসন বলেন, “লেবানন সীমান্তে আবার কীসের সমস্যা? আমি একজন আমেরিকান। লেবানন সীমান্ত নিয়ে আমার বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই। আমি মেইন অঙ্গরাজ্যে থাকি।”
শনিবার কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তলাইব জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন জনগণ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ট্রাম্প মার্কিন রাজনৈতিক উচ্চবিত্ত শ্রেণি এবং ইসরায়েলি বর্ণবাদী সরকারের সংঘাতময় কল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করছেন। তিনি সেই বিশাল সংখ্যক আমেরিকানদের কথা পাত্তাই দিচ্ছেন না, যারা পরিষ্কারভাবে বলছেন, “আর কোনো যুদ্ধ নয়।”