Advertisement Banner

পশ্চিমবঙ্গ: বিজেপির জয় যে ইঙ্গিত দিচ্ছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গ: বিজেপির জয় যে ইঙ্গিত দিচ্ছে
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জনসভা। ছবি: ফেসবুক

ভারতের চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটের ফল বেরিয়েছে আজ সোমবার (৪ মে)। এরমধ্যে সবার নজর ছিল পশ্চিমবঙ্গের দিকে। সেখানে পদ্মফুল (বিজেপি) এবার ঘাসফুলকে (তৃণমূল কংগ্রেস) নিশ্চিহ্ন করতে পারবে কি না, এ নিয়ে তরজা জমে উঠেছিল গত বেশ কয়েক দিন।

ভোট পরবর্তী বুথ ফেরত ভোটারের মতামত জরিপ বা এক্সিট পোলের হিসাব মমতার রাজ্যে মিলবে কি না, তা নিয়ে যুক্তি–পাল্টা যুক্তি কম শোনা যায়নি। কিন্তু বেলা গড়ানোর সাথে সাথে পদ্মের গেরুয়া ঢেউ যে এভাবে সুনামি হয়ে ফিরে আসবে, তা অতি বড় বিজেপির সমর্থকও ভাবেননি। প্রত্যাবর্তনকে গঙ্গায় ডুবিয়ে পরিবর্তনের ঝড়ো বাতাস পশ্চিমবঙ্গের সব হিসাবকে একেবারে বদলে দিয়েছে।

গণনার সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী, ২৯৩ (মোট আসন ২৯৪) আসনের মধ্যে বিজেপি একাই জিতেছে ২০০-র বেশি আসন। অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জিতে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় বসতে চলেছে বিজেপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের এই অবসান। সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল এবং সকাল থেকেই গণনার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজ্যে সরকার গঠনের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছে। তবে এই জয় কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়। বরং এটি পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামোর এক আমূল রূপান্তর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

৪ মে সকাল ১১টার পর থেকে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, রাজ্যজুড়ে এক প্রবল ‘গেরুয়া সুনামি’ আছড়ে পড়েছে, যা তৃণমূলের দুর্ভেদ্য হিসেবে পরিচিত দুর্গগুলোকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের এই বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে, ভোটারদের ব্যাপক মেরুকরণ এবং তৃণমূলের দীর্ঘদিনের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে ফাটল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের এই পতনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়েছে তাদের এক সময়ের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে। বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি ও জঙ্গলমহলের মতো জেলাগুলোতে এক সময় তৃণমূলের আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। সেখানে এবার বিজেপি অভাবনীয় ভালো ফল করেছে। জঙ্গলমহলের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার চিত্রটি অত্যন্ত পরিষ্কার।

এই ভূখণ্ডগত বিজয় প্রমাণ করে যে, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল স্তরের রাজনীতিতে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। যে গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে ভোট ব্যাংক একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্তির উৎস ছিল, আজ সেই ভোটাররাই পরিবর্তনের আশায় বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং তৃণমূলের দীর্ঘদিনের হেজিমনি বা একাধিপত্যের অবসান।

ভোটের জনসংখ্যাভিত্তিক বা ডেমোগ্রাফিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৃণমূলের যে রাজনৈতিক সমীকরণ গত এক দশক ধরে তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছিল, তা এবার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান দুটি স্তম্ভ ছিল–নারী ভোটারদের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সুসংহত মুসলিম ভোটব্যাংক। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এই দুই স্তম্ভই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিন্দু ভোটের প্রায় ৬৫ শতাংশ। এটি একচেটিয়াভাবে বিজেপির পক্ষে গেছে। এই নজিরবিহীন মেরুকরণ রাজ্যের প্রথাগত জাতিগত এবং আঞ্চলিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছে।

অন্যদিকে, যে মুসলমান ভোটব্যাংকের ওপর তৃণমূল টিকে থাকার বাজি ধরেছিল, সেখানে ব্যাপক বিভাজন দেখা দিয়েছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আশা করেছিল যে, ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত ইস্যুর পর সংখ্যালঘু ভোট একতরফাভাবে তাদের দিকে আসবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে হাই-মাইনোরিটি বা সংখ্যালঘু প্রধান আসনগুলোতে তৃণমূল প্রার্থীরা শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছেন, যার সরাসরি সুবিধা পেয়েছে বিজেপি।

সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা দিয়েছে তৃণমূলের ‘জনকল্যাণমূলক জনমোহিনী নীতি’র ব্যর্থতা। নির্বাচনের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুদান বাড়ানো বা যুবসাথী প্রকল্পের মাধ্যমে নগদ টাকা হস্তান্তরের যে কৌশল তৃণমূল নিয়েছিল, তা ব্যালট বক্সে ভোট টানতে ব্যর্থ হয়েছে। তৃণমূল ভেবেছিল যে, অর্থনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া বা অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি রুখে দিতে পারবে। কিন্তু ভোটের প্রবণতা বলছে, নারী ভোটাররা এবার দুর্নীতির ইস্যু এবং স্থানীয় স্তরের ক্ষোভকে নগদ প্রাপ্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। একেবারে মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং দীর্ঘদিনের শাসনজনিত ক্লান্তি এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে, ৫০০ বা ১০০০ টাকার অতিরিক্ত অনুদান সেই ক্ষোভ প্রশমন করতে পারেনি। বেকারত্বের সমস্যায় জর্জরিত যুবসমাজও বিজেপির ‘পরিবর্তন’-এর ডাকে সাড়া দিয়ে তৃণমূলের হাত ছেড়েছে।

শুভেন্দু অধিকারী।
শুভেন্দু অধিকারী।

গণনা শুরুর সাথে সাথেই কলকাতার কালীঘাটে তৃণমূলের সদর দপ্তরে (মমতার বাসভবনও সেখানে) শ্মশানের নীরবতা নেমে আসে। ঠিক তার বিপরীতে চিত্র ছিল বিজেপির রাজ্য দপ্তরে, শুরু থেকেই বিজয়োল্লাস। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ডিএনএ-তে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, তা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ফলাফল কেবল একটি দলের জয় নয়, বরং এটি বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

হিন্দু ভোট সুসংহত করে এবং বিরোধী ভোটের বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি পূর্ব ভারতের এই শেষ বড় দুর্গ জয় করতে সক্ষম হয়েছে। গত ১৫ বছর ধরে যে শাসনব্যবস্থা বাংলাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তার এই নাটকীয় পতন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। এটি স্পষ্ট যে, বাংলা এখন এক নতুন রাজনৈতিক দিশার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সমীকরণগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

অন্য চার ভোট

পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যে তিন রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোট সেখানে আসাম, কেরালা ও পুদুচেরিতে প্রত্যাশিত ফলই এসেছে। আসাম ও পুদুচেরিতে বিজেপি জোট এবং কেরালায় কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় আসতে চলেছে। এরমধ্যে ব্যতিক্রম শুধু তামিলনাড়ু। ওই রাজ্যের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিলেও বেছে নিয়েছেন রাজনীতি একেবারে আনকোরা যোশেফ বিজয়কে।

বিজয়ের অন্য পরিচয় হলো, তিনি তামিল সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। প্রতি সিনেমায় যার পারিশ্রমিক ছিল ভারতের যেকোনো অভিনেতা-অভিনত্রীর চেয়ে বেশি। রুপালি জগতকে পুরোপুরি বিদায় জানিয়ে রাজনীতিতে আসা বিজয় মাত্র দু বছরের মধ্যে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করে ফেললেন। বিজয় এখন জননায়ক। ফলে তামিলনাড়ুর স্থানীয় রাজনীতি আবার ফিরে গেল রুপালি জগতের তারকার হাতে।

সম্পর্কিত