চরচা ডেস্ক

“আমেরিকার মতো!”–উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে এভাবেই বলছিলেন সদ্য নিযুক্ত এক মন্ত্রী। তার নতুন দলনেতা তারেক রহমান তখন মাত্রই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক অনুষ্ঠানে শপথ নিয়েছেন। ভাষ্যটি পাওয়া গেল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পাঁচ দিন পর, যে নির্বাচনে মধ্য-ডানপন্থী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ৩০০ আসনের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের মানুষ ওই দিন প্রথম ‘প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে’ ভোট দেয়। ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও ভোটগ্রহণ হয়েছে মূলত শান্তিপূর্ণভাবে। এই ‘ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে’ ভবিষ্যৎমুখী করতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার গণভোটে “হ্যাঁ” -সূচক ভোট দিয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের এই ফলাফল আসলে দেশটিতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের আইনি হাতিয়ার।
গত ১৫ বছর ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ‘সাজানো নির্বাচনের’ আয়োজন করেছে, বিরোধীদের জেল পুরেছে ও হত্যা করেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘চাটুকারদের’ দিয়ে ভরে ফেলেছে। এরপর আসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ‘বিপ্লব’। ২০২৪ সালের আগস্টে ১ হাজার ৪০০ প্রাণের বিনিময়ে সেই শাসনের পতন ঘটে। গত ১৮ মাস ধরে একটি অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ‘অশীতিপর’ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছে।
তবে নতুন শুরুর এত সব আলোচনার মাঝেও ভোটাররা শেষ পর্যন্ত এক ‘পুরনো রক্ষক’ (ওল্ড গার্ড) দলের ওপরই আস্থা রেখেছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বিএনপির সর্বশেষ শাসনামলের পুরনো অভ্যাসগুলো সহজে যাওয়ার নয়। ‘টানা পাঁচ বছর ধরে’ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সেই ‘কুখ্যাত’ তকমা পেতে হয়েছিল। একটি রাজনৈতিক রাজবংশের উত্তরসূরি তারেক রহমান দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে অপরিচিত কেউ নন, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেন।
তারেক রহমানকে এখন প্রমাণ করতে হবে, তিনি একটি ‘অধিকতর ভালো’ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি নিয়ে ভাবার জন্য লন্ডনের শহরতলিতে তিনি ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির কার্যালয় ব্রিটেন-ফেরত নেতা-কর্মীদের ভিড়ে মুখরিত ছিল এবং সেই “প্রত্যাগত পুত্র” তার বিভিন্ন বক্তৃতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তবে আসল পরীক্ষা এখন শুরু।

প্রথম অংশটি হলো ‘নতুন গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা’। এটি কার্যকর করতে হলে সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। ছয়টি আসন জেতা ‘হতাশ’ জেন-জি বিক্ষোভকারী (এনসিপি) থেকে শুরু করে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইসলামপন্থীদেরও। আর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কী হবে? প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটদানের হার ইঙ্গিত দেয়, অনেকে তাদের দলের ওপর অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে আমলে নিয়ে ভোট দিতে যাননি, রয়েছেন আড়ালে। বিএনপি অবশ্য জোরালোভাবে (যদিও তা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়) দাবি করছে যে, আদালতই কেবল সিদ্ধান্ত নেবে আওয়ামী লীগ কবে এবং কোন শর্তে রাজনীতিতে ফিরতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা থেকে শুরু করে উচ্চকক্ষ গঠন পর্যন্ত অতিপ্রয়োজনীয় কিছু গণতান্ত্রিক ‘রক্ষাকবচ’ নির্ধারণ করা হয়েছে গণভোটের মাধ্যমে। কিন্তু বিএনপি খুব ভালো করেই জানে, ক্ষমতায় থাকায় এই নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যগুলো এখন তাদের নিজেদেরই বাধাগ্রস্ত করবে। তাই খুব একটা অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয় যে, দলটি গোপনে তাদের কর্মীদের ‘না’ ভোটের প্রচারণায় পাঠিয়েছিল। এখন তারা সুযোগ খুঁজছে নিয়মগুলো ‘কীভাবে বাদ দেওয়া যায়’।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি অর্থনৈতিক। আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, অনেক বাণিজ্যিক ও ঋণ সুবিধা হারানো। ঠিক এই সময়েই সরকার ব্যস্ত রয়েছে প্রভাবশালী দোসরদের পাচার করা বার্ষিক প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার উদ্ধারের চেষ্টায়। নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, তার কর্মতালিকায় রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দেশের শোচনীয় ৭ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ব্যবসা করার ব্যয় ও সহজীকরণ নিয়ে কাজ করা এবং হংকং থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত ফান্ড ম্যানেজারদের আকৃষ্ট করা।
সবশেষে, বাংলাদেশ তার ‘শক্তিশালী প্রতিবেশী’ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের একটি ‘রিসেট’ বা নতুন সূচনা চায়। তাদের কূটনীতিকদের মুখে এখন নতুন একটি শব্দ: সম্পর্কে ‘মর্যাদা’ ফিরিয়ে আনতে হবে। একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেন, “২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ অনেকটা ভারতের মক্কেলের মতো ছিল।” শেখ হাসিনা, যার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তিনি এখনো ভারতের অতিথি হিসেবে দিল্লির এক বাংলোতে অবস্থান করছেন।
তারেক রহমানের বিএনপি অবশ্য ‘খামখেয়ালি’ অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে কিছুটা বেশি বাস্তববাদী সুর বজায় রাখছে। তবে পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শেখ হাসিনার আমলে হওয়া বিতর্কিত ব্যবসায়িক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে তারা নতুন করে শর্ত নির্ধারণ করতে চায়। নির্বাচনের পর নিজের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান আমেরিকার আরেকটি আমদানি করা স্লোগান দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। করতালির মাঝে তিনি ঘোষণা করেন, “সবার আগে বাংলাদেশ”।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনোমিস্ট থেকে অনূদীত

“আমেরিকার মতো!”–উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে এভাবেই বলছিলেন সদ্য নিযুক্ত এক মন্ত্রী। তার নতুন দলনেতা তারেক রহমান তখন মাত্রই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক অনুষ্ঠানে শপথ নিয়েছেন। ভাষ্যটি পাওয়া গেল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পাঁচ দিন পর, যে নির্বাচনে মধ্য-ডানপন্থী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ৩০০ আসনের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের মানুষ ওই দিন প্রথম ‘প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে’ ভোট দেয়। ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও ভোটগ্রহণ হয়েছে মূলত শান্তিপূর্ণভাবে। এই ‘ভঙ্গুর গণতন্ত্রকে’ ভবিষ্যৎমুখী করতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার গণভোটে “হ্যাঁ” -সূচক ভোট দিয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের এই ফলাফল আসলে দেশটিতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের আইনি হাতিয়ার।
গত ১৫ বছর ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ‘সাজানো নির্বাচনের’ আয়োজন করেছে, বিরোধীদের জেল পুরেছে ও হত্যা করেছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘চাটুকারদের’ দিয়ে ভরে ফেলেছে। এরপর আসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ‘বিপ্লব’। ২০২৪ সালের আগস্টে ১ হাজার ৪০০ প্রাণের বিনিময়ে সেই শাসনের পতন ঘটে। গত ১৮ মাস ধরে একটি অন্তর্বর্তী সরকার শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ‘অশীতিপর’ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছে।
তবে নতুন শুরুর এত সব আলোচনার মাঝেও ভোটাররা শেষ পর্যন্ত এক ‘পুরনো রক্ষক’ (ওল্ড গার্ড) দলের ওপরই আস্থা রেখেছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বিএনপির সর্বশেষ শাসনামলের পুরনো অভ্যাসগুলো সহজে যাওয়ার নয়। ‘টানা পাঁচ বছর ধরে’ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সেই ‘কুখ্যাত’ তকমা পেতে হয়েছিল। একটি রাজনৈতিক রাজবংশের উত্তরসূরি তারেক রহমান দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে অপরিচিত কেউ নন, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেন।
তারেক রহমানকে এখন প্রমাণ করতে হবে, তিনি একটি ‘অধিকতর ভালো’ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি নিয়ে ভাবার জন্য লন্ডনের শহরতলিতে তিনি ১৭ বছরের দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়েছেন। নির্বাচনের আগে বিএনপির কার্যালয় ব্রিটেন-ফেরত নেতা-কর্মীদের ভিড়ে মুখরিত ছিল এবং সেই “প্রত্যাগত পুত্র” তার বিভিন্ন বক্তৃতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তবে আসল পরীক্ষা এখন শুরু।

প্রথম অংশটি হলো ‘নতুন গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা’। এটি কার্যকর করতে হলে সবাইকে নিয়েই চলতে হবে। ছয়টি আসন জেতা ‘হতাশ’ জেন-জি বিক্ষোভকারী (এনসিপি) থেকে শুরু করে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইসলামপন্থীদেরও। আর আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কী হবে? প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটদানের হার ইঙ্গিত দেয়, অনেকে তাদের দলের ওপর অন্তর্বর্তী সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে আমলে নিয়ে ভোট দিতে যাননি, রয়েছেন আড়ালে। বিএনপি অবশ্য জোরালোভাবে (যদিও তা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়) দাবি করছে যে, আদালতই কেবল সিদ্ধান্ত নেবে আওয়ামী লীগ কবে এবং কোন শর্তে রাজনীতিতে ফিরতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা থেকে শুরু করে উচ্চকক্ষ গঠন পর্যন্ত অতিপ্রয়োজনীয় কিছু গণতান্ত্রিক ‘রক্ষাকবচ’ নির্ধারণ করা হয়েছে গণভোটের মাধ্যমে। কিন্তু বিএনপি খুব ভালো করেই জানে, ক্ষমতায় থাকায় এই নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যগুলো এখন তাদের নিজেদেরই বাধাগ্রস্ত করবে। তাই খুব একটা অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয় যে, দলটি গোপনে তাদের কর্মীদের ‘না’ ভোটের প্রচারণায় পাঠিয়েছিল। এখন তারা সুযোগ খুঁজছে নিয়মগুলো ‘কীভাবে বাদ দেওয়া যায়’।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি অর্থনৈতিক। আগামী নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো, অনেক বাণিজ্যিক ও ঋণ সুবিধা হারানো। ঠিক এই সময়েই সরকার ব্যস্ত রয়েছে প্রভাবশালী দোসরদের পাচার করা বার্ষিক প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার উদ্ধারের চেষ্টায়। নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, তার কর্মতালিকায় রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দেশের শোচনীয় ৭ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ব্যবসা করার ব্যয় ও সহজীকরণ নিয়ে কাজ করা এবং হংকং থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত ফান্ড ম্যানেজারদের আকৃষ্ট করা।
সবশেষে, বাংলাদেশ তার ‘শক্তিশালী প্রতিবেশী’ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের একটি ‘রিসেট’ বা নতুন সূচনা চায়। তাদের কূটনীতিকদের মুখে এখন নতুন একটি শব্দ: সম্পর্কে ‘মর্যাদা’ ফিরিয়ে আনতে হবে। একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেন, “২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ অনেকটা ভারতের মক্কেলের মতো ছিল।” শেখ হাসিনা, যার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তিনি এখনো ভারতের অতিথি হিসেবে দিল্লির এক বাংলোতে অবস্থান করছেন।
তারেক রহমানের বিএনপি অবশ্য ‘খামখেয়ালি’ অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে কিছুটা বেশি বাস্তববাদী সুর বজায় রাখছে। তবে পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং শেখ হাসিনার আমলে হওয়া বিতর্কিত ব্যবসায়িক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে তারা নতুন করে শর্ত নির্ধারণ করতে চায়। নির্বাচনের পর নিজের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান আমেরিকার আরেকটি আমদানি করা স্লোগান দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। করতালির মাঝে তিনি ঘোষণা করেন, “সবার আগে বাংলাদেশ”।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনোমিস্ট থেকে অনূদীত