Advertisement Banner

যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প, পিছু হঠতে নারাজ ইরান

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প, পিছু হঠতে নারাজ ইরান
ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরান কেউই আর যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যেতে চায় না বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যে তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা চললেও তা পাকিস্তান, কাতার ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে চলমান আলোচনাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌ ও বিমানবাহিনী এখনো ইরানের ওপর আঘাত করার মতো দূরত্বে অবস্থান করছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরান সরকারও তাদের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে। সেই সঙ্গে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ও বাহিনী পুনর্গঠনে এই যুদ্ধবিরতিকে কাজে লাগাচ্ছে।

উপসাগরীয় অঞ্চল ও এর আশপাশের এই সামরিক উত্তেজনা যেকোনো মুহূর্তে ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাবনিকাশের এক বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র মূলত কাছাকাছি অবস্থান করে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সামর্থ্য দেখিয়ে তেহরান সরকারের ওপর চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাতে ইরান ছাড় দিতে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে, ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে তাদের প্রতিরোধের দেওয়াল এখনো ভাঙেনি। প্রয়োজনে তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং আরব উপসাগরের বিস্তীর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানতেও দ্বিধা করবে না।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বড় চুক্তির পথটি দীর্ঘ এবং হয়তো বেশ কঠিন। তবে সেই পথের প্রথম লক্ষ্য হলো- যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং পরবর্তী আলোচনার এজেন্ডা ঠিক করতে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ সই করা।

তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈরুতে আবারও বোমাবর্ষণ শুরু হবে- ইসরায়েলের এমন ঘোষণা ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথ আরও সংকীর্ণ করে দিয়েছে।

লেবাননে নতুন করে এই হামলা শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চুক্তির পথ কঠিন হয়ে যাবে. তবে তা নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। কারণ, তেহরান সরকারের সঙ্গে এই যুদ্ধবিরতি তিনি শুরু থেকেই চাননি। তার মতে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার যেকোনো চুক্তিই আদতে একটি ‘খারাপ চুক্তি’।

এদিকে ইরান লেবাননে তাদের মিত্র ও প্রক্সি বাহিনী হিজবুল্লাহকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।

ইরানি পক্ষ স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো বড় চুক্তি হতে হলে ইসরায়েলি আগ্রাসনের অবসান ঘটাতেই হবে। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন ইসরায়েলকে সংযত রাখার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে ইরান সরকার একটি বড় মূল্য দাবি করবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যা হতে পারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা তাদের জব্দ করা তহবিল ফিরিয়ে দেওয়া। আর গুরুতর কোনো আলোচনার জন্য এই নৌপথটি সচল করা একটি পূর্বশর্ত বলে মনে হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এই জলপথ দিয়ে এখন হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি জাহাজ চলাচল করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই প্রণালীটি বন্ধ করে দিয়েছিল।

সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল লোহিত সাগরের বন্দরে পাঠাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও (ইউএই) ওমান উপসাগরের উপকূলে থাকা তাদের টার্মিনালে পাইপলাইন দিয়ে তেল পাঠাচ্ছে, যা হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত।

কিন্তু এর পরও সারা বিশ্ব তাদের স্বাভাবিক তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে অন্য সব জরুরি পণ্যের রপ্তানিও আটকে গেছে।

এই প্রণালি বন্ধ থাকা মানে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিরাট বিপর্যয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভর করে না, ঠিকই, কিন্তু আমেরিকার বাজারে তেলের দাম এখনো বিশ্ববাজারের ওপরই নির্ভর করে।

ট্রাম্প এখন বড় বিপাকে পড়েছেন। খুব সহজেই জিতে যাবেন এমনটা ভেবে তিনি যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেই মারাত্মক ভুলের ফাঁদেই এখন তিনি আটকে গেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহু একটা বড় ভুল করেছিলেন। ইরান সরকার যে তাদের হামলা ঠেকিয়ে এভাবে টিকে থাকতে পারবে, তা তারা ভাবতেই পারেননি।

এই পরিস্থিতি থেকে সহজে বের হওয়ার কোনো পথ ট্রাম্পের জানা নেই, আর ইরানও চায় ট্রাম্প এভাবেই ফেঁসে থাকুন।

ইরান যুদ্ধ। ছবি: রয়টার্স
ইরান যুদ্ধ। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের এখন যেকোনো উপায়ে হরমুজ প্রণালি চালু করা দরকার। কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আমেরিকার মানুষ মোটেও পছন্দ করছে না। যুদ্ধ আবার বাড়লে আরও বহু আমেরিকান তাঁর ওপর খেপে যাবে।

কিন্তু ট্রাম্পের আসল সমস্যা হলো প্রণালী খোলার জন্য ইরান যে শর্ত দেবে, তা ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীরা একেবারেই মানবে না। আবার ট্রাম্প নিজেও চান না কোনো শর্ত মেনে নিয়ে নিজের ‘জয়’ জাহির করার সুযোগ হাতছাড়া করতে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার করা যেকোনো চুক্তিকে বারাক ওবামার ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির সঙ্গে তুলনা করাটা মোটেও সহ্য করতে পারেন না। তা সে আলোচনা দীর্ঘ করার জন্য সাধারণ কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিই হোক না কেন। ওবামার সেই চুক্তিকে ট্রাম্প সবসময় ‘নিন্দনীয়’ বলে এসেছেন এবং হোয়াইট হাউজে তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে বের করেও এনেছিলেন।

অন্যদিকে, ইরানের শাসকেরা বেশ যৌক্তিক কারণেই বিশ্বাস করেন যে তারা এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন।

তাই এটা পরিষ্কার যে, ইসরায়েলকে সাথে নিয়ে বা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যতই হামলা চালাুক না কেন, ইরানকে তাদের অবস্থান থেকে নড়ানো যাবে না।

এদিকে উপসাগরীয় ধনী আরব তেল আমদানিকারক দেশগুলো এই যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং তারা আর কোনো ক্ষতি চায় না।

তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের মূল ভিত্তিই হলো উপসাগরীয় অঞ্চলকে বিশ্ব অর্থনীতির একটি স্থিতিশীল কেন্দ্র এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে ধরে রাখা।

কিন্তু এই যুদ্ধ তাদের সেই ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে। আগের সেই স্থিতিশীল পরিবেশ ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে তাদের এখন বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে।

আলোচনা আবার শুরু করার জন্য পাকিস্তানের পাশাপাশি কাতারও এখন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পুরোদমে কাজ করছে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং সৌদি আরব দুই দেশ দুইভাবে ইরানের মুখোমুখি হয়েছে।

আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। ইসরায়েল ইতিমধ্যে আমিরাতে তাদের ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসিয়েছে এবং তা চালানোর জন্য নিজেদের সৈন্যও পাঠিয়েছে।

অন্যদিকে জানা গেছে, সৌদি আরবও ইরানের ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদির বড় কর্তারা ইরানকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে—তারা এই হামলা নিজেদের সিদ্ধান্তে করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের দলের অংশ হয়ে নয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন ভেবেছিলেন তাঁদের শক্তিশালী বিমানবাহিনী দিয়েই ইরানের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে।

কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল ছিল।

যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা আর একাকীত্বের মধ্যেও যে সরকার প্রায় ৫০ বছর ধরে টিকে আছে, তার ক্ষমতা বুঝতে তারা ভুল করেছিলেন।

এখন সেই ভুলের ফল ভোগ করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আর ভুগতে হচ্ছে বাকি পুরো বিশ্বকেও।

বিবিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত

সম্পর্কিত