বিবিসির প্রতিবেদন
চরচা ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার যে সিদ্ধান্ত আমেরিকা-ইসরায়েল নিয়েছে, তা এক বিপজ্জনক মুহূর্ত তৈরি করেছে। যার ফলাফল হতে পারে অভাবনীয়। ইসরায়েল তাদের এই আক্রমণকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে ‘প্রি-এম্পটিভ’ বা ‘আগাম সতর্কতামূলক’ কার্যক্রম হিসেবে ব্যবহার করেছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, এটি কোনো আসন্ন হুমকির পাল্টা জবাব নয়। এটি একটি ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’, যাকে ‘ওয়ার অফ চয়েস’ বলা হয়। এ সংঘাত সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। তাতে বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বাউয়েন এমন মন্তব্যই করেছেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হিসেব কষে দেখেছে, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা বর্তমানে বেশ নড়বড়ে অবস্থায় আছে। ইরান ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। বছরের শুরুর দিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো নির্মম দমন-পীড়নের নেতিবাচক প্রভাব কাটেনি। পাশাপাশি গতবার যুদ্ধের কারণে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো ক্ষতিগ্রস্ত। আমেরিকা এবং তার মিত্রদের এখন এটাই মনে হচ্ছে, এটি এমন এক সুযোগ, যা কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। এছাড়া, এই পদক্ষেপটি বর্তমানে ধুঁকতে থাকা আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থার ওপর আরও একটি বড় আঘাত।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই তাদের বিবৃতিতে বলেছেন, ইরান তাদের দেশের জন্য হুমকি। ট্রাম্প তো একে বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটা ঠিক, ইসলামি শাসনব্যবস্থা তাদের চরম শত্রু। কিন্তু একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যদিকে ইরান–এই দুই পক্ষের শক্তির মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, তাতে এখানে ‘আত্মরক্ষার’ আইনি যুক্তি প্রয়োগ করাটা বেশ কঠিন।
যুদ্ধ মূলত একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। একবার সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজাতভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নেতাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত কয়েক দশক ধরে ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু হিসেবে দেখে আসছেন। তার কাছে মনে হচ্ছে, তেহরানের শাসনব্যবস্থা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার যতটা সম্ভব ক্ষতি করার এটাই বড় সুযোগ। এছাড়া, এই বছরের শেষের দিকে নেতানিয়াহুকে সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। হামাসের সঙ্গে গত দুই বছরের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন ইসরায়েল যুদ্ধে লিপ্ত থাকলে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্যগুলো স্বভাবসুলভ ভাবেই বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। গত জানুয়ারিতে তিনি ইরানের বিক্ষোভকারীদের বলেছিলেন ‘সাহায্য আসছে’। কিন্তু সেই সময়ে মার্কিন নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ ভেনেজুয়েলার নেতাকে অপসারণে ব্যস্ত থাকায় তার হাতে পর্যাপ্ত সামরিক বিকল্প ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলে দুটি ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ (রণতরী বহর) এবং বিশাল স্থল-ভিত্তিক সামরিক শক্তি মোতায়েন করছিল, তখন ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপদ নিয়ে অনেক কথা বলেন। অথচ গত যুদ্ধের পর তিনি নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের সরকার বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে আসছে। তবে তারা এমন পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যার কোনো বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নেই। অন্ততপক্ষে, তারা একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ খোলা রাখতে চায় বলে মনে হয়। যদিও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি। যেখানে বলা হয়েছে, ‘ইরান এখনই বোমা বানিয়ে ফেলছে’।
নিজের ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের জনগণকে বলেছিলেন, “মুক্তির সময়” ঘনিয়ে এসেছে। নেতানিয়াহুও একই সুর মিলিয়েছিলেন, এই যুদ্ধ ইরানের মানুষকে বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার সুযোগ করে দেবে। তবে বিষয়টি মোটেও নিশ্চিত নয়।
শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে কোথাও ‘ক্ষমতা বদল’ বা ‘সরকার পতন’ হয়েছে–এমন নজির ইতিহাসে নেই। ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল বিশাল মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণকারী বাহিনীর মাধ্যমে। ২০১১ সালে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাত করেছিল বিদ্রোহী বাহিনী, যাদের ন্যাটোর বিমান বাহিনী এবং কিছু আরব রাষ্ট্র সহায়তা দিয়েছিল।
উভয় ক্ষেত্রেই ফলাফল ছিল রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া, গৃহযুদ্ধ এবং হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। লিবিয়া আজও একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’। ইরাকও আজও সেই আগ্রাসন এবং পরবর্তী রক্তপাতের পরিণাম ভোগ করছে।

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয়, ইতিহাসে এই প্রথমবার শুধুমাত্র বিমান শক্তির জোরে কোনো সরকারের পতন ঘটবে, তবুও সেই ইসলামি শাসনব্যবস্থার জায়গায় কোনো মানবাধিকার সম্পন্ন উদারপন্থী গণতন্ত্র আসবে না। কারণ, বিদেশে নির্বাসিত এমন কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প সরকার নেই যারা দ্রুত ক্ষমতা বুঝে নিতে প্রস্তুত।
গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি জটিল রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। যার ভিত্তি হলো আদর্শ, দুর্নীতি এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের নিষ্ঠুর ব্যবহার। গত জানুয়ারিতে তেহরান প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা বিক্ষোভকারীদের দমনে কতটা কঠোর হতে পারে। ইরানের এমন এক নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে, যারা রাজপথে সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানানো বা স্বাধীনতার দাবি তোলা হাজার হাজার স্বদেশীকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ পালন করে।
হয়তো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার চেষ্টা করছে। ইসরায়েল কৌশল হিসেবে ‘গুপ্তহত্যার’ শক্তিতে বিশ্বাসী। গত দুই বছরে তারা গাজায় হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি তাদের অনেক সহযোগীকেও হত্যা করেছে।
তবে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা একটি ভিন্ন বিষয়। এটি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এটি কোনো একজনের একক নিয়ন্ত্রণে চলে না। যদি সর্বোচ্চ নেতা নিহতও হন, তবে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন অন্য কোনো ধর্মীয় নেতা, যাকে সমর্থন দেবে ইরানের ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইএরজিসি)। এই বাহিনীটি সাধারণ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিশেষভাবে কাজ করে যার মূল লক্ষ্য হলো দেশে ও বিদেশে শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা।
ট্রাম্প তাদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, অস্ত্র সমর্পণ করলে ক্ষমা করা হবে, অন্যথায় মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু আইআরজিসির সদস্যরা তার এই প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ শিয়া ইসলাম এবং এই প্রজাতন্ত্রের আদর্শে ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগ একটি চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, রাজনীতি এবং জীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো লেনদেন বা ‘গিভ অ্যান্ড টেক’, যা তার বইয়ের ভাষায় ‘আর্ট অফ দ্য ডিল’। কিন্তু ইরানের সাথে ডিল করতে হলে তাদের আদর্শ ও বিশ্বাসের শক্তিকেও হিসেবে রাখতে হবে, যা পরিমাপ করা অনেক বেশি কঠিন।
বছরের শুরু থেকে এই সংকট যখন ঘনীভূত হচ্ছিল এবং আমেরিকা তাদের নৌবহর প্রস্তুত করছিল, তখন থেকেই তেহরানের নেতৃত্বে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল যে, তারা যুদ্ধকে অনিবার্য মনে করছে। গত যুদ্ধে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালিয়েছিল, তখনও তারা আলোচনার টেবিলে ছিল। তাই এবারও তারা আলোচনার বিষয়ে সচেতন ছিল।
ইরান কখনো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলিদের বিশ্বাস করে না। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, যা ওবামা প্রশাসনের একটি বড় সাফল্য ছিল এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত রেখেছিল।
এখানে এমন কিছু ইঙ্গিত ছিল, ইরান হয়তো সময়ের প্রয়োজনে এই চুক্তির দ্বিতীয় কোনো সংস্করণে রাজি হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করার মতো কঠোর শর্ত দিচ্ছিল।
ইরানের কাছে এটি ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং এক প্রকার আত্মসমর্পণ। তাদের নেতৃত্বের ধারণা ক্ষেপণাস্ত্র এবং মিত্রদের ত্যাগ করলে তারা বর্তমানের এই আক্রমণের চেয়েও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়বে এবং ক্ষমতা হারাবে।
ইরানের নেতারা এখন হিসেব করছেন, কীভাবে এই যুদ্ধ কাটিয়ে ওঠা যায়, কীভাবে টিকে থাকা যায় এবং এর ফলাফল মোকাবিলা করা যায়। অন্যদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন প্রতিবেশী দেশগুলো আজকের এই ঘটনার অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণাম দেখে আতঙ্কিত বোধ করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যেভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এই নতুন এবং তীব্রতর যুদ্ধ বর্তমানের অশান্ত ও বিপজ্জনক বিশ্বকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলবে।

ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার যে সিদ্ধান্ত আমেরিকা-ইসরায়েল নিয়েছে, তা এক বিপজ্জনক মুহূর্ত তৈরি করেছে। যার ফলাফল হতে পারে অভাবনীয়। ইসরায়েল তাদের এই আক্রমণকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে ‘প্রি-এম্পটিভ’ বা ‘আগাম সতর্কতামূলক’ কার্যক্রম হিসেবে ব্যবহার করেছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, এটি কোনো আসন্ন হুমকির পাল্টা জবাব নয়। এটি একটি ‘ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ’, যাকে ‘ওয়ার অফ চয়েস’ বলা হয়। এ সংঘাত সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। তাতে বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বাউয়েন এমন মন্তব্যই করেছেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হিসেব কষে দেখেছে, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা বর্তমানে বেশ নড়বড়ে অবস্থায় আছে। ইরান ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। বছরের শুরুর দিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো নির্মম দমন-পীড়নের নেতিবাচক প্রভাব কাটেনি। পাশাপাশি গতবার যুদ্ধের কারণে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো ক্ষতিগ্রস্ত। আমেরিকা এবং তার মিত্রদের এখন এটাই মনে হচ্ছে, এটি এমন এক সুযোগ, যা কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। এছাড়া, এই পদক্ষেপটি বর্তমানে ধুঁকতে থাকা আন্তর্জাতিক আইন ব্যবস্থার ওপর আরও একটি বড় আঘাত।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই তাদের বিবৃতিতে বলেছেন, ইরান তাদের দেশের জন্য হুমকি। ট্রাম্প তো একে বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটা ঠিক, ইসলামি শাসনব্যবস্থা তাদের চরম শত্রু। কিন্তু একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যদিকে ইরান–এই দুই পক্ষের শক্তির মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান, তাতে এখানে ‘আত্মরক্ষার’ আইনি যুক্তি প্রয়োগ করাটা বেশ কঠিন।
যুদ্ধ মূলত একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। একবার সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা সহজাতভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নেতাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত কয়েক দশক ধরে ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু হিসেবে দেখে আসছেন। তার কাছে মনে হচ্ছে, তেহরানের শাসনব্যবস্থা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার যতটা সম্ভব ক্ষতি করার এটাই বড় সুযোগ। এছাড়া, এই বছরের শেষের দিকে নেতানিয়াহুকে সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। হামাসের সঙ্গে গত দুই বছরের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন ইসরায়েল যুদ্ধে লিপ্ত থাকলে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্যগুলো স্বভাবসুলভ ভাবেই বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। গত জানুয়ারিতে তিনি ইরানের বিক্ষোভকারীদের বলেছিলেন ‘সাহায্য আসছে’। কিন্তু সেই সময়ে মার্কিন নৌবাহিনীর বড় একটি অংশ ভেনেজুয়েলার নেতাকে অপসারণে ব্যস্ত থাকায় তার হাতে পর্যাপ্ত সামরিক বিকল্প ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র যখন এই অঞ্চলে দুটি ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ (রণতরী বহর) এবং বিশাল স্থল-ভিত্তিক সামরিক শক্তি মোতায়েন করছিল, তখন ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপদ নিয়ে অনেক কথা বলেন। অথচ গত যুদ্ধের পর তিনি নিজেই ঘোষণা করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের সরকার বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে আসছে। তবে তারা এমন পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যার কোনো বেসামরিক বা শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নেই। অন্ততপক্ষে, তারা একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ খোলা রাখতে চায় বলে মনে হয়। যদিও ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি। যেখানে বলা হয়েছে, ‘ইরান এখনই বোমা বানিয়ে ফেলছে’।
নিজের ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ইরানের জনগণকে বলেছিলেন, “মুক্তির সময়” ঘনিয়ে এসেছে। নেতানিয়াহুও একই সুর মিলিয়েছিলেন, এই যুদ্ধ ইরানের মানুষকে বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাত করার সুযোগ করে দেবে। তবে বিষয়টি মোটেও নিশ্চিত নয়।
শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে কোথাও ‘ক্ষমতা বদল’ বা ‘সরকার পতন’ হয়েছে–এমন নজির ইতিহাসে নেই। ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল বিশাল মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমণকারী বাহিনীর মাধ্যমে। ২০১১ সালে লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাত করেছিল বিদ্রোহী বাহিনী, যাদের ন্যাটোর বিমান বাহিনী এবং কিছু আরব রাষ্ট্র সহায়তা দিয়েছিল।
উভয় ক্ষেত্রেই ফলাফল ছিল রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া, গৃহযুদ্ধ এবং হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু। লিবিয়া আজও একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’। ইরাকও আজও সেই আগ্রাসন এবং পরবর্তী রক্তপাতের পরিণাম ভোগ করছে।

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেওয়া হয়, ইতিহাসে এই প্রথমবার শুধুমাত্র বিমান শক্তির জোরে কোনো সরকারের পতন ঘটবে, তবুও সেই ইসলামি শাসনব্যবস্থার জায়গায় কোনো মানবাধিকার সম্পন্ন উদারপন্থী গণতন্ত্র আসবে না। কারণ, বিদেশে নির্বাসিত এমন কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প সরকার নেই যারা দ্রুত ক্ষমতা বুঝে নিতে প্রস্তুত।
গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থা একটি জটিল রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। যার ভিত্তি হলো আদর্শ, দুর্নীতি এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের নিষ্ঠুর ব্যবহার। গত জানুয়ারিতে তেহরান প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা বিক্ষোভকারীদের দমনে কতটা কঠোর হতে পারে। ইরানের এমন এক নিরাপত্তা বাহিনী রয়েছে, যারা রাজপথে সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ জানানো বা স্বাধীনতার দাবি তোলা হাজার হাজার স্বদেশীকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ পালন করে।
হয়তো যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার চেষ্টা করছে। ইসরায়েল কৌশল হিসেবে ‘গুপ্তহত্যার’ শক্তিতে বিশ্বাসী। গত দুই বছরে তারা গাজায় হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি তাদের অনেক সহযোগীকেও হত্যা করেছে।
তবে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা একটি ভিন্ন বিষয়। এটি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এটি কোনো একজনের একক নিয়ন্ত্রণে চলে না। যদি সর্বোচ্চ নেতা নিহতও হন, তবে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন অন্য কোনো ধর্মীয় নেতা, যাকে সমর্থন দেবে ইরানের ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইএরজিসি)। এই বাহিনীটি সাধারণ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিশেষভাবে কাজ করে যার মূল লক্ষ্য হলো দেশে ও বিদেশে শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা।
ট্রাম্প তাদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, অস্ত্র সমর্পণ করলে ক্ষমা করা হবে, অন্যথায় মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু আইআরজিসির সদস্যরা তার এই প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ শিয়া ইসলাম এবং এই প্রজাতন্ত্রের আদর্শে ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগ একটি চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, রাজনীতি এবং জীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো লেনদেন বা ‘গিভ অ্যান্ড টেক’, যা তার বইয়ের ভাষায় ‘আর্ট অফ দ্য ডিল’। কিন্তু ইরানের সাথে ডিল করতে হলে তাদের আদর্শ ও বিশ্বাসের শক্তিকেও হিসেবে রাখতে হবে, যা পরিমাপ করা অনেক বেশি কঠিন।
বছরের শুরু থেকে এই সংকট যখন ঘনীভূত হচ্ছিল এবং আমেরিকা তাদের নৌবহর প্রস্তুত করছিল, তখন থেকেই তেহরানের নেতৃত্বে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল যে, তারা যুদ্ধকে অনিবার্য মনে করছে। গত যুদ্ধে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ চালিয়েছিল, তখনও তারা আলোচনার টেবিলে ছিল। তাই এবারও তারা আলোচনার বিষয়ে সচেতন ছিল।
ইরান কখনো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলিদের বিশ্বাস করে না। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, যা ওবামা প্রশাসনের একটি বড় সাফল্য ছিল এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত রেখেছিল।
এখানে এমন কিছু ইঙ্গিত ছিল, ইরান হয়তো সময়ের প্রয়োজনে এই চুক্তির দ্বিতীয় কোনো সংস্করণে রাজি হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করার মতো কঠোর শর্ত দিচ্ছিল।
ইরানের কাছে এটি ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং এক প্রকার আত্মসমর্পণ। তাদের নেতৃত্বের ধারণা ক্ষেপণাস্ত্র এবং মিত্রদের ত্যাগ করলে তারা বর্তমানের এই আক্রমণের চেয়েও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়বে এবং ক্ষমতা হারাবে।
ইরানের নেতারা এখন হিসেব করছেন, কীভাবে এই যুদ্ধ কাটিয়ে ওঠা যায়, কীভাবে টিকে থাকা যায় এবং এর ফলাফল মোকাবিলা করা যায়। অন্যদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন প্রতিবেশী দেশগুলো আজকের এই ঘটনার অনিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণাম দেখে আতঙ্কিত বোধ করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যেভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে এই নতুন এবং তীব্রতর যুদ্ধ বর্তমানের অশান্ত ও বিপজ্জনক বিশ্বকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তুলবে।